উচ্চশিক্ষায় বৈষম্য
‘উচ্চশিক্ষা’ নিয়ে আমরা যতই বড়াই করি না কেন, অথবা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম কারিগরী ও বিজ্ঞান শাখায় শিক্ষিত মানবসম্পদের দেশ হিসাবে নিজেদের জাহির করি, আমাদের দেশের পনেরো বছরের বেশি বয়সি মানুষদের মাত্র ২.২% ‘উচ্চশিক্ষিত’ (অর্থাৎ স্নাতক, উপস্নাতক বা স্নাতকোত্তর শংসাপত্রের অধিকারী)। এটা ঠিকই যে আমাদের দেশের কারিগরি ও বিজ্ঞান শাখার অগ্রণী প্রতিষ্ঠানগুলি যেমন, বিভিন্ন আই আই টি, আই আই এম, কোলকাতার আই এস আই, বাঙ্গালোরের আই আই এস সি, নতুন দিল্লীর এ আই এম এস ইত্যাদি বহির্বিশ্বে সুনাম অর্জন করেছে। এই সমস্ত প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত ছাত্রছাত্রীরা তাদের মেধা ও সৃজনশীলতায় সমাদৃত হয়েছে। বর্তমানে ভারতবর্ষের অন্যতম ব্রান্ড অ্যাম্বাসাডরের ভূমিকায় (বা বহির্বিশ্বে পরিচিতির শিলমোহরে) এই প্রতিষ্ঠানগুলি অবতীর্ণ হয়েছে। এর ফলে আমাদের দেশের উচ্চশিক্ষার প্রতি উন্নয়নশীল ও উন্নত দেশগুলিতে সম্ভ্রম ও আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তবে এই প্রতিষ্ঠানগুলি দেশব্যপী উচ্চশিক্ষার নৈরাজ্যের অন্ধকারে ব্যতিক্রমী নক্ষত্র মাত্র। সাধারণভাবে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান যে তলানিতে ঠেকেছে সে আমাদের পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন কলেজ ও একদা গৌরবোজ্জ্বল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান হালচালেই তা টের পাওয়া যায়। এই প্রতিষ্ঠানগুলিতে যেমন পরিকাঠামোর অভাব আছে, তেমনি শিক্ষার পরিবেশও ছাত্র শিক্ষক কর্মচারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ফাঁকি রয়ে গেছে। এর সাথে উত্তরোত্তর ক্রমবর্ধমান সরকারি ঔদাসীন্যে প্রতিষ্ঠানগুলি উচ্চশিক্ষায় তাদের প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ছাত্রছাত্রীরা আসে কোনো এক ডিগ্রির সন্ধানে, আর শিক্ষক-শিক্ষিকাদের কাছ থেকে টিউশন আর সাজেশনের সাহায্যে পরীক্ষার বৈতরণী পারাপারের স্রোতে গা ভাসায়। ব্রিটিশ আমলের কেরানি গড়ার শিক্ষাব্যবস্থাই আংশিক খোলনলচে বদলে উচ্চশিক্ষিত কেরানি সরবরাহেই প্রধানতঃ মুখ্য ভূমিকা নেয়। স্বাধীনতার পর ষাট সত্তর দশক পর্যন্ত্যও সীমিত ভাবে হলেও অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের সাথে তাল মিলিয়ে এই ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছিল। সরকারী বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানগুলিতেই বিভিন্ন পেশায় দক্ষ কর্মীর দরকার পড়েছিল। সে কারণেই উচ্চশিক্ষাতে রাষ্ট্র সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। ১৯৫০-৫১ সালে যেখানে উচ্চশিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় পাঁচ লাখ, ২০০৩ -এ সেই সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে নব্বই লাখের আশপাশে। এই ৫০ বছরে সারা দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০০টি এবং প্রায় ১৩০০০ কলেজ এখন দেশে চালু আছে। এও লক্ষ্যণীয় এখনো ৩৩-৪০% উচ্চশিক্ষার্থী আসেন সমাজের নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি থেকে। যদিও বিভিন্ন উন্নত দেশগুলির তুলনায় সমাজে উচ্চশিক্ষার প্রসার অত্যন্ত কম (১৭-২৩ বছরের জনসংখ্যার কেবল ৮-৯% উচ্চশিক্ষায় যুক্ত), তবুও সীমিত ভাবে হলেও স্বাধীনতার পরবর্তী চার দশকের শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণ বা সর্বসাধারণের প্রবেশাধিকার সুরক্ষিত করার প্রয়াস ছিল। কিন্তু শিল্পায়নের গতি যখন রুদ্ধ হোলো, যার লক্ষণ ষাটের দশকের মাঝ থেকেই দেখা যাচ্ছিল, এবং যা তীব্র আকার ধারণ করে আশি ও নব্বই-এর দশকে, সেই সময় উচ্চশিক্ষিত শ্রমশক্তির সামাজিক প্রয়োজনীয়তাও কমে গেল। এই সময় থেকেই শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা বেড়েই চলল। ফলে উচ্চশিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রীয় দাক্ষিণ্যও হ্রাস পেতে লাগল। বিশেষ করে ১৯৯২-৯৩ থেকে উদারনীতি ও মুক্ত অর্থনীতির খোলা বাজারে উচ্চশিক্ষাতে সরকারী বরাদ্দ কমতে থাকল। যার অর্থ সাধারাণ মানুষের কাছে এটি ক্রমেই মহার্ঘ হয়ে উঠতে থাকল। ১৯৯৩-৯৪ সালে যেখানে ছাত্র-ছাত্রীদের মাথা পিছু সরকারী খরচ ছিল ৬৭.৩৮ টাকা, ২০০১-২০০২ এ সেটি এসে দাঁড়ায় (মূল্য বৃদ্ধি সূচক পরিশোধিত) ৫৮.৭৩ টাকা।
সরকারি ঔদাসীন্য এবং ক্রমবর্ধমান বেকারিত্বের কারণে ছাত্রছাত্রীদের অধিকাংশই তাই সাধারণ উচ্চশিক্ষার বাইরে কারিগরি ও পেশাদারি বৃত্তিমূলক শিক্ষায় আগ্রহী। ছাত্রছাত্রীদের উচ্চশিক্ষার এ চাহিদা সীমিত সংখ্যক সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি মেটাতে অক্ষম। আর সে কারণেই ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার-উকিল-নার্স প্রভৃতি বিভিন্ন পেশায় শিক্ষিত করার প্রতিষ্ঠান গজিয়ে উঠল। যদিও এই প্রতিষ্ঠানগুলির অধিকাংশেরই শিক্ষার মান ও পরিকাঠামোতে প্রচুর ফাঁকি থেকে গেছে, তবুও বহু পয়সা দিয়ে ছাত্রছাত্রীরা এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলি থেকে ডিগ্রি আদায় করছে। এই নিম্নমানের শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরাও অন্যান্য সাধারণ বিষয়ে উচ্চশিক্ষিতের মতোই কর্মক্ষেত্রে অপাংক্তেয় থেকে যায়। তাই বিভিন্ন পেশাতে বাস্তবে চাহিদা থাকা সত্ত্বেও কর্মসংস্থানে অনেকেই ব্যর্থ হচ্ছে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে উচ্চশিক্ষায় এই ধরণের বেসরকারি উদ্যোগ মানেই সেটি নিম্নমানের। নব্বইয়ের দশকের বেসরকারি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের রমরমার পুর্বেই বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান উচ্চশিক্ষার সাথে সাফল্যের সাথে যুক্ত আছে। তেমনি এও আশা করা যায় বাজারের প্রতিযোগিতার নিয়মেই অসফল এবং কেবল মাত্র মুনাফাকেন্দ্রিক অসাধু প্রতিষ্ঠানগুলি ভবিষ্যতে ঝড়ে যাবে, নয়তো উন্নত পরিষেবা (উচ্চশিক্ষা) প্রদানে বাধ্য হবে। কবে অবশ্য সেই নৈরাজ্যের অবসান হবে সে হলফ করে কেউ বলতে পারেনা। তবে অবস্থা যাই হোক এই ধরণের বেসরকারি ব্যবস্থাতে উচ্চশিক্ষা অর্জনের যে মূল্য ধরে দিতে হয় সেটি সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলি অপেক্ষা বহুগুণ। এমনিতেই সরকারি দাক্ষিণ্য প্রাপ্ত উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানগুলিতেও প্রবেশাধিকার ও পড়াশুনা চালিয়ে যাওয়ার খরচ দেশের অধিকাংশ মানুষের নেই। সুতরাং ব্যক্তিগত উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলিতে তাদের সেই অধিকার চিন্তা করা বাতুলতা। এর সাথে রয়েছে ‘বিশ্বায়নের’ যুগে শিক্ষাকেও বাজারি পণ্যের চাহিদা-সরবরাহের ভিত্তিতে সরকারি নিয়ন্ত্রণমুক্ত পরিষেবা হিসাবে দেখার ঝোঁক। সুতরাং রাষ্ট্রের বিভিন্ন সামাজিক দায়িত্বকে ‘ভর্তুকি’র তকমা লাগিয়ে যেভাবে বিসর্জনের বন্দোবস্ত করা হয়েছে, সেইভাবে ‘শিক্ষা’ বিশেষতঃ উচ্চশিক্ষাকে মহার্ঘ করার সরকারি পদক্ষেপ নেওয়া শুরু হয়েছে। আমাদের আই আই টি গুলিতে বার্ষিক টিউশন ফী গত দশবছরে আড়াই শ টাকা থেকে বেড়ে বর্তমানে দাঁড়িয়েছে পঞ্চাশ হাজার টাকায়। এর সাথে তো থাকা-খাওয়া-বই-খাতা-সরঞ্জাম কেনার আনুষঙ্গিক খরচ তো আছেই। সে কারণেই নিম্ন আয়ের পরিবারগুলি থেকে যেটুকু সুযোগ ছাত্রছাত্রীরা আগে নিতে পারত, এখন তা অনেকাংশেই কমে গেছে। তবে আসল ছাঁটাই তো হয়ে যায় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বেই। আই আই টি গুলির প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র ও সংস্থার সহায়তা নিয়ে থাকে। দেখা গেছে এই ধরণের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত ছাত্রছাত্রীরাই বহুলাংশে সফল হয়। তবে এই বিশেষ প্রশিক্ষণের জন্য বহু অর্থ ব্যয় তাদের পরিবারগুলিকে করতে হয়। সুতরাং এই ধরণের অর্থব্যয়ের অসম প্রতিযোগিতায় নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারগুলি প্রথম থেকেই পিছিয়ে থাকে। এই ব্যাপারে গতবছরের (২০০৫) আই আই টি গুলি পরিচালিত যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় (IIT JEE) কৃতকার্য্য ছাত্রছাত্রীদের কিছু পরিসংখ্যানে চোখ বুলানো যেতে পারে।এই পরিসংখ্যান আই আই টি যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত বোর্ডের একটি রিপোর্ট থেকে সংগৃহীত।
২০০৫এর আই আই টি যৌথ প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রায় দুই লক্ষ পরীক্ষার্থী অংশগ্রহণ করে। এদের মধ্যে প্রায় পাঁচ হাজার জন এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ভর্তি হয়েছে। এদের ৯.০১% এসেছে বার্ষিক ৫০,০০০ টাকার নীচে আয় এমন পরিবারগুলি থেকে। আমাদের এই পরিসংখ্যানে কোনো পরিবারের আয় বলতে বার্ষিক আয়ই বোঝাব। ৫০,০০০ থেকে ১ লাখ টাকা আয়সম্পন্ন পরিবারগুলি থেকে এসেছে ১৮.০৯%। ১ লাখ থেকে ২ লাখ টাকা উপার্জনকারী পরিবারগুলি থেকে আগত ছাত্রছাত্রীদের হার ২৯.৯৫%, ২ থেকে ৩ লাখ ও ততোধিক আয়ের পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের শতকরা বিভাজন যথাক্রমে ২৪.৩১% এবং ১৮.৫৮%। এই পরিসংখ্যানই দেখিয়ে দেয় সমাজে যে ধনবৈষম্য আছে তা উচ্চশিক্ষা অর্জনের পথে কীভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠকে অপাংক্তেয় করে রাখে। এখানে এ খেয়াল রাখতে হবে, কাগজে কলমে পারিবারিক আয়ের উল্ল্যেখ করতে আমাদের ব্যবসায়ী পরিবারগুলি বরাবরই কুণ্ঠা বোধ করে। সুতরাং নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির পরিসংখ্যান যে সেই প্রবণতা দ্বারা দুষ্ট সে ব্যাপারে সন্দেহ নেই। এর সাথে মাতাপিতার বৃত্তির বিন্যাস অনুযায়ীও ছাত্রছাত্রীদের শতকরা ভাগের হিসাব যথেষ্ট ইঙ্গিতপূর্ণ। বৃত্তি অনুযায়ী কৃষিতে নিযুক্ত ৪.৭৯%, সরকারী ও সার্বজনীন বিভাগে চাকুরীরত ৪৫.৪৪%, ব্যক্তিগত উদ্যোগে কর্মরত ৯.১৫% এবং ৬.৪৮% শিক্ষাক্ষেত্রে নিযুক্ত। মজার ব্যাপার এই সংখ্যাগুলি যোগ করলে ১০০% এর হিসাব মেলেনা (মোট ৬৫.৮৬%)। অর্থাৎ প্রায় ৩৪% ছাত্রছাত্রীর মাতাপিতার বৃত্তির কোনো বিভাগ নেই। অনুমান করা যেতে পারে এদের অধিকাংশই ব্যবসায়ী পরিবারগুলি থেকে আগত। এই প্রবেশিকা পরীক্ষাতে কোচিং সেন্টারগুলির ভূমিকাও দেখে নেওয়া যাক।উল্লেখ্য সফল পরীক্ষার্থীদের প্রায় ৬০% এর সিদ্ধি মিলেছে দুই বা ততোধিক প্রয়াসে। এরা অবশ্যই বিভিন্ন কোচিং প্রতিষ্ঠানে বা ব্যক্তিগত টিউশনে বহু অর্থব্যয়ে আলাদাভাবে প্রশিক্ষিত। এমনকি প্রথম প্রচেষ্টাতেও যারা কৃতকার্য্য (৩৯.৮১%) তাদেরও সিংহভাগ এই ধরণের কোনো না কোনো প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। এই বিশেষ প্রশিক্ষণের গড়পড়তা ব্যয় দুবছরে প্রায় এক লাখ টাকা। গ্রাম ও শহরের বিভাজনও এই পরিসংখ্যানে সঙ্গতিপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের মাত্র ৮.৭৪% গ্রাম থেকে আগত। সেই সাথে উচ্চশিক্ষায় নারীপুরুষের বৈষম্য এই পরিসংখ্যানেও প্রকট - ৯৩.৭% ছাত্র ও ৬.৩% ছাত্রী প্রবেশিকা পরীক্ষায় সফল হয়েছে। উচ্চশিক্ষায় তথাকথিত ‘ভর্তুকি’ নিরপেক্ষ একটি ব্যবস্থার প্রবেশিকা পরীক্ষায় সমাজের দরিদ্র পরিবারগুলিকে যে অসম পরিস্থিতিতে যুঝতে হয় সেটি এই পরিসংখ্যান দেখিয়ে দেয়। অবশ্য আই আই টি পরীক্ষার প্রবেশিকা পরীক্ষার ফর্মের দামও যথেষ্ট। সেটিই বহু পরিবারের ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষায় অংশগ্রহণে নিরুৎসাহ করার পক্ষে যথেষ্ট। প্রসঙ্গতঃ উচ্চশিক্ষার জন্য গ্রামীণ পরিবারগুলিকে কত খরচা করতে হয় তার একটি পরিসংখ্যান দেখা যেতে পারে। এই পরিসংখ্যান ১৯৯৪ সালে National Council of Applied Economic Research (NCAER) সংস্থা দ্বারা পরিচালিত গ্রামীণ ভারতের পরিবারগুলির উপর একটি সমীক্ষা দ্বারা প্রাপ্ত। সেই সমীক্ষা অনুযায়ী উচ্চশিক্ষার জন্য সাধারণভাবে গড়পড়তায় জন প্রতি বছরে ১৪৮৮.৫৭ টাকা খরচ করতে হয় এই পরিবারগুলিকে। এর অর্থ এই নয় যে পরিবারগুলি এর থেকে বেশী খরচের প্রয়োজন অনুভব করেনা। তাদের সাধ্যমত ও ন্যূনতম প্রয়োজন মেটানোর তাগিদে এই খরচটুকু করতেই হয়। এটুকুও না করতে পারলে স্বাভাবিকভাবেই ছাত্রছাত্রীদের পড়াশুনা ছেড়ে দেওয়া ছাড়া আর গতি থাকে না। বর্তমানে মুক্ত বাণিজ্যের দৌরাত্ম্যে এই ন্যূনতম খরচ যে বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে তা সহজেই অনুমেয়। আর সে কারণেই একবিংশ শতকের তথ্যপ্রযুক্তি সমৃদ্ধ এই আধুনিক ভারতবর্ষে প্রায় ৯২% ছাত্রছাত্রী উচ্চশিক্ষার অঙ্গনে অচ্ছুত থেকে গেছে।
…
সুতরাং প্রশ্ন থেকেই যায় ভারতবর্ষে উচ্চশিক্ষার গতি কি? নব্বইয়ের দশক থেকে চালু সরকারী ঔদাসীন্যের নীতিই কি এর ভবিতব্য? না কী এ ব্যাপারে চিন্তা ভাবনায় কোনো পরিবর্তন আমাদের নেতা ও প্রশাসকদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে? বিশেষ করে অহরহ যখন আমাদের শুনতে হয় একবিংশ শতকে ভারতবর্ষের মানুষ জ্ঞান ও বিজ্ঞানে চরম শিখরে উন্নীত হবে এবং শিক্ষার প্রসার দ্বারা জাতীয় অর্থনীতির মরা গাঙে ভরা জোয়াড় বইয়ে দেওয়া হবে, তখন আশা জাগে বইকী, দেশের মানুষের কাছে শিক্ষাঙ্গনের আমন্ত্রণ হয়তো আরও সাদর হবে! কিন্তু এতো শুধু আমাদের শুভ ইচ্ছার রূপায়ন নয়! বাস্তব সমাজের কাছে উচ্চশিক্ষার প্রয়োজন কতটুকু সেটাও দেখার প্রয়োজন। আর সেই সমাজের রক্ষক ও প্রশাসকদের বর্তমান নীতি বাস্তবতার সাথে কতখানি সামঞ্জস্যপূর্ণ সেটি আমাদের বুঝে নিতে হয়। এর আগেও আলোচিত হয়েছে যে সাধারণভাবে শিক্ষিত বেকারবাহিনীর সৃষ্টিকারী এই শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমশই সমাজে প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। এই বিষয়টিকেই বর্তমান অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে খতিয়ে দেখা যেতে পারে।
প্রখ্যাত আমেরিকান শিক্ষাবিদ জন ডিউই শিক্ষার সামাজিক ভিত্তির প্রসঙ্গে বলেছিলেন, ‘শিক্ষা আসলে সমাজকে টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার’। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় কার্য্যকলাপের ধারাবাহিকতা ‘শিক্ষা’র মাধ্যমে মানুষ বজায় রেখেছে। যে সমাজ যত উন্নত, বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্রিয়াকলাপে যত বিস্তৃত ও জটিল, সেই সমাজে শিক্ষার প্রসারের গুরুত্বও তত বেশি। সেই অর্থে শিক্ষার বিকাশ সামাজিক বিকাশের প্রতিফলন। অন্যদিকে সামাজিক বৈষম্য বজায় রাখার অনুকূলেই শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। এই কারণেই দেখা যাবে ধনতান্ত্রিক সমাজে উৎপাদনব্যবস্থার অঙ্গ হিসাবেই সার্বজনীন শিক্ষার প্রয়োজন হলেও উচ্চশিক্ষা নিয়ন্ত্রিত। সেখানে ধনীরাই এই শিক্ষার সুযোগ নিতে বেশী সক্ষম। এর ফলে উৎপাদন প্রক্রিয়ার বৌদ্ধিক অনুশীলন ও পরিচালনাদি সমাজের সেই ক্ষুদ্র অংশের হাতেই থাকে যারা এই বৈষম্যে লাভবান। আমাদের দেশও এর ব্যতিক্রম নয়। এখানে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা প্রসারের সাথে সার্বজনীন ও উচ্চশিক্ষার প্রসারও যুক্ত। তবে এখানে এও উল্লেখ্য শিক্ষাকে কেবল কোনো ব্যক্তির পেশা ও বৃত্তির প্রেক্ষাপটে বিচার করাও এক ধরণের সংকীর্ণতা। ব্যক্তির সমাজজীবনের অংশগ্রহণে তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষার সাথে ব্যক্তি চেতনার বিকাশের সেখানেই নিবিড় যোগাযোগ। গণতন্ত্রের প্রসারেও তাই উচ্চশিক্ষার প্রসার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্বাধীনতোত্তর নতুন রাষ্ট্রের গঠনপর্বে সমাজের বিভিন্ন অংশে উচ্চশিক্ষার প্রসারের প্রয়োজন অনুভূত ছিল। আর সে কারণেই রাষ্ট্রের সক্রিয় তত্বাবধানে উচ্চশিক্ষার অপেক্ষাকৃত প্রসার ঘটেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশক থেকেই ক্রমবর্ধমান শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা সমাজের শাসকদের সামনে উচ্চশিক্ষা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে থাকল। উচ্চশিক্ষার প্রসারে তারা রাশ টানতে শুরু করল। কিন্তু দেশের জনসংখ্যার বৃদ্ধির সাথে সাথে সামাজিকভাবে এই শিক্ষার চাহিদা বর্তমান। আর সেই কারণেই পণ্য হিসাবে উচ্চশিক্ষা বাজারে বিকোবার পক্ষে যথেষ্ট লোভনীয় হয়ে উঠল। তাই শিল্পমহল-বণিকমহল-বিশ্বব্যঙ্ক-WTO আদি নানা সংস্থার তরফ থেকে উচ্চশিক্ষাকে মুক্ত বাজার অর্থনীতির হস্তে সমর্পণের নানান সওয়াল-পরামর্শ চলতে থাকল। মুক্ত বাজারের একটি শর্তই হোলো বাজারের পণ্যের মূল্য নির্ধারণে যাবতীয় সরকারি নিয়ন্ত্রণের অবসান। আর সেই নীতির অবলম্বনে সরকার বাহাদুর উচ্চশিক্ষায় ব্যয় সংকোচন শুরু করলেন। এর ফলে জনসাধারণকে ঠেলে দেওয়া হোলো বহুমূল্য বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলির অঙ্গনে। শুধু প্রথাগত শিক্ষাই নয়, প্রথাবহির্ভূত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও এই নৈরাজ্যে মুনাফা কামাতে থাকল। তাদের প্রদত্ত ডিগ্রি-সার্টিফিকেটের মূল্য যাই হোক, দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর তাগিদে বিভ্রান্ত ছাত্র ছাত্রীরা তাদের দুয়ারে ভিড় করতে থাকল। এই ভাবেই গত দশক থেকেই বিভিন্ন সংস্থা ‘করেস্পন্ডেন্স কোর্স’, ‘কম্পিউটার ও তথ্য প্রযুক্তি’র নানা পাঠক্রমের ব্যবসা চালিয়ে আসছে। বহু ছাত্রছাত্রী ভালো চাকরি পাবার প্রলোভনে এই ধরণের উদ্যোগে তাদের অর্থ ও সময় ব্যয় করছে। বর্তমানে বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই ধরণের শিক্ষার ডালি নিয়ে বাজারে অবতীর্ণ। সরকারি শিক্ষাব্যবস্থা যত রুগ্ন ও অকর্মণ্য হয়ে পড়বে ততই এই সংস্থাগুলি লাভবান হবে। এই সমস্ত বিভিন্ন স্বার্থের সমীকরণই উচ্চশিক্ষায় বর্তমান সরকারি নীতির সাথে মানানসই। সে কারণেই ২০০০ সালে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর দ্বারা শিল্পপতিসমৃদ্ধ একটি কমিটি খোলাখুলি সুপারিশ করেছে, ‘ভারত সরকার উচ্চশিক্ষাকে সর্বতোভাবেই বেসরকারি উদ্যোগের হাতে তুলে দিক। সরকারের উচিত কেবলমাত্র বিদ্যালয়ের শিক্ষাতেই মনোনিবেশ করা।’ উচ্চশিক্ষায় তারা কেবল সেটুকু ছাড়ই সরকারকে দিতে রাজী, যেসব বিষয় ‘পণ্য’ হিসাবে উচ্চশিক্ষার কোনো বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হতে এখনো ব্যর্থ, যেমন কলাবিভাগের বেশ কিছু বিষয় (liberal arts)। বোঝাই যায় বর্তমান শাসকদের নীতিতে উচ্চশিক্ষার গণতন্ত্রীকরণের প্রশ্নটি কতখানি ব্রাত্য। তাদের কাছে উচ্চশিক্ষার বৈষম্যই কাম্য। সামাজিক সাম্যের বিপরীতে বর্তমান ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে সেটাই বেশি জরুরি।
৭/৩/২০০৬

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home