ফিলোক্টেটিস
ফিলোক্টেটিস
- সফোক্লিস (৪০৮ খৃস্ট পূর্বাব্দ)
চরিত্র
অডিসিয়াস,
নিওপ্টলেমস,
ফিলোক্টেটিস,
বণিক (গুপ্তচর),
সমবেত কণ্ঠ (স ক ),
হেরাক্লিস (নেপথ্য)
ট্রয়ের যুদ্ধের দশম বছর চলছে। কিন্তু ট্রয় নগরী তখনো দুর্জেয় । সেই সময় গ্রীকদের কাছে এক জ্যোতিষী নিদান দিলেন যে লেম্নস দ্বীপে পরিত্যক্ত ফিলোক্টেটিস ও তাঁর দেবদত্ত ধনুর্বান ছাড়া গ্রীকদের এ যুদ্ধ জয় অসম্ভব। সে কারণেই অডিসিয়াস ও নিওপ্টলেমস এর নেতৃত্বে ছোট্ট এক দল গ্রীক বাহিনী এসেছে ফিলোক্টেটিসের সন্ধানে।
[অডিসিয়াস, নিওপ্টলেমস ও সমবেত কন্ঠধারীদের প্রবেশ। ]
অডিসিয়াস ঃ এই সেই লেম্নসের বন্ধুর তীর; জনহীন তরঙ্গপ্রাবৃত প্রান্তর। এখানেই আমি পোইয়াস তনয় মেলোসবাসী ফিলোক্টেটিসকে রেখে যাই। সে বহুবছর আগের কথা - মহান অ্যাকিলিসের পুত্র নিওপ্টলেমস ! এইখানেই তাকে ফেলে যেতে হয়েছিল । আমাদের কিছু করার ছিলনা। আমাদের প্রভূরা, রাজারা এই আদেশই আমাকে দিয়েছিলেন। কারণ ব্যাধি তাকে গ্রাস করেছিল। তার একটি পা রক্ত পুঁজ ঘায়ে ক্ষয়ে যাচ্ছিল। আর কী ভয়ঙ্কর তার আর্তনাদ। যন্ত্রণাক্লিষ্ট সে ভীষণ চিৎকারে আমাদের রাতের ঘুম চলে গিয়েছিল। যজ্ঞ, পবিত্র ভোজের আয়োজন বারংবার বিঘ্নিত হচ্ছিল। সমস্ত রাত সে চেঁচাত । হায়নার চেয়েও জিঘাংসাপূর্ন সে ক্রন্দন। সমস্ত শিবির সেই দুঃসহ ক্রন্দন, গোঙানি, আর্তনাদে, আতঙ্কে ছেয়ে ছিল।
কিন্তু এখন আর এতো কিছু বলার সময় নেই। সে আমাদের পায়ের শব্দ শুনতে পাবে - আর তাহলেই তাকে নিয়ে যাবার আমার সমস্ত পরিকল্পনা জলাঞ্জলি যাবে।দেখোতো আশেপাশে কোনো গুহা দেখতে পাচ্ছ কিনা? একটা দুমুখো গুহা - ওটাতেই ওকে আমি রেখে গিয়েছিলাম, যাতে সূর্যের আলো গুহার মুখে এসে পরে - শীতল মাসে উষ্ণতা যোগায়। আবার গ্রীষ্মে শীতল বাতাস চলাচল করে উত্তাপ হরণ করে। গুহার বামদিকে নিকটেই একটি সুমিষ্ট ঝর্না প্রবাহিত - অবশ্য যদি না সেটা এতদিনে শুকিয়ে গিয়ে থাকে। আর সেও যদি না এতো বছর কাটিয়ে টিকে রয়। দেখোতো গুহাতে বা অন্য কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে কিনা? যদি তার সন্ধান মেলে তবেই আমি তোমায় আমার সমস্ত পরিকল্পনা খুলে বলব। মনে রেখো, আমরা দুজনে এক বিশেষ অভিযানে এখানে এসেছি।
নিওপ্টলেমস (উইং থেকে) ঃ মাননীয় অডিসিয়াস ! আপনি যা বলেছেন ঠিক সেরকমই । এইটাই তাঁর জায়গা ।
অ ঃ কোথায় ? এ স্থানের উপরে না নীচে? আমি তো ঠিক ঠাহর পাচ্ছিনা ।
নি ঃ উঁচুতে। কিন্তু কোনো আওয়াজ পাচ্ছিনা । না পায়ের - না গলার।
অ ঃ ভিতরে গিয়ে দেখোতো, বেচারা ঘুমোচ্ছে কিনা?
নি ঃ খালিই তো দেখছি। কেউ তো নেই!
অ ঃ আর কিছু নেই যাতে বোঝা যায় এখানে কেউ বাস করে?
নি ঃ এক কোনে পাতার গাদা জড় করা - মনে হচ্ছে কারো শয্যা ।
অ ঃ আর কিছু? কোন জিনিষপত্র নেই?
নি ঃ একটা কাঠের মগ, কোন রকমে বানানো - কিছু অগ্নিশলাকা।
অ ঃ তাহলে ওটিই তার শূন্য কক্ষ ।
নি ঃ এই দেখুন! কয়েকটা ন্যাকড়া রোদ্দুরে শুকোচ্ছে। এঃ ! এতো ঘেয়ো রক্ত পুঁজের দাগে ভর্তি।
অ ঃ তাহলে সন্দেহাতীত সে জীবিত । খুব দূরেও সম্ভবত নেই। কারণ বহু বছরের ব্যাধিতে সে নিশ্চয়ই কাহিল হয়ে পরেছে। বেশি দূরে যাওয়ার ক্ষমতা তার না থাকারই কথা। খুব সম্ভবত খাবারের খোঁজে সে গেছে। অথবা কোনো লতা পাতার সন্ধানে, তার চিকিৎসার জন্য। - একজন প্রহরীকে ঐ স্থানে নিযুক্ত কর, যাতে হঠাৎ করে না সে উদয় হয় । ও গ্রীকদের মধ্যে আর কাউকে না হোক আমাকে পেলে যে ছাড়বেনা তাতে আমার এতোটুকু সন্দেহ নেই।
নি ঃ ঠিক আছে। প্রহরার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এখন বলুন আমার কি কর্তব্য?
অ ঃ অ্যাকিলিসপুত্র এখানে আসার এক উদ্দেশ্য আছে। তোমাকে তোমার স্বর্গীয় মহান পিতার পথ অনুসরণ করতে হবে। এর গুরত্ব এতটাই যে, এর সাফল্যের জন্য কেবল শক্তিই নয় কৌশল অবলম্বন করতে এতটুকু পিছপা হোয়োনা। সে কৌশল তোমার মনপসন্দ নাই হতে পারে। কিন্তু উপরওয়ালাদের হুকুম তালিমে তাকেই শিরোধার্য করতে হবে।
নি ঃ কি আমায় করতে হবে?
অ ঃ ফিলোক্টেটিসকে ধূর্ততায় বশীভূত করতে হবে। তাকে বোলো “আমি অ্যাকিলিসের সন্তান” - এতে অবশ্য কোনও মিথ্যা নেই। বোলো তুমি বাড়ি ফিরছ। গ্রীকদের পরিত্যাগ করেছ। তাদের নৌবাহিনী বর্জন করেছ। তাদের তুমি ঘৃণা কর। ধর্মের নামে শপথ নিয়ো - এমনভাবে নিয়ো তোমাকে মনে হয় যেন অলিম্পিয়ার দেবতাদের সততার সাক্ষাত প্রতিমূর্তি। সেই শপথবানী সহ বোলো গ্রীকরা তোমায় প্রতারণা করেছে। তোমাকে বাড়ি থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে এনেছে এই বলে যে তুমি একাই ট্রয়কে ধ্বংস করতে সক্ষম। অথচ তুমি যখন তোমার মৃত পিতার অস্ত্র চাইলে তখন তারা তোমায় বিদ্রূপে বিঁধেছে। বলেছে তুমি সেই অস্ত্রের যোগ্য নও। অথচ উত্তরাধিকার বলে এ তো তোমার প্রাপ্যই ছিল। আর সেই অস্ত্র দিয়ে দিল আমকে মানে অডিসিয়াসকে! আমার বিরুদ্ধে যা ইচ্ছা হয় তুমি বোলো। যতটা নিচু করতে হয় কোরো। আমি কিছু মনে করবোনা। যদি এই কাজ না করতে পার, মনে রেখ গ্রীকদের জন্য অশেষ দুর্গতি জমা পরে আছে। যদি আমরা সেই হতভাগার ধনুকটা নিয়ে না ফিরি, তুমিও পবিত্র ট্রয়কে ধ্বংস করতে পারবেনা।
তুমি হয়ত ভাবছ তুমিই বা এই কাজের জন্য উপযুক্ত কেন? ফিলোক্টেটিসএর রোষ থেকে তুমিই বা রেহাই পাবে কেন? কেনই বা সে তোমায় বিশ্বাস করতে যাবে? অ্যাকিলিসপুত্র চিন্তা কোরোনা। সে তোমায় বিশ্বাস করবে। কারণ তুমি যুদ্ধে এসেছ স্বেচ্ছায়। কারোর জোরাজুরিতে নয়। অতীত ঘটনাতেও তোমার কোন ভূমিকা ছিলনা। কিন্তু আমার ক্ষেত্রে এ কথা খাটেনা। ফিলোক্টেটিস ধনুক হাতে একবার যদি আমায় দেখে, তবে জেনে রেখ সেই মুহূর্তে আমার ভবলীলা সাঙ্গ হবে। তুমিও মরবে। আমার সঙ্গী বলেই ।আমাদের তাই ছলনার আশ্রয় নিতে হবে। তোমাকে ধূর্ততা শিখতে হবে ওর অজেয় ধনুকটি ছলে বলে কৌশলে যে ভাবেই হোক ছিনিয়ে নেওয়া চাই।
আমি জানি বৎস, তোমার স্বভাব, সহজ - সরল। শঠতা, ছলনা, মিথ্যাচারিতা তোমার স্বভাব বিরুদ্ধ। কিন্তু জয়ের লক্ষ্যে আমাদের নিজের সাথেও তো লড়তে হবে। যে ভাবেই হোক লক্ষ্যপূরণই আমাদের কাম্য। জয় করায়ত্ত্ব হলে লোকে চেয়েও দেখবেনা যে তুমি কপট না অকপট? অন্তত এই মুহূর্তে আমার কথা তোমায় শুনতেই হবে। এরপর না হয় তুমি তোমার স্বাভাবিকতায় ফিরে যেও ।
নি ঃ লায়েট্রেসপুত্র! যে কথা শুনতে আমার ঘৃণা জাগে, সেটাই বা করি কি করে? আপনিই তো বললেন, এ কাজ আমার স্বভাববিরুদ্ধ। ধূর্ততা আমার পেশা নয়। শুনেছি আমার পিতাও ছিলেন ঋজুভাষী সহজ সরল নির্ভীক পুরুষ। আমি বরং ফিলোক্টেটিস-এর সাথে লড়াই করব। তাকে বন্দী করব। কিন্তু এই কুৎসিত ছলনার আশ্রয় গ্রহণ করব না। একজন বিকলাঙ্গ পঙ্গুকে জয় করতে পারবেননা? আমি জানি আপনি আমাদের নেতা। আপনার আদেশ অবশ্য পালনীয়। এক্ষেত্রে লড়তে আমি ভয় পাইনা। হয়ত ব্যর্থতা অবশ্যম্ভাবী। তবুও সততাকে ছাড়তে পারব না। বিশ্বাসঘাতকের জয় আমার কাম্য নয়।
অ ঃ তুমি একজন মহান বীরের পুত্র। তোমার মতই তরুণ আমি এককালে ছিলাম। তখন বাকচাতুর্য্যের মহিমা আমিও বুঝতামনা। ভাবতাম পেশিশক্তিই সমস্ত যুদ্ধের প্রথম ও শেষ কথা। কিন্তু ক্রমশঃ - তুমিও বুঝবে জীবন এতো সোজা নয়। আমার মতই বুঝতে পারবে শুধু বলই নয়, ছলও চাই জয় কে ছিনিয়ে নিতে।
নি ঃ মহান অডিসিয়াস! আমি আপনার আজ্ঞাবহ ভৃত্য। তবুও মিথ্যাচারণ করতে বলবেন না। অন্য কোনও আদেশ কি নেই আপনার? অন্য কোনোভাবে আপনার উদ্দেশ্য কি পূরণ করা যায় না?
অ ঃ আমি আদেশ দিচ্ছি, ওকে আমাদের অধীনে আনা চাই। ছলে বলে কৌশলে - তা যত আপাত ঘৃণ্যই হোক, ওকে চাই-ই আমাদের।
নি ঃ কিন্তু বুঝিয়ে নয় কেন? সমস্ত কিছু প্রকাশ্যে আনলেই তো হোলো। আমাদের এই অসহায় অবস্থায় উনি কি আমাদের ফেরাবেন?
অ ঃ বোঝানো? অসম্ভব! আর যুদ্ধেও তাকে হারানো অসম্ভব!
নি ঃ উনি কি ওনার শক্তি সম্পর্কে এতটাই নিশ্চিত?
অ ঃ অবশ্যই! বিশেষ করে ওর হাতে যদি ধনুকটি থাকে তবে কারোর রেহাই নেই।
নি ঃ তাহলে তো তাঁর সাক্ষাতই বিপজ্জনক।
অ ঃ যদিনা তুমি ওকে ধূর্ততায় বশে আনো, মিষ্টি কোথায় তাকে ভুলাও।
নি ঃ কিন্তু এমন কপটতা আপনার রুচিতে বাধেনা?
অ ঃ মোটেই না । যদি বুঝি ছলনাতেই আছে মুক্তি।
নি ঃ কী করে এই ঘৃণ্য শব্দগুলো উচ্চারণ করে মাথা উঁচু রাখব?
অ ঃ যা তুমি করবে সে তো আমাদের সবার হিতের জন্যই। তোমার অযথা দোনামনায় আমাদের পরাজয় হতে পারে।
নি ঃ উনি ট্রয়তে এলে আমাদের বা কি লাভ?
অ ঃ কেবল ফিলোক্টেটিসই পারে ট্রয়কে জয় করতে।
নি ঃ ও আমি তাহলে সেই ব্যক্তি নয় যাকে কিনা বলা হয়েছিল তোমার হাতেই গ্রীসের জয় পরাজয় নির্ভর করছে। সে কী কেবলি আমাকে যুদ্ধে টেনে আনার ছলনা ।
অ ঃ অবশ্যই তোমাকে চাই। তোমাকে ছাড়াও যেমন চলবেনা, তেমনি চলবেনা ফিলোক্টেটিস-এর তীর ধনুক ছাড়া ।
নি ঃ তা হলে তো আমার সেই তীর ধনুক চাইই, অবশ্য যদি আপনি সত্য বলে থাকেন।
অ ঃ অবশ্যই । সেই তীর ধনুক তোমাকে ছিনিয়ে নিতেই হবে। আর একাজে সফল হলে তুমি দুদিক থেকেই সাধুবাদ পাবে।
নি ঃ কী রকম?
অ ঃ তোমার কৌশল অবলম্বনের জন্য তোমাকে বলা হবে জ্ঞানী । আবার ট্রয় ধ্বংসের কারণে তুমি হবে বীর ।
নি ঃ তা’হলে তাই হোক। আমি আপনার আদেশ অনুযায়ীই চলব। আমার সমস্ত সম্ভ্রম কে কলুষিত করেও আমাকে ছলনার আশ্রয় নিতে হবে ।
অ ঃ তাহলে মনে আছে তো আমার পরামর্শগুলো।
নি ঃ প্রতিটি কথাই । আমি অক্ষরে অক্ষরে তা অনুসরণ করব।
অ ঃ এই গুহার সামনেই ওর জন্য অপেক্ষা কর । আমি চলে যাচ্ছি, যাতে সে না জানে যে আমি এখানে ছিলাম। আমি এই প্রহরীটিকে নিচ্ছি। জাহাজে অপেক্ষা করব। যদি বুঝি তুমি সঙ্কটে পরেছ, প্রহরীটিকে পাঠাব এক বণিকের ছদ্মবেশে। সে যা বলবে তুমি তা তোমার স্বপক্ষে ব্যবহার কোরো । আমি চললাম । বাকি সব তোমার উপর নির্ভর করছে। তস্করদেব হার্মিস আমাদের সহায় হোন। কৃপা করো হে বিপত্তারিনী অ্যাথিনা !
[অডিসিয়াসের প্রস্থান।]
সমবেত কণ্ঠ ঃ এই বিদেশে আমরা অচেনা । ফিলোক্টেটিসকে কি বলব? কী করে তাঁর কাছে গোপন রাখা যাবে আমাদের উদ্দেশ্য? বল হে আমাদের নির্ভীক তরুণ! দেবরাজ জিঊসের আশীর্বাদ ধন্য তুমি। মহান অ্যাকিলিসের উত্তরসূরি। আমাদের বোঝাও তোমার উদ্দেশ্য পূরণে আমাদের কী করনীয়?
নি ঃ ভয় পেওনা ! ওই যে, সাগরপারে এক পাহাড়ের ঢালে তিনি হয়তো নিদ্রামগ্ন। মনে সাহস আনো সব। মাভৈঃ। যখন উনি জাগবেন তখন নিশ্চিত ভয়ঙ্করের মুখোমুখি হব আমরা। তবুও সাহস হারিয়ো না । তোমাদের সাহায্য আমার একান্তই দরকার। এখন আমায় অনুসরণ কর। যেমন পারবে সাহায্য কোরো।
স ঃ যথা আজ্ঞা । হে প্রভু নিওপ্টলেমস ! আপনার নির্দেশ পালনই আমাদের প্রথম ও শেষ কাজ। আপনার স্বার্থরক্ষাই আমাদের পবিত্র কর্তব্য। এখন আমদের দেখান উনি কোথায় থাকেন? কোথায়ই বা ঘুমান? আমাদের এটা বুঝে নেওয়া প্রয়োজন। নইলে উনি অতর্কিতে আঘাত হানতে পারেন। আমরা সন্ত্রস্ত, আবার কৌতূহলীও বটে। কোথায় থাকেন উনি? ঘুমানই বা কোথায়? কোথা দিয়ে চলা ফেরা করেন? উনি কি গুহার ভিতরে? না কী বাইরে কোথাও ?
নি ঃ দেখ। ওই যে। দুমুখো গুহাটা । ওখানেই ওঁর বাস। আর ওই পাহাড়তলেই ওঁর শয্যা।
স ঃ কোথায় তিনি এখন? বেচারা ভাগ্যহীন?
নি ঃ নিঃসন্দেহে এটি ওঁর হামাগুড়ির দাগ। বেড়িয়েছেন খাবারের সন্ধানে। এখন তীর দিয়ে পাখি শিকারে নিশ্চয়ই ওঁকে যথেষ্ট বেগ পেতে হয়। হতভাগ্যের জীবনে বিধাতার কি নিষ্ঠুর পরিহাস? ওঁর ক্ষতের নিরাময়ের কোন ঔষধই ওঁর জানা নেই।
স ঃ আমরা তাঁর এই দুর্দশায় দুঃখিত। তাঁর যন্ত্রণা - একাকীত্ব - সঙ্গীহারা জীবন নিঠুর নিয়তির খেলা। ওই নিঃসঙ্গের সঙ্গী শুধুই এক কালান্তর ব্যাধি। এই অসীম যন্ত্রণা সহ্যের শক্তি উনি কোথা থেকে পেলেন? হায়রে বিধাতার কি করুন পরিহাস! হায়রে দুঃখী মানুষ! মরণের সীমানায় দাঁড়িয়ে হয়ত কোনো বীর যোদ্ধা উনি। আমাদের মহান গ্রীক বীরদের মতই। কিন্তু জীবনের সুস্বাদ রহিত। কেবল একাকী বিচরণ - জনমানবহীন দেশে - চিতল হরিণ বা বুনো ছাগের অরণ্যে। নিরন্তর যন্ত্রণাক্লিষ্ট ক্ষুধার্ত চিত্তের ক্রন্দন। ব্যাধির যন্ত্রণায় ওঁর আর্তনাদের একমাত্র আশ্বাস তার প্রতিধ্বনি।
নি ঃ আশ্চর্যের কী? আমাদের ললাটের বিধিলিপি কেই বা খণ্ডাবে? শুনেছি ক্রাইজের জিঘাংসার শিকার উনি। তাঁর এই ব্যাধি অকারণ নয়। ঈশ্বর নিশ্চইই তাঁর উপর এই বোঝা চাপিয়েছেন যাতে অযথা ধনুকের অপব্যবহার না ঘটে। এতে তাঁর শক্তিক্ষয় হত। কেবল সঠিক সময়েই সেটির প্রয়োগ অপেক্ষমান । জিউসের এই হয়ত ইচ্ছে। এখন ট্রয়ের বিপক্ষে তাঁর শানিত তূনের লক্ষ্য স্থির।
স ঃ সাবধান বৎস!
নি ঃ কি ব্যাপার?
স ঃ পরিষ্কার আর্তনাদের আওয়াজ। কেউ এদিকে হেঁটে আসছে। কোন দিক থেকে আসছে? একটু একটু করে তার তীব্রতা বাড়ছে। আওয়াজ এগোচ্ছে। এইদিকে! একজন মানুষকে দেখা যাচ্ছে। বহুদূর থেকে পা টেনে টেনে হাঁটছে সে - চীৎকার করছে। নজর রাখ বৎস।
নি ঃ কাকে?
সঃ ওই মানুষটিকে। খুব দুরে আর সে নেই। তার গুহার ভিতরে। ওর ক্ষত-বিক্ষত পা দাপিয়ে ও চেঁচাচ্ছে। যেন বহুদূরের কাউকে ডাকছে। যেন মনে হচ্ছে বন্দরে ও কাউকে দেখেছে। কী ভয়ঙ্কর ওই আওয়াজ!
[ফিলোক্টেটিস-এর চেঁচাতে চেঁচাতে প্রবেশ। ]
ফি ঃ কে তোমরা? কে? এই নির্জন জনহীন দ্বীপে নেমেছ? কোন দেশ থেকে এসেছ? আন্দাজ মত তোমাদের গ্রীক বলেই মনে হচ্ছে। তোমাদের পরিধান গ্রীসদেশীয়। কতদিন যে সে দেশের মানুষ দেখিনি। আমি তোমাদের ভাষা শুনতে চাই। সে কী আমারই মাতৃভাষা ? আমায় দেখে ঘাবড়ে যেওনা। আমি জংলী ভুত। আমায় তোমরা দয়া কর। আমি একা এ অরণ্যে আমার দুঃখকে বয়ে বেড়াচ্ছি। বল , বল, কথা বল। যদি বন্ধু হও তবে কথার উত্তর দাও। জিজ্ঞাসায় মৌন থাকাই কি তোমাদের শিষ্টাচার?
নি ঃ আমরা গ্রীক। এ কথাই কি জানতে চাইছিলেন?
ফি ঃ আঃ। কি মধুর বচন । আমার ভাষা । কতদিন পরে সুমধুর গ্রীসের ধ্বনি উচ্চারিত হল আমার শ্রবণে। তুমি কে বাছা? কে পাঠিয়েছে তোমায়? কেনই বা এলে এখানে? কীসের আশায়? কোন সৌভাগ্য বাতাস তোমাদের জাহাজের পালে লেগেছিল? বল আমায়। আমাকে জানাও তোমার সমস্ত কথা।
নি ঃ আমরা স্কাইরোস দ্বীপের বাসিন্দা। এখন সেই অভিমুখেই প্রত্যাবর্তন করছি। আমার নাম নিওপ্টলেমস - অ্যাকিলিসের পুত্র। এই আমার পরিচয়।
ফি ঃ তুমি সেই পিতার সন্তান যাকে আমি এক সময় ভীষণ ভালোবাসতাম। আমার প্রিয় দেশের মানুষ তুমি। কী উদ্দেশ্যেই বা এখানে এসেছ? কোথা থেকেই বা আসছ?
নি ঃ আমি ট্রয় ফেরতা।
ফি ঃ তুমি ট্রয় থেকে ফিরছ? প্রথম থেকেই তুমি আমাদের সাথে ট্রয় অভিযানে ছিলে?
নি ঃ আপনিও কি সেই দুর্ঘটনায় অংশ নিয়েছিলেন?
ফি ঃ তাহলে তুমি জানোনা তোমার সামনে কে দাঁড়িয়ে ?
নি ঃ আমি তো আপনাকে আগে দেখিইনি । কিভাবে জানব আপনার সম্বন্ধে ?
ফি ঃ তুমি আমার নামই শোনোনি? আমার দুঃখগাঁথা তোমাদের কানে পৌঁছোয়নি ? সেই কুচক্রী কাপুরুষদের চক্রান্তের কথা - যারা আমাকে এই চরম দুর্দশায় ফেলে রেখে গেছে! কিছুই শোনোনি তুমি?
নি ঃ দেখুন আমি তো বলছি। আপনার সম্বন্ধে কোনো কথাই আমার জানা নেই।
ফি ঃ তাহলে আমি নিতান্তই হতভাগ্য। দেবতার রোষে আমার এমনি দুর্দশা যে আমার সম্বন্ধে এতটুকু রটনাও গ্রীসের মানুষের কাছে পৌঁছয়নি। কিভাবে আমি বেঁচে আছি! যে দুরাত্মারা আমায় এখানে ফেলে রেখে গেছে তারা নিজেদের কীর্তি এমনি গোপন রেখেছে! এতটুকু কথাও বাইরে প্রকাশ করেনি। আর এই দুরন্ত ব্যাধিতে তখন তিলে তিলে ক্ষইছি আমি।তবুও বৎস অ্যাকিলিসপুত্র! হয়ত এমনিতেই আমার কথা শুনে থাকতে পার। আমি ফিলোক্টেটিস - পোইয়াসের পুত্র। দেবতা হেরাক্লিসের অস্ত্র চালনায় অদ্বিতীয় (ধনুকটি দেখিয়ে)। অ্যাগামেম্নন, মেনালাউস আর অডিসিয়াস আমাকে এই দ্বীপে নির্বাসিত করেছে। কেউ কোথাও আমায় দেখবার নেই। বিষাক্ত সাপের ছোবলে মারাত্মক ব্যাধি আমায় গ্রাস করেছে।
সেই অভিশপ্ত দংশনের পরও আমরা ক্রাইস দ্বীপ থেকে ট্রয়ের দিকে এগোচ্ছিলাম গ্রীক নৌবাহিনীর সাথে যোগ দিতে। পথিমধ্যে এই দ্বীপে অবতরণ করি। দুর্গম পথ বেয়ে চলে আসি এই গুহার সম্মুখে। আর সমুদ্রের ধারের ওই পাহাড়ি ঢালে আমার ক্লান্ত দেহে ব্যাধিক্লিষ্ট চিত্তে কখন নিদ্রা নেমে আসে। ঘুম যখন ভাঙল দেখি ওরা নেই। ওরা চলে গেছে। কিছু রুটির টুকরো আর ক’ফালি ন্যাকড়া জড়ো করে ফেলে রেখে ওরা চলে গেছে। ওঃ ! বিধাতার শাস্তি ওদের সহ্য করতে হবেই একদিন।
ভেবে দেখো, সে দিনটার কথা। যখন আমি জেগে উঠে দেখি ওরা কেউ নেই। একা এই জনহীন অরণ্যে আমি পরিত্যক্ত। সেদিন শুধুই কেঁদেছি । শুধু রাগেই নয় - অভিমানেও । আমার স্বদেশবাসী স্বজন সঙ্গী বন্ধুরা আমায় ফেলে গেছে। আমার পাশে কেউ নেই। এই দুরন্ত ব্যাধি আমায় একা সইতে হবে। একাই বইতে হবে ক্ষুধার জ্বালা। শীতল দিনে উষ্ণতার লোভে কুঁকড়ে পরে থাকতে হবে এই গুহার অন্ধকারে।
সময় বয়ে যায় - তবু তো জীবন নেভে না । আমায় জোগাড় করতে হয় তার রসদ। এই জঠরের ক্ষুধার্ত আবেদনে বেড়োই পাখির সন্ধানে। গুহার মুখে আগলে রাখি আত্মরক্ষার পাথর। এই দুর্গন্ধ পুঁজ রক্ত মাখা পা টেনে চলি ঝর্নায় তৃষ্ণা মেটাতে।বরফ শীতল শীতে কেটে আনি কাঠ, টুকরো লতা পাতা - বরফ তো গলানো চাই। যখন আগুন নিভে যায় পাগলের মত পাথরে পাথর ঠুকতে থাকি যতক্ষণ না সে স্ফুলিঙ্গ ধরা দেয় লতা পাতায়। ওই আগুনের ভরসাতেই এই গুহায় বেঁচে থাকা। বেঁচে আছি - সেটাই স্বান্তনা। তবুও ব্যাধিও কমেনা। যন্ত্রণারও শেষ নেই।
তোমাকে এই দ্বীপ সম্পর্কে বরং কিছু বলি বৎস! স্বেচ্ছায় তো কেউ এখানে আসে না। এখানে নেই কোনো জাহাজ ভেড়ানোর সুব্যবস্থা। নেই কোনো বাণিজ্যের সম্ভাবনা। অভ্যর্থনায় কাউকে পাবেনা এখানে। একবার যারা আসে তারা আর দ্বিতীয় বার এ মুখো হয় না । কিন্তু কখনো কখনো আসতে হয়। না চাইলেও এসে পরে কেউ কেউ। এতটা বছর এখানে কাটালাম। কোনো মানুষ দেখবোনা তাও কী হয়? যখন তাদের সাক্ষাত মেলে আমার দুঃখে করুণা প্রকাশ করে। অন্তত চোখে মুখে তাদের সেই ভাবই ফুটে ওঠে। আমায় নতুন পোশাক দেয়- কিছুটা খাবার ও । কিন্তু যখন আমি তাদের বলি আমায় নিয়ে চলো - নিয়ে চলো আমার বাড়িতে - আমার বাড়ি ! ওরা কেউ আমায় নেয়না।
এটা আমার নির্বাসনের দশম বৎসর । আমার কালান্তর ব্যাধিরও । আট্রেয়াসের পুত্রেরা আর অডিসিয়াস - এদের চক্রান্তেই আজ আমার এই হাল। অলিম্পিয়ার দেবতারা তোমরা এর বিধান কোরো।
স ঃ আমাদের কেউ কেউ আগেও এখানে এসেছে। হে হতভাগ্য ফিলোক্টেটিস! তোমায় স্বান্তনা দেবার ভাষা আমাদের নেই।
নি ঃ আমি জানি, আপনি সত্য কথাই বলছেন। কারণ আমিও আপনার মতোই ওই তিনজনের চক্রান্তের শিকার।
ফি ঃ ওঃ ! তোমাকেও ওরা বঞ্চিত করেছে। ওই কুচক্রী আট্রেয়াসের পুত্ররা? তোমার উপরও অবিচার করেছে? তুমি কি সেই কারণেই এতো ক্ষুব্ধ?
নি ঃ আমার ক্ষোভ, ক্রোধ এখন প্রতিশোধস্পৃহায় প্রজ্বলিত। মাইসেনা আর স্পার্টার মানুষ জানবে স্কাইরোসেও বাঘের বাচ্চা জন্মায়!
ফি ঃ এই তো বীরের যোগ্য জবাব। তোমার উপর কি অবিচার হয়েছে?
নি ঃ ফিলোক্টেটিস! আমি আপনাকে সবই বলছি। যদিও সেই ঘৃণ্য ঘটনার কথা মনে আনলেই আমি ক্ষোভের আগুনে জ্বলতে থাকি। ট্রয় এ আসা মাত্রই এ অপমান আমায় সইতে হয়। অ্যাকিলিসের মৃত্যুর পর যুদ্ধক্ষেত্রে - -
ফি ঃ আঃ ! আর শুনতে চাইনা! একি শুনলাম? পেলেয়াস পুত্র মহান অ্যাকিলিস মৃত?
নি ঃ হ্যাঁ ! তিনি মৃত। কোনো জীবিত মানুষের হাতে নয়। দেবতার শরাঘাতে তিনি প্রাণ হারিয়েছেন। প্রভু অ্যাপোলোর তীরে তাঁর এই জীবনবসান।
ফি ঃ ওঃ ! দুজনেই মহান! ঘাতক এবং নিহত! আমি জানি না এ দুঃখ আমি কেমনে বইব?
নি ঃ আমার মনে হয় আপনি যে ভার বয়ে বেড়াচ্ছেন তার তুলনায় এ অতি সামান্য!
ফি ঃ বৎস, তুমি বলে যাও। আমি সবই সইব। ওরা কি করেছে? কেমনভাবে অপমান করেছে তোমায়?
নি ঃ ওরা স্কাইরোসে এসেছিল ওদের সুসজ্জিত জাহাজ নিয়ে। তাদের মধ্যে ছিলেন অডিসিয়াস আর আমার বাবার এক শিক্ষক। ওরা একটা রটনা নিয়ে এসেছিল, সত্যি মিথ্যে জানিনা। দেবতারা বিধান দিয়েছেন আমার বাবার মৃত্যুর পর কেবল আমিই পারি একমাত্র ট্রয়ের প্রাচীর ভাঙতে। তাই বলেছিল আমায়। আর সে কারণেই বিন্দুমাত্র দেরী না করে ওদের সাথে বেড়িয়ে পরেছিলাম। আমার নিহত পিতার দেহ দেখব বলেও। তাকে জীবনে তো কখনো জ্ঞানতঃ দেখিনি। সেই সাথে নিজেকে প্রমাণ করতে চাই আমি তাঁর যোগ্য পুত্র।
বাতাস সহায় ছিল। দুদিন লাগল পৌঁছতে ট্রয়ে। সৈন্যরা জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল আমায় দেখে। “মৃত অ্যাকিলিসের পুনরাগমন হয়েছে!” পিতার দেহ তখন শায়িত। আমি সামলাতে পারলাম না নিজেকে। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদেই চলেছি কতক্ষণ! তারপর আট্রেয়াসের পুত্রদের কাছে গেলাম। অ্যাগামেম্নন আর মেনালাউস - আমার পিতার পরম বন্ধুজনেরা! আমি তাদের কাছে আমার পিতার অস্ত্রশস্ত্র আর অন্যান্য দ্রব্যের উত্তরাধিকার চাইলাম। তারা পরম সহানুভূতিতে বললে, “অ্যাকিলিস পুত্র! তোমার পিতার আর সবই পাবে তুমি, কিন্তু অস্ত্রশস্ত্র পাবেনা। এখন সেগুলি লায়েট্রেস পুত্র অডিসিয়াসের দখলে।” আমি ক্রোধে চেঁচিয়ে বললাম, “বেজন্মার দল! কোন সাহসে আমার প্রাপ্য অন্যকে দেওয়া হয়েছে? আমার অনুমতিটুকু নেওয়ার প্রয়োজন মনে করলেনা?” তখন অডিসিয়াস, সেও ছিল সেখানে, সে বললে, “শোনো বাছা! এঁরা যা করেছেন ঠিকই করেছেন। আর যাই হোক, আমিই সেই ব্যক্তি যিনি তোমার মহান পিতার নিহত দেহকে শত্রুদের হাত থেকে ছিনিয়ে এনেছি - অসম্মানের কবল থেকে রক্ষা করেছি।”
ক্ষোভে দুঃখে তাকে কতনা গালি দিলাম! কত অভিশাপই জানালাম! সত্যই একদিন তাকে সেই জ্বালা সহ্য করতে হবে! অডিসিয়াস বেশি কথা বললেন না। কেবল ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “বাছা! সবে তো যুদ্ধে এলে! এতদিন গৃহের নিরাপদ কোনে দিন কাটিয়েছো। সুতরাং এতো শীঘ্র আমার সম্পর্কে তোমার এ কঠিন বিচার সময়োপযোগী নয়। তোমার এ অভদ্র আচরণে আমি নিদারুন মর্মাহত। আর সে কারণেই এ অস্ত্র পাবার যোগ্য তুমি নও।”
আমাকে দুপক্ষের তিরস্কারই সহ্য করতে হল। অন্যদিকে আমার ন্যায্য দাবীও পরিত্যক্ত হোলো। তাই ঘরে ফেরাই মনঃস্থ করলাম। বেজন্মার বাচ্চা অডিসিয়াস আমাকে ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করেছে। কিন্তু তাকে আমি সেনাপতিদের থেকে কম দায়ী করি। তারাই তো রক্ষক - প্রশাসক। ওদের দোষেই অডিসিয়াসের এ দুর্মতি! এখন থেকে যারাই আট্রেয়াসের পুত্রদের আর অডিসিয়াসকে ঘৃণা করবে তারাই আমার মিত্র।
স ঃ হে সসাগরা বসুন্ধরা! দেবরাজ জিউসের মাতা! আমাদের দুঃখ যাতনার জন্মদাত্রী। মিনতি করি হে সিংহবাহিনী জননী! যেদিন থেকে উদ্ধত আট্রেয়াসের পুত্ররা আমাদের প্রভুকে অপমান করেছেন - যেদিন তারা লায়েট্রেসের পুত্র অডিসিয়াসকে মহান অ্যাকিলিসের অস্ত্র দান করেছেন- সেদিন থেকেই তাদের উপর নেমে আসুক বিপর্যয় আর ভয়ঙ্কর দুঃসময়!
ফি ঃ ঠিকই করেছ তুমি। অত্যন্ত ন্যায্য তোমার দাবী। ওদের সঙ্গত্যাগ তোমার সুবিবেচনার পরিচয়। আমার মতোই তুমিও প্রবঞ্চিত। ওদের সম্বন্ধে তুমি যা বললে আমি তো তার জ্বলন্ত সাক্ষ্য! কুচক্রী অডিসিয়াস আর আট্রেয়াসের পুত্ররা! আমি জানি অডিসিয়াস মিথ্যা ভাষণে অভ্যস্ত। তার দুরাত্মা রসনা কেবল অন্যায়ের জাল বুনতে ব্যস্ত। কোনো শুভ কাজই তার দ্বারা সম্ভব নয়। আমি অবাক হচ্ছি, বিচক্ষণ আইয়াসের উপস্থিতিতে এত বড় অবিচার ঘটে গেল?
নি ঃ মহান আইয়াসও আমাদের মধ্যে আর নেই। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন আমাকে হয়তো এ অপমানের জ্বালা সইতে হোতোনা।
ফি ঃ ওঃ! আইয়াস মৃত!
নি ঃ তাই সত্য বটে!
ফি ঃ কি নিষ্ঠুর বিধাতার পরিহাস! যাঁদের বেঁচে থাকার কথা তাঁরা মৃত।ঘৃণ্য টিডিয়াস পুত্র আর লায়েট্রেসের পুত্র অডিসিয়াস, শুনেছি তাকে সিসিফোস লায়েট্রেস এর কাছে বেচে দিয়েছিল, তারাই জীবিত!
নি ঃ শুধু তাই নয়! সসম্মানে! গ্রীকদের অন্যতম নায়ক তারা।
ফি ঃ আর নেস্টর! আমার প্রবীণ বন্ধুটি! পাইলসের রাজা? তিনিও কি বেঁচে নেই? তিনি তো জানি ওদের কুকর্মকে যতদূর পারতেন সুপরামর্শ দিয়ে প্রতিরোধ করতেন।
নি ঃ নেস্টরের এখন দুঃসময়! তাঁর বীর পুত্র অ্যান্টিলোখোস যুদ্ধে নিহত।
ফি ঃ হায়রে বালক! এ কি কথা শুনাচ্ছ পরের পর? আইয়াস আর অ্যান্টিলোখোস - দুই মহান ব্যক্তি - তাঁরা মৃত? আর ওই ঘৃণ্য কীট অডিসিয়াস এখনো মাটির উপর চরে বেড়াচ্ছে? ওকেই তো মরতে হোতো সবার আগে! ওঃ বিধাতা ! এ কী বিধান তোমার?
নি ঃ সে খুবই ধূর্ত! ভাগ্যকে ধূর্ততায় বশ করে! তবে এর পরিণাম তাকেও একদিন সইতে হবে নিশ্চয়!
ফি ঃ আর পাট্রোক্লোস! তাঁর কি খবর? তোমার পিতার অতি অন্তরঙ্গ সুহৃদ যিনি?
নি ঃ উনিও মৃত! যুদ্ধ কখনো মন্দ লোকেদের গ্রাস করেনা।
ফি ঃ তবুও আর একজনের কথা জিজ্ঞাসা করি। যে অধমেরও অধম! নরকের কীট! ধূর্ত, কপট, শঠ -
নি ঃ এতো আপনি অডিসিয়াসের কথাই বলছেন!
ফি ঃ না না ! সে নয়! আমি বলছি থার্মাইটের কথা! যার মুখে বড় বড় কথা লেগেই থাকত! সে কি জীবিত?
নি ঃ আমি তাকে চিনিনা। তবে শুনেছি সে বেঁচে আছে।
ফি ঃ বাঁচবেই তো! বাঁচবেই তো! কোনো দুরাত্মাই মরেনি। দেবতারাই ওদের সুখী রাখেন। এতেই বোধ হয় দেবতাদের সুখ! যত বেইমান আর প্রবঞ্চকদের মৃত্যু থেকে দূরে রাখা! আর এই পৃথিবীর যত ভালো লোকেদের বিদায় দেওয়া! এই তো তাঁদের বিচার! কি করে তাহলে ওঁদের উপর ভরসা রাখি বলো?
নি ঃ এখন থেকে আমাকে আরও সাবধানী হতে হবে। আমাকে আট্রেয়াসের পুত্রদের নজরে রাখতে হবে। আর ট্রয়ের যুদ্ধের গতি প্রকৃতির উপর খেয়াল রাখতে হবে। ওদের সাথে আমার কোনো লেনদেন নেই! ভালোর উপর মন্দের আধিপত্য যেখানে - যেখানে ভীরু কাপুরুষেরা ছড়ি ঘোরায় - অথচ মহান যাঁরা তাঁরাই মৃত্যু বরণ করেন - সেখানে আমি তাদের আজ্ঞা বাহক হতে চাইনা। বরং পাথুরে স্কাইরোস অনেক ভালো! ভবিষ্যতে তাই গৃহেই অবস্থান করার সংকল্প নিয়েছি।
আমি এখন জাহাজে ফিরব। ফিলোক্টেটিস! দেবতারা আপনাকে রক্ষা করুন! বিদায় দিন এখন। দেবতার আশীর্বাদে আপনার ব্যাধির নিরাময় হোক এই কামনা করি। নাবিকেরা তৈরি হও। যাত্রা শুরুর প্রস্তুত নাও। দেবতাদের আশীর্বাদই আমাদের পাথেয়।
ফি ঃ এখনি বিদায় নেবে?
নি ঃ আবহাওয়া ক্রমেই পরিষ্কার হচ্ছে। এ সুযোগ হারালে তো চলবেনা। আমাদের এখুনি রওনা দেওয়া প্রয়োজন।
ফি ঃ হে বৎস! আমার মত হতভাগ্যকে দয়া কর! (নতজানু হয়ে) তোমার মহান পিতাকে স্মরণ করি। তোমার জননীর আশীর্বাদ ঝরুক। যাদের তুমি ভালোবাসো তারা সবাই সুখী হোক। আমায় ফেলে যেওনা । আমায় তো দেখছো, আর অন্যদের কাছেও শুনলে আমার হতভাগ্য জীবনের কথা।একটু দয়া কর আমায়। আমায় সঙ্গে করে নিয়ে চলো।
জানি আমার প্রয়োজন তোমাদের কাছে কতটুকু। হয়তো ভাবছো, আমি এক উটকো বোঝা তোমার যাত্রাপথে। তবুও আমায় ফেলে যেওনা। গ্রহণ করো তোমাদের দলে। তোমার মতন মহান পিতার সন্তান এ নিষ্ঠুর কাজ করতেই পারেনা। তুমি যদি আমায় ফেলে যাও, লোকে তোমাকে ধিক্কার দেবে।কিন্তু আমায় নিয়ে গেলে কত ভালোমানুষের প্রশংসাই না পাবে!
ওঃ ! আবার যদি ওয়েটার সবুজ ক্ষেত্র চোখে পড়ে! বড় জোর একদিনের পথ সেটা। এটুকু অসুবিধে না হয় মেনেই নিলে। আমাকে জাহাজের যে কোনে ফেলে রাখবে সেখানেই পড়ে থাকব। গলুইতে, বইঠায় - যেখানে তোমার কম বিরক্তি হয় সেখানেই না হয় রেখো।
জিউসের নামে শপথ কর বালক! আমায় নেবে তো? আমি নতজানু হয়ে এই ভিক্ষে চাইছি। এক পঙ্গু অথর্বকে এতটুকু দয়া কর। এই একাকীত্বে আমায় রেখে যেওনা। এখানে আমার কেউ নেই। আমার বাড়িতে না হয় নিয়ে যেও। নয়তো ইউবোয়ান চাল্কিসের বন্দরে ফেলে যেও।ওখান থেকে ওয়েটা কাছে। ট্রাকিস পাহাড়ের ঢালে, স্প্রেখোইওস নদীর তীরে, সেখানে আমার পিতার সামনে হাজির কোরো। সম্ভবত উনি বেঁচে নেই। নয়তো বাবা কী আমায় নিতে আসতেন না?
(ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে) এখানে যারা এসেছে তাদের কতবার বলেছি আমার বাবাকে খবর দিয়ো। বলেছি, ‘বাবা এসো! আমায় নিয়ে যাও!’ তিনি নিশ্চয়ই মৃত! নইলে তো আসতেনই। আর নয়তো যাদের বলেছি তারা আমাকে মানুষ বলে গ্রাহ্যই করেনি। কথার কোনো গুরত্ব দেয়নি। চলে গেছে যে যার ঘরে।
তুমিই আমার মুক্তিদাতা! আমায় রক্ষা করো। দয়া করো। দেখো এই তুচ্ছ মানব জীবনে কী ভয়ানক অভিশাপই না নেমে আসতে পারে। তোমার আপাত নিরাপত্তায় নিশ্চিন্ত থেকো না। তুমি জানো না কখন ভয়ঙ্কর বিপদ তোমার সামনে হাজির হবে। তাই সদা সতর্ক থেকো।
স ঃ হে প্রভু! ওকে দয়া করুন। ও ভয়ানক যন্ত্রণার শিকার। কাউকে যেন এমন না সইতে হয়। প্রভু আট্রেয়াসের পুত্রদের যদি সত্যিই ঘৃণা করে থাকেন তবে ও আপনার স্বার্থেও আসতে পারে। আমরা ওকে এখান থেকে নিয়ে যাই এইটুকুই ও চায়। আপনার দ্রুতগামী জাহাজে ওকে পৌঁছে দেওয়া হোক ওর নিরাপদ আশ্রয়ে। ঈশ্বরের শাস্তির হাত থেকে ও রক্ষা পাক।
নি ঃ ভেবে কথা বল তোমরা! এরপর আবার ওর ব্যাধি তোমাদেরকে ধরবে বলে ভয় পাবে না তো? তোমরা কিন্তু ঘন ঘন মত পাল্টাও।
স ঃ মোটেই না! আপনি কোনো অজুহাতেই আমাদের এই মহান কার্য্য থেকে নিরস্ত করতে পারেননা। আমরা কথা দিচ্ছি, কথার খেলাপ করব না।
নি ঃ ওনাকে না নিয়ে গেলে আমি লজ্জিত বোধ করব। তাহলে চলো তোমরা। এখনি নোঙ্গর তোলো। দেবতারা আমাদের সহায় হোন। হোক আমাদের ঘরে ফেরার যাত্রা।
ফি ঃ ওঃ ! কি শান্তি! আমার প্রিয় সাথীরা। বন্ধু নাবিকেরা! কীভাবে যে তোমাদের কৃতজ্ঞতা জানাই? অন্তরের কত ঘনিষ্ঠ তোমরা! চলো বৎস! তবে যাবার আগে চুম্বন করি এই ভূমিকে। আমার এতদিনের গৃহকোণটিকে। একবার ভিতরে ঢুকে দেখো। কী অসম সাহসেই এ দশটা বছর কাটিয়েছি হেথা! কেবলমাত্র এই বনবাসে দিন কাটানোর কথা ভাবলেই যে কোনো সাহসী হৃদয় কেঁপে উঠবে। কিন্তু দুঃখকে জয় করতে শিখেছি।
স ঃ প্রভূ সাবধান! দুজন এদিকে আসছে। একজন আমাদের জাহাজের নাবিক - অন্যজন অচেনা! ওদের কাছ থেকে শোনা যাক ওরা কি বলে। তারপর না হয় গুহার ভিতর যাবেন।
(বণিকের প্রবেশ)
বণিক ঃ অ্যাকিলিস পুত্র! আমি আপনার জাহাজে প্রহরারত এই নাবিকটিকে আপনার কাছে নিয়ে আসতে বলি। অনিচ্ছাসত্ত্বেও এ দ্বীপে আমাকে জাহাজ ভেড়াতে হয়েছে এক দুর্ঘটনার শিকার হয়ে। আমি এক পণ্য পরিবাহী জাহাজের ক্যাপ্টেন। ট্রয় থেকে যাচ্ছিলাম কাছেই এক স্থানে- পিপারেযস- আঙ্গুর আর সুস্বাদু মদের জন্য বিখ্যাত। আমি জানতে পারি আপনি এখানে। আমি আপনাকে কিছু খবর দিতে চাই। অবশ্য বিনিময়ে পুরস্কৃত হবার প্রত্যাশা রাখি। আপনি খুব সম্ভবত আপনার বিপদ সম্বন্ধে অবহিত নন। গ্রীকরা নতুন পরিকল্পনা ফেঁদেছে। শুধু কথার কথা নয় - তারা কাজেও নেমে পরেছে।
নি ঃ আমার শুভানুধ্যায়ীকে অসংখ্য ধন্যবাদ! যতক্ষণ না আমার বুদ্ধিনাশ হয় ততক্ষণ আমাকে আপনার বন্ধু হিসাবেই গণ্য করবেন। এবার ভালো করে খুলে বলুন তো গ্রীকরা আবার নতুন কী কূটনীতি গ্রহণ করেছে?
ব ঃ ফিনিক্স আর থিসিয়াসের পুত্ররা ট্রয় থেকে রওনা দিয়েছে। ওদের সঙ্গে আছে একদল সশস্ত্র নাবিক।
নি ঃ ওরা কি অস্ত্র প্রয়োগে আমায় বশ্যতায় আনতে চায়? না কি কোনো সমঝোতা সূত্র নিয়ে আসছে।
ব ঃ তা আমি জানিনা। কেবল আমি যা শুনেছি তাই বললাম।
নি ঃ ফিনিক্স আর তাঁর বন্ধুরা কি আট্রেয়াসের পুত্রদের কথা শুনতে এতটাই উদগ্রীব?
ব ঃ শুধু উদগ্রীবই নয়! ওরা রওনাও দিয়েছে। এক মুহুর্ত ও দেরী করেনি।
নি ঃ আর অডিসিয়াস, সে নিজে আসবেনা? না কী ভীরু কাপুরুষ নেপথ্যেই থাকতে চায়?
ব ঃ আমি যখন সে স্থান ত্যাগ করি শুনি তিনি ও টিডিয়াস পুত্র অন্য এক মানুষের সন্ধানে বেড়িয়েছেন।
নি ঃ কোন মানুষটির জন্য তাদের এ তাড়না?
ব ঃ তাঁর নাম - দাঁড়ান! আগে বলুন তো এই ব্যক্তিটি কে? (ফিসফিসিয়ে) আস্তেই বলুন।
নি ঃ বন্ধু! ইনি মহান ফিলোক্টেটিস।
ব ঃ তাহলে আর কোনো কথা নয়। এখনি এ স্থান পরিত্যাগ করুন। যত শীঘ্র সম্ভব!
ফি ঃ ওই ব্যক্তিটি কি বলছে তোমায় বৎস? ও এরকম ছায়াতে ঢেকে কিসের দরদাম করছে? আমাকে লুকিয়ে কিসের এতো ফিসফাস?
নি ঃ আমিও জানিনা কেন ও এভাবে কথা বলছে? কিন্তু এখন খোলাখুলিই ওর সবাইকে বলা উচিত।
ব ঃ অ্যাকিলিস পুত্র! এইভাবে আমাকে আপনার সমস্ত লোকেদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে বলবেন না। ওরাও তো আমার কাজের প্রতিদানে আমাকে যথাসাধ্য সাহায্য করে। একজন সাধারণ নাগরিকের প্রতিও আমি দায়বদ্ধ।
নি ঃ আমি আট্রেয়াসের পুত্রদের শত্রু। উনিও তাই। উনি আমার পরম বন্ধু। আপনিও এসেছেন বন্ধুত্বের দাবী নিয়ে। তাই স্পষ্ট করে বলুন। গোপন করার কিছু নেই। যা শুনেছেন এদের সবাইকে বলুন।
ব ঃ কী করতে যাচ্ছেন তার পরিণাম ভেবে দেখেছেন তো?
নি ঃ নিশ্চয়ই!
ব ঃ তাহলে কোন অঘটন ঘটলে আপনিই দায়ী থাকবেন।
ফি ঃ যথার্থই! এবার বলুন।
ব ঃ যে দুজনের কথা বললাম - টিডিয়াস পুত্র আর অডিসিয়াস - এরা দুজনে ফিলোক্টেটিসকে ধরতে বেড়িয়েছেন। তাঁরা শপথ নিয়েছেন তাকে যেভাবেই হোক - যুক্তিতে বুঝিয়ে নয়তো হিংসার আশ্রয়ে বশে আনবেন। আর গ্রীকদের সবাই অডিসিয়াসের এই শপথ বানী শুনেছে। কারণ তিনি তো আত্মম্ভরিতায় মহত্বম।
নি ঃ কিন্তু এতদিন পরে আর কী প্রয়োজন হোলো? যে ফিলোক্টেটিসকে তারা পরিত্যাগ করেছিল, হঠাৎ তাঁর কথা কেন মনে পরল তাদের? তাঁর জন্য কি তাদের রাতের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটেছে? না কী দেবতার প্রতিহিংসা থেকে এখন তারা বাঁচতে চাইছে? তাদের অবিচারের শাস্তি এড়াতে এই পরিকল্পনা?
ব ঃ আমি বলছি। এ কাহিনী হয়তো আপনার জানা নেই। ট্রয়ের রাজা প্রায়ামের এক ধার্মিক পুত্র হেলেনস। তাঁকে একদিন রাতে অডিসিয়াস বন্দি করেন। অবশ্যই কৌশলে। অডিসিয়াস তো ছল চাতুরীতে অদ্বিতীয়।সুতরাং গ্রীক সৈন্য শিবিরে এই হেলেনসকে হাজির করা হয়। হেলেনস তখন অনেক কিছুই ভবিষ্যদ্বানী করেন। বিশেষ করে ট্রয়ের বিষয়ে। ফিলোক্টেটিসকে ছাড়া গ্রীকদের ট্রয় বিজয় অসম্ভব। যে মুহূর্তে অডিসিয়াস এ কথা শুনেছেন - সে মুহূর্তেই প্রতিজ্ঞা করেন তাকে ধরে আনার। যদি তিনি পরস্থিতির গুরুত্ব বুঝে নিজেই আসেনতো ভালো, নইলে তাঁর উপর বলপ্রয়োগ করতে তিনি এতটুকু সঙ্কোচ বোধ করবেন না। আর যদি অডিসিয়াস এ কাজে ব্যর্থ হোন, তবে যে কোনো শাস্তি মাথা পেতে নিতে তিনি প্রস্তুত। সুতরাং অ্যাকিলিস পুত্র বুঝতেই পারছেন কেন এই মুহূর্তে এই স্থান ত্যাগের পরামর্শ আমি দিচ্ছি।
ফি ঃ ওঃ ! সেই নীচ শপথ নিয়েছে আমায় বুঝিয়ে ফেরাবে! বেটা বেজন্মা ! বলপ্রয়োগে সঙ্কোচ বোধ করবেনা ! বোধ কিছু আছে বেটার ? ওর বাপের মতোই আমাকে কবর থেকে ফেরাক ও! - বোঝাবে? এঃ !
ব ঃ আমি অত কথা বাপু জানিনা! আমাকে এখন যেতে হবে। দেবতারা আপনাদের সহায় হোন!
(বণিকের প্রস্থান)
ফি ঃ কী বেহায়া এই অডিসিয়াস! ভাবছে ওর ধূর্ততায় আমি মুগ্ধ হয়ে ট্রয়ে ফিরব! আর আমাকে ও গ্রীক সৈন্য শিবিরে হাজির করবে! ওকে বিশ্বাস করব? বরং ক্রাইস দ্বীপের যে সাপটা আমায় দংশন করেছিল তাকে বিশ্বাস করতে পারি। ওকে ওর মতো চেষ্টা করতে দাও বৎস! কিন্তু এখন আমাদের রওনা দেওয়াই উচিত। আশা করছি অনুকূল আবহাওয়ায় অডিসিয়াসকে পিছনে ফেলে আমরা বহুদূর এগিয়ে যাব। জানোতো সময় মতো সিদ্ধান্ত নিলে সুনিদ্রার কোন ব্যাঘাত ঘটেনা।
নি ঃ কিন্তু এখন বাতাস বিরুদ্ধে বইছে। এটা স্তিমিত হলেই আমরা রওনা দেব।
ফি ঃ মন্দ লোকের সংশ্রব এড়াতে যত শীঘ্র রওনা দাও, ততই মঙ্গল। তাই এক মুহূর্তও দেরী নয়।
নি ঃ ঠিকই ! কিন্তু ওদের বিরুদ্ধে ও তো বাতাস বইছে।
ফি ঃ জলদস্যুদের কাছে কি বা অনুকূল, আর কিবা প্রতিকুল বায়ু। ওদের লুণ্ঠন আর অপহরণের তাড়নায় ওরা সর্বদাই বেয়ে চলে।
নি ঃ বেশ! তাহলে চলুন! গুহা থেকে আপনার প্রয়োজনীয় সামগ্রী নিয়ে আসুন!
ফি ঃ সত্যিই সামান্য হলেও কিছু জিনিষের আমার প্রয়োজন।
নি ঃ সেসব আমার জাহাজে মিলবেনা?
ফি ঃ আমার এক লতার ওষুধ আছে যা আমাকে আমার যন্ত্রণা থেকে আমায় মুক্তি দেয়। আমায় ঘুম পারায়।
নি ঃ তাহলে সেটা নিয়ে আসুন। আর কিছুর প্রয়োজন?
ফি ঃ দেখি আর কোনো তীর এদিকে ওদিকে পরে আছে কিনা? অন্যদের জন্য তো ওগুলো ছেড়ে যেতে পারিনা।
নি ঃ এটাই কী আপনার সেই বিখ্যাত ধনুক?
ফি ঃ হ্যাঁ ! এটা কখনোই কাছ ছাড়া করিনা।
নি ঃ আমি কি এটা ধরতে পারি? এটা কী হাত দিয়ে একটু ছুঁতে পারি?
ফি ঃ কেবল তুমিই ! এই নাও ধর। এ ছাড়াও আর কিছু প্রয়োজন হলে নাও।
নি ঃ আমি এটাকে এত ধরতে চাইছি! এতে কোনো নিয়ম ভঙ্গ হচ্ছেনা তো?
ফি ঃ তুমি ধার্মিক বৎস! তাই তোমার স্পর্শ পবিত্র, বৈধ! তুমিই একমাত্র আমাকে আমার পবিত্র জন্মভূমির সূর্যালোকের সন্ধানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছো। ওয়েটা, আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে আমাকে পৌঁছে দেবে। আমার পিতাকে দেখতে পাব। আরো কত বন্ধু বান্ধবের সাথে সাক্ষাত মিলবে। এই শত্রুদের হাত থেকে তুমিই আমায় ছিনিয়ে নিয়ে পৌঁছে দিতে পারো সে স্বর্গভূমে! সাহস আনো বৎস! ধরো! এই মহাশক্তিধর ধনুকটিকে ধরো! তারপর আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো। তুমিই এই জগতে একমাত্র ব্যক্তি যে ফিলোক্টেটিস ছাড়া হেরাক্লিসের এই দৈবধনুটির পরশ পেলে! কেবলমাত্র চরিত্রের মহত্বেই এ সম্ভব! সেই কারণেই বহুদিন আগে এটি আমার করায়ত্বে ।
নি ঃ আমি সত্যিই ভাগ্যবান, আমি আপনাকে বন্ধু হিসেবে পেয়েছি! একজন হৃদয়বান বন্ধু যে কোনো সম্পদের থেকেও মূল্যবান! চলুন ভিতরে গিয়ে দেখি আপনার জিনিষপত্রের কী ব্যবস্থা করা যায়?
ফি ঃ তাহলে ভিতরে এস। আমার রুগ্নতায় তোমার সাহায্য পেলে ভালো লাগবে।
স-১ ঃ আমি সেই ভয়ঙ্কর কাহিনী শুনেছি, যদিও আমার চোখে দেখা নয়-কেমনভাবে জিউস তাঁর পত্নীর শয্যাপার্শ্বে লুকানো তস্করকে ধরেছিলেন, তারপর অগ্নিচক্রে তাকে নিবদ্ধ করে ঘুরিয়েছিলেন। সে ভয়ঙ্কর শাস্তির থেকেও কঠোর শাস্তি পেতে আর কোন মানুষকে দেখিনি - যেমনটি পেয়েছেন ফিলোক্টেটিস। তিনি তো চুরি করেননি, ডাকাতি করেননি। কাউকে হত্যা করেননি। এক সৎ মানুষ। সবাইকে তাদের ন্যায্য সম্মান দিয়েছেন। তবুও এমন ভয়ানক শাস্তি তাকে পেতে হোলো? একী তার প্রাপ্য? আমি অবাক হয়ে ভাবি এ তরঙ্গবেষ্টিত তীরে তিনি একা জীবনকে আঁকড়ে ধরে আছেন। জীবন এনেছে ব্যাধি, যন্ত্রণা অশ্রুনিবিড়ক্ষণ।তবুও তিনি হার মানেননি।
স-২ ঃ তিনি তো পঙ্গু! নিঃসঙ্গ! এমনভাবেই দুঃখের বোঝা বইছেন। পাশে কেউতো সে বোঝা হাল্কা করার নেই! কেউ তাঁর ক্রন্দনে স্বান্তনা যোগায়নি! তাঁর বিষরক্ত ক্ষরিত ক্ষতের যাতনায় কেউতো আনেনি এতটুকু আশ্বাসের বানী? কেউতো তাঁর ক্ষতে বেঁধে দেয়নি কোমল পত্রবন্ধনী? ক্ষতের পরিচর্যায় কেউ বাড়ায়নি সহমর্মিতার হাত? এই কঠোর ভূমিতে তিনি দুমড়ে মুচড়ে হেঁটে বেড়িয়েছেন। নির্মম নিষ্ঠুর ক্রন্দনে নিরন্তর দিনগুলি তাঁর কেটে গেছে। এমনি ভয়ানক সে জীবন।
স-৩ ঃ এই পবিত্রভুমির কোনো শস্য তাঁর ক্ষুধা মেটায়নি। না কোনো সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণ তাঁর রসনাকে প্রলুব্ধ করেছে। কেবল জুটেছে পাখীর মাংস। কোনওরকমে জঠর জ্বালা স্তিমিত করার পথ্য।এই দশ বছর তিনি সুমিষ্ট মদ্যের আস্বাদ নেন নি। কেবল ঝর্নার জল - তাতেই তৃষ্ণার নিবারণ।
স-৪ ঃ কিন্তু এখন সৌভাগ্য পৌঁছে দেবে তাঁকে বিজয়প্রান্তে।তিনি এখন এক মহান বীরের মহান সন্তানের আশ্রয়ে। আমাদের প্রভু পৌঁছে দেবেন তাঁকে সাগরপারের তাঁর নিজের দেশে - মালিয়ার পরীদের দেশে - সুমধুর তটিনী স্প্রেখোইওসের ধারে, যেখান থেকে দেব হেরাক্লিস ধনুর্বান হাতে আরোহণ করেন অলিম্পিয়ার পর্বত শিখরে। তাঁর ব্রোঞ্জের বক্ষাবরনী পবিত্র আগুনের বেষ্টনে ঝলসে ওঠে - সেই পর্বতময় ওয়েটার উপকূলে তাঁর দেশ।
নি ঃ আসুন তাহলে। এভাবে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? এত নিশ্চুপ?
ফি ঃ (চেঁচিয়ে উঠে) আঃ ! আঃ ! আঃ !
নি ঃ কি হয়েছে?
ফি ঃ ভয়ের কিছু নয়। এস বৎস!
নি ঃ আপনার ব্যধি কি এখন পীড়া দিচ্ছে?
ফি ঃ না এখন ভালো বোধ করছি। (আবার চেঁচিয়ে উঠে) ওঃ ! ভগবান!
নি ঃ কী ব্যাপার? দেবতার উদ্দেশ্যে এমন চেঁচিয়ে উঠলেন কেন?
ফি ঃ আমি চেঁচাচ্ছি যাতে তাঁরা এসে আমার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দেন। আঃ ! আঃ ! আঃ !
নি ঃ কী হয়েছে? আমায় বলুন। আমি দেখছি আপনি যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছেন। আমাকে খুলে বলুন কী হয়েছে?
ফি ঃ ওঃ ! এই আমার নিয়তি বৎস! চাইলেও তোমার কাছ থেকে এই ভয়ঙ্কর সর্বনাশকে আড়াল করতে পারলাম না । আঃ ! আঃ! আঃ! এ আমার রক্তকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছে। আমি শেষ হয়ে গেলাম! আমি ঘৃণ্য! আঃ! আঃ! আঃ! দেবতার দিব্যি, বৎস, যদি তোমার তরবারি থাকে তো এখনি কোষমুক্ত করে আমার পা’টাকে কেটে ফেলে দাও। কেটে ফেল! তুমি আর আমাকে বাঁচাতে পারবেনা । এখনি করো বৎস।
নি ঃ কী এ ভয়ানক ব্যাধি যে আপনাকে এমন আক্রমণ করে, আর আপনি এমনভাবে মারাত্মক চেঁচাতে থাকেন?
ফি ঃ তুমি জানোনা?
নি ঃ কী এ ব্যাধি?
ফি ঃ কী করে জানবে? আঃ ! আঃ! আঃ!
নি ঃ এমনি মারাত্মক যন্ত্রণা! এমন মরণ আর্তনাদ!
ফি ঃ মারাত্মকই বটে! কোনো বর্ননাই এর যথেষ্ট নয়। দয়া কর!
নি ঃ কী করব বলুন?
ফি ঃ ভয় পেয়োনা। আমায় ছেড়ে যেওনা! এ ব্যাধি এরকমই আসে। আবার প্রস্থান করে। বোধ হয় অন্য কাউকে ধরে - জানিনা !
নি ঃ হায় রে হতভাগ্য! এমনি দুর্দশা আপনার! তবুও যুঝে যাচ্ছেন! আমি কি আপনাকে ধরব?
ফি ঃ খবর্দার! আর যাই কর, ওটি কোরোনা! বরং আমার ধনুকটা নাও। কিছুক্ষণ আগে যেটা তুমি ধরতে চেয়েছিলে। যতক্ষণ না আমার যন্ত্রণার উপশম হয় ধনুকটা ধরে রাখো। ওটা নিরাপদে রেখো বালক! একটু পরে আমি ঘুমিয়ে পরব। যন্ত্রনাও শেষ হবে। এই আমার নিয়তি! না হলে আবার যন্ত্রণা ফিরে আসবে। আমায় কিছুক্ষণ ঘুমাতে দাও।যদি আমার পরম মিত্রও আসে ভগবানের দিব্যি আমার ধনুক ছেড়ো না । ইচ্ছায় - অনিচ্ছায় - বলে - কৌশলে, কোনো অবস্থাতেই নয়। যদি ধনুকটা আর কাউকে দাও তবে তুমি আর আমি দুজনেই মরব।
নি ঃ আপনি নিশ্চিন্ত থাকুন। আমি সতর্ক থাকব। একমাত্র আমার দখলেই ধনুকটি থাকবে। আর কেউ এর পরশ পাবেনা। আমায় তাহলে ওটা দিন। দেবতার আশীর্বাদ এর উপর যেন সদা বর্ষে।
ফি ঃ এই নাও বৎস। দেবতাদের কাছে প্রার্থনা কর যাতে তারা তোমাকে না হিংসা করেন এ কারণে। এই ধনুক আমার মতন তোমার দুঃখের কারণ যেন না হয়।
নি ঃ হে দেবতাগণ! উনি যা চাইছেন তাই যেন হয়। আমাদের ঘরে ফেরার অনুকূল আবহাওয়াও যেন আমরা পাই। জিউসের আশীর্বাদ আমাদের উপর ঝরে পরুক।
ফি ঃ তোমার প্রার্থনা পূরণ বোধ হয় হোলো না। খুনি রক্ত শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। আমি আবার নতুন আক্রমণের অপেক্ষায় আছি। ওই যে! সে আসছে! ওঃ ! ওঃ ! ওঃ! শেষ পর্যন্ত হতচ্ছাড়া আবার ফিরে এলি! ওঃ ! এ পা’টাকে বাদ দিলে যেন বাঁচি। তোমার কাছে ধনুক বৎস! তুমি বুঝতে পারছ কী ঘটতে চলেছে? আমায় ছেড়ে যেওনা! আঃ ! আঃ! বেইমান অডিসিয়াস! তুই মর রে বেহায়া! আমার ব্যাধির করাল ছায়া তোকে ঘিরে থাক! আঃ! অ্যাগামেমনন, মেনালাউস! তোদের শরীরে এ অভিশাপ প্রবেশ করুক! তিল তিল করে সে তোদের গিলে খাক!
মরণরে ! তোর কৃষ্ণবর্ণ কায়া কেন আসেনা আমার সামনে? কতবার তো তোকে ডাকি! তুই আয়! বৎস! আমার শরীরটা তুলে চিতায় নিক্ষেপ করো! কোনো আগ্নেয়গিরির জ্বালামুখে একে ফেলে এসো। আমিও তো সেটাই করেছিলাম! জিউসের এক সন্তানকে ফেলে এসেছিলাম অগ্নিকুণ্ডে। আর তারই পুরস্কার এ অস্ত্র! এটাকে সাবধানে রাখো! রাখবে তো বাছা! কথা বলছনা কেন তুমি? কোথায় তুমি?
নি ঃ আপনার কষ্টে আমি ব্যথিত ফিলোক্টেটিস! আপনার যন্ত্রণা আমাকেও দহন করছে!
ফি ঃ না বৎস! সাহসী হও! এই ব্যাধি যেমন শীঘ্র আসে, তেমনি দ্রুত প্রস্থান করে। তোমায় মিনতি করি আমায় ফেলে যেওনা।
নি ঃ চিন্তা করবেন না ! আমরা সবাই আপনার পাশেই থাকব।
ফি ঃ পাশে থাকবে? সব্বাই!
নি ঃ নিশ্চয়ই !
ফি ঃ না না ! আমি তোমাদের শপথ নিতে বলছিনা। আমি তোমাদের বিশ্বাস করি!
নি ঃ আপনাকে ছাড়া আমরা এ স্থান পরিত্যাগ করতে পারিনা।
ফি ঃ তোমরা হাত বাড়াও তাহলে।
নি ঃ এই যে ! আপানার হাতে হাত রাখছি!
ফি ঃ এখন আমায় নিয়ে চলো।
নি ঃ কোথায়?
ফি ঃ ওই উপরে !
নি ঃ একি পাগলামো! হঠাৎ উপরের দিকে হাত দেখাচ্ছেন কেন?
ফি ঃ আমায় যেতে দাও!
নি ঃ মোটেই না! কী আবোল তাবোল বকছেন!
ফি ঃ আমায় মেরে ফেলো তোমরা!
নি ঃ ঠিক আছে! আমি আপনায় ছেড়ে দিচ্ছি! এখন একটু আরাম লাগছে কি?
ফি ঃ হে বসুন্ধরে! আমায় গ্রহণ কর! এই ব্যধি আমায় দাঁড়াতে দিচ্ছেনা ।
(শুয়ে পড়বে)
নি ঃ শীঘ্রই নিদ্রা এসে ওকে গ্রাস করে নেবে। ওঁর মাথা মৃদু মৃদু নড়ছে। গা থেকে গলা বেয়ে ঘাম বয়ে যাচ্ছে। আরো কালো দুষিত রক্ত ওঁর ক্ষত থেকে নির্গত হচ্ছে। এখন ওঁকে ঘুমাতে দাও। বন্ধুরা এখন ওকে শান্তি পেতে দাও।
স-১ ঃ ঘুমাও হে শ্রান্ত যন্ত্রণাক্লিষ্ট পান্থ।
নিদ্রা আসুক নেমে স্বর্গের সুষমা লয়ে।
চক্ষু দুটি মুদে থাক শান্তির প্রলেপে।
হে নিরামক প্রভু ওকে সুস্থ করে তুলুন।
স-২ ঃ যুবক এখন তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে?
এখন তুমি কি করবে? ওকে দেখো -
ও তো ঘুমিয়ে! - তবে কীসের অপেক্ষায়?
সঠিক মুহূর্ত ছিনিয়ে আনতে পারে বিজয়লক্ষ্মী।
নি ঃ হ্যাঁ! উনি কিছুই শুনছেন না। কিন্তু বৃথাই ধুনুকটাকে করায়ত্ব করা! ওঁকে ছাড়া ব্যর্থ এর গরিমা। জিউসের নির্দেশে ওঁকে ফেরাতেই হবে। অথচ প্রতারণা ছাড়া সে কী সম্ভব? ওঃ ! প্রতারক! নির্লজ্জ ঘৃণিত !
স-৩ ঃ জিউসের পরেই বিচার ছাড়ো হে যুবক! বরং ওই আধঘুমন্ত মানুষ - যার জিয়নকাঠি এখন তোমার হাতে - ওকে অচেতনেই রাজি করাও - ও না বুঝেই সম্মতি দেবে।
স-৪ ঃ তুমি তো জানো, আরো একজন সদা সতর্ক তোমার উদ্দেশ্য সাধনে। তুমিও তো তাঁর সাথে একমত। তবে বৃথা এ কালহরণ। নয়তো গভীর সঙ্কট তোমাদের সম্মুখে। এখন বাতাস অনুকূল। মানুষটি অসহায়! পঙ্গু! অন্ধকারে নিমজ্জিত। ওর বশে কিছু নেই। না হাত - না পা - না কিছু! ও এখন মৃত্যুপুরীর দুয়ারে শায়িত। এই তো সঠিক সময়! বৃথা এ সংশয়।
নি ঃ শান্ত হও তোমরা! তোমাদের কি ভীমরতি হয়েছে? ওর চোখের পাতা খুলছে। ও মাথা তুলছে।
ফি ঃ আঃ! কী পবিত্র এ সূর্য্যালোক। বন্ধুদের নিরাপত্তায় আনন্দময় এ জাগরণ। এ তো আমি স্বপ্নেও ভাবিনি। তোমরা আমায় দয়া করবে। আমার দুঃখে সমব্যথী হবে। পাশে রইবে, যন্ত্রণা সইবে। মহান সেনাপতিরা! আট্রেয়েসের পুত্ররা? তারা তো কই এমনটি করেনি। করবেও না। ওরা আমার ব্যাথা বোঝেনি। তুমি সত্যিই মহান। তুমি তো মহান মাতা পিতার সন্তান। আমার ভার কত সহজেই গ্রহণ করলে। এমন যন্ত্রণাক্লিষ্ট আর্তনাদপুর্ণ কঠিন বোঝা! দুর্গন্ধ পরিপূর্ণ হতভাগ্যের প্রার্থনা। এখন ব্যাধির প্রকোপ অবসিত। আমি বিশ্রাম নিতে পারব। হে বৎস! তোমার নিজের হাতে আমায় তুলে ধরো। আমাকে দাঁড় করাও। আমি শক্তি ফিরে পাই। তারপর তোমার জাহাজের দিকে রওনা দেব। আমাদের যাত্রা শুরু হোক।
নি ঃ আপনাকে দেখে আমি আনন্দিত। যন্ত্রনামুক্ত, জাগ্রত। কিছুক্ষণ আগেও যেন ছিলেন মৃত্যুশয্যাতে । এখন তবে উঠুন। আপনি যদি চান আমার লোকেরা আপনাকে তুলে ধরুক। ওরা সবই করতে প্রস্তুত। আমরা তো সহযাত্রী।
ফি ঃ ধন্যবাদ! কিন্তু তুমিই আমায় ধরো। আমি তাহলেই দাঁড়াতে পারব। ওদের আর বোঝা বইতে বোলোনা। একেবারে শুরুতেই ওদের বিব্রত করতে চাইনা। আমাকে তো অনেকটা পথ যেতে হবে। ওদেরও সহ্য করতে হবে অনেক কিছুই।
নি ঃ তাহলে উঠুন। (উঠিয়ে) ধরুন আমায়।
ফি ঃ তার দরকার নেই। আমি এতেই অভ্যস্ত। একবার খাড়া হলে আমি চলতে পারি।
নি ঃ এখনি তো সময়! কিন্তু কি যে করি?
ফি ঃ তোমার কথা কিছু এলোমেলো ঠেকল। কী ব্যাপার বৎস?
নি ঃ আমি জানিনা! আমার অক্ষম কথা কীভাবে শোনাই আপনাকে?
ফি ঃ অক্ষম? না- না , ও কথা বোলোনা।
নি ঃ কিন্তু অক্ষম ভাবনাতেই যে আমি জর্জরিত।
ফি ঃ এ কী আমার ব্যাধির প্রভাবের দরুন? তুমি কি আমায় তোমাদের সাথে নিয়ে যেতে চাও না?
নি ঃ চরিত্রের সাথে সঙ্গতিবিহীন যে কোনো কাজই ঘৃণিত!
ফি ঃ কই? তোমার চরিত্রের সাথে অসঙ্গতিপুর্ণ কোনো কাজই তো দেখছিনা। তোমার মৃত পিতার মহত্ব তোমাতেই অধিষ্ঠিত - এক দুঃখী আর্তের সেবাতে। কথা ও কাজে কোনো তো অসঙ্গতি নেই।
নি ঃ এখন তো আমাকে মন্দ ভাববেন। সেই ভাবনাতেই আমি সঙ্কুচিত।
ফি ঃ তুমি যা করেছ সে তো কম নয়? তবুও তোমার কথায় আমি বিভ্রান্ত।
নি ঃ হে জিউস! আমার এখন কী করা উচিত? আমি কি আরও একবার ছলনার আশ্রয় নেব? না কী সত্যকে প্রকাশ করব।
ফি ঃ আমি ঠিক যদি বুঝে থাকি তবে মনে হয় এই যুবকটি এবার আমাকে পরিত্যাগ করবে। তারপর চলে যাবে।
নি ঃ আমি আপনাকে পরিত্যাগ করতে আসিনি। কিন্তু আমাদের সাথে যে যাত্রায় আপনি অগ্রসর হবেন তা আপনাকে বিপর্যস্ত করবে।
ফি ঃ আমি বুঝলাম না ! কী বলছ তুমি?
নি ঃ আর গোপন করা নয়। খোলাখুলিই বলা ভাল। আপনাকে ট্রয় যেতে হবে। গ্রীক বাহিনীতে আট্রেয়েসের সৈন্যদলে যোগ দিতে।
ফি ঃ (চেঁচিয়ে উঠে) আঃ ! কী বললে তুমি?
নি ঃ দয়া করে বিচলিত হবেন না । আগে আমার পুরো কথা শুনুন!
ফি ঃ কী শুনব? কী শোনাবে তুমি? আমায় নিয়ে কী চক্রান্ত তোমার হে যুবক?
নি ঃ প্রথমতঃ আপনার ব্যাধির নিরাময়। তারপর আপনি ও আমি দুজনে মিলে ট্রয়কে ধ্বংস করব।
ফি ঃ এই কী তবে সত্য? এটাই কী তোমার উদ্দেশ্য?
নি ঃ এক চরম প্রয়োজনে আমি এ কাজ করতে বাধ্য হয়েছি। দয়া করে ক্রোধ সংবরণ করুন।
ফি ঃ আমি বিধ্বস্ত। রে বিশ্বাসঘাতক! কেন এমন করলে? আমার ধনুক আমায় ফিরিয়ে দাও।
নি ঃ ক্ষমা করবেন, আমি অপারগ।
ফি ঃ রে পামর! মূর্তিমান যমদূত! কুচক্রী দস্যু! এই তবে তোর উদ্দেশ্য? তাই এত ছলিবলি! তোর কী আমার দিকে সোজা চোখে তাকাতে লজ্জা হচ্ছেনা?
যে লোকটা নতজানু হয়ে তোমার সাহায্য প্রার্থনা করেছে তাকে এই চরম প্রত্যাঘাত কেন হানলে? তুমি আমার ধনুকটাকে কেড়ে নিয়ে আমার জীবনটাকেই মুঠোতে ধরেছো। তোমায় মিনতি করি - ওটা ফিরয়ে দাও আমায়। তোমার মহান পিতাকে স্মরণ করো। আমার মৃত্যুকে ডেকে এনোনা।
এ-তো কথা বলছেনা। কেবল অন্যদিকে ফিরে আছে। ও কিছুতেই ধনুকটা আমাকে দেবেনা।
শোনো হে অরণ্য! আশ্রয়দাতা গুহা! তৃষ্ণানিবারী তটিনী! শোনো হে অরন্যচারী প্রাণীরা! তোমরাই সাক্ষী। তোমাদের কাছেই আমার যা দাবী। আর তো কেউ নেই, যে এই ব্যাধিক্লিষ্ট মানুষটির কথা শোনে। কেবল তোমরাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছ। তোমরা দেখো - মহান অ্যাকিলিসের মহান (?) পুত্রের কীর্তি! ব্যাটা আমায় ঘরে ফেরাবার স্বপ্ন দেখিয়ে ট্রয়ে ফেরাতে চায়! আমার ধনুক ছিনিয়ে নিয়েছে ছলনায়। হেরাক্লিসের সেই ধনুক। সেই ধনুক এখন গ্রীক বাহিনীতে দেখিয়ে ও বলবে, কি লড়াইটা করেই না ও এটা বাগিয়েছে। ব্যাটা ভীরু, কাপুরুষ! এক মৃতপ্রায় ব্যক্তির বুকে ছুরি চালাস! এক মুমূর্ষু - যে কিনা কেবলই অতীতের ছায়া! যদি আমি শক্তিশালী হতাম তবে কি এটা পারতিস? আর তাও কিনা ছলনার আশ্রয়ে! হায়রে বীরের সন্তান! আমাকে এমনভাবে মারবি!
ধনুকটা ফিরিয়ে দাও! তোমার মহানুভবতাকে স্মরণ কর। একটু ভাবো তুমি নিজে কেমন? না! এখনো নিরুত্তর! আমি কী কিছুই নই! জঙ্গলের শুকনো পাতা! ফেলনা! আমার আশ্রয়দাত্রী গুহা! আমি তোমাতেই ফিরে আসছি! অস্ত্রহীন - প্রাণধারণে অসমর্থ। তোমার ভিতরেই আমি অনাহারে শুকিয়ে যাব। শিকার করতে বেড়োবোনা। এখন আমিই শিকার হব অরণ্যশ্বাপদের।আমার জীবন দিয়েই তাদের ঋণ পরিশোধ করব। কারণ এই প্রতারক আমার ধনুকটি নিয়েছে। ভেবেছিলাম মহান যুবক! কত না বিশ্বাসই করেছিলাম তোমায়। তোমায় অভিশাপ দিচ্ছি। না, এখন নয়। হয়তো তুমি তোমার মত বদলাতে পার। তবুও যদি না বদলাও - তুমি মরো দুঃখ দুর্দশায়।
স ঃ এখন আমারা কী করব? আমরা কী রওনা দেব? না কী ও যা বলছে সেটাই মেনে নেব? সবই আপনার হাতে।
নি ঃ আমি অন্তর্দহনে জ্বলছি। সারাক্ষণই এ লড়াই চলছে ভিতরে ভিতরে।
ফি ঃ দেবতাদের নামে বলছি, দয়া করো। আমাকে প্রতারণা করে আজীবন অনুশোচনার আগুনে পুড়ো না।
নি ঃ কী করব ভেবে পাচ্ছিনা। বোধ হয় স্কাইরোস থেকে ট্রয়ের যুদ্ধে না এলেই ভালো করতাম। সমস্ত ঘটনাই আমার কাছে ঘৃণ্য।
ফি ঃ তুমিতো মন্দ লোক নও। অন্যদের দেখে এমন ভয়ঙ্কর ছলনা বোধ হয় শিখেছ। ছুড়ে ফেল এই প্রতারণা। ওরা ওদের চক্রান্তে শেষ হোক। আমরা বরং দেশে ফিরে যাই। অস্ত্রটা আমায় দাও বৎস।
নি ঃ কী করব তবে আমরা?
অডিসিয়াস ঃ (নেপথ্যে) ভীরু ! কাপুরুষ! এতো কী ভাবছ এতক্ষণ? আমাকে ধনুকটা দিয়ে দাও।
(অডিসিয়াসের প্রবেশ)
ফি ঃ কে ওখানে? অডিসিয়াসের গলার আওয়াজ যেন পাচ্ছি।
অ ঃ হ্যাঁ! অডিসিয়াসের গলাই বটে। এখন আমাকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছ তো?
ফি ঃ আমি সত্য সত্যই প্রতারিত - বিধ্বস্ত। এখন স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ তবে অডিসিয়াসের চাল! আমার অস্ত্র বাগানোর চক্রান্ত!
অ ঃ হ্যাঁ, আর কারো নয়। বুঝতে পারলে তাহলে এতক্ষণে!
ফি ঃ আমার ধনুক ফিরিয়ে দাও যুবক। এখনি দাও।
অ ঃ ও চাইলেও পারবেনা। তোমাকেও আসতে হবে ওই ধনুকের সাথে সাথেই! না হলে এই সব লোক তোমায় ধরে বেঁধে নিয়ে যাবে।
ফি ঃ তোমার মন্দ চরিত্র অবিশ্বাস্য! অকল্পনীয়! আমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে এরা নিয়ে যাবে?
অ ঃ যদিনা তুমি স্বেচ্ছায় লেংচে লেংচে আমাদের সাথে চলো।
ফি ঃ হে লেম্নসেরর বিজন প্রান্তর! আগ্নেয়গিরির বিধ্বংসী জ্বালামুখ ! আমি কী এদের কাছে হার মানব? আমি কী এদের শক্তির কাছে আত্মসমর্পন করব?
অ ঃ এ জিউসেরই নির্দেশ মাত্র। জিউস এই দ্বীপও শাসন করেন। আমি তো শুধু তাঁর আজ্ঞাবাহী দাস।
ফি ঃ ঘৃণ্য কীট! মিথ্যা উচ্চারণ কোরো না! দেবতার নাম নিয়ে তোমরা দেবতাকে মিথ্যাবাদী বানাও।
অ ঃ দেবতা সত্য কথাই বলে। তাঁদের নির্দেশ পালনীয়।
ফি ঃ আমি বলছি - না!
অ ঃ আর আমি বলছি - হ্যাঁ ! তোমাকে সে নির্দেশ মানতেই হবে।
ফি ঃ স্পষ্টতই আমরা সবাই দাস! কেউই আর মুক্ত মানুষ নই! আমাদের পিতৃ পিতামহরা এমনই পরগাছা তৈরী করেছিলেন বটে!
অ ঃ মোটেই তা নয়! সমস্ত অভিজাতদের মধ্যে তুমিও একজন। তাদের সাথে তোমাকে ট্রয়ের প্রাচীর ধ্বংসে যোগ দিতে হবে। এটাই তোমার বিধিলিপি!
ফি ঃ অডিসিয়াস! কিছুই মিলবেনা তোমাদের আমার কাছ থেকে। আমার এই সমুদ্র সন্নিকট পাহাড়তলটিই বরং পরম মিত্র!
অ ঃ কী মতলব ভাঁজছ?
ফি ঃ ওই পাহাড়চুড়া থেকে ঝাঁপিয়ে পড়ব নীচে। শেষ হয়ে যাক তবে ফিলোক্টেটিস।
অ ঃ ধরো ওকে। লাফাতে দিয়ো না ।
[স-১ ইত্যাদি বাধা দেবে ও বেঁধে ফেলবে]
ফি ঃ হায়রে এ হাত দুটো! ধনুকটা থাকলে একবার দেখে নিতাম। এমন নির্বিরোধে শিকার হতাম না। রে দাসমনোবৃত্তিধারী! এ ভাবেই তবে তোর শিকার সম্পন্ন করিস? ছলনায় - অপহরণে - এই নিষ্পাপ অচেনা যুবককে সামনে রেখে এই তোর কুটিল চক্রান্ত! ওর বরং অন্য প্রভুর প্রয়োজন। তোর মতো হীন ব্যক্তিকে নয়। ও তোরও চক্রান্তের শিকার। দেখ কী অন্তর্জ্বালায় ভুগছে। তোর দুষ্ট অভিসন্ধিতে ও ক্রীড়নক। তোর অপরাধের সঙ্গী - যদিও অনিচ্ছায়, ঘৃণায় এমন ঘৃণ্য কাজে ও নিয়োজিত। এখন তো বেঁধেছো আমায়! এখন তো এই জায়গা থেকে নিয়ে যেতে চাও যেখানে তোমার অভিরুচি! অথচ এখানেই তো আমায় ফেলে রেখে গিয়েছিলে নির্বান্ধব নির্বাসনে - ব্যাধিক্লিষ্ট এক পঙ্গুকে।
আমি তোমায় অভিশাপ দিচ্ছি। এর আগেও বহুবার দিয়েছি। কিন্তু দেবতারা নিষ্ঠুর - বধির! তাই তুমি সুখেই আছ। আর আমি যন্ত্রণায় স্থবির হোয়ে আছি। তুমি আর তোমার প্রভুরা - আট্রেয়েসের পুত্রদ্বয় - আমার আর্তনাদকে উপহাস করেছ। আমি তো স্বেচ্ছায় আমার সপ্ততরী নিয়ে ট্রয়ের যুদ্ধে যোগ দিয়েছিলাম। তবুও নির্বিচারে আমায় ফেলে গেলে জনমানবহীন এই দ্বীপান্তরে। তুমি বলবে এটা তাদেরই কাজ। আর তোমার মনিবেরা বলবে এটা তোমার কাজ। এমন ঘৃণ্য তোমার প্রতারণা!
কেন নিচ্ছ আমায়? আমিতো কিছুই নই তোমাদের কাছে! বহু বছর আগেই তো মৃত। আমি কী আর পঙ্গু নই! এখন কী আর এই ক্ষতের দুর্গন্ধে তোমার ঘৃণা জাগছেনা? আমার সাহচর্য্যে কেমনভাবে দেবে তবে তোমাদের যজ্ঞের আহূতি? এই কারণেই না আমায় ত্যাগ করেছিলে! তবে এখন কী সে প্রয়োজন?
তবে এর প্রতিফলন তুমি নিশ্চয়ই পাবে। তোমায় গ্রাস করুক ভয়াবহ মৃত্যু।তোমার অপরাধের সেটাই চরম শাস্তি। দেবতারা এতটা নিষ্ঠুর, নির্বিকার নন। তাঁরা নিশ্চয়ই আমার এ প্রার্থনা শুনছেন। তোমার এই আগমনই নিশ্চয়ই তাঁদের ইচ্ছাতে, যাতে তোমার পাপের বোঝা পরিপূর্ন হয়। তুমি ধনে মানে নির্বংশ হও। এই আমার একমাত্র কামনা। এতেই আমি নিজেকে রোগমুক্ত মনে করব।
স ঃ এই মানুষটির রসনা তিক্ত - ওর ভাষা তীক্ষ্ণ। দুঃখ যন্ত্রণা আক্ষেপে পরিপুর্ন।
অ ঃ আমার অনেক কিছুই বলার ছিল। তবে অত সময় নেই। সংক্ষেপেই বলি। আমি পরিস্থিতির সাথে খাপ খাইয়ে চলি। মহান শুভবুদ্ধি মানুষজনের মাঝে আমিও মহত্ত্বমের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কেবল তুমি! তোমার বিরুদ্ধে আমি অন্য অডিসিয়াস! বিজয় আমার একমাত্র লক্ষ্য।
ওকে যেতে দাও। ওর কোনো প্রয়োজন নেই। ও এ স্থানেই থাকুক। ওর ধনুক আমাদের দখলে। টয়কার আমাদের সাথে আছে। সে মহা ধনুর্ধর। আমি এ ব্যাপারে কম দক্ষ নই। ওর কোনো প্রয়োজন নেই। বিদায় হে ফিলোক্টেটিস! বিদায় লেম্নোস! চলো সবাই। শীঘ্রই জয় আমাদের করায়ত্ত হবে।
(স ঃ ইত্যাদি বাঁধন মুক্ত করবে)
ফি ঃ ওঃ! অক্ষম এ দু হাত! তুমি কী তবে গ্রীকদের সামনে এই ধনুক নিয়ে ঔদ্ধত্য দেখাবে?
অ ঃ আর কথা নয়। আমরা চলে যাচ্ছি।
ফি ঃ তোমার কি কিছুই বলার নেই অ্যাকিলিসপুত্র? কোনো কথা না বলেই কী এ স্থান পরিত্যাগ করবে?
অ ঃ বৎস! চলে এসো। ওর দিকে তাকিয়ো না । তোমার হৃদয় কোমল। আর সে কারণেই তুমি সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারো।
ফি ঃ তোমরা নাবিকেরা! আমাকে ছেড়ে যাবে? আমার প্রতি কী কোনো করুণাই তোমাদের নেই?
স ঃ আমাদের তরুণ প্রভুই আমাদের রক্ষক। উনি যা বলবেন তাই আমরা করব।
নি ঃ অডিসিয়াস ওনাকে দয়া দেখালে আমাদের তিরস্কার করবেন। তোমরা এখানে ওর সাথেই এখানে থাকো যতক্ষণ না অন্য নাবিকেরা যাত্রা শুরুর আয়োজন সম্পন্ন করে। দেবতার কাছে প্রার্থনা জানাই, ফিলোক্টেটিস যেন আমাদের ক্ষমা করেন। অডিসিয়াস চলুন! তোমরা ডাক শোনা মাত্রই চলে এসো।
(অঃ ও নি ঃ এর প্রস্থান।)
ফি ঃ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের গহীনে বিরাজ করুক বরফশীতলতা ।আমার আশ্রয়দাতা গুহা - এখন থেকে আমি তোমাতেই বন্দী। তুমি সাক্ষী থেকো আমার অনাহারের, আমার মরণের। খাবার তো কিছু রইলনা। বাঁচব তবে কিভাবে? এখন শিকারি পাখীরাই বরং আসবে আমার মাংস ভক্ষণে।
স ১ ঃ তুমিই তো তোমার নিজের ধ্বংস ডেকে আনলে হে স্থবির! তোমার সামনে মুক্তির পথ তো খোলাই ছিল। তুমিই তো এ দুর্ভাগ্যকে বরণ করলে।
ফি ঃ আমার দুঃখ আমারই থাকুক। এই হতভাগ্যকে একা থাকতে দাও তোমরা। আমি এই স্থানেই বাঁচব বা মরব। আমার তীর দিয়ে আর খাবার জোগাড় করা হবে না। আমার হাত দুটোই অকেজো হয়ে গেলো। তোমাদের প্রভুর ছলনায় আমি ভুলেছি। তাকে এ শাস্তি পেতে হবে একদিন।
স ২ ঃ দেবতারাই এর বিচার করছেন! তাদের ইচ্ছাতেই তোমার এ অবস্থা। আমাদের ছলনাতে নয়। তোমার ঘৃণা পরিত্যাগ কর। অভিশাপ ফিরিয়ে নাও। যদিও জানি, তুমি এ পরামর্শ গ্রহণ করবেনা।
ফি ঃ ওই তরুণ যুবকটি এখন সুনীল সাগরপারে সদা হাস্যময়। ওর হাতেই আমার জীবন। আমার ধনুক। একমাত্র আমি ছাড়া কেউ তার স্পর্শ পায়নি। আমার প্রিয় ধনুক বিদায়! আমার এই হাত দুটো তোমার পরিচর্যায় আর নিয়োজিত হবেনা। যদি কখনো আমাকে সামনে পাও একটু দয়া দেখিয়ো। তোমার এখন নতুন প্রভু। এক ধূর্ত প্রভু! সেই তোমার ছিলায় টান দেবে। এখন থেকে তুমি বিশ্বাসঘাতকদের সাথী। আমার শত্রুদের আজ্ঞাবাহী।
স ৩ঃ বিচক্ষণ যদি হও তবে ভেবে দেখো, অডিসিয়াস কেবল তাঁর প্রভুদের আদেশই মান্য করছেন। তাঁর বন্ধুত্বের অঙ্গীকার মেটাচ্ছেন। তোমার রসনাকে সংযত করো হে দুঃখী মানুষ!
ফি ঃ অরণ্যের পশু ও পাখীরা! পাহাড়ের উপরে যাদের নিবাস - এখন থেকে তোমরা নির্ভয়ে আমার কাছে আসতে পারো। আমার দেহ তোমাদের জন্য উৎসর্গীকৃত। কেবল সমুদ্রের বাতাসে আর জীবনকে আর কতদূরই বা টেনে নিয়ে যেতে পারে?
স ৪ ঃ দেবতার নামে শপথ নিয়ে বলছি। যদি অবশ্য দেবতাদের এখনো তুমি বিশ্বাস করো। ভালোভাবে ভেবে দেখো তুমি কী করবে? এখনো সময় আছে। তুমি তোমার ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারো। একজন এগিয়ে আসছেন তোমার দিকে। দেখো উনি কী বলেন? আমরা চাইনা তুমি এই গুহার ভিতরে অনাহারে মর। পশুপাখিদের খাদ্যে পরিণত হও।
ফি ঃ কেন তোমরা আমার ক্ষতে নুনের প্রলেপ দিচ্ছ? তবুও তোমরা ভালো। ওই বিশ্বাসঘাতকদের থেকে তো বটেই। কেন তোমরা আমায় এমন আঘাত দিলে?
স ১ ঃ কেন এ কথা বলছেন?
ফি ঃ তোমরা আমাকে ট্রয়তে যেতে বলছ।
স ২ ঃ আমাদের মনে হয় সেটাই আপনার পক্ষে মঙ্গল।
ফি ঃ তাহলে এ স্থান থেকে এক্ষুনি চলে যাও।
স ৩ঃ সে তো ভালোই। আমরা সানন্দে রাজী। এসো হে সবে! আমরা জাহাজে ফিরি।
ফি ঃ না, না! অতিথিরা! দেবতার নাম নিয়ে বলছি। একটু থাকো। এই আমার প্রার্থনা।
স ৪ঃ থামো সবাই!
ফি ঃ আমি মিনতি করছি, আমার সাথে তোমরা থাকো।
স ১ঃ এখন কিসের প্রয়োজন?
ফি ঃ আমি তো বিধ্বস্ত! বন্ধুরা আমার কাছে ফিরে এসো!
স ২ঃ ফিরে এসে কি করব? তুমি কী তোমার সিদ্ধান্ত বদলেছ?
ফি ঃ দেখো এই পীড়িত উন্মাদের কথায় কিছু মনে কোরো না।
স ৩ ঃ তাহলে আমাদের সাথে এসো হে হতভাগ্য!
ফি ঃ কক্ষনো না! এমনকি দেবরাজ জিউসের বজ্রও যদি আঘাত হানে, তবুও না! ট্রয় ধ্বংস হোক আর না হোক, আমি যাব না। বন্ধুরা আমার একটিই অন্তিম প্রার্থনা।
স ৪ ঃ কী সে?
ফি ঃ যদি তোমাদের কোনো অস্ত্র থাকে - তরবারী, কুঠার ছুরি, যা হোক! আমায় দাও।
স ১ঃ কী করবে তা নিয়ে?
ফি ঃ আমিই আমার শিরোচ্ছেদ করব। পা কেটে ফেলব। আমাকে টুকরো টুকরো করে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করব। মৃত্যু ছাড়া আর কোনো কামনাই নেই আমার!
স ২ঃ কেন?
ফি ঃ আমি আমার বাবার সাথে মিলিত হতে চাই।
স ৩ঃ কোথায়?
ফি ঃ মৃত্যুপুরীতে! নিশ্চয়ই তিনি আর বেঁচে নেই। আমার জন্মভূমি - প্রপিতামহদের নগরী - কত যে দেখতে চেয়েছি তোমাকে! তোমার পবিত্র তরঙ্গিণী বেয়ে বেড়িয়েছিলাম একদিন গ্রীকদের সাথে - আমার শত্রু যারা এখন! আমি এখন কিছুই না!
স ৪ঃ আমাদের জাহাজে ফিরতে হবে এখনি! অডিসিয়াস আর অ্যাকিলিস পুত্র আসছেন।
(ফিঃ এর প্রস্থান এবং অঃ ও নিঃ এর প্রবেশ)
অ ঃ এতো তাড়াহুড়োতে ফিরছ কেন বৎস?
নি ঃ আমি অত্যন্ত খারাপ কাজ করেছি! তার প্রায়শ্চিত্ত করতে চাই।
অ ঃ খুব অদ্ভুত কথা বলছ তো? কী সে কাজ?
নি ঃ আমি আপনার ও সেনাপতিদের আদেশ মেনেছি! সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত!
অ ঃ এমন কি অপরাধের ভাগীদার করেছি আমরা তোমায়?
নি ঃ আমি প্রতারণা ও ছলনার আশ্রয় নিয়েছি। খুব সফলতার সাথেই।
অ ঃ আর কী চাও তবে এখন?
নি ঃ নতুন কিছু নয়। আমার কাছে ফিলোক্টেটিস এর ধনুকটা আছে।
অ ঃ ওটা নিয়ে কী করবে? বেশ চিন্তায় ফেললে দেখছি!
নি ঃ আমি এর ন্যায্য অধিকারীকে ফিরিয়ে দেব।
অ ঃ তুমি বলতে চাও, ওটা ফিরিয়ে দেবে!
নি ঃ হ্যাঁ! এটা আমি ঘৃণ্য ছলনায় হস্তগত করেছি।
অ ঃ সত্যই এ তোমার উদ্দেশ্য!
নি ঃ আমি সত্য কথাই বলছি।
অ ঃ অ্যাকিলিস পুত্র কী বলছ তুমি জানো?
নি ঃ আর একবার তবে সে স্থানে যাওয়া যাক।
অ ঃ এখন আমার মনে হচ্ছে প্রথমবারেই সেখানে আমাদের না যাওয়াই ভালো ছিল।
নি ঃ কিন্তু এখন তো সব শুনলেন!
অ ঃ তোমাকে কেউ কেউ এ কাজে বাধা দেবে।
নি ঃ কারা?
অ ঃ সমস্ত গ্রীক বাহিনী! আর আমি তাদের মধ্যে অন্যতম!
নি ঃ আপনি ধূর্ত অডিসিয়াস! কিন্তু যা বলছেন সেটা হবার নয়!
অ ঃ তোমার কথা ও কাজ কোনোটাই কিন্তু বুদ্ধিমানের নয়!
নি ঃ কিন্তু তারা ন্যায়ের অনুসারী। সেই ভালো।
অ ঃ কি করে এটা ভাবলে? আমার পরিকল্পনাতেই তো তুমি ওটা পেয়েছো। এখন আমাকেই ছুড়ে ফেলে দিতে চাইছ?
নি ঃ আমি অত্যন্ত এক অন্যায় কাজ করেছি। এটা আমার স্বভাববিরুদ্ধ। এখন তার প্রতিকার চাই।
অ ঃ আর গ্রীকদের কথা ভাবছ না? তাদের সম্মিলিত শক্তির সামনে দাঁড়াতে ভয় পাচ্ছ না?
নি ঃ আমি আপনাদের কারোর ভয়েই ভীত নই। কারণ আমি ন্যায়ের পথে চলতে চাই। আমার উপর জোড় খাটাবেন না।
অ ঃ তাহলে আর ট্রয় নয়, এখন আমরা তোমার বিরুদ্ধেই লড়ব।
নি ঃ তাই হোক।
অ ঃ (তরবারী কোষ মুক্ত করে) দেখতে পাচ্ছ কি এই তরবারী আমার হাতে।
নি ঃ আপনিও তবে দেখুন। (তরবারী বার করে)
অ ঃ বেশ তাহলে তোমার উপরেই এ বিচার ছাড়ছি। তোমার অপরিনামদর্শিতার ফল তোমাকে ভুগতে হবে। আমি ট্রয়ে ফিরে গিয়ে সমস্ত গ্রীক বাহিনীকে এ কথা জানাব। ওরা তোমায় শাস্তি দিতে এখানে আসবে।
[অ ঃ প্রস্থান]
নি ঃ খুব বুদ্ধিমত্তার পরিচয়ই দিলেন। এমন সদা সতর্ক থাকবেন, তবে ভবিষ্যতেও বিপদ থেকে রক্ষা পাবেন আপনি।
( ফিলোক্টেটিস-এর কাছে গিয়ে)
ফিলোক্টেটিস, পোইয়ার পুত্র! গুহার বাইরে আসুন! আমি আপনার সাক্ষাত চাই।
[ফি ঃ প্রবেশ]
ফি ঃ আঃ! কি চাও তুমি? ডাকলে কেন আমায়? আবার কোন অশুভ চক্রান্তের জাল বুনছ? নতুন করে কী সঙ্কট বয়ে আনলে? আমার এই দুর্দশায় আরো কী আঘাত হানার মতলব আঁটছ?
নি ঃ শান্ত হোন! দয়া করে যা বলছি শুনুন!
ফি ঃ এক সময় তাই তো শুনেছিলাম! যখন তুমি মিষ্টি কোথায় আমায় ভুলালে। তোমায় বিশ্বাস করে আমার ধ্বংসকে ডেকে আনলাম।
নি ঃ আমি আপনার ক্ষমাপ্রার্থী। সে কী একেবারেই অসম্ভব?
ফি ঃ ঠিক আগের মতই মিষ্টভাষণ! দুষ্টের মিষ্টতা! দেখলে মনে হবে পরম বন্ধু! কিন্তু ভিতরে ভিতরে ক্রুর জিঘাংসায় প্ররিপুর্ণ।
নি ঃ এখন আর আমি তেমন নই। আপনি কী এখনো আপনার সিদ্ধান্তে অনড়? আমাদের সাথে কী আসবেন না?
ফি ঃ আঃ! থামো! বৃথাই এতো কথা বলছ!
নি ঃ এই তবে আপনার শেষ সিদ্ধান্ত?
ফি ঃ শেষ! শেষ! এ শেষের কোনো শেষ নেই!
নি ঃ আমি আশা করেছিলাম, আমি আপনার মত বদলাতে পারব। কিন্তু আমি অক্ষম। আমি হতভাগ্য!
ফি ঃ তোমার সমস্ত কথাই নিরর্থক! তোমরা কখনোই আমাকে জয় করতে পারবেনা। তোমার বন্ধুত্বের কাপট্যে - প্রতারণার আশ্রয়ে আমাকে ধ্বংস করেছো। এখন আবার কথার জাল বুনে চলেছ? এক মহান পিতার তুমি ঘৃণ্য সন্তান। তোমাকে অভিশাপ দিই। তোমার প্রভুদের- আট্রেয়েসের পুত্রদের - অডিসিয়াসকে - সবাইকে আমি অভিশাপ দিই। বিশেষ করে তোমাকে। তুমিই তো এই চক্রান্তের মুল নায়ক।
নি ঃ আর অভিশাপ দেবেন না। এই নিন আপনার ধনুক। ফিরিয়ে নিন এটা।
ফি ঃ এও কি অন্য কোনো ছলনা?
নি ঃ না - না! জিউসের নামে শপথ নিচ্ছি।
ফি ঃ তোমার কথা যদি সত্য হয় তবে ভালো।
নি ঃ সত্যিই তাই! আসুন গ্রহণ করুন।
[অঃ প্রবেশ]
অ ঃ আমি বারণ করছি! দেবতারা সাক্ষী থাকুন! আট্রেয়েসের পুত্রদের প্রতিনিধিস্বরূপ, সমস্ত গ্রীক সৈন্যদলের পক্ষ থেকে এটাই আমার আদেশ।
ফি ঃ বৎস! কার কণ্ঠ এ? অডিসিয়াস!
অ ঃ আর কেউ নয়? তোমার বেশ কাছেই দাঁড়িয়ে। আমি তোমাকে তোমার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তোমাকে ট্রয়ে নিয়ে যেতে এসেছি। এই চপলমতি বালকের সম্মতি বা অসম্মতির পরোয়া না করেই।
ফি ঃ তুমি তোমার ঘৃণ্য কথার জবাব পাবে! এই তীরের আঘাতে -
নি ঃ না, না! মারবেন না! দেবতার দিব্যি!
ফি ঃ আমাকে ছেড়ে দাও বালক!
[অ ঃ পলায়ন]
নি ঃ না ছাড়ব না!
ফি ঃ কেন আমায় আমার শত্রুকে বধ করতে নিরস্ত করছ ?
নি ঃ এটা আপনার বা আমার কারোরই সাহসের পরিচয় হবে না।
ফি ঃ ধিক! এই মিথ্যা সম্মানের অধিকারীদের! গ্রীক সেনানায়কেরা যুদ্ধক্ষেত্রে এমনি ভীরু কাপুরুষ! কথায় তারা যতই দর হোক না কেন - সাহস এদের এতোটুকু নেই।
নি ঃ তারা যাই হোন ! এখন আপনি আপানার ধনুক পেয়েছেন। আপনার ক্রোধ আশা করি সংবরিত হয়েছে।
ফি ঃ না, তুমি সত্যিই তোমার মহত চরিত্রের পরিচয় রেখেছ। তুমি অ্যাকিলিসের পুত্র! সেটাই তো স্বাভাবিক! সিসিফোসের তো নও। তোমার পিতা জীবৎকালে ছিলেন গ্রীকদের মধ্যে সব চাইতে বিখ্যাত, এখন মৃতদের মধ্যে তিনিই মহত্বম।
নি ঃ আপনি আমার বাবার সম্পর্কে এ মন্তব্য করায় আমি গর্বিত। আমার সম্পর্কে মত পাল্টানোয় আমি খুশী। কিন্তু দয়া করে আমার কথা একবার শুনুন। দেবতাদের ইচ্ছার বাহক আমরা। যারা সেই ইচ্ছার বিরুদ্ধে যান তাদের কোনো করুণারই ভাগীদার করা যায়না। আপনি আপনার ক্রোধের আগুনে পুরে মরছেন। আপনি কোনো সুপরামর্শই নিচ্ছেন না। আর যারাই আপনাকে সে পরামর্শ দেয় আপনি তাদের এমন ঘৃণা করেন যেন তারা আপনার শত্রু।
আমি খোলাখুলিই বলছি। দেবতারা আমার সহায় হোন। আমার কথা যেন আপনার হৃদয়ে স্পর্শ করে। আপনার এ ব্যাধি দেবদত্ত। কারণ আপনি ক্রাইজ দ্বীপের রক্ষক সর্পদেবতার সীমানায় অনধিকার প্রবেশ করেছিলেন। তার সে দংশনের কোনো নিরাময় নেই, যদি না আপনি স্বেচ্ছায় ট্রয়ের যুদ্ধে যোগ দেন। সেখানে অ্যাস্ক্লেপিয়াডিস আপনাকে ব্যাধিমুক্ত করবে। তারপর আমার সাথে আপনার ধনুক হাতে ট্রয় জয় করবেন। দেবতাদের এটাই ইচ্ছে।
এক ট্রোজান বন্দী - হেলেনস- এ কথাই বলেছেন। তিনি সাধুপুরুষ। তিনি বলেছেন ট্রয় আমাদের করায়ত্ব হবেই এবং ধ্বংসস্তূপে পরিণত হবে। যদি তা না হয় - তবে তাকে হত্যা করা হবে। আপনাকে সবই বললাম। কেন আমরা এসেছিলাম - কেন আপনাকে এতো চাইছি। আপনি আমার কথা শুনুন! তাহলে এক উজ্জ্বল গৌরবের ভাগীদার হবেন আপনি!
ফি ঃ ঘৃণ্য এ জীবন! ধিক তোমায়! কেন বাঁচিয়ে রেখেছ আমায়? কেন অন্ধকারেই শেষ হয়নি এ দিন? কেমন করে এই তরুণকে অবিশ্বাস করি? আমি কী তবে তাই করব? তাহলে কীভাবে এই নিষ্পাপ সূর্যালোকে মাথা উঁচু করে ঘুরে বেড়াব? তাদেরই পদসেবা করব যারা আমাকে ঘেয়ো কুকুরের মতো পরিত্যাগ করেছে? আমার ওই বিশ্বাসঘাতক শত্রুদের সাথে কীভাবেই বা কইব কথা? এই চোখে তাদের হাস্যময় জীবন দেখে বেড়াব - ওই ঘৃণিত আট্রেয়েসের পুত্রদের আর বেজন্মা অডিসিয়াসকে ? ওরা যে অবিচার আমার উপর করেছে, তাতে আমার কিছু আর আসে যায় না, কিন্তু ওদের অবিচার আরো কত নিষ্পাপ প্রাণকে দলে যাবে? তার সাথী হব আমি?
তুমি ভেবে দেখো বৎস! তোমারও কী ওই কুচক্রীদের সঙ্গ ত্যাগ করা উচিত নয়? ওরা তোমার পিতার অস্ত্র কেড়ে নিয়েছে। কেন তুমি ওদের সাহায্য করবে? আর আমাকেই বা বলবে সেই সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে? না - না ! বরং চল, যেমন তুমি বলেছিলে। আমরা গৃহে ফিরে যাই। তোমার স্কাইরোসেই ফিরে চলো। এই ঘৃণিত ব্যক্তিরা থাকুক ট্রয়তে। মরুক তারা যুদ্ধের আগুনে। এটাই ওদের উপযুক্ত। দুষ্টদের সাহায্য করলে তুমি দুষ্ট হবে।
নি ঃ আপনার কথার যৌক্তিকতা অস্বীকার করিনা। তবুও দেবতাদের উপর ভরসা রেখে আর আমার কথাকে বিশ্বাস করে আমার সাথে চলুন।
ফি ঃ ট্রয়ের ঘৃণ্য রণাঙ্গনে ফিরতে বলছ? ওই আট্রেয়েসের পুত্রদের সামনে এই দুষিত পা নিয়ে দাঁড়াতে?
নি ঃ না, ওরা আর শত্রু নয় আপনার। ওরা আপনার নিরাময় চান। আপনাকে এই ব্যাধিমুক্ত করাতে প্রয়াসী ওরা।
ফি ঃ তুমি যা বলছ মারাত্মক! তোমার কথা কী আমায় বিশ্বাস করতে হবে?
নি ঃ আমাদের দুজনের মঙ্গলের জন্যই।
ফি ঃ দেবতাদের সামনে এমন কথা বলতে লজ্জা হচ্ছেনা!
নি ঃ কেনই বা হবে? এ তো শুভ কাজ।
ফি ঃ কার জন্য শুভ? আমার জন্য না আট্রেয়েসের পুত্রদের জন্য?
নি ঃ আমি আপনার বন্ধু। তাই বন্ধুত্বের এ দাবী নিয়েই এ কথা বলছি।
ফি ঃ কী করে তবে আমাকে শত্রুদের হাতে তুলে দিতে চাইছ?
নি ঃ আপনাকে আপনার এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে হবে।
ফি ঃ এবার পরিষ্কার হোলো। তুমি আমাকে ধ্বংস করতে চাও।
নি ঃ না, আপনি ঠিক বোঝেননি।
ফি ঃ এটা কী সত্য নয়, আট্রেয়েসের পুত্ররা আমাকে এখানে নির্বাসিত করেছে।
নি ঃ হ্যাঁ, একবার একটা খারাপ কাজ করেছে বটে! কিন্তু এবার দেখবেন ওরা আপনাকে রক্ষা করবেন।
ফি ঃ সেই রক্ষার নমুনা বুঝি আপন স্বার্থসিদ্ধিতে আমায় ট্রয়ে ফিরিয়ে আনা? তোমার কথা মানিনা।
নি ঃ আমার দুর্ভাগ্য! আপনাকে বোঝাতে পারলাম না। বরং আর কথা না বাড়ানোই ভালো। আপনি আপনার ব্যাধি নিয়েই বরং থাকুন।
ফি ঃ সেই ভালো! আমাকে এই ব্যাধি নিয়েই বরং বাঁচতে দাও। কিন্তু তুমি আমার হাত ধরে যে প্রতিজ্ঞা আগে করেছিলে তা পূরণ করো। আমাকে বাড়ি নিয়ে চলো। এক্ষুনি! ট্রয়কে ভুলে যাও। আমি নির্বাসনে ক্লান্ত।
নি ঃ তাই হোক! তবে যাত্রা শুরু হোক।
ফি ঃ এই তো! এখন মহান চরিত্রটি কথা বলছে!
নি ঃ শক্ত করে পা মাটির উপর রাখুন। উঠুন!
ফি ঃ তাই করছি। যতটা পারি - আঃ!
নি ঃ গ্রীকদের বিদ্রূপ এড়াব কি করে?
ফি ঃ ওতে কান দেবে না।
নি ঃ আর আমার দেশের বিরুদ্ধে যদি তারা যুদ্ধে নামে?
ফি ঃ আমি তোমায় সাথ দেব।
নি ঃ কি সাহায্য আপনি করতে পারেন?
ফি ঃ এই হেরাক্লিসের ধনুকের সহায়তা!
নি ঃ এর অর্থ?
ফি ঃ তোমার পিতৃভূমি থেকে ওদের বিতাড়িত করব।
নি ঃ বেশ, আসুন তবে আমার সাথে। এই ভূমিকে চুম্বন করুন। এবার আমরা সত্যিই এগোবো।
হেরাক্লিস (নেপথ্য) ঃ এখনো নয়, যতক্ষণ না আমার কথা তুমি শুনছ ফিলোক্টেটিস! জেনে রাখো এ হেরাক্লিসের কণ্ঠস্বর। তুমি তোমার নিজের কানে শোনো, আর আমাকে দেখো। আমি মৃত্যুপুরী থেকে এসেছি তোমাকে সাহায্য করতে। জিউসের উদ্দেশ্য বোঝাতে আর তোমাকে ঘরে ফেরা থেকে নিরস্ত করতে। শোনো তুমি।
তার আগে আমার নিজের কথাই বলি। আমার নিজের ভাগ্যের কথা! বহু যন্ত্রণা ও কষ্ট আমায় সহ্য করতে হয়েছে। এর ফলে কালজয়ী খ্যাতি আমি পেয়েছি । আমি অমরত্ব পেয়েছি। তুমিও তাই পাবে। তোমার অসীম দুঃখ কষ্টের শেষে গৌরবে ভরবে। এই যুবকের সাথে তুমি ট্রয়তে যাও। সেখানে তোমার ব্যাধির নিরাময় ঘটবে। আর সমস্ত গ্রীক যোদ্ধাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্বের শিরোপা পাবে। তুমি প্যারিস আলেকজান্ডারকে হত্যা করবে, যে এই যুদ্ধের শুরুর কারণ। তাকে আমার দেওয়া ধনুক দিয়ে হত্যা করবে। ট্রয় জয় করবে। লুণ্ঠিত ট্রয়ের ধনরত্নের ভাগ নিয়ে দেশে ফিরবে। তোমার বাবা পোইয়াস তোমার অপেক্ষায় - তোমার দেশ ওয়েটাতে। অবশ্যই সেই ধনরত্নের কিছু ভাগ আমার উদ্দেশ্যে উৎসর্গ কোরো।
অ্যাকিলিস পুত্র! তুমিও শোনো! একা তুমি ট্রয় বিজয়ে সক্ষম নও। ফিলোক্টেটিসকে তোমার চাই। সেও তোমাকে ছাড়া এ কাজ করতে পারবে না। তোমাদের সম্মিলিত বিক্রমই ট্রয়সংহারে সক্ষম। আমি আস্ক্লেপিডিয়াসকে ট্রয়তে পাঠাচ্ছি। সে ফিলোক্টেটিসের ব্যাধির নিরাময় করবে। ট্রয় দুইবার আমার ধনুকের সামনে মাথা নোয়াবে। মনে রাখবে ট্রয় ধ্বংস কালে ধর্মকে অনুসরণ কোরো। জিউস অধার্মিকের পতন ডেকে আনে সেটা জেনে রেখো।
ফি ঃ এই আদেশই আমাকে বাধ্য করছে। আমি তা অমান্য করতে পারবনা।
নি ঃ আমিও না।
হে (নেপথ্য) ঃ তাহলে দেরী নয়। শুভক্ষণ সমুপস্থিত। সমুদ্রের জোয়ার তোমাদের ডাকছে।
ফি ঃ হে লেম্নোস, বিদায়! বিদায় হে আশ্রয়দাত্রী গুহা, জলপরীরা - বজ্রঘোষী তরঙ্গের দল! আমার ঘুমন্ত শিয়রে যারা চুম্বনে ভরিয়ে দিতে - বিদায় তোমাদের! হে আগ্নেয়গিরি! আমার আর্তনাদের প্রতিধ্বনি ফেরাতে তুমি! তোমাকেও বিদায়! বিদায় হে সুমিষ্ট ঝর্না! এবার আমাকে যেতে হবে। আমার ক্রন্দন - হতাশাকে ফেলে গৌরবের স্বর্নশিখরে আমার এ অভিযাত্রা!
স ঃ তাহলে এসো! চলো সবে! এই জলপরীদের কাছে প্রার্থনা জানাই - আমাদের যাত্রা নিরাপদ হোক।
৩/১১/২০০২

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home