Tuesday, 4 May 2021

শিক্ষাঃ ব্যক্তি ও সমাজ


ছাত্র অবস্থা থেকেই শিক্ষার গৌরবগাঁথা শুনে এসেছি। ‘কানু বিনে যেমন গীত নেই’, তেমনি দেশ ও সমাজের কল্যাণে ‘শিক্ষা বিনা প্রগতি নাই’ এই আপ্তবাক্য বিভিন্ন উপলক্ষ্যে ব্যক্ত হয়েছে। ‘সত্য’, ‘শিক্ষা’, ‘জ্ঞান’, ‘কর্ম’ বিভিন্ন শব্দই শেষ পর্যন্ত্য তাদের স্ব-আরোপিত  মহিমায় এমন কুহকজাল বিস্তার করে থাকে, যে সাধারণ বিচার বুদ্ধি দিয়ে এগুলি না মাপাই ভালো এমন একটা ধারণা আমাদের পেয়ে বসে।  তাই পণ্ডিতদের এক্তিয়ারে এদের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের দায় ঠেলে আমরা আমাদের প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতায় এদের অবক্ষয়ের পীড়ায় পীড়িত হতে থাকি। হয় কোনো অতীত স্বর্গরাজ্যের স্বান্তনায়, নয় ভবিষ্যতে তার পুনরাবির্ভাবের প্রেরণায় বর্তমানকে দুঃসহ যন্ত্রণায় বয়ে বেড়াই।ব্যধির লক্ষণ বিভিন্নভাবেই লক্ষ্য করা যায়। বিপুল পরিমাণে  ‘শিক্ষিত’ বেকার বাহিনীর সৃষ্টিতে, কর্মজীবনের উদ্দেশ্যহীন উচ্চশিক্ষার অপ্রাসঙ্গিকতা, সর্বোপরি সার্বজনীন শিক্ষা প্রসারের প্রতিবন্ধকতা - আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার করুণ চিত্রই তুলে ধরে। আমাদের সামাজিক পশ্চাদপদতার শিলমোহোর যেমন এই শিক্ষাব্যবস্থার গায়ে লেগে আছে - তেমনি শিক্ষার এই দৈন্য দশা সামাজিক প্রগতির অন্তরায়। সুতরাং  ‘আদর্শ’   শিক্ষায় শিক্ষিত মানুষেরা উন্নততর সমাজ গড়ে তুলবে - এই ভাবনাতে   ‘আদর্শ’ শিক্ষার মহত সঙ্কল্প ও উদ্যোগ বিভিন্নভাবেই গ্রহণ করা হয়েছে। তবে এই প্রয়াসগুলিতে প্রথম প্রথম পদ্ধতিগত ভাবে ও বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্যে স্বকীয়তা থাকলেও পরবর্তীকালে সেগুলিও সমাজের ‘গতানুগতিক’ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পর্য্যবসিত হয়। নতুবা সেই উদ্যোগটি অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে থাকে।

 

আমার এ কথার অর্থ এই নয় যে স্বাধীন ভারতবর্ষে পরাধীন ভারতবর্ষের তুলনায় শিক্ষাতে অগ্রগতি ঘটেনি। স্বাধীনতা পরবর্তী দশকগুলিতে শিক্ষাব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি এমন কথাও বলতে চাই না। বর্তমানের দৈন্যদশার পরিপ্রেক্ষিতে আমি যেমন কোনো উজ্জ্বল অতীতকে চিত্রিত করতে চাই না - তেমনি বর্তমান গতানুগতিকতার শৃঙ্খল মোচনের কোনো সংস্কারের দাওয়াইও দিতে চাইনা। এই  আলোচনাতে আমার উদ্দেশ্য এই শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক বাস্তবতার  অনুধাবন এবং তারই সূত্র ধরে ভবিষ্যতের ইঙ্গিত বা দিশা প্রণয়ন। এই অনুশীলনের উপলক্ষ্য এতোটুকুই। এখানে উল্লেখ করা ভালো যে শিক্ষাব্যবস্থা বলতে মূলতঃ বৈজ্ঞানিক অনুশীলন ও অনুসন্ধানের প্রতি আস্থাশীল প্রথাগত শিক্ষাব্যবস্থাকেই আমি বোঝাচ্ছি। এর বাইরেও বিভিন্ন ধর্মীয় ও পারিবারিক বৃত্তি মূলক শিক্ষাকে এ আলোচনার বাইরে রাখা হোলো।

...

সাধারণভাবে আমাদের বর্তমান শিক্ষার কাঠামো ত্রি বা চতুর্স্তরে বিন্যস্ত - প্রাথমিক, মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক, এবং উচ্চশিক্ষা এই ধরণের ক্রমপর্য্যায় পাশ্চাত্য ও অন্যান্য উন্নত দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। যদিও পদ্ধতিগত এবং বিষয়গত নানা পার্থক্য সেখানে রয়ে গেছে। বিশেষ করে আমাদের মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা যে গতানুগতিকতায় বিদ্যালয়ের চৌহদ্দি পার  হয়ে উচ্চশিক্ষার অঙ্গণে   প্রবেশ  করে উন্নত দেশগুলিতে ঠিক সেভাবে এটি ঘটেনা। এ ব্যাপারে আমার এক ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই বরং বলা যাক।

 

বছর পাঁচেক আগে আমি মাস দুএক USAতে ছিলাম। সেখানে যে বাড়ীউলির বাড়ীতে আমি ভাড়া থাকতাম তাঁর দুই ছেলে। বড় ‘মার্ক’ কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার এবং ছোটো ‘জন’ জীববিদ্যার অধ্যাপক।  আঠারো পেরোতেই বিদ্যালয় থেকে মুক্তি পেয়ে মার্ক বেড়িয়ে পরে সঙ্গীত শিল্পী হতে। তার বন্ধুবান্ধবের সাথে দলবল গড়েছিল। দৈনন্দিন জীবন ধারণ করত রেস্তোরাঁতে কাজ করে। এই ভাবে প্রায় বছর পনেরো কাটানোর পর তার শিল্পজীবনে সাফল্যের আশা ছাড়তে হোলো। তখন আবার সে পড়াশুনার জগতে ফিরে আসে। আমেরিকাতে ‘সিটি’ কলেজগুলি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পাঠক্রমে ভর্তি হবার যোগ্যতা অর্জনের সোপান হিসাবে কাজ করে। সেখানে  বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের জন্য বিভিন্ন বিষয়ে পড়াশুনা করা যায়। এর জন্য আলাদা কোনো ডিগ্রি মেলেনা, তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠক্রমগুলিতে ভর্তি হবার যোগ্যতা অর্জন করা যায়। সেই ভাবেই মার্ক যখন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার হিসাবে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করল তখন তার বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। 

 

মার্কের ছোটো ভাই ‘জন’ও বাড়ী থেকে বেড়িয়ে গিয়েছিল (স্কুলের গণ্ডী পেরিয়েই) কাঠের মিস্ত্রী হতে। বছর দুএক তার এক বন্ধুর বাবার কাছে কাঠের ঘরবাড়ী বানানোর প্রশিক্ষণ নেয়। তারপর আবার পড়াশুনার ইচ্ছা মনে জাগলে ‘সিটি কলেজে’ ভর্তি হয় জীববিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনার জন্য।

 

আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই ধরণের আপন ইচ্ছার কদর খুব কমই থাকে। ছাত্রছাত্রীরা তাদের উচ্চশিক্ষার বিষয় নির্বাচন করে চাকরির বাজারে তার দর কতখানি সেই বিচারে। এ ছাড়াও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হবার অদম্য বাসনায় যে কোনো বিষয়কে অবলম্বন করতেও তারা প্রস্তুত। সেখানে ডিগ্রিই মুখ্য বা মোক্ষ, শিক্ষা গৌণ বা নগণ্য। স্বভাবতই প্রশ্ন ওঠে শিক্ষার উদ্দেশ্য কী এবং আদর্শ শিক্ষা ব্যবস্থার স্বরূপ কি? ছাত্র অবস্থা থেকেই এই প্রশ্নদুটি আমাকে যথষ্ট ভাবিয়েছে। 

...

আলোচনার শুরুতে শিক্ষা সম্পর্কিত কতকগুলি চালু ধারণা ও আপ্তবাক্য স্মরণে আনতে চাই। ছাত্র অবস্থা থেকেই এই কথাগুলি শুনে এসেছি এবং এদের প্রভাবে নিজের মত কিছু ধারণা গড়ে তুলেছিলাম। যেমন স্মরণ করা যেতে পারে স্বামীজীর সেই বহুচর্চিত আপ্তবাক্য - “Education is the manifestation of perfection already in a man.” মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ বিকাশই হোলো শিক্ষা। অথবা বহুক্লিশে ক্লিষ্ট হওয়া শ্লোগান, ‘শিক্ষা আনে চেতনা, চেতনা আনে বিপ্লব’। একই ভাবে প্রাচীন ভারতের তপোবনের শিক্ষা এবং আধুনিককালে রবীন্দ্রনাথের ‘আশ্রমিক’ শিক্ষার চিত্রকল্পে আমাদের মনের নানান নিরুচ্চারিত প্রশ্নের উত্তর আমরা মেলাতে চাই। এই প্রশ্নগুলিকেই সামনে রেখে বিভিন্ন মতামতের আলোচনা করতে চাই। 

 

শিক্ষা কী ও কেন - এই প্রশ্নের উত্তর দুভাবে দেওয়া হয় - ‘ব্যক্তির প্রয়োজনে’ শিক্ষা ও ‘সমাজের প্রয়োজনে’   শিক্ষা। এমন নয় যে একটিকে অন্যটির বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দিতে হবে। তবে জোড়টা কোথায় তা   নির্ভর করে, নাড়া কোথায় বাঁধা হবে তার উপর। স্বামীজী যখন ‘অন্তর্নিহিত সত্তার’ পরিপূর্ণ বিকাশ চান, তখন ব্যক্তি মানুষের উপরই তাঁর জোড়। কিন্তু সমাজকে উপেক্ষা করে সে বিকাশ নয়। ‘শিবজ্ঞানে’  ‘জীবসেবা’ করার মন্ত্রের প্রবক্তার  কাছে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণতা আসে সন্ন্যাসীর নিঃস্বার্থ সমাজসেবার মধ্যেই। সাধারণভাবে এই প্রচেষ্টার সম্যক  বাস্তবায়ন সম্ভব কিনা সে বিচার চলতেই পারে, তবে কথাটিতে ‘সমাজে’র উল্ল্যেখ না থাকলেও তাঁর চিন্তাভাবনায় সেটি যে জড়িয়ে ছিল তা অনস্বীকার্য্য।

 

অন্য এক বিচারধারায় সোভিয়েত শিক্ষাবিদ আন্তন ম্যাকারাঙ্কোর বক্তব্যও ভেবে দেখা যেতে পারে। তিনি সোভিয়েত শিক্ষার উদ্দেশ্যের ব্যখ্যা এইভাবে দেন, ‘ আমরা চাই সৃজনশীল কৃষ্টিবান  সোভিয়েত শ্রমজীবী মানুষের প্রতিপালন। সেই লক্ষ্যেই এই ধরণের মানুষের শিক্ষার আয়োজন করতে হবে - বিশেষ করে মাধ্যমিক শিক্ষা। সেই মানুষটিকে আমাদের কর্মদক্ষ করে তুলতে হবে, শৃঙ্খলাপরায়ণ করতে হবে। সে যেন রাজনৈতিক ভাবে সচেতন হয় - তাকে কমসোমলের সদস্য হতে হবে। বলশেভিক হতে হবে। শ্রেণীর প্রতি তাকে দায়িত্ববান হতে হবে। তার সহকর্মীদের যৌথ কর্তৃত্বের প্রতি অনুগত থাকতে হবে। অন্যদিকে নেতৃত্ব প্রদানেও সক্ষম হতে হবে। তাকে হতে হবে একাধারে বিনয়ী, দৃঢ়, দয়ালু, এবং নির্ভীক। তার জীবনসংগ্রামের শর্ত অনুযায়ীই তার চরিত্রকে নমনীয় করে তুলতে হবে। তাকে হতে হবে সক্রিয় সংগঠক - হার না মানা লৌহমানব, আত্মনিয়ন্ত্রণশীল এবং প্রেরণাদায়ী সমষ্টির শাস্তি সে সসম্মানে মেনে নেবে। তাকে হতে হবে সদা হাস্যময় - আনন্দময় - সপ্রতিভ - সংগ্রামী ও সুখী। কেবল ভবিষ্যতের সুখের স্বপ্নে জীবন অতিবাহিত করা নয়, বর্তমান জীবনেও যেন সে সুখী থাকে।’ ম্যাকারেঙ্কো বর্ণিত শিক্ষার উদ্দেশ্যে ‘সমাজ’ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলেও ব্যক্তির বিকাশকে তিনি যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়েছেন।

 

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘তাকেই বলি শ্রেষ্ঠ শিক্ষা, যা কেবল তথ্য পরিবেশন করেনা - যা বিশ্বসত্তার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের জীবনকে গড়ে তোলে।’ বিশ্বসত্তার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যক্তির বিকাশই ছিল তাঁর কাম্য। অন্যদিকে গান্ধীজী মনে করতেন শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য চরিত্র গঠন - ‘The end of knowledge must be the building of character.’ এক্ষেত্রেও সেই অন্তর্নিহিত সত্তার পরিপূর্ণ প্রকাশের প্রতিধ্বনি তাঁর কথাতেও   রবীন্দ্রনাথ ও গান্ধীজী দুজনেই শিক্ষাকে ভারতীয় সমাজের বিশেষ করে গ্রামীণ সমাজের উপযোগী করে গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন।

 

সুতরাং  কারোর শিক্ষার মূলমন্ত্রে ব্যক্তির বিকাশ উচ্চারিত হলেও নেপথ্যে সামাজিক বিকাশের কামনা সুপ্ত থাকে। তেমনি কেউ যখন শিক্ষাকে সমাজের বিকাশের হাতিয়ার করে তোলেন - ব্যক্তিকে তার চালকের ভূমিকায় দেখতে চান। সম্ভবতঃ ফরাসী দার্শনিক রুশোই ছিলেন একমাত্র  ব্যতিক্রম। সমাজ তাঁর কাছে শৃঙ্খল মাত্র। সেই শৃঙ্খলমুক্তি ঘটিয়ে  চরম ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশের সহায়ক  এক কল্পিত শিক্ষার রাজত্বে তিনি বিচরণ করেছেন। যেহেতু বিভিন্ন শিক্ষাবিদের চিন্তাভাবনায় ‘সমাজ’ ও ‘ব্যক্তি’র বিকাশে শিক্ষার প্রয়োজনের বিষয়টি এসেছে, স্বভাবতই প্রশ্ন উঠতে পারে তবে কী তাঁদের মতাদর্শে কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই? সমাজ ও ব্যক্তির প্রয়োজনে শিক্ষা - এই সাধারণ সারমর্মটুকুই কী তাঁদের সবাইকে একই পঙক্তিতে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে? আমাদের পরবর্তী প্রসঙ্গ সেই বৈশিষ্ট্যকরণে - তাঁদের শিক্ষা দর্শনের বৈপরীত্য বুঝে নেওয়ার জন্য।

...

 

প্রখ্যাত আমেরিকান শিক্ষাবিদ জন ডিউই- এর মতে, ‘শিক্ষা আসলে সমাজকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার (Means of social existence)’সমাজের পূর্ণবয়স্ক সদস্যদের সাথে নবাগত শিশুদের দেহে মনে বিপুল ফারাক। সেই শূন্যতা পরিপূরণেই শিক্ষার প্রয়োজন বিভিন্ন পশুপাখিদের ক্ষেত্রেও এ কথা প্রযোজ্য। তাদের অপরিণত শাবকদেরও জীবনধারণের রীতি নীতি রপ্ত করতে হয়। কিন্তু সে কেবলই বয়স্কদের সান্নিধ্যে ও তাদের অনুকরণে বেড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে। আদিম মানব সমাজেও সেই প্রথা ছিল এবং এখনো আমরা অনুন্নত সমাজে তারই রেশ দেখতে পাই। কিন্তু সমাজ যত উন্নত হয় সামজিক ক্রিয়াদি এতোই জটিল হয়ে পরে যে নবাগত শিশুসদস্যদের পূর্ণবয়স্কদের সমকক্ষ করে গড়ে তুলতে প্রয়োজন নিয়ন্ত্রিত ও পরিকল্পিত শিক্ষার। এই শিক্ষার পরিমণ্ডল ও পরিবেশের উপকরণগুলি নিতে হয় বৃহত্তর সমাজের প্রেক্ষাপটে। শিক্ষাঙ্গনের চৌহদ্দিতে সে ক্ষুদ্র সংস্করণের প্রতিরূপ গড়ে তুলতে আমরা সচেষ্ট হই। স্বভাবতই সমাজের জটিলতার প্রতিফলন এই কৃত্রিম পরিমণ্ডলে সম্ভব নয়। তাই প্রয়োজন মূর্ত বিষয়গুলির বিমূর্তায়ন। প্রয়োজন হয়ে পরে ক্রমপর্যায়ে দক্ষতা ও যোগ্যতা অনুযায়ী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষাদান। সমাজজীবনের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্যই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা তাই নিতান্তই আবশ্যক। এ নিছকই শাসনকর্তাদের শুভেচ্ছার পরিচায়ক নয়। বিজ্ঞানের এক কল্পকাহিনীতে পড়েছিলাম ভিনগ্রহের বাসিন্দারা এসে পৃথিবীর তাবৎ মানুষের বৌদ্ধিক মননে আঘাত হানে ও মানুষকে তাদের দাস বানায়। মানুষ ভুলে যায় তার  আপন সংস্কৃতি ও সৃষ্টির সমস্ত রহস্য। ফলে সভ্যতার অবলুপ্তি ঘটে। এটি কল্পকাহিনী হলেও এতে সমাজজীবন অবসানের মূল জায়গাটিকে ধরা হয়েছে। প্রাচীন উন্নত গ্রীক ও রোমান সভ্যতাও ধ্বংস হয়ে যায় যখন তাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুরোপুরি নব্য খ্রিষ্টীয় যাজকেরা বাতিল করে। এমন কী পুরাতন পুঁথিগুলিও লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়। এইভাবেই অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন ও ক্ষেত্রবিশেষে অনুন্নত জাতিগুলি পুরাতন সভ্য জাতিদের সমাজজীবনকে পৃথিবী থেকে লুপ্ত করে দিয়েছে। চৈনিক সভ্যতা,  আমাদের ভারতবর্ষের হিন্দুসমাজ ও বিশ্বব্যপী ইহুদীরা নিশ্চয়ই এ ক্ষেত্রে কিছুটা ব্যতিক্রম। বিভিন্ন ঐতিহাসিক কারণে এরা এদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য ও বৌদ্ধিক চর্চার ধারাবাহিকতা রাখতে সক্ষম হয়েছে।

 

সুতরাং সমাজকে সচল রাখতেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে।  বিশেষতঃ উৎপাদন ব্যবস্থা এবং আনুষঙ্গিক রাজনৈতিক ও সামাজিক শাসন-অনুশাসনকে পরিপুষ্ট করার লক্ষ্যেই এই শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রাচীন গ্রীক ও রোমান সভ্যতায় সমাজ ছিল  মূলতঃ মুক্ত মানুষ ও দাস এই দুই শ্রেণীতে বিভক্ত। সেখানে প্রথাগত শিক্ষার ব্যবস্থা ছিল কেবল মুক্ত মানুষদের জন্যই। তার লক্ষ্যই ছিল ধর্মীয়, রাজনৈতিক, ও সামাজিক কার্য্যকলাপে অংশগ্রহণ করার উপযুক্ত ‘নাগরিক’ গড়ে তোলা। যদিও শিক্ষা সমাজের সর্বস্তরে প্রসারিত ছিল  না (উৎপাদনব্যবস্থার মান ও উৎপাদন সম্পর্কের ভিত্তিতে যার বাস্তব প্রয়োজনও ছিল না), তবুও মুক্ত মানুষদের গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে (যেমন এথেন্স এবং কিছুটা হলে রোমে) শিক্ষাব্যবস্থা ‘স্বাধীন চিন্তা’ ও ‘বৌদ্ধিক অনুশীলনে’ উৎসাহিত করত। অবশ্য পরবর্তীকালে যতই সেই গণতন্ত্র খর্বিত  হয়েছে এবং রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা পেয়েছে ‘শিক্ষা’র এই চরিত্র খর্বিত হয়েছে। তবুও সে যুগের বিচারে সমাজ ছিল ধর্মীয় নানান বিশ্বাস ও মতের প্রতি সহনশীল। এর   প্রতিফলন সে যুগের শিক্ষাব্যবস্থাতেও পরেছিল।

 

মধ্যযুগের শুরুতেই খ্রীষ্টিয় ধর্ম বিশ্বাসের সাথে এই ব্যবস্থার সংঘাত লাগে। বিশেষ করে খ্রীষ্ট ধর্ম যখন রাজধর্ম হয়ে উঠল এবং শাসনের অন্যতম হাতিয়ার হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হোলো, বাতিল করতে হোলো পুরাতন শিক্ষার ধ্যান, ধারণা - ধাঁচাকে। ধর্মীয় বিশ্বাস স্থান করে নিল গ্রীক ও রোমান সভ্যতার বহুমুখীন বৌদ্ধিক অনুশীলনের। যদিও ‘দাস সমাজ’ থেকে ‘সামন্ত সমাজ’ এক ধরণের সামাজিক অগ্রগতি - ‘ঈশ্বরে’র প্রতিনিধিদের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার ‘শিক্ষাব্যবস্থা’ কিন্তু তার পূর্বাবস্থার বিচারে অপেক্ষাকৃত অনুদার ও সংকীর্ণ। প্রায় হাজার বছর ব্যপী ইউরোপের এই মধ্যযুগকে অন্ধকার যুগ বলা হয় - তার অন্যতম কারণ এই সংকীর্ণতা।

 

উৎপাদন ব্যবস্থার বিকাশের সাথে সাথে প্রয়োজন হয়ে পরল সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শিক্ষার প্রসার। উৎপাদন প্রক্রিয়ার জটিলতা বৃদ্ধির সাথে সাথেই তাতে অংশগ্রহণকারী মানুষকে শিক্ষিত করার প্রয়োজন হোলো। পুরাতন অর্থনৈতিক সম্পর্ক ভেঙ্গে প্রয়োজন হল ‘মুক্ত’ শ্রমিকদের এবং তাদের শিক্ষিত করার লক্ষ্যে ‘সার্বজনীন’ শিক্ষাব্যবস্থা। সামন্ততন্ত্রকে উচ্ছেদ করে ধনতন্ত্রের বৈপ্লবিক উত্তরণে তাই ‘স্বাধীনতা’, ‘সাম্য’ ও ‘ভ্রাতৃত্বের’ বার্তার সাথে ‘সার্বজনীন শিক্ষা’র আহ্বানও দুয়ারে নাড়া দিল। রাষ্ট্রকে এ   বিষয়ে যথেষ্ট  গুরুত্বের সাথে ভূমিকা নিতে হোলো। অন্যদিকে উৎপাদন প্রক্রিয়া যত জটিল ও বহুমুখী হয়েছে, ততই শিক্ষার বিভিন্ন পর্য্যায় ও শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

...

 

  আমরা শুরু করেছিলাম দুটি সাধারণ ধারণা নিয়ে -  ‘সমাজের জন্য শিক্ষা’ ও ‘ব্যক্তির জন্য শিক্ষা’। তার প্রথমটির চরিত্র বুঝতেই সমাজের বিকাশে শিক্ষাব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার এই সংক্ষিপ্ত রূপরেখা আলোচিত হয়েছে। এর থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আমরা গ্রহণ করতে পারি।

 

 এক, সমাজের উপর, উপর থেকে চাপানো কোনো শিক্ষাব্যবস্থা কার্য্যকরী হয়না। সমাজের উন্নয়নের মাপকাঠিতে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কগুলির প্রেক্ষাপটে এই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে। ফলে যারা মনে করেন ‘শিক্ষাই উন্নয়নের চাবিকাঠি’ তাদের এই ‘অর্ধসত্য’টুকু বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। ‘শিক্ষা’র মাধ্যমে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। বরং সামাজিক বিপ্লবই শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার আনে। অন্যদিকে সমাজব্যবস্থার পরিবর্তন নিরপেক্ষ যারা ‘আদর্শ শিক্ষাব্যবস্থা’ প্রবর্তনের স্বপ্ন দেখেন - তাদের সেই আদর্শ প্রকৃত অর্থেই ‘ইউটোপিয়া’  বা ‘অধরা মাধুরী’ রয়ে যায়।

 

দুই, কোনো শিক্ষাব্যবস্থা ব্যক্তির বিকাশকে ততখানিই প্রাধান্য দেয়, যা তৎকালীন সমাজের বিকাশে বা সামাজিক ক্রিয়াদি সম্পন্নে সহায়ক হয়। সামাজিকভাবেই বৌদ্ধিক অনুশীলনের কতখানি প্রয়োজন তার উপরেই নির্ভর করে শিক্ষা প্রসারের প্রশ্নটি। বিশেষতঃ বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এ কথা খুবই সত্যি। জাতি-ধর্ম-ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে শিক্ষার গণতান্ত্রিক প্রসারের ভিত্তিভূমিও এই প্রয়োজনীয়তার উপর দাঁড়িয়ে।

 

তিন, যদিও সমাজকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হিসাবেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে ওঠে - তবুও সেটা বিকাশমান ও পরিবর্তনশীল। যে কোনো সমাজব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এ কথা সত্যি। সে কারণেই খ্রিষ্টীয় যাজকদের মধ্য থেকে নবজাগরণের সময় আমরা শ্রেষ্ঠ মনীষীদের পাই। তেমনি যে কোনো ‘শিক্ষাব্যবস্থাতে’ই লালিত হয় ভাবী সমাজের চিন্তানায়কেরা। সেই সাথে সামাজিক ভাবেও মানুষ বিকাশের পথে শিক্ষিত হয়। যখন সেই বিকাশ রুদ্ধ হয় শিক্ষাব্যবস্থাতেও অচলবস্থা দেখা দেয়। সমাজের পরিবর্তনের তাগিদে সেই শিক্ষাব্যবস্থা পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষাও মানুষের মধ্যে জাগে।

 

চার, শিক্ষার বিষয়বস্তু উৎপাদন ব্যবস্থা ও সামাজিক সম্পর্কের সাথে জড়িত থাকে। এ ছাড়াও রাষ্ট্রের রাজনৈতিক চরিত্রও শিক্ষায় যথেষ্ট প্রভাব ফেলেএকই ধরণের উৎপাদনব্যবস্থা থাকা সত্বেও অপেক্ষাকৃত   ‘গণতান্ত্রিক’ সমাজের শিক্ষায় চিন্তার স্বাধীনতা ও বহুমুখীনতার সুযোগ বেশী। প্রাচীন গ্রীসে এথেন্স ও স্পার্টা এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। অপেক্ষাকৃত গণতান্ত্রিক এথেন্সে শিক্ষার মান উন্নততর ছিল, যদিও স্পার্টার সীমিত সাম্যবাদী সমাজে মুক্ত নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই শিক্ষার সমান অধিকার ভোগ করত। কিন্তু এথেন্সে ‘শিক্ষা’ও পণ্যে পরিণত হওয়ায় দরিদ্রেরা এ   সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিল। তবে নাগরিকত্বে অভিষেকের পূর্বক্ষণে (পূর্ণবয়স্কদের পঙক্তিতে ঠাঁই হওয়ার সময়) রাষ্ট্র প্রতিটি নাগরিককেই বছর দুই তিনের সামরিক শিক্ষা সহ বিভিন্ন ধরণের শিক্ষায় শিক্ষিত করার দায়িত্ব গ্রহণ করেছিল। বর্তমান ধনতান্ত্রিক সমাজেও রাষ্ট্রের চরিত্রানুযায়ী শিক্ষার মান ও প্রসার নির্ভরশীল।

 

...

 

এবার ব্যক্তির বিকাশে শিক্ষার ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা যাক। প্রকৃতপক্ষে রবীন্দ্রনাথ, বিবেকানন্দ ও গান্ধীজীর শিক্ষাদর্শনে ‘ব্যক্তি’ই প্রাধান্য লাভ করেছে - যদিও সেটি সমাজবিমুখ এ কথা একেবারেই বলা চলেনা। তবুও সমাজ সেখানে ‘গৌণ’। ‘ব্যক্তি’ ও ‘সমাজ’কে অনেকটা তাঁরা ‘দাতা’ ও ‘গ্রহীতা’র ভূমিকায় দেখেছিলেন। ‘অন্তর্নিহিত সত্তা’র পরিপূর্ণ বিকাশে বিবেকানন্দ সেই সমস্ত কর্মবীরের স্বপ্নই দেখেছিলেন যারা আপন প্রজ্ঞা ও ধীশক্তিতে   সন্ন্যাসীর ত্যাগমন্ত্রে দীক্ষিত। সমাজের পথপ্রদর্শক ও শিক্ষক তারা। কিন্তু ‘সমাজ’ও তো এক অর্থে ‘শিক্ষক’। সেখানে ‘ব্যক্তি’ ও ‘সমাজ’ একে অপরের পরিপূরক। এখানেই তাঁদের ভাবাদর্শের সীমাবদ্ধতা। যার ফলে বাস্তব প্রয়োগে দেখা যায়, অন্যান্য সামাজিক  শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলি থেকে চরিত্রগতভাবে তাঁদের ভাবানুসারী   শিক্ষাঙ্গনের বিশেষ কোনো পার্থক্য নেই। হতে পারে সেখানে শিক্ষণ পদ্ধতির কিছু হেরফের আছে, হতে পারে সেখানে শিক্ষক শিক্ষিকারা অনেক নিষ্ঠাবান, ধৈর্য্যপরায়ন, ও সহমর্মী- তবুও মৌলিকত্বের বিচারে আলাদা করার কিছু থাকেনা। যেটুকু বৈশিষ্ট্য জন্মলগ্নে প্রতিষ্ঠানগুলি বহন করে, ক্রমেই সেটি স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে অন্যান্য সামাজিক প্রতিষ্ঠানের মতই শিক্ষাব্যবস্থার অঙ্গ হয়ে ওঠে। যদি তা না হয়, প্রতিষ্ঠানটি টিঁকে থাকতে পারেনা।

 

 

এর আগেই উল্ল্যেখ করেছি শিক্ষাব্যবস্থায় ব্যক্তির বিকাশের প্রশ্নটিও সামাজিক বিকাশের প্রশ্নের সাথে জড়িত। প্রকৃতপক্ষে শিক্ষাব্যবস্থা সামাজিক বৈষম্য বজায় রাখার অনুকূলেই গড়ে তোলা হয়। যে কারণে, ধনতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনব্যবস্থার অঙ্গ হিসাবেই সার্বজনীন শিক্ষার প্রয়োজন হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে ধনীরাই সেই শিক্ষার সুযোগ নিতে বেশী সক্ষম। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার বৌদ্ধিক অনুশীলন এবং পরিচালনাদি সমাজের সেই ক্ষুদ্র অংশের হাতেই থাকে, যারা এই বৈষম্যে লাভবান। সামন্ততন্ত্রে প্রাথমিক শিক্ষার সেই সার্বজনীনতাও স্বীকৃত নয়পরাধীন ভারতবর্ষে ব্রিটিশ ঔপনবেশিক শাসনে শাসকদের লক্ষ্য ছিল শাসনকার্য্যে সহায়ক চাকুরীজীবী আমলাদের, যারা বর্ণে ভারতীয়, কিন্তু মরমে ইংরেজ। সেই মতই তারা শিক্ষাব্যবস্থা সজিয়েছিল। সার্বজনীন শিক্ষা তাদের লক্ষ্য ছিলনা। এর প্রতিক্রিয়াতে জাতীয় মুক্তি আন্দোলনে ‘ভারতীয়’ শিক্ষার আন্দোলন গড়ে ওঠে - যার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন রবীন্দ্রনাথ। স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের শিক্ষায় সেই ভাবনা  চিন্তা যথেষ্ট প্রভাব ফেলে, যদিও আমাদের স্বাধীনতা প্রাপ্তিতে কোনো ‘সামাজিক বিপ্লব’ বা ‘আমূল পরিবর্তন’ না ঘটায়, শিক্ষাব্যবস্থায় ঔপনিবেশিক রেশ ও প্রভাব থেকে যায়। বর্তমানে উন্নতদেশগুলির সাম্রাজ্যবাদী জোট, বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ, অনেক বেশি আগ্রাসী। কেবল অর্থনৈতিক শোষণই নয় সাম্রাজ্যবাদ চায় সহায়ক রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল। আমাদের দেশীয় শাসকেরা যতই এই সাম্রাজ্যবাদের সাথে আপোষ করবে ও তাদের কাছে নতি স্বীকার করবে - ততই তার প্রভাব শিক্ষাব্যবস্থায় পড়বে এবং সেটি পড়ছেও। ‘ব্যক্তি’র বিকাশও সেই প্রশ্নে জড়িত থাকবে। উচ্চশিক্ষা হয়ে উঠবে আরো ‘মহার্ঘ’। দরিদ্র পরিবারের ছাত্ররা যেটুকু ন্যুনতম সুযোগ রাষ্ট্রের তত্বাবধানে পেয়ে থাকে, সেটুকুও তারা ক্রমেই হারাবে এবং হারাচ্ছেও। এর সাথে এও বলা যেতে পারে সাম্রাজ্যবাদ যেহেতু চরিত্রগতভাবে  গণতন্ত্রবিরোধী, সার্বজনীন শিক্ষার প্রসারেও সে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করবে। সমাজকল্যাণে, বিশেষতঃ শিক্ষায় ও স্বাস্থ্যে রাষ্ট্রের  দায়িত্ব আরো অবহেলিত হবে।

...

 

এই আলোচনার শেষভাগে ব্যক্তির বিকাশে শিক্ষণপদ্ধতি নিয়েও কিছু কথা বলা যেতে পারে। পাঠশালার পণ্ডিতমশাইদের বেতের   শাসনের বিরুদ্ধে গর্জে উঠলেও বহু শিক্ষাবিদই ‘গুরুশিষ্যে’র সম্পর্ককে পবিত্রতা প্রদান করেছেন, অর্থাৎ ‘শিষ্য’কে শাসন করার গুরুর অধিকারকে তাঁরা স্বীকৃতি দিয়েছেন। ব্যক্তির বিকাশকে কেন্দ্র করে শিক্ষকের এই ভূমিকা নিয়েও একটি দ্বন্দ্ব এখানে উপস্থিত। অনেকেই মনে করেন প্রতিটি ব্যক্তির (বা শিশুর) প্রকৃতি ও সম্ভাবনা পৃথক।তাই তাদের প্রত্যেকের ‘আদর্শ’ শিক্ষণ পদ্ধতি পৃথক- সেই মতোই আদর্শ শিক্ষকের কর্তব্য ব্যক্তির প্রকৃতি ও সম্ভাবনা অনুযায়ী ব্যক্তিগত প্রশিক্ষণের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। বাস্তবে বিদ্যালয়ের শ্রেণীকক্ষের শিক্ষায় ‘ব্যক্তি’ নয়, ‘সমষ্টি’ই শিক্ষার উদ্দিষ্ট। সুতরাং পুনরায় ভাবাদর্শ ও প্রয়োগের মধ্যে দ্বন্দ্ব বা ফারাক দেখা দেয়।

 

সোভিয়েত শিক্ষাবিদ আন্তন ম্যাকারাঙ্কো এই দ্বন্দ্ব নিরসনে এক সুন্দর তত্ত্ব যুগিয়েছেন। সেখানে তিনি ‘শিক্ষক’    ও ‘শিক্ষার্থী’র সাথে ‘সমষ্টি’কেও শিক্ষণ পদ্ধতির অঙ্গ হিসাবে দেখিয়েছেন এবং ‘সমষ্টি’ কীভাবে শিক্ষায় অংশগ্রহণ করে তার সুন্দর উদাহরণ আপন অভিজ্ঞতার নিরিখে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর কথাতেই এই অভিজ্ঞতার সার তুলে দেওয়া হোলো-

“ ...  কোনো ব্যক্তি বিশেষের প্রতি আলাদা করে বিশেষ শিক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বনের নীতি আমাদের পরিহার করা উচিত। আমরা কোনো ব্যক্তির উপর অন্য ব্যক্তির প্রভাবের গুরুত্বের ততটা স্বীকৃতি দিতে চাই না। বরং সমষ্টির (এ ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের সমষ্টি) উদ্দেশ্যেই শিক্ষাকে সাজাতে চাই। তাদের উদ্দেশ্যেই আমাদের পরিকল্পিত ও সুসংগঠিত শিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োগ চাই। এ ছাড়াও আমরা নিশ্চিত যে ব্যক্তির বিকাশের সব চাইতে বাস্তবসম্মত উপযোগী কাজ হবে এই যে তাকে সমষ্টির মধ্যেই এমনভাবে লালিত করা, যাতে স্বেচ্ছায় সেই সমষ্টির অঙ্গ হতে চাইবে। আবার অন্যদিকে তার সহপাঠী ও সহপাঠিনীরাও তাকে তাদের সমষ্টির অঙ্গ হিসাবে দেখতে চাইবে। ...  এখানে সমষ্টি ব্যক্তির শিক্ষকের ভূমিকা গ্রহণ করে।”

 

সুতরাং ম্যাকারাঙ্কো কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীই নয় তৃতীয় উপাদান হিসাবে শিক্ষার্থীর সহপাঠী ও সহপাঠিনীদেরও অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছেন এবং ব্যক্তির বিকাশের অন্যতম শর্ত হিসাবে তুলে ধরেছেন। এমনকি তিনি শিক্ষকদেরও সেই সমষ্টির অঙ্গ হতে বলেছেন। সমষ্টির ভিতর থেকেই ছাত্রছাত্রীদের সমবেত ও ব্যক্তিগত বিকাশে নেতৃত্ব দিতে বলেছেন। তাঁর কথাতে -

“ একজন শিক্ষক কোনো ব্যক্তি বিশেষকে সেভাবেই প্রভাবিত করেন যেভাবে সমষ্টির সদস্যরাও তাঁকে প্রভাবিত করে। এর অর্থ এই নয় যে আমরা শিক্ষকেরা এবং সাধারণভাবে সমষ্টির প্রবীণ সদস্যরা কেবলমাত্র দর্শকের ভূমিকা পালন করব। সমষ্টির নানা কর্মকাণ্ডে, প্রত্যয়ে, ইচ্ছায় প্রতিনিয়ত আমাদের চিন্তা ভাবনা ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগাতে হবে এবং বিভিন্ন উপলক্ষ্যে আমাদের পরামর্শ, মতামত ও প্রত্যয় দ্বারা সমষ্টিকে সাহায্য করতে হবে।”

 

এখানে খেয়াল রাখতে হবে, ম্যাকারাঙ্কো তাঁর অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেছেন বিপ্লবোত্তর সোভিয়েত রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক সমাজ  গঠণপর্বে। তৎকালীন সামাজিক পরিবেশ তাঁর এই নীতি প্রণয়নের অনুকূল ছিল।  স্বভাবতই আমাদের দেশের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা  তাঁর নীতি প্রয়োগের বাস্তব শর্তগুলি পূরণ করেনা। তবুও শিক্ষাঙ্গনে ছাত্রছাত্রীদের সমষ্টিগত কর্মকাণ্ড ও চিন্তাভাবনায় আমাদের সচেতন অংশগ্রহণ এবং তার মাধ্যমে সমষ্টির বিকাশও আমাদের কাম্য এবং কর্তব্য।

 

১৫/১২/২০০৫

 

Sunday, 2 May 2021

উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য

 

উচ্চশিক্ষা নিয়ে আমরা যতই বড়াই করি না কেন, অথবা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম কারিগরী ও বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষিত মানবসম্পদের দেশ হিসাবে নিজেদের জাহির করি, আমাদের দেশের পনেরো বছরের বেশি বয়সি মানুষদের মাত্র ২.২% ‘উচ্চশিক্ষিত’ (অর্থাৎ স্নাতক,  উপস্নাতক বা  স্নাতকোত্তর শংসাপত্রের অধিকারী)এটা ঠিকই যে আমাদের দেশের কারিগরি ও বিজ্ঞান শাখার অগ্রণী প্রতিষ্ঠানগুলি যেমন, বিভিন্ন আই আই টি, আই আই এম, কোলকাতার  আই এস আই,  বাঙ্গালোরের  আই আই এস সি, নতুন দিল্লীর এ আই এম এস ইত্যাদি বহির্বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা তাদের মেধা ও সৃজনশীলতায় সমাদৃত হয়েছে। বর্তমানে ভারতবর্ষের অন্যতম ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডরের ভূমিকায় (বা বহির্বিশ্বে পরিচিতির শিলমোহরে) এই প্রতিষ্ঠানগুলি অবতীর্ণ হয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতি উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলিতে সম্ভ্রম ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলি দেশব্যপী উচ্চশিক্ষার নৈরাজ্যের অন্ধকারে ব্যতিক্রমী নক্ষত্র মাত্র। সাধারণভাবে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান  যে তলানিতে ঠেকেছে সে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও একদা গৌরবোজ্জ্বল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান হালচালেই তা টের পাওয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে যেমন পরিকাঠামোর অভাব আছে, তেমনি শিক্ষার পরিবেশও ছাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ফাঁকি রয়ে গেছে। এর সাথে উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান সরকারি ঔদাসীন্যে প্রতিষ্ঠানগুলি উচ্চশিক্ষায় তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্রছাত্রীরা আসে কোনো এক ডিগ্রির সন্ধানে, আর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে টিউশন আর সাজেশনের সাহায্যে পরীক্ষার বৈতরণী পারাপারের স্রোতে গা ভাসায়। ব্রিটিশ আমলের কেরানি   গড়ার শিক্ষাব্যবস্থাই আংশিক খোলনলচে বদলে উচ্চশিক্ষিত কেরানি সরবরাহেই প্রধানতঃ মুখ্য ভূমিকা নেয়। স্বাধীনতার পর ষাট সত্তর দশক পর্যন্ত্যও সীমিত ভাবে হলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে এই ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল। সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলিতেই বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মীর দরকার পড়েছিল। সে কারণেই উচ্চশিক্ষাতে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ১৯৫০-৫১ সালে যেখানে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ, ২০০৩ -এ সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে নব্বই লাখের আশপাশে। এই ৫০ বছরে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে   দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০টি  এবং প্রায় ১৩০০০ কলেজ এখন দেশে চালু আছে। এও লক্ষ্যণীয় এখনো ৩৩-৪০% উচ্চশিক্ষার্থী আসেন সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি থেকে। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশগুলির তুলনায় সমাজে উচ্চশিক্ষার প্রসার অত্যন্ত কম (১৭-২৩ বছরের জনসংখ্যার কেবল ৮-৯% উচ্চশিক্ষায় যুক্ত), তবুও সীমিত ভাবে হলেও   স্বাধীনতার পরবর্তী চার দশকের শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ বা সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করার প্রয়াস ছিল। কিন্তু শিল্পায়নের গতি যখন রুদ্ধ হোলো, যার লক্ষণ ষাটের দশকের মাঝ থেকেই দেখা যাচ্ছিল, এবং যা তীব্র আকার ধারণ করে আশি ও নব্বই-এর দশকে, সেই সময় উচ্চশিক্ষিত শ্রমশক্তির সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও কমে গেল। এই সময় থেকেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলল। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় দাক্ষিণ্যও হ্রাস পেতে লাগল। বিশেষ করে ১৯৯২-৯৩ থেকে উদারনীতি ও মুক্ত অর্থনীতির খোলা বাজারে উচ্চশিক্ষাতে সরকারী বরাদ্দ কমতে থাকল। যার অর্থ সাধারাণ মানুষের কাছে এটি ক্রমেই মহার্ঘ হয়ে উঠতে থাকল। ১৯৯৩-৯৪ সালে যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের মাথা পিছু সরকারী খরচ ছিল ৬৭.৩৮ টাকা, ২০০১-২০০২ এ সেটি এসে দাঁড়ায় (মূল্য বৃদ্ধি সূচক পরিশোধিত) ৫৮.৭৩ টাকা।

 

সরকারি ঔদাসীন্য এবং ক্রমবর্ধমান বেকারিত্বের কারণে ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই তাই সাধারণ উচ্চশিক্ষার বাইরে কারিগরি  ও পেশাদারি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আগ্রহী। ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার এ চাহিদা সীমিত সংখ্যক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি মেটাতে অক্ষম। আর সে কারণেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-নার্স প্রভৃতি বিভিন্ন পেশায় শিক্ষিত করার প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠল। যদিও এই প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশেরই শিক্ষার মান ও পরিকাঠামোতে প্রচুর ফাঁকি থেকে গেছে, তবুও বহু পয়সা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ডিগ্রি আদায় করছে। এই নিম্নমানের শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরাও অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষিতের মতোই কর্মক্ষেত্রে অপাংক্তেয় থেকে যায়। তাই   বিভিন্ন পেশাতে  বাস্তবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানে অনেকেই ব্যর্থ হচ্ছে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে উচ্চশিক্ষায় এই ধরণের বেসরকারি উদ্যোগ মানেই সেটি নিম্নমানের। নব্বইয়ের দশকের বেসরকারি  কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমার পুর্বেই বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার সাথে সাফল্যের সাথে যুক্ত আছে। তেমনি এও আশা করা যায় বাজারের প্রতিযোগিতার নিয়মেই অসফল এবং কেবল মাত্র মুনাফাকেন্দ্রিক অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলি ভবিষ্যতে ঝড়ে যাবে, নয়তো উন্নত পরিষেবা (উচ্চশিক্ষা) প্রদানে বাধ্য হবে। কবে অবশ্য সেই নৈরাজ্যের অবসান হবে সে হলফ করে কেউ বলতে পারেনা। তবে অবস্থা যাই হোক এই ধরণের বেসরকারি ব্যবস্থাতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের যে মূল্য ধরে দিতে হয় সেটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি অপেক্ষা বহুগুণ। এমনিতেই সরকারি দাক্ষিণ্য প্রাপ্ত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিতেও প্রবেশাধিকার ও পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ দেশের অধিকাংশ মানুষের নেই। সুতরাং ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের সেই অধিকার চিন্তা করা বাতুলতা। এর সাথে রয়েছে ‘বিশ্বায়নের’ যুগে শিক্ষাকেও বাজারি পণ্যের চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে  সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিষেবা হিসাবে দেখার ঝোঁক। সুতরাং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্বকে ‘ভর্তুকি’র তকমা লাগিয়ে যেভাবে বিসর্জনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, সেইভাবে ‘শিক্ষা’ বিশেষতঃ উচ্চশিক্ষাকে  মহার্ঘ করার সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। আমাদের আই আই টি গুলিতে বার্ষিক টিউশন ফী গত দশবছরে আড়াই শ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকায়। এর সাথে  তো  থাকা-খাওয়া-বই-খাতা-সরঞ্জাম কেনার আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই। সে কারণেই নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি থেকে যেটুকু সুযোগ ছাত্রছাত্রীরা আগে নিতে পারত, এখন তা অনেকাংশেই কমে গেছে। তবে আসল ছাঁটাই তো হয়ে যায় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বেই। আই আই টি গুলির প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সংস্থার সহায়তা নিয়ে থাকে। দেখা গেছে এই ধরণের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরাই বহুলাংশে সফল হয়। তবে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য বহু অর্থ ব্যয় তাদের পরিবারগুলিকে করতে হয়। সুতরাং এই ধরণের অর্থব্যয়ের অসম প্রতিযোগিতায় নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি প্রথম থেকেই পিছিয়ে থাকে। এই ব্যাপারে গতবছরের (২০০৫) আই আই টি গুলি পরিচালিত যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় (IIT JEE)  কৃতকার্য্য  ছাত্রছাত্রীদের কিছু পরিসংখ্যানে চোখ বুলানো যেতে পারে।এই পরিসংখ্যান আই আই টি যৌথ  প্রবেশিকা পরীক্ষা পরিচালনার  দায়িত্বপ্রাপ্ত  বোর্ডের একটি রিপোর্ট থেকে সংগৃহীত।

 

২০০৫এর আই আই টি যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় দুই লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে  প্রায়  পাঁচ হাজার জন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হয়েছে। এদের ৯.০১% এসেছে বার্ষিক  ৫০,০০০ টাকার নীচে আয় এমন পরিবারগুলি থেকে। আমাদের এই পরিসংখ্যানে কোনো পরিবারের আয় বলতে বার্ষিক আয়ই বোঝাব।  ৫০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা আয়সম্পন্ন পরিবারগুলি থেকে এসেছে ১৮.০৯%। ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা উপার্জনকারী পরিবারগুলি থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের হার ২৯.৯৫%, ২ থেকে ৩ লাখ ও ততোধিক আয়ের পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের শতকরা বিভাজন যথাক্রমে ২৪.৩১% এবং ১৮.৫৮%। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় সমাজে যে ধনবৈষম্য আছে তা উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠকে অপাংক্তেয় করে রাখে। এখানে এ খেয়াল রাখতে হবে, কাগজে কলমে পারিবারিক আয়ের উল্ল্যেখ করতে আমাদের ব্যবসায়ী পরিবারগুলি বরাবরই কুণ্ঠা বোধ করে। সুতরাং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির পরিসংখ্যান যে সেই প্রবণতা দ্বারা দুষ্ট সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এর সাথে মাতাপিতার বৃত্তির বিন্যাস অনুযায়ীও ছাত্রছাত্রীদের শতকরা ভাগের হিসাব যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। বৃত্তি অনুযায়ী কৃষিতে নিযুক্ত ৪.৭৯%, সরকারী ও সার্বজনীন বিভাগে চাকুরীরত ৪৫.৪৪%, ব্যক্তিগত উদ্যোগে কর্মরত ৯.১৫% এবং ৬.৪৮% শিক্ষাক্ষেত্রে নিযুক্ত। মজার ব্যাপার এই সংখ্যাগুলি যোগ করলে ১০০% এর হিসাব মেলেনা (মোট ৬৫.৮৬%)অর্থাৎ প্রায় ৩৪% ছাত্রছাত্রীর মাতাপিতার বৃত্তির কোনো বিভাগ নেই। অনুমান করা যেতে পারে এদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী পরিবারগুলি থেকে আগত। এই প্রবেশিকা পরীক্ষাতে কোচিং সেন্টারগুলির ভূমিকাও দেখে নেওয়া যাক।উল্লেখ্য সফল পরীক্ষার্থীদের প্রায়  ৬০% এর সিদ্ধি মিলেছে দুই বা ততোধিক প্রয়াসেএরা অবশ্যই বিভিন্ন কোচিং প্রতিষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত টিউশনে  বহু অর্থব্যয়ে আলাদাভাবে প্রশিক্ষিত।  এমনকি প্রথম প্রচেষ্টাতেও যারা কৃতকার্য্য (৩৯.৮১%) তাদেরও সিংহভাগ এই ধরণের কোনো না কোনো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এই বিশেষ প্রশিক্ষণের গড়পড়তা ব্যয় দুবছরে প্রায় এক লাখ টাকা। গ্রাম ও শহরের বিভাজনও এই পরিসংখ্যানে সঙ্গতিপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের মাত্র ৮.৭৪% গ্রাম থেকে আগত। সেই সাথে উচ্চশিক্ষায় নারীপুরুষের বৈষম্য এই পরিসংখ্যানেও প্রকট - ৯৩.৭% ছাত্র ও ৬.৩% ছাত্রী প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় তথাকথিত ‘ভর্তুকি’ নিরপেক্ষ একটি ব্যবস্থার প্রবেশিকা পরীক্ষায় সমাজের দরিদ্র পরিবারগুলিকে যে অসম পরিস্থিতিতে যুঝতে হয় সেটি এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়। অবশ্য আই আই টি পরীক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষার ফর্মের দামও যথেষ্ট। সেটিই বহু পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহ করার পক্ষে যথেষ্ট। প্রসঙ্গতঃ উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রামীণ  পরিবারগুলিকে  কত খরচা করতে হয় তার একটি পরিসংখ্যান দেখা যেতে পারে। এই পরিসংখ্যান ১৯৯৪ সালে National Council of Applied Economic Research (NCAER) সংস্থা দ্বারা পরিচালিত গ্রামীণ ভারতের পরিবারগুলির উপর একটি সমীক্ষা দ্বারা প্রাপ্ত। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার জন্য সাধারণভাবে গড়পড়তায় জন প্রতি বছরে ১৪৮৮.৫৭ টাকা খরচ করতে হয় এই পরিবারগুলিকে। এর অর্থ এই নয় যে পরিবারগুলি এর থেকে বেশী খরচের প্রয়োজন অনুভব করেনা। তাদের সাধ্যমত ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে এই খরচটুকু করতেই হয়। এটুকুও না করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর গতি থাকে না। বর্তমানে মুক্ত বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে  এই ন্যূনতম খরচ যে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। আর সে কারণেই একবিংশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই আধুনিক ভারতবর্ষে প্রায় ৯২% ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে অচ্ছুত থেকে গেছে।

 

সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায় ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার গতি কি? নব্বইয়ের দশক থেকে চালু সরকারী ঔদাসীন্যের নীতিই কি এর ভবিতব্য? না কী এ ব্যাপারে চিন্তা ভাবনায় কোনো পরিবর্তন আমাদের নেতা ও প্রশাসকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে?  বিশেষ করে অহরহ যখন আমাদের শুনতে হয় একবিংশ শতকে ভারতবর্ষের মানুষ জ্ঞান ও বিজ্ঞানে চরম শিখরে উন্নীত হবে এবং শিক্ষার প্রসার দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির মরা গাঙে ভরা জোয়াড় বইয়ে দেওয়া হবে, তখন আশা জাগে বইকী, দেশের মানুষের কাছে শিক্ষাঙ্গনের আমন্ত্রণ হয়তো আরও সাদর হবে!  কিন্তু এতো শুধু আমাদের শুভ ইচ্ছার রূপায়ন নয়! বাস্তব সমাজের কাছে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন কতটুকু সেটাও দেখার প্রয়োজনআর সেই সমাজের রক্ষক প্রশাসকদের বর্তমান নীতি বাস্তবতার সাথে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ  সেটি আমাদের বুঝে নিতে হয়এর আগেও আলোচিত হয়েছে যে সাধারণভাবে শিক্ষিত বেকারবাহিনীর সৃষ্টিকারী এই শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশই সমাজে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। এই বিষয়টিকেই বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে খতিয়ে দেখা যেতে পারে।

 

প্রখ্যাত আমেরিকান  শিক্ষাবিদ জন ডিউই শিক্ষার সামাজিক ভিত্তির প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘শিক্ষা আসলে সমাজকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার’। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্য্যকলাপের ধারাবাহিকতা ‘শিক্ষা’র মাধ্যমে মানুষ বজায় রেখেছে। যে সমাজ যত উন্নত, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে যত বিস্তৃত ও জটিল, সেই সমাজে শিক্ষার প্রসারের গুরুত্বও তত বেশি। সেই অর্থে শিক্ষার বিকাশ সামাজিক বিকাশের প্রতিফলন। অন্যদিকে সামাজিক বৈষম্য বজায় রাখার অনুকূলেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই কারণেই দেখা যাবে ধনতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনব্যবস্থার অঙ্গ হিসাবেই সার্বজনীন শিক্ষার প্রয়োজন হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে ধনীরাই এই শিক্ষার সুযোগ নিতে বেশী সক্ষম। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার বৌদ্ধিক অনুশীলন ও পরিচালনাদি সমাজের সেই ক্ষুদ্র অংশের হাতেই থাকে যারা এই বৈষম্যে লাভবান। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসারের সাথে সার্বজনীন ও উচ্চশিক্ষার প্রসারও যুক্ত। তবে এখানে এও উল্লেখ্য শিক্ষাকে কেবল কোনো ব্যক্তির পেশা ও বৃত্তির প্রেক্ষাপটে বিচার করাও এক ধরণের সংকীর্ণতা। ব্যক্তির সমাজজীবনের অংশগ্রহণে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার সাথে ব্যক্তি চেতনার বিকাশের সেখানেই নিবিড় যোগাযোগ। গণতন্ত্রের প্রসারেও তাই উচ্চশিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতোত্তর নতুন রাষ্ট্রের গঠনপর্বে সমাজের বিভিন্ন অংশে উচ্চশিক্ষার প্রসারের প্রয়োজন অনুভূত ছিল। আর সে কারণেই রাষ্ট্রের সক্রিয় তত্বাবধানে উচ্চশিক্ষার অপেক্ষাকৃত প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা সমাজের শাসকদের সামনে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকল। উচ্চশিক্ষার প্রসারে তারা রাশ টানতে শুরু করল। কিন্তু দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির  সাথে সাথে সামাজিকভাবে এই শিক্ষার চাহিদা বর্তমান। আর সেই কারণেই পণ্য হিসাবে উচ্চশিক্ষা বাজারে বিকোবার পক্ষে যথেষ্ট লোভনীয় হয়ে উঠল। তাই শিল্পমহল-বণিকমহল-বিশ্বব্যঙ্ক-WTO আদি নানা সংস্থার তরফ থেকে উচ্চশিক্ষাকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির হস্তে সমর্পণের নানান সওয়াল-পরামর্শ চলতে থাকল। মুক্ত বাজারের একটি শর্তই হোলো বাজারের পণ্যের মূল্য নির্ধারণে যাবতীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণের  অবসান। আর সেই নীতির অবলম্বনে সরকার বাহাদুর উচ্চশিক্ষায় ব্যয় সংকোচন শুরু করলেন। এর ফলে জনসাধারণকে ঠেলে দেওয়া হোলো বহুমূল্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির অঙ্গনে। শুধু প্রথাগত শিক্ষাই নয়, প্রথাবহির্ভূত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই নৈরাজ্যে মুনাফা কামাতে থাকল। তাদের প্রদত্ত ডিগ্রি-সার্টিফিকেটের মূল্য যাই হোক, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর তাগিদে বিভ্রান্ত ছাত্র ছাত্রীরা তাদের দুয়ারে ভিড় করতে থাকল। এই ভাবেই গত দশক থেকেই বিভিন্ন সংস্থা  ‘করেস্পন্ডেন্স কোর্স’, ‘কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি’র নানা পাঠক্রমের ব্যবসা চালিয়ে আসছে। বহু ছাত্রছাত্রী ভালো চাকরি পাবার প্রলোভনে এই ধরণের উদ্যোগে তাদের অর্থ ও সময় ব্যয় করছে। বর্তমানে বিদেশী  বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই ধরণের শিক্ষার ডালি নিয়ে বাজারে অবতীর্ণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা  যত রুগ্ন ও অকর্মণ্য হয়ে পড়বে ততই এই সংস্থাগুলি লাভবান হবে। এই সমস্ত বিভিন্ন স্বার্থের সমীকরণই উচ্চশিক্ষায় বর্তমান সরকারি নীতির সাথে মানানসই। সে কারণেই ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর দ্বারা শিল্পপতিসমৃদ্ধ  একটি কমিটি খোলাখুলি সুপারিশ করেছে, ‘ভারত সরকার উচ্চশিক্ষাকে সর্বতোভাবেই বেসরকারি উদ্যোগের  হাতে তুলে দিক। সরকারের উচিত কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষাতেই মনোনিবেশ করা।’ উচ্চশিক্ষায় তারা কেবল সেটুকু ছাড়ই সরকারকে দিতে রাজী, যেসব বিষয়  ‘পণ্য’ হিসাবে উচ্চশিক্ষার কোনো বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হতে এখনো ব্যর্থ, যেমন কলাবিভাগের বেশ কিছু বিষয় (liberal arts)বোঝাই যায় বর্তমান শাসকদের নীতিতে উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের প্রশ্নটি কতখানি ব্রাত্য। তাদের কাছে উচ্চশিক্ষার বৈষম্যই কাম্য। সামাজিক সাম্যের বিপরীতে বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সেটাই বেশি জরুরি।

 

৭/৩/২০০৬