Sunday, 11 April 2021

ভারতবাসী ও বাঙ্গালী

 


যে প্রশ্নটা নানাভাবেই আমাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজজীবনে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে সেটি আমাদের জাতীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে। এই যে আসমুদ্র হিমাচল দেশের নাগরিক তুমি তার কতটুকু আত্মীয়তার ভাগীদার বটে!

আমি শুধু ভারতবর্ষের সীমান্ত প্রদেশগুলির বিচ্ছিন্নতাপন্থী স্বাধীনতাপ্রয়াসী মানুষদের কথা ভেবেই বলছিনা - আমি বলছি প্রশ্নাতীত ভারতীয় আত্মপরিচয়ে গর্বিত মানুষদের কথা ভেবেও। তাদের ভাষার ভিন্নতা, লোকাচারের ভিন্নতা - সমস্ত কিছুরে মাঝেও ভারতবর্ষ স্বপ্নের মত জড়িয়ে আছে মায়াময় মনমাতানো মৌতাতে। কিন্তু শুধু ভাবের ঘোরেই সমাজ চলেনা। তাই ভাবের অভাব ঘটলে কীসের তাগিদে আমাদের ভারতীয়ত্ব বিকশিত হয় তারও বোঝাপড়া প্রয়োজন। কেননা এই বোঝাপড়ার খামতি দেখা দিলেই  ভারতীয়ত্বের ভিত্তিভূমি নড়ে ওঠে।

 

আমরা যারা বাঙ্গালী - যাদের মাতৃভাষা বাংলা - তাদের কাছে প্রশ্নটি গুরুতর। আমরা কতখানি ভারতীয়? আমাদের বাঙ্গালীত্ব ও ভারতীয়ত্ব কী যথার্থই পরিপূরক? আমাদের বাঙ্গালী কবি যখন বলেন, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”, বা “কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল?’ - সেও কী “সারে জাঁহাসে আছা হিন্দোস্তাঁ” -র কুচকাওয়াজে দ্বিধাহীন কণ্ঠ মেলায়? এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল, সুব্রহ্মনিয়াম ভারতীদের দেশবন্দনায় এই দুইই একে অপরের পরিপূরক। সেখানে তামিল জননী থেকে বঙ্গ জননী সবাই ভারতজননীর প্রতিভূ। আবার সেই ভাবজগতের ঐক্য ও নৈকট্য। এর সাথে অবশ্যই ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রত্যয়। পরাধীনতার গ্লানি ও অপমান থেকে মুক্তিকামী এক উন্নত  সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এ কথা অনস্বীকার্য্য আমাদের ভাষা লোকাচারে বিভিন্নতা থাকলেও সংস্কৃত ভাষা, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও হিন্দু ধর্ম এদের মধ্যে একতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।তারা যতই মুষ্টিমেয় অংশ হোন না কেন, তারাই ভারতীয় সমাজে নেতৃত্ব প্রদান করায় ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও চিন্তাধারায় সহমর্মিতা  গড়ে উঠেছিল।তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দুর্বলতাও সেখানেই নিহিত ছিল, যার কারণে ঔপনিবেশিক শাসনের  সমাপ্তি ঘটে দেশভাগের মধ্য দিয়ে। তবুও সাধারণভাবে বলা চলে রাজনৈতিক ভাবে প্রধানত ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ ও সমাজগত ভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতি ভারতীয় ঐক্যের প্রস্ফুটন ঘটায়। বিভিন্ন প্রদেশই আপন আপন সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশের সাথে এই ঐক্যের সান্নিধ্য অনুভব করত।

 

বিদেশী শাসকদের প্রস্থানে স্বদেশীয় শাসনব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্যের ধারণাটি  স্বভাবতই  বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে বহুজাতিক ভারতবর্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন অঞ্চলের জাতিসত্বার বিকাশের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।  স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের সেই  জাতীয় ঐক্যের শর্তগুলিকে বরং আমরা সংক্ষেপে দেখে নিই। আমি মূলতঃ এখানে তিনটি শর্তের উল্লেখ করব।

 

প্রথমতঃ  বিভিন্ন ভাষার জনগোষ্ঠী ও তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ যখন পারস্পরিক ভাব বিনিময় দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, তখন ভারতবর্ষের ঐক্য সুদৃঢ় হয়। অন্যদিকে এই বিকাশের গতি যখন মন্দ বা রুদ্ধ হয়, তখনি ভারতবর্ষের সাথে তাদের আত্মীয়তার বন্ধনও দুর্বল হয়। এ কথা বিশেষ ভাবে মনে রাখা দরকার, যখন কোনো বিশেষ ভাষা বা সংস্কৃতিকে অন্য একটির উপর জোড় করে চাপিয়ে দিয়ে “এক দেশ, এক ভাষা, এক জাতির’  স্বপ্ন দেখানো হয়, তখনি ভারতবর্ষের অন্তরের ঐক্যে আঘাত হানার প্রক্রিয়াও শুরু হয়।

 

দ্বিতীয় শর্তটি  ভারতীয় চিরায়ত দর্শন, সাহিত্য ও ললিতকলার মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে কোনো প্রাদেশিক ভাষার বিশিষ্টতা অপেক্ষা সংস্কৃত ভাষা এবং ললিতকলার আঙ্গিক ও বৌদ্ধিক প্রকাশ এই বিশিষ্টতা প্রদান করেছে। সেটি আরো সুলতানি ও মুঘল আমলের হিন্দুস্তানি ঘরানার সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে।বিভিন্ন লোকসংস্কৃতিও এদের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। সুতরাং উত্তরাধিকারের এই ঐতিহ্য এবং তার বিকাশ যতই অবহেলিত হবে, ততই ভারতীয়ত্বের  ভিত্তিভূমি দুর্বল হবে। একথা বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য যখন  পশ্চিমী প্রচারমাধ্যমের সংস্কৃতি বিপণনে দেশীয় সংস্কৃতিকে (চিরায়ত ও লোকায়ত দুই বিভাগেই) বিপন্ন দেখায়।

 

 তৃতীয় অন্যতম  শর্তটির ভিত্তি  ভারতবর্ষের বহুত্ববাদ -- বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতিপূর্ণ আদান-প্রদান।সংস্কৃতির থেকে ধর্মকে আলাদা করা মুশকিল। তবে যতই দিন যাচ্ছে সংস্কৃতির উপর ধর্মের প্রভাব ক্রমশঃই  কমছে (ক্ষেত্র বিশেষে যে বাড়ছে সেটি না বললেও নয়)। ভারতবর্ষে শুধুই হিন্দু বা শুধুই মুসলমান বা শুধুই শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খৃষ্টান ধর্মালম্বীর মানুষেরা থাকবেন তা নয়। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি নিয়েই বসবাস করেন। এই শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির ভাঁড়ারে টান পরলেই একতা বিনষ্ট হয়। বর্তমানে এ এক মহাবিপদ।ইংরেজ শাসন ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক ভাবে এক করলেও, ধর্মীয় বিভাজনে ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করেছে।সেই প্রক্রিয়া এখনো সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সমীকরণে ধর্মীয় বিভাজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। সেখানে ভাষা ও সংস্কৃতি পিছু হটে ধর্মের একতাই হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এমনকি কোনো বিশেষ জাতিসত্বার স্বাধীন আকাঙ্ক্ষাতেও এই ধর্মীয় মোড়ক বিদ্যমান। এ কথা যেমন সত্য যে ভারতীয় সমাজজীবন থেকে ধর্মকে ছেঁটে ফেলা যাবে না, তেমনি এই যুগে ধর্ম যতই গেঁড়ে বসবে ততই ভারতীয় অনৈক্য বিকশিত হবে। অর্থাৎ ধর্ম আজ মিলন অপেক্ষা বিভেদের অন্যতম ভিত্তিভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

...

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিকাশের আঞ্চলিক অসাম্য নিরপেক্ষেই আমি পূর্বোক্ত শর্তগুলিকে বিচার করতে চেয়েছি। অর্থনীতির সুষম বিকাশেও প্রশ্নগুলি যে গুরুত্ব দাবী করে, তা নব্বই-এর দশকের বিভিন্ন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাই (যেমন সোভিয়েত রাশিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়া) প্রমাণ দেয়। এই বিচারেই দেখা যেতে পারে আমাদের বাঙ্গালীত্ব এই ভারতবর্ষে কতখানি ভারতীয়ত্বের অংশীদার। আমি অতীত ঘাঁটতে এখানে বসিনি। শুধু এই উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে এই বাংলাদেশের নবজাগরণেই ভারতীয় জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং প্রাক-স্বাধীনতা যুগে বাঙ্গালীর বাংলা ও ভারতমাতা যে এক ও অভিন্ন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এমন কী স্বাধীনতা পরবর্তী তিন দশকেও এর হেরফের খুব ছিলনা। ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। অসচেতনভাবেই; যখন বাংলা তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবহেলা করতে শুরু করল। শুরুতে যেন অনেকটা প্রাদেশিক সংকীর্ণতার ঊর্ধে দাঁড়িয়ে বাঙ্গালীয়ানা বিসর্জনের মুগ্ধবোধে আমরা মোহিত ছিলাম। ক্রমেই সেই ঔদার্য্য অক্ষমতায় পরিণত হয়েছে। এখন আমরা আত্মপরিচয়ের আত্মবিশ্বাস খুইয়ে বসেছি। বিশেষত আমাদের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বাংলার অতীত মনীষা নিয়ে যেমন গর্ব, তেমনি বর্তমান সম্পর্কে চরম উন্নাসিকতা ও হীনমন্যতা।

 

এর সরাসরি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শিক্ষাক্ষেত্রে। সাধারণ শিক্ষিত পরিবারগুলিতে (উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সমস্ত স্তরেই) প্রচলন হয়েছে “ইংলিশ মিডিয়াম”-এ সন্তানদের পড়ানো। সরকারি “ফ্রী এডুকেশনে” এদের আর ভরসা নেই। আর তাই অলিতে গলিতে কচিকাঁচাদের “ইংলিশ রাইমস” আর “ফেব্লস” মুখরিত স্কুলগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে। এমনকি অধিক সচেতন বাপ মায়েরা এখন ইংরাজির সাথে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে বাংলাকে দুয়োরানীর মর্যাদাটুকু দিতে রাজী নন। সেক্ষেত্রে হিন্দী পঠন পাঠনের ব্যবস্থা থাকলে ছেলেমেয়েদের সেদিকেই ঠেলছেন। এর ফলে শৈশব থেকেই যে উন্নত বঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে শিশু মনের পরিচয় ঘটত তা রুদ্ধ হচ্ছে।এ কারণেই কোনো ছড়া বা কবিতা বলতে বললে এখন শোনা যায় আধো আধো কুণ্ঠিত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জনি জনি ইয়েস পাপা’ বা ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাক শীপ’। ‘হাট্টিমাটিম’এর জগত তাদের অজানা। রবীন্দ্রনাথ- নজরুল- যোগীন্দ্রনাথ- উপেন্দ্রকিশোর- সুকুমার রায় - জসীমুদ্দিন- অবন ঠাকুর - এঁরা সবাই  এদের যে বিচিত্র সম্ভার নিয়ে শিশুমনের কল্পনার জগতকে উন্মোচিত করত - তা থেকে এরা  বঞ্চিত। অথচ শিশু যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় জগতকে চেনে - সেই ভাষাতেই তার বৌদ্ধিক মননে আলোড়ন তোলা সম্ভব। সেই ভাষার বুননেই কল্পনার জগত প্রসারিত হয়। কিন্তু বর্তমান বিকল্প শিক্ষায় বিজাতীয় ভাষার পেষণেই শিশুমানস পঙ্গুত্বের শিকার হয়। সে তার আপনজনের আত্মীয়তা থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে বিজাতীয় ভাষার অঙ্গনের সাদর আমন্ত্রণকেও অকুণ্ঠিতে গ্রহণ করতে পারেনা। এর ফল, আপন সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ঔদাসীন্য ও হীনমন্যতা। আমাদের আত্মহননের বীজ এইভাবে বপন করা হচ্ছে। এতে যে শুধু বাঙ্গালীত্বই খর্বিত হচ্ছে তা নয়, ভারতবর্ষও দূরত্ব তৈরী করেছে। আমাদের ‘বাঙ্গালী’ পরিচয় বাদ দিলে ‘ভারতবাসী’ শব্দটিও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এটি ভারতবর্ষের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই সত্য।

...

আমাদের জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সর্বাধিক বিপজ্জনক ভারবর্ষকে ‘এক জাতি এক প্রাণ’ হিসেবে উপস্থাপিত করা। ভারতবর্ষ যে বহু জাতির মিলনভূমি এই সরল সত্য এই  ‘এক জাতি এক প্রাণ’ শ্লোগানে চাপা পরে যায়। বিভিন্ন জাতির বিকাশের অন্তরায় এই ধরণের অতিরিক্ত কেন্দ্রমুখী চিন্তাভাবনা - যার কেন্দ্রস্থলে বিরাজ করছে ‘হিন্দী  ভাষা’ ও ‘বাণিজ্যিক হিন্দী  সংস্কৃতি’। হিন্দী রাষ্ট্রভাষা হতে পারে - কিন্তু হিন্দী এই গোটা রাষ্ট্রের ভাষা নয় সেই সত্য স্বীকার করা অতি আবশ্যক। হিন্দী প্রচারের মাধ্যমে হিন্দীকে গোটা রাষ্ট্রের ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন যারা দেখেন - তারা আর যাই হোক ‘ভারতবর্ষ’কে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না। অথচ হিন্দীকে ঠিক এই লক্ষ্যেই এতোটাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে সাধারণভাবে সরকারী অনুষ্ঠান ও প্রচারমঞ্চে  প্রদেশগুলিতেও তিনভাষার রীতিনীতি অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দী, ও ইংরাজী - এই তিনের সমাবস্থান রক্ষিত হয় না। সে ক্ষেত্রে হিন্দী ও ইংরাজীর পঙক্তি থেকে আঞ্চলিক ভাষাগুলি বিদায় নিয়েছে। কিছুদিন আগেই দূরদর্শনে কোলকাতা মহানগর টেলিফোন নিগমের টেলিফোন ডিরেক্টরি প্রকাশের অনুষ্ঠানের ব্যানারে দেখলাম কেবল হিন্দী আর ইংরাজীটুকুই সেখানে উপস্থিত। বিষয়টি হয়তো ছোটো খাটো ত্রুটির আওতায় পরে, তবে এই ত্রুটি এখন সর্বত্রই। তাই মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। এমনকি হিন্দী ভাষী অঞ্চলের বড় বড় রেলস্টেশনগুলিতে দেখা যায় কেবল হিন্দীতেই ঘোষণা হচ্ছে, অথবা অনুসন্ধান বিভাগের বোর্ডটিতে কেবল হিন্দীতেই ট্রেনের খবর লেখা আছে। এও এক ধরণের অসহিষ্ণুতা। এক্ষেত্রে অন্ততঃ ইংরাজীতে লেখা থাকা উচিত। যদি তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকে কেবল সেখানকার ভাষাতেই ঘোষণা করা হোতো অথবা ট্রেনের খবরাখবর লেখা থাকত তাহলে ভিন প্রদেশের মানুষদের যেমন অসুবিধে হবে, এই স্টেশনগুলিতেও তেমন অসুবিধে হিন্দী না জানা মানুষের হয়ে থাকে।

আমাদের ভাষানীতির এই অসহিষ্ণু লঙ্ঘন অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। হিন্দী ও ইংরাজী উভয়েই সংযোগকারী ভাষা হিসাবে ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকায় কোনো ভাষাকেই ছোটো করা উচিত নয়। আবার কাউকেই বাড়িয়ে দেখে সর্বত্র বাধ্যতামূলক করার অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ‘রাষ্ট্রভাষা’ বা ‘রাজভাষার’ এই বিশেষণটুকু ছেঁটে ফেলে কেবল ‘সংযোগ ভাষা’ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত। এর ফলে আমাদের আন্তঃসম্পর্কে স্বচ্ছতা আসবে।

...

সুতরাং  প্রশ্ন উঠতেই পারে কিসের তাগিদে এই বিবিধ জাতির সম্মলেনভূমি হিসাবে ভারতবর্ষ টিঁকে আছে? বিশেষতঃ জাতিগুলির আপন আপন বিকাশ স্বতন্ত্র উদ্যোগেই কী কাম্য নয়? এতো কিছু ‘কষ্টকর’ বোঝাপড়ায় এই বিকাশের গতি কী শ্লথ হয়ে যায়নি?

 

আমাদের বিভিন্ন ধরণের প্রাদেশিক টানাপোড়েন, বোঝাপড়ার অসঙ্গতি সত্বেও আমাদের এই ঐক্য যে কতখানি জরুরী সেটি বোঝা যেতে পারে যদি আমরা তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র দেশগুলির দিকে তাকাই। যদিও ভারতবর্ষ অনেকাংশেই অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পশ্চাদপদ, তবুও তার এই বিশালতা ও জাতিসম্মেলনের উন্নত সংস্কৃতির প্রভাব বাইরের দুনিয়ায় যথেষ্ট পরিচিত। সুতরাং ভারতবর্ষের পরিচিতিতে বিশ্বের অঙ্গনে যে স্বাতন্ত্র্যের গৌরব আমরা লাভ করেছি, সেটি আমরা হারাবো। ক্ষুদ্র প্রদেশগুলি সেই গুরুত্ব অর্জনেও অক্ষম হবে। অন্যদিকে এই বিশালতা ও ভারতীয় জাতিসম্মেলনের এই  বৈচিত্র্য আমাদের গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। হঠাৎ করে  কোনো সামরিক অভ্যুত্থান এই দেশের চালু শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে পারবে না। ভারতীয় গণতন্ত্রের নানা দুর্বলতা সত্বেও যে কোনো স্বৈরতন্ত্রী একনায়কত্ব অপেক্ষা তা বরণীয়। এছাড়া রাজ্যগুলি নিজেদের অর্থনৈতিক আদান-প্রদান বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপেও লাভবান হয়। স্বতন্ত্র উদ্যোগে সেই বোঝাপড়ায় খামতি থেকে যেতো। এমনকি যে কোনো অন্তর্বিরোধই এই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সামলানো সহজ। সাম্প্রতিককালে নদীর জলভাগ নিয়ে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিবাদ বিসম্বাদ লক্ষ্যণীয়। এরা সবাই যদি স্বতন্ত্র দেশ হোতো তবে এই কাজিয়ায় না যুদ্ধ লেগে যেতো?

 

এই বিভিন্ন কারণেই আমাদের ঐক্য অত্যন্ত জরুরী। আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া রাখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ঐক্যের খাতিরে যেমন নিজস্ব জাতীয় স্বাতন্ত্র্য জলাঞ্জলি দেওয়া চলে না, তেমনি বিরোধ আছে বলেই গাঁটছড়া ছিন্ন করা চলে না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বহুজাতিক ভারতবর্ষের এই সমাধান আবশ্যক। আমাদের বোঝা প্রয়োজন আমাদের বাঙ্গালীত্ব বিনা আমরা ভারতবাসী নই - আমাদের এই দ্বৈতসত্ত্বাই আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

 

২২/৮/৯৭

 

 

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home