Thursday, 19 September 2019

হঠাৎ অবাক হয়ে


হঠাৎ অবাক হয়ে

ফাগুন এসেছে কখন - বুঝতে পারিনি ৷

শীতের জড়তা মেশা রোদের ঝলক ভাষায়
পলাশ হেসেছে কখন ধরতে পারিনি ৷

গাছের ডালের কোণে নিসার শাখার প্রাণে
সবুজ জেগেছে কখন চিনতে পারিনি ৷

ভোরের কুয়াশ চিড়ে শীতল সাঁঝের নীড়ে
কোকিল ডেকেছে কিনা শুনতে পারিনি ৷

হঠাৎ অঙন মাঝে চিলতে রোদের সাজে
ফাগুন ভরাট দেখে মানতে পারিনি ৷৷

২০.৩.১৯৮০

চড়াই

চড়াই যদি ডালে নাচে
সবজে পাতায় ঠোঁটটি মোছে
ফুরফুরে ওই দখিন হাওয়ায়
সুড়ুৎ করে উড়ে বেড়ায়
ঝোপের কানাচে -
তবে দেখতে ভারী লাগে ৷

চড়াই যদি প্রাচীর কোণে
শুখা ঘাসের বাসা বোনে
ফোকর ফাকর ইঁটের খোপে
পা ফেলে যায় মেপে মেপে
অতি সাবধানে -
তবে মন ভরে বেফাগে ৷৷
৯.৪. ১৯৮০

বেলাশেষের গান

বেলাশেষের গান হঠাৎ উঠেছিল বেজে
আমার চারপাশে ৷
করুণ বেদন ভরা পৃথিবীর বুকে
কিসের রোদন ছিল ভেসে -
ছন্দহারা ছন্নছাড়া জগতের
আকুল আর্তি পড়েছিল ঝড়ে
নিভে আসা গোধূলির বুকে ৷
অঘ্রাণের বৃষ্টি ঝড়া রাতের
নিদ্রাহারা কৃষকের মতো
শুনেছিলাম আমি সে বসুধা সঙ্গীত ৷
বুভুক্ষার রাগরাগিনীর করুণ আলাপ
বেজেছিল ডালে ডালে বিবর্ণ পাতায় ৷
রক্ত আঁধার বাসে বিষণ্ণ গোধূলি
হঠাৎ ডুকড়ে উঠেছিল কেঁদে ;
রক্তধারা গিয়েছিল বয়ে
উন্মাদ উদ্দাম নদীর বুকে ৷
শ্রান্ত সাথীহারা বিহঙ্গের
নীরব বিলাপ ছিল আঁকা
আকাশের মাঝে ৷৷

১১.৪.১৯৮০


গাঁ

গাঁয়ের বাঁটে বাঁটে
যেথায় ছায়ায় আলো ঘাঁটে -
সকাল বিকেল ভূতের দলে
  নাচে তেতুল বটে ৷

গাঁয়ের গোয়ালঘরে
কালো ঝোপের সারে সারে
বাঁশ ঝাড়েতে তাল সারেতে
 ভূতুড়ে হাওয়া ফেরে ৷

আঁধার সাঁঝের সোঁতা
যেন জোনাক যাগে হোতা
মাথার পরে জরির আকাশ
  বুকে নীরবতা ৷

হঠাৎ চাঁদনী রাতে
পিছলে ডাবের পাতে
জোছনা এসে যোগীর সাথে
  রঙ্গরসে মাতে ৷

ধ্যানীর ধেয়ান ভাঙ্গে
নতুন রঙে রাঙ্গে
ডুমুর ডালে কাঁপে শুধু
 তন্বী স্বর্ণলতা ৷

হঠাৎ চমক জাগে
জ্বলতে থাকে রাগে
সুড়ুৎ করে সেই ফাঁকেতে
 চাঁদনী রাত ভাগে ৷

যোগী যোগের মাঝে
ঝিল্লী মন্ত্র ভাঁজে
গাছের পাতায় অশরীর
   নীরব তালি বাজে ৷৷

          ২৬.৪.১৯৮০

ডায়েরীর পাতায়

ডায়েরীর পাতায় ঠিকানাগুলো চাপা রয়ে গেছে ৷
ভোরের আলো একটু মুচকি হেসে বলে গেল
   কীহে তোমার পুরোনো দিনগুলির খবর কী ?
সামনের হলুদ গাছটা মাথা ঝাঁকালো
   তাদের খবর ভালো তো ?
আর হু হু করা বাতাসটা ফিসফিসিয়ে বলে গেল
   সবাইকে হারিয়ে ফেলেছো ?
আমি ফোঁটা ফোঁটা নিঃশ্বাস ফেললাম
 "না! আমে নিজেই হারিয়ে গেছি ৷৷"

                                                                ---

মাঝে মাঝে বুড়ো বটের আড়াল দিয়ে
চাঁদখানা আধখানা প্রশ্ন ছুঁড়ে
  আমায় হাতছানি দেয়,
আমি ধীরে ধীরে এগিয়ে যাই,
  আর নিজেকে হারিয়ে ফেলি ৷
আর তখনই জটানো বটের আঁধার
  চেঁচিয়ে বলে ওঠে "ওদের মনে রেখো ৷"
আমি মাথা নাড়ি,
আর বটগাছটা ডালপালা নেড়ে নেড়ে
    মৃদু হাসতে থাকে ৷৷

    ---

শেষ রাতে শেষ তারাখানার বিদায়ক্ষণে
হঠাৎ ডায়েরীখানার পাতা খুলে বসি
  বিবর্ণ হয়ে আসা ছবি আর রেখা
  আমার পুরোনো দিনের ভাষা
  ভালোবাসা, আশা-প্রত্যাশা ৷৷
                                      
                                           (January, 1980)




সমাজ

মরা তুলসীর ঝোঁপ ৷
নীচেতে পিদিম,
টিম্ টিমে আলো ৷
রুক্ষ বুকের কালো ধোঁয়া,
অশরীরী ছোঁয়া ৷৷


বিদায়ী

অস্তাচলের চাঁদখানাকে বলে রেখো
আমি চলে গেছি ..
আর ওই বয়ে যাওয়া নদীটা
ওঠানামা ঢেউএ এঁকে গেছে সারাটা পথ ৷
নিশাশেষের দীর্ঘশ্বাসে
সবাইকে বোলো সে আর নেই ..
রাত্রির মৃদু জোছনায় গিয়েছে মিশে ৷
আর ওই গুহার আঁধার
সবার অগোচরে রচে গেছে
  কিছু স্বপ্ন, কল্পনা আর ভালোবাসার জগৎ ৷৷

...

আর সবাই যখন চলে যাবে ৷
ফুলের ঘ্রাণ, নিশার দীর্ঘশ্বাস
আর অস্তাচলের চাঁদ ..
তখন তুমি আবার আমায় খুঁজো,
ওই নদীর ঊর্মিতে, গুহার আঁধারে,
আর কথা কওয়ার প্রতীক্ষায়
আবছায়া দিগন্তের মাঝে ৷৷




ফিরে যাও

বাতাসটা ক্রমেই উষ্ণ হয়ে উঠল,
"ফিরে যাও!"
আমি বললাম,  "কোথায় ?"
সে বললে, "যেখান থেকে এসেছিলে ৷"

...

নদী তার ঢেউ উছলে চেঁচাল
"কোথায় যাচ্ছ ?"
আমি নিরুত্তর ৷
"ফিরে যাও !"
"কোথায় ?"
সে বললে, "যেখান থেকে এসেছিলে ৷"

...

অরণ্য অবরুদ্ধ অভিমানে ফোঁপাল
"ফিরছ না কেন ?"
আমি নিরুত্তর ..
"ফিরে যাও !"
আমি ফিসফিসালাম, "ঠিকানা হারিয়েছি ৷"
সে বললে, "যেখান থেকে এসেছিলে ৷"

...
আমি মুখোমুখি হলাম ৷
অবশিষ্ট সবুজ, নিচ্ছায় রৌদ্র
আর শীর্ণ স্রোতা নদী ৷
তারা একসাথে বলল
"ফিরে যাও! "
আমি বললাম, "কেন ?"
সবাই মুক দৃষ্টি মেলে রইল ৷
শুধু কালো আকাশটার বুকে
অসীম শুন্যতা সুনীলের সন্ধানে উঠল কেঁদে ৷৷





প্রতিজ্ঞা

বজ্রের রেখায় লিখব শমন
গুরুগম্ভীর স্বনাদে ..
জানাবো জগতে রয়েছি আমরা
শত বঞ্চনার জেহাদে ৷
মুষ্টিবদ্ধ হাতগুলো আজ
রাঙা দুনিয়ার পটে ..
ভোরের আকাশে কালো মেঘ এনে
বিজলী হানব ললাটে ..
সবুজের বুকে আবীর ছড়াবো ..
সুনীলের বুকে ধূলো ..
চুম্বনে ভেজা পৃথিবীর মাটি
বাসবে মোদের ভালো ৷৷



জীবন আমায় ডেকে ছিল

জীবন আমায় ডেকে ছিল ৷
যখন পলাশের ডালে রিক্ত সবুজ
 রাঙা সৌন্দর্য্যে মেলে দিয়েছিল নিজেকে ..
নীল আকাশের বুকে কোনো নাম না জানা পাখী
  অচেনা সুরের মাতনে
পাখা মেলে চলেছিল রোদ্দুরের সিঁড়ি বেয়ে ..
জীবন আমায় ডেকে ছিল ৷৷

...

পাহাড়ের কোলে কোলে মোচড় খাওয়া নদীটা
যখন আলো ছায়ার বাঁকে বাঁকে
  ওঠা নামা ঢেউএর ছন্দে
সুনীলে মিশেছিল ..
জীবন আমায় ডেকে ছিল ৷৷
...

গোধূলির মায়াবী আলোয়
উজ্জ্বল শ্যামলের ডগা চিরে
 ফেরারী বাতাসের আনাগোনা -
যখন রহস্যময় সন্ধ্যার দিগন্তে
কোনো সূতোকাটা রঙীন ঘুড়ি
 অজানা অচেনা প্রান্তরে
   দিয়েছিলো পাড়ি ..
জীবন আমায় ডেকে ছিল ৷৷


শৈশব

চন্দনের বনে আমি তোমার
কবর বিছিয়েছি ..
তোমার মরণ এনেছিলাম
  শারদ জোছনা রাতে ..
নীল সাগরের ঢেউএ আমি
তোমায় সাজিয়ে দিয়েছি,
 তোমার কাঁকন গড়েছিলাম
  স্মৃতির অশ্রুপাতে ৷
বিজন প্রান্তে আমি তোমার
বাসর শয্যা রচছি ..
 তোমার মালা গেঁথেছিলাম
  ঝড়া শেফালির প্রাতে ৷
শীতের কুহেলে তোমায়
ঢেকে দিয়েছি ..
  তেপান্তরের প্রহরগুলি
  দিয়েছি তোমার হাতে ৷৷

নতজানু

আজ আমি নতজানু হয়ে প্রণাম জানাই
হে আমার প্রিয় অতীত !
হে আমার বঞ্চিত লাঞ্ছিত জনমানবের ইতিহাস!
আজ আমি নতজানু হয়ে প্রণাম জানাই ৷

...

আজ আমি নতজানু হয়ে আছি
হে আমার প্রিয় বাংলা
  সৌন্দর্য্যে স্নিগ্ধময়ী প্রকৃতি,
  হে আমার বিগত সারল্য!
আজ আমি নতজানু হই
ওই স্তব্ধগতি তটিনীর ঢেউএ
ওই শতাব্দীর গুঞ্জন মুখরিত
 ভৌতিক অরণ্যের রোদনে ..
ওই দিগন্ত বিস্তৃত রুক্ষ শ্যামলিমায় ৷৷

ছোট্ট নদী

গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী
' যদি 'র উপর ছোট্ট জোড়ে
   খুঁড়িয়ে চলে এই গরমে
পার হওয়া ওর পা দুখানি ..৷

গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী
পারের বালি রাজ্য করে
দুই ধারেরই বাঁশ ঝাড়েতে
বালির চরের একটু ছোঁয়া ..৷

' তবু' র ওপর দীর্ঘ আশে
বর্ষা আসে দু ধার ভাসে
জল নামে ওই ভরা ঢলে
স্নিগ্ধ স্নাত গা খানি ওর ..৷

আহা গা খানি কী ওরই শুধু
গা দুখানি দুই পারেরও
ওরই মতো গা ডুবোনো;
খোড়ো চালে ঝোড়ো কথা
আকাশ জুড়ে রহস্যতা..
  মাঠের খাঁজে কচি জীবন
  উছলে ওঠে ঢাকের সাঁঝে ..৷

গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী
' কিন্তু ' ছাড়াই সোনা রোদে
   হেসে বেড়ায় নেচে বেড়ায়
শান্ত নিথর বিসর্জনে
ঢাকি কাঁসর সব ছাপিয়ে
  ঢেউ কাঁপিয়ে ওঠে কেঁদে ..৷

নীরব সবাই নীরব নদী
আহা বছর বুঝি শেষ হোলো বা
এরই তরে ভরা নদী
 হাসছিল আর নাচছিল বা ..৷

' কিন্তু '  ' তবু ' জীবন ' যদি ' ...
গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী
  যায় বয়ে ওই কুয়াশ সাঁঝে,
সকাল রোদে খোড়ো ডিঙা
শীতের হাওয়ায় জোয়ার ভাঁটা
শিশির ধোয়া গা খানিতে ..৷

শান্ত ধ্যানে মৌন মুনি
জপের মালার মন্ত্রখানি
  আধোভাষায় কইতে থাকে,
কোকিল ডাকে, আমের বোলে
গন্ধ ছোটে .. ফাগুন আসে
গ্রামের পাশে ছোট্ট নদী
 বইতে থাকে বইতে থাকে ৷৷

আমি

আমি অর্থহীন
আমি সমুদ্রের ফেনা ..
  অগুন্তির মাঝে মিলে মিশে
  আছড়ে যাই কঠিন বালুতে ৷

আমি বিবর্ণ
আমি অস্পষ্ট দিগন্ত ..
  সন্ধ্যার আঁধারে মিশে থাকি
  তারাদের কোলে ৷

আমি শ্রান্ত
আমি ডালে বেঁধা ঘুড়ি ..
  রোদে জলে ছিঁড়ে ছিঁড়ে
   ঘুমিয়ে যেতে চাই সবুজের পরে ৷৷




এক যে ছিল বুড়ি

বনের ধারে এক বুড়ীর বাস ..
তার বড় বড় চোখে
  অন্ধকারের রাশ ..
তার জটানো কেশে
 স্তব্ধতার ধূসরতা..
বনের ধারে ছিল এক বুড়ীর বাস ৷

হাওয়ারা সেথায় যেতে পায় ভয় ৷
ফুলেদের গন্ধও হয়ে আছে স্তব্ধ
  বুড়ীর কুটীর ঘিরে ৷
সেই বনের ধারে বুড়ীর বাস যেখানে
তার কুটীর ঘিরে ছিল ফুলের নিযাস,
 আর ছাউনীর আঁধারে ঢাকা ভয়াল ক্রূরতা ৷৷

একদিন সেখানে এলো এক পথিক ৷
তার না ছিলো কোনো পক্ষীরাজ,
    না ছিলো ব্যঙ্গমা ৷
কেবল পথ ঘুরতে ঘুরতে
দেশ দেখতে দেখতে
  নিজের খেয়াল খুশীতে
  এক ঝলক নিঃশ্বাসের দোলায়
আঘাত পেল বনের ধারের
  সেই রুক্ষ স্তব্ধতায় ৷৷

পথিক বড় বড় চোখে চাইল
চোখের মণিতে কৌতুহলের ঝিলিক
  টলটলে সর্বনাশা হাসি ..
পথিক বড় বড় চোখে দেখতে থাকল ৷
সেখানে এক পিঙ্গল ঘোলাটে
রহস্য লুকিয়ে ছিল ,
 (পথিকের মনে হোলো)
সাগরের সুনীল গভীরতা
ঘন কৃষ্ণ মসীতে কষানো
অমার তারাহারা আকাশ
  পড়েছে বা ঢুকে ওই কুঠরীতে..
কুণ্ডলীকৃত কোনো অজগর বা
বন্দী আলোর মাঝারে ..
 কিম্বা আঁধার রেখেছে সরিয়ে
আলোকের ব্যর্থ আহ্বানে ৷
পথিক দেখল চেয়ে..
তারপর নিল ঘ্রাণ
 সুগন্ধে ছাওয়া চারপাশ ৷৷

    ...

বনের ধারে এক বুড়ী ছিল,
সেখানে এক পথিক গিয়েছিল ..
তারপর কী হয়েছিল তা কেউ জানেনা ৷
শুধু আলো ছায়ায় ঘেরা পথখানা
   এখনো আছে পরে ৷
সেখানে ক্ষণে ক্ষণে স্তব্ধতাতে
    ক্ষণে ক্ষণে কাকলি ৷
কখনো বা মৃদু সমীরণে ফুলের গন্ধ যায় বয়ে -
কখনো বা ক্রুর মৌনতা চোখ রাঙিয়ে দেয় আঁধারে ..
  সমস্ত কিছুকে .. নীল আকাশটার হাসি ,
  কূজনে গুঞ্জনে মুখর সুগন্ধি বাতাস ৷
আবার মাঝে মাঝেই অকারণ ব্যথায়
আকাশটা বিবর্ণ হয়ে ওঠে কেঁদে ..
 কেবলই কেঁদে চলে ৷
বনের ধারে এক বুড়ী ছিল,
আর সেখানে হঠাৎই
  হাজির হয়েছিল এক পথিক ৷৷




মুক্তি

মুক্তি চেয়ে চেয়ে
পাগল ঝোরাটা
 এপাশে ওপাশে
 পাথরে মাথা ঠুকে
  শেষে কোথায় যে হারিয়ে গেল ?

লেত্তির পাকে জড়া লাট্টুটা
মুক্তির আনন্দে ঘুরছে
  না কী বন্ধনের আবেগে মত্ত
   এই দুনিয়াটার মত ?

সূর্য্যের রঙগুলি মুক্তি পেয়ে
ক্ষ্যাপা পাগলের মতো
 সন্ধ্যার আকাশটা দিচ্ছে পারি,
  আর ধীরে ধীরে
   আঁধারের বুকে হারিয়ে যাচ্ছে ৷
   সেও কী মুক্তির অন্তিমে ?


তবু

একটা তারা বুঝি
ভুল করে উঠে পড়েছে ৷
হাজার তারাদের ভীড়ে
 সেও ছিল এতদিন ..
হাজার দৃষ্টিতে
হঠাৎ কেমন করে
 সে ধরা পড়ে গেছে ৷

আকাশটা মেঘে মেঘে
বিনা বিদ্যুতে,
 থমকে রয়েছে সাঁঝের আঁধারে ..
ঝোড়ো হাওয়ার মিছিল
হঠাৎ ক্লান্ত হয়ে
 পাতার ফাঁকে ফাঁকে গিয়েছে মিলিয়ে ৷
গুমড়ে ওঠা বেদনা রোদনের
না জানা জটানো সূতোগুলো
  আরো হতাশ জালে
  জড়িয়ে চলেছিল ..
সঙ্গীহীন জনাকীর্ণ পৃথিবীর রাতে ..
 অন্ধকার বড় অন্ধকার ৷

তারই মাঝে
 কখন একটা তারা
  ভুল করে উঠে বসে আছে ৷৷

অধরা

ঠিক বুঝতে দিলে না ৷
কখনো বা হাসলে হঠাৎ ..
কখনো বা থাকলে চেয়ে ..
কখনো বা রইলে চুপে ..
  কইলে কথা হঠাৎ কখন
  বুঝতে পেলাম না ৷
বাতাস কখন উষ্ণ মেদুর
কখন শীতল কখন মৃদু
কখন ঝড়ে নড়িয়ে আগল
 আবার কোথায় হারিয়ে যায়
  ধরতে দিলে না ৷৷

আকাশটা বা কেমন সুনীল
নাচতে থাকে হাসতে থাকে
সাদা মেঘের নিশান নিয়ে
ভাসতে থাকে, ভাসতে থাকে
রঙের ঘুড়ি উড়তে থাকে
ঠুনকো ফানুস পলকা সুতো
হঠাৎ কখন অভিমানে
কালো হয়ে কাঁদতে থাকে,
চোখের কোনে বিজলী হেনে
রামধনুতে সুর বা টেনে..
কখনো বা অন্ধ রাগে
  ব্যর্থ মাথা ঠুকতে থাকে ..
কখনো বা নিশার আঁধে
কোথায় নিজে লুকিয়ে থাকে
  ধরতে পেলেম না ৷৷

ছুড়তে নোঙ্গর নদীর স্রোতে
ভীড়ল গিয়ে কঠিন খাতে ..
বালুর পরে ছিড়ল দড়ি
ধরতে পেলে না ৷
রঙীন পাখী কোন ভোরেতে
অতিথ হোলো সবুজ ডালে,
দুলল শিসে উড়ল আবার
  ফিরতে গেলে না ৷
মনখানাকে ভাসিয়ে দিয়ে
কোন সহজে পৌঁছে গেলুম
অনেক কাছে ..
কোন চড়েতে আটকে গেলো
  ভিড়তে পেল না ৷
ঠিক বুঝতে দিলে না ৷৷


একটি বটগাছের কথা

পাতাগুলি পড়ছে খসে ৷
বাতাসেতে যাচ্ছে উড়ে
ঘুরছে কত,
রোদ্দুরেতে উঠছে জ্বলে ৷
জটাজাল বিছিয়ে দিয়ে
আঁধার বুকে,
হাসছে আলো সবুজ মাথে ..
নানা রঙের পাখীর বাসা
খড়কুটোতে ঢাকা আশা ..
রক্তবীজ ছড়িয়ে দিয়ে
পাতাগুলো যাচ্ছে খসে ৷৷

দিচ্ছে বাতাস পড়ছে আলো
মাথার পরে আকাশটাও
কখন রোদে কখন কালো ..
রামধনুসুর বজ্রবাণী
  শোনায় কত ৷৷

পাতাগুলো যাচ্ছে খসে ৷
সবুজক্ষেতের উদাস হাওয়ায়
যাচ্ছে ভেসে, যাচ্ছে মিশে..
অচিনপুরীর সে কোন দেশে ..
ঝিরঝিরঝির খসখসখস
শুনছে সবাই .. বলছে ওরা
আসছে তারা, আসবে তারা ৷৷

চিঠি

তোমার চিঠি আজকে পেলাম,
নীল চাহনি আঁকা বাঁকা ..
 কটা কথাই হল জানা,
 কত কিছুই রইল বাকী ৷
রহস্যেরই আঁধার করা
শুন্যপাতার কটা তারা
 দিচ্ছে আলো দূরের থেকে
  সেইটুকু সার সেইটুকু সুখ
  সেইটুকুরই স্পর্শে বুঝি
  সত্য তুমি নওগো ফাঁকি ৷

তবু আঁধার রইবে চুপে?
কইবে না কি সৃজন কথা?
ধরবে না কী মূহূর্তেরে
 কলম হাতে চুপটি করে
 ছিলে যখন?
 তোমার কাছের শুন্য পাতা
 কইবে না কী তাদের কথা ?

হয়তো তখন সাঁঝের আলো
দিনের শেষে আয়েশ করে
 ধূসর পোষাক চরিয়ে গায়ে
  তোমার চোখে হেসেছিল ..
কিম্বা সবুজ হাওয়ার দলে
অচিনপুরী যাবার কালে
 মুখে চোখে এলোচুলে
 দুষ্টুমিতে ছুঁয়ে গেলে ৷

কত যে গান কত যে সুর
আনমনেরই কত কথা
সাগরপারের ঢেউগুলো সব
বালুর পরে ছিটিয়ে ফেনা
  ফের সাগরে ফিরছিল ..
ভাসা ভাসা আঁচড়গুলো
বালুর পরে স্বাক্ষী রেখে
 আমায় তুমি ডাকছিলে ৷
তোমার চিঠি আজকে এলো
ঝলক আলোর সত্যটুকুয়
 সাতখানা রঙ রইল ঢাকি ৷৷

তুমি দিগন্ত

দিগন্তটা ভাসা ভাসা ৷
তার শ্যামলিমার ঔজ্জ্বল্য আছে
 কিন্তু কোনো অবয়ব নেই ৷
তবু আমার তাকে ভালো লাগে ৷
আমার কামনার নীল আকাশটা
 তার পরশ পেতে চায় ৷
কিন্তু কতদূর গেলে
সে তার ছোঁয়া পাবে
 তার হিসেব জানেনা ৷
  ...

একটা রঙীন খামে তাই
আমার ভালোবাসা জানিয়ে
 ওই নীল আকাশটার মেঘে
  উড়িয়ে দিলাম..
  ওই দিগন্তটার উদ্দেশ্যে ৷
সে উড়তে উড়তে
হাওয়ার কোলে দুলতে দুলতে
  সাত স্বপ্নের ভীড়ে মিশে গেল ৷
তার গন্তব্যের শেষ বিন্দুটিও
আমার নির্ণিমেষ নয়নের
  কোণ থেকে ঝড়ে গেল ৷

...

আমি এখন উত্তরের অপেক্ষায় ৷
কোনো শীতল উত্তুরে হাওয়ার দল
বা উষ্ণ দখিনা বাতাসেরা ভেসে আসলেই..
  আমি আমার উত্তর খুঁজি ৷
হয়তো বা ওর মতই
  ওর উত্তরটাও ভাসা ভাসা ৷
কোন লহমায় সে তার
আধো  নীরব উত্তরখানা পাঠিয়েছে
 হয়তো বা বুঝতে পারিনি ৷
আমে তাই মুহূর্তগুলিকে
মনের ঝুলিতে এক এক করে
  বাছাই করতে থাকি ৷

...

মাঝে মাঝে মনে হয়  তুমিও দিগন্ত ৷
ও তোমারই মত সবুজ
অথচ তোমারই মত নিষ্প্রাণ ৷
তবু আমার রক্তরাঙা সূর্য্যটা
তারই কোল থেকে মুখ তুলে
 সেখানেই ঘুমিয়ে যেতে চায় ৷
তবুও তার মৌণ চাহনি
ছিন্ন মেঘের মতো
আমার নীল আকাশটায়
  তুফান তোলে ৷
তার সরল শ্যামলিমা
আমায় পাগল করে তোলে ৷
মাটীর শক্ত বাঁধন ছিড়ে
হৃদয়ের গভীরে তার
  মিশে যেতে চাই ৷

...

মাঝে মাঝে তাই ভাবি  তুমিও দিগন্ত ৷
তোমারই মতো সে নিষ্ঠুর ..
 ধরা সে দেয়না ৷
আমার অবসন্ন হৃদয়টা
 কঠিন মাটীতে লুটায় ৷
রুদ্ধ আক্রোশে তার অভিমান
 দ্রিম দ্রিম লয়ে বয়ে যায় ৷
সে দেখে ঠিক যতদূরে ছিল
  ততদূরেই দিগন্তটা ৷

...

একরাশ অভিমান নিয়ে তাই
 পালিয়ে বেড়াতে চাই ৷
কোথায় বা পালাই ?
যেখানেই যাই চেয়ে দেখি
সে আমারই চারপাশে
 আমাকেই ঘিরে ৷
আমার চোখে তার বেলাশেষের
  ঘুমপাড়ানী রোদ্দুর ..
বয়ে নিয়ে আসে একরাশ
তাজা হাওয়ার দল ৷
সেই সাথে ভীড় করে আসে
আরো কত স্বপ্ন আরো কত রঙ ৷

...

চোখ জুড়ে ঘুম নামার আগে
বুঝতে পারি - ভালোবাসি
 তাকে বড়ো ভালোবাসি ৷৷

গ্যালপিং

প্লাটফর্মের বেঞ্চিতে লোকটা নির্বিকার ভাবে
চায়ের কাপের ধোঁয়া গিলে যাচ্ছে ৷
আর বুড়ো লোকটার বিড়ি
বাতাসে পুড়ছে তো পুড়ছেই ৷
দড়ি বাঁধা ঝাঁকা ঝুড়িগুলো পর্যন্ত্য
ছড়িয়ে ছিটিয়ে এখানে ওখানে পড়ে আছে,
ভীড় করে সীমানায় হাজিরা দেয়নি ৷
স্টেশনের ঝিমোনো গেটের সামনে
চেকারবাবু তাঁর পোশাকী কর্তব্যের
হিসেব দাখিল করতে আসেননি ৷
কেবল বন্ধ কাউন্টারের রেলিঙে
দুটো নোংরা ছেলে উঁকি মেরে তাকালো ..
ট্রেনটা প্লাটফর্ম ছুঁয়ে বেড়িয়ে গেলো ৷
অহঙ্কারে, না কী অভিমানে ?
 একটু সময়ও দিতে সে রাজী হোলো না ৷
তবুও একজন - হয় সে পাগল
নয়তো কোনো প্রত্যাশী পথিক
 ট্রেনটাকে ধরবার জন্য দৌঁড়োচ্ছিল ..
 মেঠো সবজে আলে,
চারপাশের জগৎটাকে উপেক্ষা করে ৷৷

....

জানালার রডে মাথা ঠেকিয়ে
সূর্য্যের আলোখানা এড়িয়ে বসেছিলাম -
আর দম্ভী সুখের রেশে
না ভেড়া প্লাটফর্মের খটখটে চেহারাখানা
  এক পলক দেখে নিলাম ৷
আমার চারপাশে ভীড় করা
অসংখ্য মুখ, নানান কথা - শত সহস্র হৃদয়
আর আমি গ্যালপিং ট্রেন ছুটে চলেছি ৷
কত প্লাটফর্ম এড়িয়ে,
চকিতের চাউনি, মৌন ইশারা উপেক্ষা করে ..
কখনো অভিমানে, কখনো অহঙ্কারে
 কিম্বা উদাস অচেতনে ৷৷

রূপকথা

এক রাজকন্যে তাকে ডাকত ৷
সে যখন বাবুদের বাগানবাড়ীতে
সবুজ নরম ঘাস ছিঁড়ত আর জল ছিটাতো-
সে দেখত সে কন্যে ঘুমিয়ে আছে
কোনো গজমোতির দেশে ..
সাতনরী হার তেরো নদী পারে ৷৷

আর সে অপেক্ষা করছিল কোনো রাজপুত্তুরের জন্য ৷
যখন সে বাবুদের পুকুরঘাটে এঁটো বাসন মাজত
  আর ঠুনঠুন কাঁচের চুড়ি বাজত তার হাতে;
সে ভাবত কোনো না কোনো রাজপুত্তুর
পক্ষীরাজে উড়ে হুই চারচৌকি ঘুড়ে
তাকে তুলে নিয়ে যাবে কোনো ব্যঙ্গমার দেশে ৷৷

এরপর,
অনেক বৃষ্টি হোলো ..
রোদ উঠল ..
কুয়াশ পড়ল .. ছিঁড়ল ..
মেঘলা দিনগুলো কখনো উঠলো জ্বলে ..
আবার কখনো ঝড়ের মাতন নিয়ে স্তব্ধ হয়ে রইল ৷
এমনি সময়ে এক গনগনে দুপুরে
সে হঠাৎ আবিষ্কার করল
তার রাজপুত্তুর মাটী কোপাচ্ছে বাবুদের বাগানবাড়ীতে -
আর সে তার কন্যেকে বাসনহাতে ৷৷

১৯.১১.১৯৮২