Saturday, 28 November 2020

দাবার ঘুঁটি

 


 

অলোক বলল, "মানুষ এমন এক প্রজাতি, যে সবরকম পরিবেশে মানিয়ে নেয়৷ যেখানে খুশী বাসা বাঁধে৷ তার উঁচু নিচুর কোনও বাছবিচার নাই৷ সে  সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে পঁচিশ হাজার ফুট উঁচু মালভূমিতেই হোক, কি সাগরতটের  থেকে নিচু সমতলেই হোক, তুই দেখবি মানুষ কিন্তু ঠিক মানিয়ে নিয়েছে৷ এমনকি কোনদিন প্রয়োজনে সাগরের গভীরেও হয়তো ঘরবাড়ী বানিয়ে বসবাস শুরু করে দেবে৷ অথচ জীবজন্তু পোকামাকড় প্রত্যেকেই এক একটা উচ্চতা বেছে নেয়৷ পরিযায়ী পাখিরা যখন লম্বা পাড়ি দেয়, তারা একই উচ্চতায় উড়ে চলে৷ বেগুন গাছে এক ধরণের পোকা আছে, সেটা মাটি থেকে এক নির্দিষ্ট উচ্চতার মধ্যে বিচরণ করে৷ বেগুন গাছের গোড়া থেকে সেই পর্যন্ত ঘন মশারীর জাল জড়িয়ে দিলে সে পোকা থেকে রেহাই পাওয়া যায়৷"

বেশ ক'মাস পরে ওর সাথে আবার দেখা৷ মোবাইলে ফোন করতেই পাওয়া গেলো৷ বলল, "এখানেই আছি৷ ক্লাবে চলে আয় সন্ধ্যাবেলা৷" সেই উপলক্ষেই আসা৷ প্রচণ্ড গরমে চারপাশ হাঁসফাঁস করছে৷ সন্ধ্যায় গঙ্গার হাওয়া খেতে খেতে যখন ক্লাবে গিয়ে পৌঁছলাম, দেখলাম সেও সবে হাজির হয়েছে৷ চেয়ার পাতার যোগাড় যন্তর করছে৷ বলল,"যা গরম! বাইরেই বসি চল৷" সেখানেই দুজনে বসলাম৷ আমার অন্য বন্ধুরা অবশ্য ক্লাব ঘরেই সেঁধিয়ে গেলো৷

বাইরে রাস্তার আলোগুলো ততক্ষণে জ্বলে উঠেছে৷ নদীর হাওয়াও শহরের বুক চিড়ে হালকা ছোঁয়া দিয়ে যাচ্ছে৷ স্বল্প আলোতে অলোকের অবয়বে মালুম হচ্ছে সে খানিকটা পরিশ্রান্ত৷ বলল, "গরমে ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছি ভাই৷ এই রকম হাওয়া পেলে কোথায় আর যেতে ইচ্ছে করে?"

অলোক আমারই মত কর্মসূত্রে বাড়ীর বাইরে থাকে৷ কলকাতার আরও কাছাকাছি সে বাসা বানিয়েছে৷ মাঝেমধ্যে সপ্তাহান্তে বাড়ী আসে৷ বললাম,"অফিসে যাতায়াত করতে নিশ্চয়ই কষ্ট হচ্ছে? যাচ্ছিস কীভাবে? ট্রেনে?"

"আবার কি?"

"ভিড় কেমন পাস?"

"সে কামরার ভিতরের খবর থোরাই রাখি৷ আমার কাজতো কামরায় পা রেখে কোনোভাবে দরজার পাশে লেগে থাকা৷ আমি সেই চারজন ভাগ্যবানদের একজন হতে চাই যারা চলন্ত ট্রেনের খোলা দরজার হাওয়ার সওয়ারী হতে পারে৷ ভিতরের বাকী দু'শ জন প্যাসেঞ্জারের খবর অতশত রাখিনা৷"

"বাস চলে না?"

"সময় বেশী লাগে৷ আর সেও তো ভিড়ে গাদাগাদি৷ তবে এতো আমাদের গা সওয়া হয়ে গেছে৷ এ নিয়ে ফালতু  টেনশন করে কি লাভ? জানিস তো, মানুষ এমন এক প্রজাতি .."

এর পিঠোপিঠিই সে এই লেখার শুরুর কথাগুলো বলেছিল৷

এই প্রসঙ্গে আমার এক ডাক্তার বন্ধুর কথা মনে পড়ল৷ সে আর্মিতে কর্মরত৷ চাকরির শুরুতেই তাকে সিয়াচীনে যেতে হয়েছিল৷ সেখানকার অভিজ্ঞতার কথা সে আমায় বলেছিল৷ কীভাবে সেখানে মাইনাস ৩৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় আমাদের সেনানীরা ছাউনি গেড়ে বসে আছে সে কথা শুনিয়েছিল৷ সিয়াচীনে থাকতে গেলে সেখানকার পরিবেশে মানিয়ে নেওয়ার জন্য প্রয়োজন এক ধরণের প্রশিক্ষণ৷ প্রায় দুমাস ধরে চলে এই ট্রেনিং৷ মনুষ্যপ্রজাতির পরিবেশের বুকে দাপট দেখানোর এমন মহড়ার উল্ল্যেখ করার লোভ সামলাতে পারলাম না৷

অলোককে সেই কথাই বললাম,'সিয়াচীনের ওই চরম ঠাণ্ডাতেও জোয়ানরা দিনের পর দিন প্রতিমুহূর্তে পরিবেশের সাথে লড়াই করে - তাদের পারিপার্শ্বিকতার সাথেও৷ সেখানে একজন ডাক্তারের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা৷ তাকে প্রতিটি জোয়ানের সাথে যোগাযোগ রাখতে হয়৷ খুব সাধারণ মাথাব্যথাও ওই ধরণের উচ্চতায় মারাত্মক হয়ে উঠতে পারে৷ কখনো কেউ মানসিক অবসাদে ভুগতে পারে৷ সেই সময় ডাক্তারের সিদ্ধান্তের উপরই নির্ভর করে তাকে সমতলে স্থানান্তরিত করা হবে কি, হবে না! অনেক সময় কমান্ডিং অফিসার খরচ বাঁচানোর তাগিদে এই সিদ্ধান্তে সহমত নাই পোষণ করতে পারে, তবুও ডাক্তারকে তার সিদ্ধান্তে দৃঢ় থাকতে হয়৷ তার সিদ্ধান্তের উপরেই একটি মানুষের বাঁচা-মরা নির্ভর করে৷'

অলোক আগ্রহের সাথেই আমার কথা শুনছিল৷  আমার ডাক্তার বন্ধুটির কাছ থেকে এ ব্যাপারে আরও যা শুনেছিলাম তাই বললাম, 'ওখানে মাসে অন্তত দুবার বিতর্কিত ভূখণ্ডে পেট্রোলিং হয়৷ ভারতের পাশাপাশি সে জমিতে চীন বা পাকিস্তানেরও দাবী৷

ভারতের দাবী বজায় রাখতেই এই চৌকিদারির প্রয়োজন৷ একটি পেট্রোলিং শাখাতে প্রায় ১১০ থেকে ১২০ জন লোক থাকে৷ এদের মধ্যে একজন ডাক্তারকেও থাকতে হয়৷ এরাই আবার ছোটো ছোটো ১০-১২ জনের দলে ভাগ হয়ে সেই বিস্তীর্ণ অঞ্চলকে পরিক্রমণ করে৷ প্রতি দলেই একজন নার্স থাকে৷'

'মহিলারাও পেট্রোলিং-এ থাকে?' অলোক বিস্ময় প্রকাশ করে৷

বললাম,'পুরুষ নার্স৷ পেট্রোলিং কথাটি শুনতে খুব নিরিমিষি লাগলেও, ব্যাপারটা মোটেই তা নয়৷ এর পরিণতি কখনো কখনো কোনও সেনা বা তাদের পরিবারের পক্ষে ভয়ঙ্কর হতে পারে৷ আসলে এ এক ধরণের লুকোচুরি খেলা৷ ভারতীয় দলকে ঐ মহল্লায় ঘুরে আসতে হবে, তবে চাইনিজ বা পাকিস্তানিদের চোখ এড়িয়ে৷ কাজ বলতে প্রায় ১০-১২ কিলোমিটার হেঁটে ভারতীয় পতাকা পুঁতে আসা৷ সেই সাথে ইন্ডিয়ান ব্রান্ডের ব্যবহৃত কিছু সামগ্রী ছড়িয়ে ছিটিয়ে আসা৷'

'কেন?'

'প্রমান, যে আমরা এখানে আছি৷ এই ধর টুথপেষ্টের টিউব, শাবানের বা শ্যাম্পুর প্যাকেট, এমন কিছু৷ যদি চাইনিজরা দেখে ফেলে, তবে ওরা চ্যঁচাতে থাকবে, 'Go back Indian! Go back!' তবে ওরা ভারী ভদ্র৷ ওই চ্যঁচাবেই, গুলিগোলা ছোড়েনা৷ কিন্তু পাকিস্তানি এলাকাতে সে গ্যারান্টি নেই৷  একবার আমার বন্ধুটি বিপদে পড়ে গেছিল৷ তারা টহল দিতে কখন মূল চীনা ভূখণ্ডের এক পাহাড়ে চড়ে বসেছিল, খেয়াল করেনি৷ খেয়াল হোলো যখন অন্য দলগুলি তাদের ওয়াকি-টকিতে জানালো যে চীনা সেনারা তাদের উপস্থিতি টের পেয়েছে, আর পাহাড়ের নীচে অপেক্ষা করছে৷ ধরা পড়লেই বন্দিত্ব বাঁধা৷ কোনোরকমে পাহাড়ের অন্য ঢাল দিয়ে তাদের নজর এড়িয়ে হামাগুড়ি দিয়ে নেমে তারা সে যাত্রা রেহাই পায়৷'

অলোক হালকা মন্তব্য করল,'এ তো চোর-পুলিশ খেলা দেখছি৷'

'খানিকটা তাই৷ তবে ছোটো ছেলেদের বিবেচনা এখানে খাটেনা৷ কখন বিরুদ্ধ পক্ষের গুলিতে যে প্রাণ যাবে, বা সারা জীবনের পঙ্গুত্বের ভাগীদার হতে হবে, কেউ বলতে পারেনা৷ তবু এ খেলা চলছেই, চলে যাবে৷ এক কল্পিত সীমারেখার দুধারে দুর্গম বসবাসের অযোগ্য চিরতুষারের ভূখণ্ডে বহু সেনা আর রসদের সমাবেশে এই লড়াই লড়াই খেলা৷ কতদিন ধরে এ চলবে ঈশ্বরই জানেন৷'

অলোক এক অদ্ভুত হাসি হেসে বলল,' সেটাই system৷ শুধু সিয়াচীনে কেন? 'তো সর্বত্রই৷ আমি, তুই, সবাই এই ব্যবস্থার অঙ্গ, খেলে যাচ্ছি৷ তোর জ্ঞাতেই হোক আর অজ্ঞাতেই হোক, একে এড়াতে পারবি না৷ তা'হলে তোকে একটা গল্প বলি শোন৷ এই  system-এর জাঁতাকলে কীভাবে লটকে আছি তার হিসেব পাবি৷'

এরপর অলোক যে গল্পটা বলেছিল, সেটা ওর কথাতেই বলা যাক৷

 

তুইতো জানিস মনীষার বাবা, মানে আমার শ্বশুরমশাই, শিক্ষকতা করতেন৷ বেশ ক'বছর হোলো তিনি রিটায়ার করেছেন৷ ওনাদের পৈতৃক ভিটে মুকুন্দপুরের কাছে একটা গ্রামে৷ সেখানে কিছু জমিজমাও আছে৷ এখন অবশ্য সেখানে কেউ থাকেন না৷ ওনার কাকাই বিষয় আশয় দেখতেন৷ তা তিনিও গত হয়েছেন বছর তিনেক৷ তারপর জমিজমা কিছু বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে৷ কিছু ভাগ চাষে দেওয়া হয়েছে৷ গত শীতের আগের শীতে শ্বশুরমশাই আমাকে বললেন, 'অলোক, ভাবছি গ্রামের বাড়ীতে বাবার স্মৃতিতে একটা মন্দির বানিয়ে দেব৷ আমাদের সাবেকী মন্দিরটার সংস্কার করব৷ তারই লাগোয়া বাবার সমাধি মন্দির বানিয়ে দেব৷'

বললাম,'ভালোইতো৷' এমনিতেই কাজ পাগলা মানুষ৷ রিটায়ার্মেন্টের পর এরকমই কিছু কাজ খুঁজছিলেন৷ সেই উপলক্ষেই বহুদিন পর ওঁরা সবাই গ্রামের বাড়ীতে গেলেন৷ আমিও গেলাম৷ বেশ কটা দিন সেবারে সেখানে ছিলাম৷ খুব আনন্দেই কাটল৷ গ্রামের মানুষও আমাদের কাছে পেয়ে দারুণ খুশী৷ তাদের গ্রাম্য সারল্যে আর আতিথেয়তাতে মুগ্ধ না হয়ে পারা যায় না৷ বারবার শুধু এ কথাই শুনতে হোলো, 'বাবুরা, আপনারা আমাদের এখানে এসেছেন, এটা আমাদের পরম সৌভাগ্য৷ আবার আসবেন৷' শ্বশুরমশাইকে অনুযোগের সুরে বলল, 'আপনার বাবা আমাদের মাথার উপরে ছিলেন৷ তার কথা আমরা সবাই মানতাম, শুনতাম৷ আজ তিনি নেই৷ কিন্তু আপনিতো আছেন৷ আপনিই এখন আমাদের অভিভাবক৷ আমাদের ভুলে গেলে কি করে চলবে?'

তাদের কথা শ্বশুরমশাই-এর মনে ধরল৷ গেলো শীতে আবার সবাই মিলে সেখানে গেলাম৷ এবার বাবার মৃত্যুবার্ষিকী পালনে শ্বশুরমশাই সেখানে 'সমাজ' দিলেন৷ 'সমাজ' মানে গ্রামের সবাইকে নিমন্ত্রণ করে খাওয়ানো৷ সে এক এলাহি ব্যাপার৷ ভোর-রাত থেকে পুকুরে জাল ফেলে মাছ ধরা, আরো কত যন্তরের আয়োজন৷ ক'দিন আবার খুব হৈ-চৈ করে কাটল৷

এ বছরের গোড়াতে শ্বশুরমশাই বললেন,'অলোক, গ্রামে গিয়ে মাঝেমধ্যে টানা থাকব ভাবছি৷ তাই বাড়ীটাকে ঠিক করে নিতে চাই৷ ওখানকার পুরানো টালির চাল আর কড়ি-বরগার কাঠামো ভেঙ্গে ফেলে নতুন ঘরদোর বানাবো ভাবছি৷'

সেই মতোই চলছিল৷ উনি আর আমার শাশুড়ি-মা গ্রামে চলে গেলেন৷ বাড়ীর লাগোয়া উঠানে এক অস্থায়ী ছাউনিতে স্বামী-স্ত্রী থাকার ব্যবস্থা করে নিলেন৷ সেই সাথে গৃহনির্মাণে রাজমিস্ত্রিদের তদারকিও চলতে থাকল৷ শ্বশুরমশাই মাঝে মাঝে আমাকে ফোনে অনুযোগ করেন,'তোমরা একবারও কেউ এলে না৷ দেখে যাও না একবার, এখানকার  কর্মকাণ্ড৷'

গত শনিবার সন্ধ্যাবেলা৷ উনি বাড়ীতে আছেন৷ এমন সময় দেখলেন, কিছু লোক দৌড়োদৌড়ি করছে, আর উত্তেজিত ভাবে কীসব বলছে৷ উনি বাড়ীর বাইরে বার হলেন৷ জিজ্ঞাসা করলেন, 'কি হয়েছে রে?'

তারা বলল,'বাবু, নস্কর পাড়ায় চোর ধরা পড়েছে৷ আমরা সেখানেই যাচ্ছি৷'

ব্যস এইটুকুই৷ এর বেশী কিছু জানার বা বোঝার ইচ্ছে ওনার হয়নি৷ আবার বাড়ীর ভিতরেই চলে গেলেন৷ এর মধ্যে গ্রামের মানুষজনে চোরকে উত্তম-মধ্যম কিছু দিয়েছে৷ পুলিশও এসে চোরকে ধরে নিয়ে গেছে৷ উনি জানলেন পরদিন সকালবেলা, যখন থানার বড়বাবু গ্রামে এসে এনকোয়ারী করে গেলেন৷ সেই সাথে একটা রিপোর্টও তৈরি করলেন৷ গ্রামের লোকজন এসে শ্বশুরমশাই-কে একবার রিপোর্টটা দেখে নিতে বলল৷ উনি সেটি দেখে বললেন, 'ঘটনার তারিখের উল্লেখ দেখছিনা৷ সেটি লেখা উচিত৷' সেইমতোই রিপোর্ট সংশোধিত হোলো৷ সেখানেই ব্যপারটা চুকে বুকে গেলো৷ অন্ততঃ সেরকমই মনে হয়েছিল৷

পরদিন সোমবার৷ তাঁর এক ভাইপো সেখানে গেছেন৷ তিনি হোমিওপ্যাথ ডাক্তার৷ মুকুন্দপুরেই চেম্বার৷ বাড়ী অবশ্য আমাদের এই শহরে৷ তিনি পৈতৃক ভিটের সংস্কারের তদারকিতে মাঝে মধ্যে কাকার সাথ দেন৷দুপুরে তাঁরা খেতে বসেছেন৷ এমন সময় তিনি ফোন পেলেন,'ডাক্তারবাবু আপনি কোথায়?'

জবাব দিলেন,'গ্রামে৷ কাকার কাছে৷ সন্ধ্যায় চেম্বার করে বাড়ী ফিরব৷'

'আজ আর বাড়ী ফিরতে যাবেন না৷ মুকুন্দপুরে দারুণ গণ্ডগোল বেধেছে৷ ট্রেকার-বাস কিছুই চলছে না৷ পাবলিক থানা ঘেরাও করে রেখেছে৷ যে চোরটাকে আপনাদের গেরামের লোক পিটিয়েছেল, সে আজ মারা গেছে৷'

উনি তাই সেখানে রয়ে গেলেন৷ সন্ধ্যার দিকে কয়েকজন শ্বশুরমশাই-এর কাছে এসে বলল,' বাবু আপনারা বরং এখান থেকে সরে যান৷ এখানে থাকবেন না৷ পুলিশ আসছে৷'

শ্বশুরমশাই অবাক হয়ে বললেন,'পুলিশ আসছে তো আমার কি? আমি চুরিও করিনি, ডাকাতিও করিনি৷ কোনো মারামারিতেও থাকিনি৷ পুলিশ পুলিশের কাজ করবে, আমি আমার কাজ করব৷'

তারা তাই শুনে সেখান থেকে কেটে পড়ল৷ শুধু তারাই নয়, আসলে গোটা গ্রামের ব্যাটাছেলেরা গ্রাম ছেড়ে অন্যত্র সরে গিয়েছে৷ পুলিশ এলো সন্ধ্যার পর পর৷ বেশ কয়েকটা গাড়ীতে ব্যাটালিয়ন সমেত হাজির S.D.P.O., আর থানার বড়বাবু৷ শ্বশুরমশাই-এর বাড়ীর সামনে তারা হাজির হতেই, তিনি ও তার ভাইপো বার হলেন৷

S.D.P.O.  সাহেব জিজ্ঞাসা করলেন, 'আপনারা?'

উনি নিজের পরিচয় দিলেন৷ ডাক্তারবাবুও তাই৷

সাহেব বললেন,'একবার আমাদের সাথে আসুন৷'

উনি বললেন, 'কি ব্যাপার৷'

'আসুনই না, একটু কথা আছে আপনাদের সাথে৷'

ভাইপো একটু ইতস্তত করে বললেন,'শুধু গেঞ্জি পড়ে আছি -'

'তাহলে একটা জামা বা পাঞ্জাবি গলিয়ে নিন৷'

যেতে যেতে শ্বশুরমশাই বড়বাবুকে জিজ্ঞাসা করলেন,'কোথায় যাচ্ছি বলুন তো?'

'চলুনই না৷ দেখতে পাবেন৷'

পুলিশের গাড়ীতে ওদের উঠিয়ে নেওয়া হলো৷

 

রাত ন'টা নাগাদ ওরা যখন ফিরলেন না, তখন শাশুড়িমা আমাকে ফোন করলেন৷ এর আগেও অবশ্য উনি ফোনে পুলিশ যে ওদের কথাবার্তা বলার জন্য ডেকে নিয়ে গেছে, তা জানিয়েছিলেন৷ কিন্তু ঘরে না ফেরাতে তিনি ভীষণ ভাবে ঘাবড়ে গেছেন৷ দুশ্চিন্তায় ঘরবার করছেন৷ আমাদের অবস্থাও তথৈবচ৷ গ্রামে কারোর সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না৷ সবারই ফোন বন্ধ৷ চেনাজানা সব গ্রাম ছাড়া৷ শেষ পর্যন্ত সাদিকের মেজদার শরণাপন্ন হলাম৷ সাদিককে মনে আছে৷ আমাদের সাথে স্কুলে পড়েছে৷ ওরা তো মুকুন্দপুরের জমিদার ছিল৷ বাজারঘাট মন্দির মসজিদ সবই ওর ঠাকুরদার বানানো৷ এখনো ওখানে ওদের প্রতিপত্তি কম নয়৷ জমিজমাও প্রচুর আর বড় ব্যবসাও আছে৷ সাদিকতো এখন কোলকাতায়৷ ডাক্তার৷ ওর কাছ থেকে ওর মেজদার ফোন নম্বর জোগাড় করলাম৷ ওর মেজদা প্রায় আমাদেরই সমবয়সী৷ বড়জোড় বছরদুয়েকের বড়৷ আমার সাথে ভালোই চেনাজানা ছিল৷

সে আমায় জানাল,'ওদের দুজনকেই পুলিশ অ্যারেষ্ট করেছে৷ থানাতেই আছে৷ ৩০৪-এ মার্ডার চার্জ দিয়েছে৷'

আঁতকে উঠলাম,'সে কি? এমন মিথ্যে কেসে ফাঁসিয়ে দিল? Please, কিছু একটা কর৷'

'কিছু করার নেই ভাই৷ এখানে লোক ভীষণ খেপে আছে৷ ভয়ানক গণ্ডগোল বেধে যেতে পারে৷ আমার বড়দা ওখানে সামলানোর চেষ্টা করছে৷ কিন্তু তাকেও থানায় ঢুকতে দিচ্ছেনা৷ পুলিশকে একটা কিছু করে দেখাতেই হবে৷'

সাদিকের বড়দার মতো প্রভাবশালী লোকের এই অবস্থা শুনে বুঝলাম গণ্ডগোল চুড়ান্ত৷ সেই রাতেই ওদের দুজনকে কাকদ্বীপ থানাতে চালান করে দেওয়া হল৷ মুকুন্দপুরের মারমুখী জনতার হাত থেকে আসামীদের রক্ষার্থেই এই ব্যবস্থা৷ পরদিনই কাকদ্বীপ কোর্টে ওদের হাজির করা হোলো৷ কিন্তু জামিন মিলল না৷ ৩০৪-এ মেলার কথাও নয়৷

 

কাকদ্বীপ কোর্টে গিয়ে আমার নতুন অভিজ্ঞতা হোলো৷ এর আগে কোর্ট-কাছারি উকিল মুহুরি হাকিম এসব সম্পর্কে আমার বিন্দুমাত্র ধারণা ছিল না৷ জামিন পাওয়ার ফ্যাঁচাকলের প্যাঁচ যে কতটা জড়ানো  তা বুঝিনি৷ ঘটনার শিকড় অনুসন্ধানে যা খবর পেলাম সেও রীতিমতো চমকপ্রদ৷ বুঝলাম আমার শ্বশুরমশাই আর তাঁর ভাইপো আদতে দাবার বোড়ে হয়ে গেছেন৷ মুকুন্দপুরের ধনী ব্যবসায়ীদের মধ্যে অনেকদিন ধরেই থানার মেজবাবুর উপর রাগ পোষা ছিল৷ ভদ্রলোক একটু করিতকর্মা সোজাসাপ্টা অফিসার৷ সে কারণেই তিনি এমন কিছু  পদক্ষেপ নিয়েছিলেন যা এদের স্বার্থে ঘা দিয়ছিলো৷ তাই তাকে ওখান থেকে কীভাবে হটানো যায় তারই ফন্দি ফিকিরের সন্ধানে এরা ছিল৷ কদিন আগেই মেজবাবুকে এরা একটা রেপ কেসে জড়িয়ে দিয়েছে৷ এবার এই চোরটা মরে যেতেই ওরা আরো আরো একটা মওকা পেয়ে গেলো৷ সে মুসলমান বলে, পুরো ঘটনাটিতে সাম্প্রদায়িকতার রং চড়িয়ে দিল৷ এলাকার মুসলমান মানুষদের নিয়ে এককাট্টা হয়ে থানা ঘেরাও করল৷ দাঙ্গার পরিস্থিতি তৈরি হয়ে গেলো৷ রটিয়ে দিল, 'হিন্দু গ্রামবাসীদের সাথে ষড়যন্ত্র করে থানার মেজবাবু এক মুসলিম যুবককে পিটিয়ে মেরে ফেলেছে৷' লক্ষ্য কর, মেজবাবু কিন্তু ঘটনার ধারে কাছে ছিল না৷ তদন্তই বল,  অ্যারেষ্টই  বল - যা করেছে সবই থানার বড়বাবু৷ তবু মেজবাবুই সেই ব্রাকেটে ঝুলে রইল৷ প্রশাসনের উপরমহল ব্যস্ত হয়ে পড়ল৷ নয়া জমানায় এখন 'মুসলমান' সম্পর্ক যুক্ত কিছু বিক্ষোভ চারা দিলেই আগে তাকে যে করে হোক শান্ত করতে হবে৷ বাম জমানায় হয়তো ব্যপারটা এতদূর পর্যন্ত গড়াতো না৷ মেজবাবু আগেই সরে যেতেন পার্টি অফিসের নির্দেশে৷ কিন্তু পরিবর্তনের পালে এখনো হাওয়ারা এলোমেলো৷ কীভাবে যে এ কাজটা হাসিল করা যাবে তা এলাকার গণ্যমান্যরা বুঝে উঠতে পারেননি৷ আর তাতেই এত বিপত্তি৷ অবস্থা সামাল দিতে পুলিশ এখন রোজই গ্রামে ঢুকে যাকে হোক একটা ধরে আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে৷ কিন্তু পাবে কাকে? সব এলাকা ছেড়ে পালিয়েছে, লুকিয়ে বেড়াচ্ছে৷ কাউকে দিয়ে যে শাশুড়ি-মাকে নিয়ে আসব, তারও উপায় দেখছিলাম না৷ শেষ পর্যন্ত সাদিকের মেজদাই তাঁকে আমার এখানে পৌঁছে দিলেন৷

কাকদ্বীপ কোর্টে আমার এক পরিচিত লইয়ার আমাকে বলল,'দেখো অলোকদা তোমাকে একটা সত্যি কথা বলি৷ তোমার শ্বশুরমশাই-এর জামিন-এর জন্য যতোই বড় বড় উকিল ধর না কেন, জামিন হবে না৷ পয়সার পর পয়সা ঢেলে যাবে, কিন্তু জামিন দেখতে পাবে না৷ মামলা এখন জজকোর্টে৷ ওখানে তোমাকে জামিন চাইতে হবে৷ তুমি বরং এক কাজ কর৷ সেখানকার পি.পি.দের নেতাকে ধর৷ তিনিও পি.পি., তৃণমূল করেন৷ তিনি তাদের ইনচার্জকে বলে দিলে জামিনের বিরোধিতা করবে না৷ তবেই জামিন হোতে পারে, নইলে নয়৷ তুমি তোমাদের লোকাল  M.P. বা M.L.A.-র চিঠি নিয়ে ওই নেতাকে ধর৷'

তার কথা আমার মনে ধরল৷ বুঝলাম এ লোকটি System-কে ঠিকঠাক বুঝেছে৷ এমন অদ্ভুতুড়ে পরিস্থিতি থেকে রেহাই পাওয়ার এটাই সিধে রাস্তা৷ বাকী সব টেঁড়া৷'

 

গেলাম লোকাল M.L.A-র কাছে৷ ওনার একটা জনসংযোগ অফিস আছে আমাদের শহরে৷ সেখানেই দেখা করলাম৷ ভদ্রলোক দেখতে সাধারণ৷ কিন্তু সাধারণ বুদ্ধি ভালোই ধরেন৷ এই সিস্টেম বোঝেন৷ আদতে সোজা-সাপ্টা ভালোমানুষ৷ শ্বশুরমশাই-এর ভাইপো গত নির্বাচনে ওনার পোলিং এজেন্ট ছিলেন৷ সেটা কাজে দিল৷ বললাম, 'দাদা৷ বাঁচান৷ আপনি আলিপুরে পি.পি.দের মাঝে আপনাদের যে নেতা আছেন, তাকে একটু বলে দিন যাতে এঁরা জামিন পান৷ এরা স্পষ্টতই নিরাপরাধ৷ শুধু শুধু জেল হাজতে পচে মরছেন৷'

তিনি বললেন,'ঠিক আছে৷ আপনি দুটো Application লিখুন৷ একটা পি.পি.দের সরকারী ইনচার্জকে৷ অন্যটা আমাদের ওখানকার নেতাকে৷ আমি সেই কাগজে সুপারিশ লিখে দিচ্ছি৷ আপনি ওনার কাছে যান৷'

অনুরোধ করলাম,'একটু ফোনও করে দেবেন?'

উনি তাই করলেন৷ সেইমতো বুধবার গেলাম আলিপুরে জজকোর্টে৷ দেখা করলাম সেই নেতার সাথে, যিনি বকলমে পি.পি.দের ইনচার্জ৷ উনি কাগজপত্র দেখলেন৷ তারপর ৬৫০ টাকা নিলেন৷ বললেন,'আমরা কোর্টে কেস'টা তুলব৷'

তার কথায় ভরসা পেলাম৷ মনে হোলো একটা রাস্তা পাওয়া গেল৷ দুর্ভাগ্য এই যে গরমের কারণে আদালতে  Cease work চালু হয়ে গেল৷ আগে কথা ছিলো ওটা সোমবার থেকে হবে৷ বৃহস্পতিবার রাতেও আমার সাথে সেই নেতার কথা হয়৷ উনি শুক্রবারই কোর্টে আসতে বলেন৷ পৌঁছে দেখি কোর্ট বন্ধ৷ নেতা পি.পি.র কাছে গেলাম৷ তিনি বললেন,'Cease work শুরু হয়ে গেছে৷ তবে আজ যে কেসগুলি ওঠার কথা ছিল, তাতে আপনাদেরটাও ছিল৷ এর Hearing আবার ৩১শে মে হবে৷ সেদিন আবার কোর্টে আসুন৷'

বুঝতেই পারছিস তখন আমাদের অবস্থা৷ শুধু হতাশ হয়েছি বললে, কম বলা হবে৷ দমে গেলাম৷ দুহপ্তা পিছিয়ে গেলো পুরো ব্যপারটা৷ তবু  একটু আশা ভরসার কথা শোনার আশায় জিজ্ঞাসা করলাম,'দাদা ওদিন জামিন মিলবে তো?'

উনি হাসলেন,'দেখুন ওদিন তো কোর্ট C.D. (Case Diary) চেয়ে পাঠাবে, তারপর আবার Date দেবে৷'

'তারপর?'

'তারপর?', ভদ্রলোক যেন নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করলেন৷ তারপর, মাথা নেড়ে বললেন,'দেখুন ৩০৪ ধারার জামিন পি.পি. বিরোধিতা না করলেই যদি মেলে, এর পরে জেনুইন কেসগুলোর আসামীরাও তো পার পেয়ে যাবে৷ দেখুন জজসাহেব কি বলেন?'

ব্যস জলের মতো পরিষ্কার! বুঝতে কোনো অসুবিধে হোলো না৷  এটাই  System৷ একজন নিরপরাধ ব্যক্তির হাজতবাস দীর্ঘায়ত হোলো কি হোলো না, সেটি কোর্টের কাছে ততটা জরুরী নয়৷ বরং বিবেচ্য আদালতের কর্মোপযোগী তাপমাত্রার মাত্রা নির্ধারণ৷ যা গরম পড়েছে, তাতে জজসাহেব আর উকিলবাবুরা আর একদিনও অপেক্ষা করতে রাজী নন৷ যত শীঘ্র Cease work চালু হয়ে যাবে৷ তেমনি পুলিশ বা প্রশাসনের উপরমহল থেকে থানার বড়বাবু সবাই নিজেদের পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত৷ তাতে কোনো নিরীহ বেচারা যদি ফেঁসে যায়, তাতে আর কিই বা করার থাকে? এ ঠিক কি বেঠিক, তক্ষুনি তক্ষুনি কে ঠিক করবে? ফয়সালা করার দায়'তো  তাদের নয়৷ আইন আছে, আদালত আছে, তারা না হয় বিচার করে দেবে৷ ভুল-চুক তো মানুষের হোতেই পারে?  কেবল সমস্ত দায় যত সে বেচারার৷ বিচার বিবেচনার এই গোলোকধাঁধায় তাকে অপরাধের গুরুদণ্ড  মাথায় নিয়ে চলতে হবে৷ এক্ষেত্রে এটাই নিয়ম৷

 

অলোককে দেখে বুঝতে পারিনি যে এ কদিন ওর উপর দিয়ে এত ঝড় বয়ে গেছে৷ এমনকি ও যখন ঘটনাটার বর্ণনা দিচ্ছিল, প্রথমে মনে হয়েছিল বেশ কিছুদিন আগের কথা বলছে৷ এক অদ্ভুত শান্ত নিঃস্পৃহ স্বরে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল৷ তাই একটু অবাক হয়েই বললাম, 'এই ক'দিনেই এসব ঘটে গেছে বলছিস৷'

মুচকি হেসে বলল,'সেরকমি৷ আজ শনিবার৷ গত শনিবারে চোর ধরা পড়ে৷ পুলিশের বড়বাবু রবিবার এসে রিপোর্ট লেখে৷ সোমবার সন্ধ্যেতে শ্বশুরমশাই আর তাঁর ভাইপোকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায়৷ তারপর এ ক'দিন হুশ করে কীভাবে কেটে গেছে টের পাইনি৷ কালই আলিপুরে গিয়েছিলাম৷ কাজ যে হয়নি আগেই বলেছি৷'

এর মধ্যে ও একটা ফোন পেল৷ জানল যে ৩১শে মেতেই শুনানি পড়েছে৷

জিজ্ঞাসা করলাম,'তোর শ্বশুরমশাই এখন কোথায় আছেন?'

'আমাদের এখানেই৷ জেলখানাতে৷ পুলিশ ওদের আর Custody-তে নেয়নি৷'

'কেমন ব্যবস্থা?'

'যেমন হওয়ার কথা৷ একটা ১৫' বাই ১৫' ঘরে ৫৬জন লোককে পুরে দিয়েছে৷'

'খাট আছে?'

'বসার জায়গাই নেই তো খাট ঢুকবে কি করে? ঠিকমতো মেঝেতেই শুতে পারেনা৷ বললামনা ঐটুকু ঘরে ৫৬জনের গাদাগাদি৷ কিভাবে নাচ্ছে, খাচ্ছে, শুচ্ছে - সে জিজ্ঞাসা করে ওঁদেরকে বিব্রত করার সাহস আমার হয়নি৷ তবে জেলার মানুষটি সদাশয়৷ উনি বলে দিয়েছেন,'আপনাদের যখন ওনাদের সাথে দেখা করার ইচ্ছে হবে, আসবেন৷ দেখা করিয়ে দেব৷' আমিও জেলের অন্যান্য কয়েদীদের অনুরোধ করেছি, যাতে তারা ওঁদের সাথে ভালো ব্যবহার করে৷

শ্বশুরমশাইও বললেন,'এখানে না এলে এ জগৎটা সম্পূর্ণ অজানা থেকে যেত৷ কোনো ধারণাই ছিলনা৷ বিশ্বাস করো, এদের মধ্যে ৭০% লোকই নিরপরাধ৷ শুধু শুধু এখানে আছে৷ এদের একজনের জামিনও হয়ে গেছে৷ মাত্র ২০০ টাকা৷ কিন্তু কে সে টাকা দেবে? তাই বেচারার জামিনদার মেলেনি৷ বাড়িতে কেবল বউ আর দুটো বাচ্চা আছে৷ তাদেরকে জামিনের খবর পর্যন্ত পৌঁছতে পারেনি৷ আমি এসে ওদের খবর পাঠানোর ব্যবস্থা করলাম৷ হয়তো এবার ছাড়া পাবে৷ একদিন জেলের অন্য কামরা থেকে এই কয়েদীদের মাতব্বর গোছের একজন এসে প্রণাম করে গেল৷ বলল,'মাস্টারমশাই, কোনো অসুবিধে হলে বলবেন৷ আমি একজন লাইফার৷ এখনো দুটো খুনের মামলায় ফেঁসে আছি৷ আপনার বাবাকে আমি চিনতাম৷ দারুণ মানুষ ছিলেন৷ আপনার ভয়ের কিছু নেই৷ আমি এদের বলে দিয়েছি আপনাকে যেন ঝামেলা না করে৷' এদের নিয়ে আমার ভালোই দিন কাটছে৷ তোমরা চিন্তা কোরো না৷'

আমি আমার শ্বশুরমশাইকে বললাম,'বাবা! এটাই আসল ছবি৷ এই জেলখানার বেশীরভাগ কয়েদীই আপনার মতই নির্দোষ৷ আমি  একটুও অবাক হয়নি৷ এ ক'দিনে আমাদের আইন-আদালতের এই নির্যাসটুকু হজম হয়ে গেছে৷ আমি আপনি এসব থেকে অনেক দূরে৷ এগুলো আসলে এসব সমাজের নিম্নবর্গের মানুষদের জন্য৷ তাদেরকে ভীত সন্ত্রস্ত করে রাখার যন্তর৷ ঘটনাচক্রে আপনি এখানে ঢুকে পড়েছেন৷ আপনি ভুল সময়ে ভুল জায়গায় হাজির ছিলেন৷ সুযোগ পেলেই  খ্যাপলা জাল দিয়ে মাছ ধরতে বাবুরা বেড়িয়ে পরে৷ আপনি সেই ঝাঁকে ধরা পড়ে গেছেন৷'

 

অলোক এসব কথা বলে কিছুক্ষণ চুপ থাকল৷ তারপর আমাকে জিজ্ঞাসা করল,'এই System-এ টিকে থাকতে গেলে কি চাই বল তো?'

ওই উত্তর দিল,'ধৈর্য্য! তোকে ধৈর্য্যের পরীক্ষা দিয়ে যেতে হবে৷ যেমন নাটকের মহড়া চলবে তেমনি তোকে সাথ দিতে হবে৷ বুঝে নিতে হবে সেখানে তোর ভূমিকা কি? চাটুকারের? মস্তানের? ভিলেনের? আসামীর? না নির্ভেজাল ভদ্রলোকের? এই System যা চাইছে সেই সঙ তোকে সাজতে হবে৷ বেচাল হয়েছিস কি গেছিস? দুঃখ এটাই এ ক'দিনের সেই পরীক্ষায় আমি ডাহা ফেল? যাকে তাকে কি না কি বলেছি আমার নিজেরই খেয়াল নেই৷ মাথা গরম করে ফেলেছি যেখানে সেখানে৷  এখনো পর্যন্ত তারা সহ্য করেছে৷ কিন্তু আমি এখন অনেক সাবধানী৷ ব্যপারটা হজম হয়েছে৷ সামনের মহড়ার দিনগুলির জন্য তৈরি হচ্ছি৷'

 


0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home