Thursday, 28 May 2026

বিপরীত সাম্প্রদায়িকতা

   

মৌলবাদ ও সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে আমাদের এই আলোচনায়  আমরা অন্য আর এক প্রকার  সাম্প্রদায়িকতার বহিঃপ্রকাশ  নিয়ে  কথা বলব। এই সাম্প্রদায়িকতার  বহিঃপ্রকাশ  সরাসরি কোনো  ধর্মীয় বিশ্বাস বা অনুভূতিকে কেন্দ্র করে হয় নাবরং  বিভিন্ন কারণে ও উদ্দেশ্যে ধর্মীয় বিশ্বাসের সাথে যুক্ত না থেকেও কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলকে কোনো একটি ধর্মের সাম্প্রদায়িক রাজনীতি ও দলগুলির  প্রতি সহানুভূতি ও সহমর্মিতা পোষণ  ও সমর্থন করতে  দেখা যায় তাই এটিকে  এক প্রকার বিপরীত সাম্প্রদায়িকতা’ (Reverse communalism) বলা যেতে পারে। এর সাথে রাজনৈতিক সুবিধাবাদও জড়িয়ে থাকে, যেটা আদতে ছদ্ম ধর্মনিরপেক্ষতার নামান্তর।  বিশেষ করে আমাদের দেশে  বামপন্থী বুদ্ধিজীবী ও ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলির মধ্যে ইসলামী মৌলবাদী সংগঠনগুলির প্রতি এই ধরণের সহনশীলতা ও আপোষ লক্ষ্য করা যায়।[1] আমরা দেখেছি ইসলামী মৌলবাদের সাথে ইসলামী রাষ্ট্রবাদ কতটা সম্পৃক্ত, সেখানে জাতিসত্বার বিকাশ বা জাতীয়তাবাদী আকাঙ্ক্ষা যখন মেশে তখন জটিলতা বাড়ে। আর ইসলামী সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক  সংগঠনগুলিও সুচতুর ভাবে সেটির ব্যবহার করে এসেছে। ১৯৪০ সালে মুসলিম লীগ যখন পাকিস্তানের দাবী সামনে আনে, তখন তাদের এই দাবী ও সংগ্রামকে বৃটিশ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী মনে করে  তদানীন্তন ভারতীয় কম্যুনিস্ট পার্টি (Communist Party of India (CPI)) তাদের এই দাবীকে  সমর্থন জানায় ও বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে  কংগ্রেসের সাথ ছেড়ে মুসলিম লীগের ভিতরে তাদের দলীয় কর্মীদের কাজের নির্দেশ দেয়। পরবর্তীকালে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় মুসলিম লীগের ভূমিকা প্রত্যক্ষ করে তারা নিজেদের সংশোধন করে।[2]

 

এই মনোভাব আমরা বর্তমান প্যালেস্টাইনে ইজরায়েল রাষ্ট্র ও হামাসের দ্বন্দ্বে প্রতিফলিত। হামাস একটি ইসলামী মৌলবাদী রাজনৈতিক সংগঠন হওয়া সত্বেও তাদের মত ও পথের প্রতি নির্বিচার সহমর্মিতা পোষণ ও সমর্থনের ঢেউ আমরা বিশ্ব জুড়েই দেখতে পাই। এমনকি ২০২৩এর ৭ই অক্টোবর তারা যেভাবে নিরীহ ইসরায়েলি নাগরিকদের একটি জলসাতে হামলা করে তাদের হত্যা করেছে, ও পণবন্দি বানিয়ে রেখেছে, তার আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদটুকুও  আমরা সেভাবে দেখি নি। এ  বিষয়ে তাদের নৈতিক টানা পোড়েনের একটি চিত্র আমরা দেখি প্যালেস্টাইনে  ইজরায়েল রাষ্ট্রের হামাসের হামলার প্রতিক্রিয়ায় গাজাতে যে অমানবিক ধ্বংসলীলা চালাচ্ছে তার  বিরুদ্ধে প্রখ্যাত লেখিকা অরুন্ধতী রায়ের মন্তব্যে[3]

 

আমি স্পষ্টতই  জানি যে আমি একজন লেখিকা, আমি একজন অমুসলিম এবং আমি একজন নারী হামাস, হিজবুল্লাহ্‌  বা ইরানি শাসনের অধীনে দীর্ঘকাল বেঁচে থাকা আমার জন্য খুব কঠিন, সম্ভবত অসম্ভব। কিন্তু এখানে মূল কথাটি তা নয়। মূল কথা হল ইতিহাস এবং পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজেদেরকে শিক্ষিত করা যে তারা কোন পরিস্থিতিতে অস্তিত্বে এসেছিল। মূল কথা হল এই মুহূর্তে তারা একটি চলমান গণহত্যার বিরুদ্ধে লড়াই করছে। মূল কথা হল নিজেদেরকে জিজ্ঞাসা করা যে একটি উদার, ধর্মনিরপেক্ষ সৈনিকদের  বাহিনী কি এই ধরণের  গণহত্যাকারী  রণোন্মত্ত রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে যেতে পারে? কারণ, যখন বিশ্বের সমস্ত শক্তি তাদের বিরুদ্ধে, তখন তাদের ঈশ্বর ছাড়া আর কে আছে? আমি জানি যে হিজবুল্লাহ্‌  এবং ইরানি শাসকদের  স্ব-স্ব দেশেই সোচ্চার বিরোধীরা রয়েছে, যারা কেউ কেউ কারাগারেও বন্দী অথবা আরও খারাপ পরিণতির মুখোমুখি। আমি জানি যে তাদের কিছু কর্মকাণ্ড - বেসামরিক নাগরিকদের হত্যা এবং ৭ অক্টোবর হামাস কর্তৃক জিম্মি করা - যুদ্ধাপরাধের সামিল। তবে, গাজা, পশ্চিম তীর এবং এখন লেবাননে ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যা করছে,  তার সাথে এর কোন তুলনা হতে পারে না। ৭ অক্টোবরের সহিংসতা সহ সমস্ত সহিংসতার মূলে রয়েছে ইসরায়েলের ফিলিস্তিনি ভূমি দখল এবং ফিলিস্তিনি জনগণের উপর তাদের অধীনতা। ইতিহাস ৭ অক্টোবর, ২০২৩ তারিখে শুরু হয়নি।”

 

স্বাধীন ভারতেও ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ দলগুলি হিন্দুত্বের বিরুদ্ধে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করা সত্বেও সময়ে সময়ে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন RSS ও তার  রাজনৈতিক দলের সাথে জোট বেধেছে। বর্তমানেও যখন কেন্দ্রে আগ্রাসী হিন্দুত্ববাদী দলের শাসন  স্বৈরাচারের রূপ  নিয়েছে,  এমন অনেক দলের  সমর্থনে ও সক্রিয় সহযোগিতায় BJP কেন্দ্রে  একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না থাকা সত্বেও তাদের কার্য্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যাদের অনেকেই এক সময় তাদের রাজনীতির বিপরীত মেরুতে অবস্থান করেছে। একই ভাবে ভোটের ও জোটের রাজনীতিতে  ইসলামী মৌলবাদের প্রতিও  বাম-কংগ্রেস সহ বিভিন্ন ধর্ম নিরপেক্ষ দলগুলি প্রশ্রয় দিয়ে গেছে। সময়ে সময়ে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে  ও সাম্প্রদায়িক সদ্ভাবনা বজায়ের নামে  আপোষও করেছে।[4]

 

এই প্রসঙ্গে ভারতবর্ষের বামপন্থী বুদ্ধিজীবীদের বিশেষত ধর্মনিরপেক্ষ ইতিহাসবিদদের (এদেরকে আমরা এই আলোচনায় এক কথায় প্রগতিশীল বলেও  উল্ল্যেখ করব।)  হিন্দুত্ব ও ইসলামী মৌলবাদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির বিচার করতে প্রয়াত প্রখ্যাত সমাজতত্ববিদ ধর্মা কুমারের (১৯২৮-২০০১)  বিশ্লেষণ প্রণিধানযোগ্য।[5] তার মতে আধুনিক ভারতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বৈশিষ্ট্য  সম্পর্কে  এই সমস্ত ইতিহাসবিদদের  কতকগুলি ধারণা বা সিদ্ধান্ত  পক্ষপাতদুষ্ট, যেগুলির পক্ষে ইতিহাসের সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাব আছে। বরং সেগুলির বিরুদ্ধে বস্তুগত প্রমাণের সন্ধান মেলার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু এই সমস্ত ইতিহাসবিদরা সেই সত্যকে এড়িয়ে চলতে চান, আর তাই ভারতীয় মধ্যযুগের সমাজ নিয়ে সেই মত গবেষণার উদ্যোগ দেখা যায় না। তার সংকলিত এইধরণের পক্ষপাতদুষ্ট  ধারণা ও সিদ্ধান্তগুলির একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা বরং আমরা দেখে নিই।

 

(১)  ব্রিটিশ শাসনের আগে মধ্যযুগীয় সমাজে হিন্দু ও মুসলমানরা সম্প্রীতির সাথে বসবাস করত। কিন্তু ঔপনিবেশিক শাসনের পক্ষের  পশ্চিমা ইতিহাসবিদরা ও তাদের দ্বারা প্রভাবিত স্বদেশী ইতিহাসবিদরাও মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজে  হিন্দু-মুসলমানের সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনের মিথ্যা ছবি এঁকেছেন। বর্তমান ভারতের হিন্দুত্ববাদীরা ও সেই ভাবধারার ঐতিহাসিকেরা  সেটিকে সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে  ব্যবহার করছে।  

 

(২)  আধুনিক সাম্প্রদায়িকতার বীজ ঔপনিবেশিক যুগে নিহিত ছিল। প্রকৃতপক্ষে, ঔপনিবেশিক শাসকরা ইচ্ছাকৃতভাবে এগুলো রোপণ করেছিলেন  এবং  সাম্প্রদায়িকতা আদতে একটি ঔপনিবেশিক "নির্মাণ"।

 

(৩) ঔপনিবেশিক যুগ হিন্দু-মুসলিম সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক বিরাট পরিবর্তন এনে দিয়েছে, কেননা প্রথমবারের মতো, কিছু এলাকায় এবং নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে হিন্দু-মুসলিম দ্বন্দ্বের লক্ষণ দেখা দেয়। বিভিন্ন কারণে এটির প্রকাশ ঘটেছে, যথা পশ্চিমা ধাঁচের প্রতিষ্ঠানের প্রবর্তন,  বাংলা, পাঞ্জাব এবং মহারাষ্ট্রে শক্তিশালী সামাজিক-ধর্মীয় সংস্কার আন্দোলন গড়ে ওঠা, আবার তার প্রতিক্রিয়ায়  ধর্মীয়-রক্ষণশীলতার পুনরুত্থান, প্রভৃতি।

 

(৪) আজ ভারতের মুখোমুখি সবচেয়ে বড় বিপদ হল হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা। এই কারণেই প্রয়োজন হিন্দুদের ধর্মনিরপেক্ষ হওয়া এবং এর মাধ্যমে সংখ্যালঘুদের ধর্মনিরপেক্ষ হতে সাহায্য করা। কারণ সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়ই কেবল নিরাপত্তার অনুভূতি প্রদান করতে পারে। এও মনে করা হয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ সাম্প্রদায়িকতা (অর্থাৎ ভারতে হিন্দু সাম্প্রদায়িকতা) অনিবার্যভাবে ফ্যাসিবাদের দিকে পরিচালিত হয়, অন্যদিকে  সংখ্যালঘু সাম্প্রদায়িকতা (অর্থাৎ ভারতে মূলত  ইসলামী সাম্প্রদায়িকতা)  বিচ্ছিন্নতাবাদ বা বিচ্ছিন্নতাবাদী অনুভূতির দিকে পরিচালিত হয়।

 

ভারতীয় ইতিহাস ও সমাজ সম্পর্কিত যে সমস্ত কয়েকটি চালু ও জনপ্রিয় ধারণার  উপর নির্ভর করে উপরোক্ত সিদ্ধান্তগুলি গৃহীত হয়,  সেইগুলির উপর আলোকপাত করতে গিয়ে ধর্মা কুমার তাদের কিছু স্ববিরোধিতার দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উদ্ভব ও চরিত্রের বিচারে এই পর্য্যবেক্ষণ খুবই প্রাসঙ্গিক। তাই  সেই পর্য্যবেক্ষণগুলির  একটি সংক্ষিপ্ত রূপরেখাও এখানে হাজির করা হোলো।

 

(১) কিভাবে ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে বৌদ্ধধর্মের প্রস্থান ও  হিন্দু ধর্মের প্রত্যাবর্তন ঘটে সে ব্যাপারে  প্রগতিশীল ইতিহাসবিদরা একটি ধারণা গড়ে তুলেছেন। হিন্দু ধর্মের এই প্রত্যাবর্তনকে তারা সামাজিক রক্ষণশীলতার ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিজয় হিসাবে দেখেছেন। কারণ সাধারণ ধারণাতে   বৌদ্ধধর্ম  সাম্যবাদী, প্রজাতন্ত্রবাদী এবং এর  সাথে বর্ণাশ্রম ও  ব্রাহ্মণ্যবাদ-বিরোধী তাই  বৌদ্ধধর্মের পতন খারাপ। শুধু তারাই নন, হিন্দুত্ববাদী লেখকরাও সেটি প্রকারান্তরে স্বীকার করেন। তবে তারা বৌদ্ধধর্মের পতনের জন্য মুসলমানদের দোষারোপ করেন। বিপরীতে, বাম ও  ধর্মনিরপেক্ষ শিবিরের যুক্তি এই যে ব্রাহ্মণরা তাদের কায়েমী স্বার্থ বজায় রাখতে বৌদ্ধধর্মকে ধ্বংস করেছিল। তবে আশ্চর্য এই যে,  এত বিশাল জনপদ জুড়ে ও সুদীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলা সত্বেও সেই ধরণের কোনো  হিন্দু রাজশক্তি গুলির  বৌদ্ধদের উপর লাগাতার সহিংসতার বিবরণের  ইতিহাস মেলেনা।[6]

  বিষয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ডি ডি কোসাম্বি (১৮৭৬-১৯৪৭) অন্য আর এক তত্ত্বের হাজির করেছেন।[7] এর আগে আমরা উল্ল্যেখ করেছি যে বৌদ্ধ ধর্মের রাষ্ট্রবাদে একজন চক্রবর্তী  রাজার সর্বজনীন শাসনকে আদর্শ ধরা হয়। যেমন, এই ধরণের রাজার প্রকৃষ্ট  উদাহরণ মৌর্য্য সম্রাট অশোক তিনি ও তার পরবর্তী বিভিন্ন সম্রাটদের শাসনে বৌদ্ধ ধর্মের বিকাশ ঘটেছিল সেই প্রসঙ্গের উল্ল্যেখ করে তিনি বলেন যে যখন হর্ষবর্ধন-পরবর্তী ভারতবর্ষে বৃহৎ সাম্রাজ্যগুলি ছোট ছোট রাজ্যে  ভেঙ্গে যায়, সেই সব দেশে  সামন্ততান্ত্রিক  ব্যবস্থা কায়েম হয় তখন সেই রাজ্যগুলির পক্ষে  অর্থনৈতিক ভাবে বৌদ্ধদের ব্যয়বহুল বৃহৎ মঠগুলিকে তাদের অগণিত শ্রমণ-ভিক্ষু সহ চালানো সম্ভবপর হচ্ছিল না তুলনায় হিন্দু মন্দির ও স্বল্পংখ্যক পুরোহিত-ব্রাহ্মণদের নিয়ে ধর্মীয় অনুশাসন প্রতিষ্ঠা তাদের পক্ষে সহজ ছিল। তবে  এই তত্বেরও  খামতি এই যে,   যে  নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াতে হিন্দুধর্ম বৌদ্ধধর্মকে আত্তীকরণ করেছিল, তাকে এখানে উপেক্ষা করা হয়েছে। এ ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাবে হিন্দু ধর্মেও নানা পরিবর্তন  এসেছিল,  ও এক ধরণের সংশ্লেষে নবম-দশম শতাব্দীর সমকালীন  বৌদ্ধ ধর্ম বৃহত্তর হিন্দু পরিবারে বিলীন হয়ে যায়, এই বিষয়টির উপরও আমাদের ঐতিহাসিকদের যথেষ্ট নজর পড়েনি।[8]  

 

(২) প্রগতিশীল  ইতিহাসবিদরা “ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্ম”  এবং “লোকায়ত  হিন্দুধর্মে”র মধ্যে পার্থক্য করেন। তাদের মতে ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্ম মূলত খারাপ হিন্দুধর্ম, যা জনগণের ভালো হিন্দুধর্ম বা 'প্রকৃত হিন্দুধর্ম' থেকে আলাদা।

 

তাদের এই যুক্তির মূলে আছে হিন্দু সমাজের জাতিভেদ ও অস্পৃশ্যতার প্রথা। তবে কেবল জাতিভেদ প্রথার উপর জোর দিয়ে ব্রাহ্মণ্যবাদী দর্শনকে সম্পূর্ণভাবেই কলঙ্কিত  করলে সেটিও একপেশে বিচার হয়ে দাঁড়ায়।  আধুনিকতার সাথে খাপ খাইয়ে হিন্দুধর্মের সংস্কার ও পুরাতন আচার বিচারের পরিবর্তন এক্ষেত্রে উপেক্ষিত থাকে। এটা অস্বীকার করার উপায় নেই যে বিবেকানন্দ এবং মহাত্মা গান্ধী সহ ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা দীর্ঘদিন ধরে নৈতিক ভিত্তিতে অস্পৃশ্যতাকে আক্রমণ করে আসছে, এবং  হিন্দু সমাজের একটি বড় অংশে তার তত্বগত গ্রহণযোগ্যতা আছে। এমনকি এর আগেও আমরা আলোচনায় দেখেছি তত্বগত ভাবে হিন্দুত্ববাদীরা জাতিভেদকে বর্জন করেছে; যদিও তারা বর্ণাশ্রমকে প্রত্যাখ্যান করে না, কারণ তারা এটিকে প্রাচীন বৈদিক সমাজে শ্রম বিভাজনের একটি ব্যবস্থা বলে মনে করে, যা সামাজিক স্তরগুলির মধ্যে অনেক বেশি গতিশীলতার সুযোগ করে দেয়।[9]

 

এখন আবার ব্রাহ্মণ্যবাদের বিরুদ্ধে আর এক ধরণের জাতপাতের সুবিধাবাদী রাজনীতি চলছে। বামপন্থীরাও সেই সুবিধাবাদকে আশ্রয় করে চলেছে। এও সেই বিপরীত সাম্প্রদায়িকতার এক উদাহরণ। তাই রাজনৈতিক সুবিধাবাদের গতিতে  তথাকথিত ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুত্ববাদীদের সাথে দলিত -কুর্মি বিভিন্ন জাতের প্রতিনিধিত্বমূলক  রাজনৈতিক দলগুলির মোর্চাও আজ সম্ভব হয়েছে।[10] 

 

(৩) প্রগতিশীলদের একটি সাধারণ কৌশল হল হিন্দুদের কেবল 'সংখ্যাগরিষ্ঠ সম্প্রদায়' হিসাবে উল্লেখ করা এইভাবে সাম্প্রদায়িকতাকে সংখ্যাগরিষ্ঠএবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের দ্বন্দ্বের সহজ সাধারণীকরণে  নামিয়ে আনা যায়।  এমনকি তারা হিন্দু 'সংখ্যাগরিষ্ঠতা'-র আকার যতটা সম্ভব হ্রাস করতে বৌদ্ধধর্ম এবং জৈনধর্মকেও  'সংখ্যালঘু' ধর্মের অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু এই ধরণের জগাখিচুড়ি বিভাজনের সমস্যা এই যে আব্রাহামপন্থী ধর্মের সাথে ভারতীয় উপমহাদেশের ধর্মগুলিকে একই সংখ্যালঘু  ঝুড়িতে রাখা। এর আগেও আমরা আলোচনা করেছি চরিত্রগত ভাবে এই দুই ঘরানার ধর্মের মধ্যে পার্থক্য যথেষ্ট। এর একটি ভয়ঙ্কর রূপে আধিপত্যবাদী, আর অন্যটি বহুত্ববাদী। তাই এই দুই ঘরানার সাম্প্রদায়িক চরিত্রের পার্থক্যও তারা উপেক্ষা করে যান।

 

(৪) বিভিন্ন মুসলমান শাসকদের অধীনে সাধারণ মানুষের জীবন যাপনের বিবরণের ঐতিহাসিক দলিল ও প্রমাণ কম মেলে। তা থেকে সারা দেশ  জুড়ে হিন্দু-মুসলমান সংস্কৃতির সম্প্রীতিময় পরিবেশের সিদ্ধান্তে আসা অতিসরলীকরণ।  প্রগতিশীলদের লেখায় প্রায়শই কেবল এই শাসকদের দরবারের  জীবনের উল্লেখ রয়েছে, এবং, সেও শুধুমাত্র - উত্তর ভারতীয় দরবারী  জীবন। এটা ঠিকই যে, কিছু শাসকের অধীনে শিল্প, স্থাপত্য, সঙ্গীত এবং সাহিত্যে হিন্দু, ফার্সি, সারাসেমিক ইত্যাদি ধারার  সংশ্লেষে এক ধরনের  দরবারি  সংস্কৃতি বিকশিত হয়েছিলএটাও ঠিক যে,   কিছু শাসকের অধীনে অনেক শিক্ষিত ব্যক্তি, যারা একসময় সংস্কৃত শিখতেন, তারা তার পরিবর্তে ফার্সি শিখতেন। এটি উত্তর ভারতীয় শহুরে উচ্চসমাজের  জীবনে এক ধরণের  সর্বভারতীয় চরিত্র নিয়ে আসে।  কিন্তু এটি কখনই সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে পড়েনিএটি উত্তর ভারতীয় জীবনের একটি খুব ছোট অংশ ছিল। নিঃসন্দেহে, এই উত্তর ভারতীয় দরবারী  সংস্কৃতিকে সঠিকভাবে একটি সংমিশ্রিত  সংস্কৃতি বলা যেতে পারে এবং ভারতীয় স্থাপত্য এবং সঙ্গীতে এর অর্জনগুলি গৌরবময়। কিন্তু,  তাজমহলের  সৌন্দর্য দেখেই  এটা বলা চলে না যে  এটি নির্মাণের সময় মুসলমান  ও হিন্দুদের মধ্যে দ্বন্দ্ব অনুপস্থিত ছিল। মুসলমানদের  ইসলামী শাসনের অহংকার, অন্য দিকে হিন্দুদের অবদমিত ভীতি  ও অবিশ্বাস, এই সমস্ত বিষয়ে  এই বিবরণ গুলিতে   কোন নির্দিষ্ট বক্তব্য নেই তবে শাসকের ধর্মীয় পক্ষপাত জনিত অবিশ্বাস এবং কর্তৃত্বের ভয় যে তাদের মধ্যে ছিল,  তার আভাস   মেলে  মুসলমান  শাসনের অবসানের পর হিন্দুদের আচরণ থেকে। যেমন  ঔপনিবেশিক যুগের একজন ঐতিহাসিকই  মন্তব্য করেছেন, “ঊনবিংশ শতাব্দীতে হিন্দু উৎসবগুলি  যে বর্ধিত সংখ্যাতে প্রকাশ্যে এসেছিল তার গুরুত্ব অনুধাবনের প্রয়াস তেমন  হয় নি।"[11] ("It is rarely acknowledged how much Hindu festivity came out into the open during the 19th century") তার মন্তব্যে এক ধরণের সম্ভাব্য সাম্প্রদায়িক টানাপোড়েনের ইঙ্গিত আছে সেটি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি বেদনাদায়ক হতে পারে, কিন্তু সত্য যা, সেটা অপ্রিয় হলেও তাকে সঠিকভাবে বোঝা প্রয়োজন।

(৫) ভারতে কিভাবে ইসলাম ধর্মের প্রসার ঘটেছে সে বিষয়েও প্রগতিশীলদের একটি বিশেষ বিবরণের প্রতি ঝোঁক আছে। ইসলামের জিহাদি তত্বকে তারা আমল দেন না। অন্যদিকে হিন্দুত্ববাদীরা আবার দাবি করেন যে ইসলাম এই উপমহাদেশে বলপ্রয়োগের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিলএই তত্বকে সরাসরি নাকচ না করে তারা এটি যেকোনো ধর্মের সহিংস প্রসার একটি স্বাভাবিক মধ্যযুগীয় বা প্রাচীন প্রক্রিয়া হিসাবে দেখাতে চান। আর সে কারণেই  ধর্মনিরপেক্ষ এবং বিভিন্ন মতবাদের মুসলমান ঐতিহাসিকেরা এই তত্বের  প্রতিক্রিয়ায়  জানায় যে হিন্দুরা নিজেরাই বৌদ্ধদের প্রতি সহিংস ছিলযেমন 1961 সালে উত্তর প্রদেশে স্কুল পাঠ্যপুস্তক নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী সম্পূর্নানন্দ এবং এ জে ফরিদীর মধ্যে বিতর্কের সময়, ফরিদী গল্পের বর্ণনায় কোনও আপত্তি না থাকার দাবি করেছিলেন এই বলে যে  "মুসলিম বিজেতাদের হিন্দু মন্দির ধ্বংস করার ঘটনা স্কুলের ইতিহাস বইতে পড়ানোতে কোন আপত্তি থাকবে না,  যদি হিন্দু শাসকরা কীভাবে  বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করেছে সেটিও শেখানো হয়।"[12]  এর সাথে কিছু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের এই মত যে হিন্দুধর্মের ত্রুটিগুলি, বিশেষ করে নিম্নতম বর্ণের সাথে উচ্চবর্ণের অমানবিক আচরণ  বিপুল সংখ্যক দরিদ্রকে ইসলাম গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত  করেছিল।

 

ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলামের প্রসারের তথ্য সহ ইতিহাস অধ্যয়নে বিশ্লেষণমুখী গবেষণা এখনো  পর্যাপ্ত নয়। এর মধ্যে আরিজোনা  বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের প্রফেসর রিচার্ড এম. ইটন বাংলায় ইসলামের প্রসার নিয়ে একটি তথ্য বহুল গবেষণা গ্রন্থ প্রকাশ করেন।[13] সেখানে তিনি ভারতে ইসলামীকরণের চারটি প্রচলিত তত্ত্বের বিচার  করেন ও সেই আলোকে ইসলামীকরণের সম্ভাব্য কারণটি বোঝার চেষ্টা করেন। এর প্রথমটি, এবং সবচেয়ে কম বিশ্বাসযোগ্য তত্বটি এই যে, ইসলাম এসেছে অভিবাসী মুসলমানদের মাধ্যমে, অর্থাৎ ইসলামীকরণ এদেশের বাসিন্দাদের ধর্মান্তর করণের মধ্য দিয়ে আসেনি,  বরং ভারতীয় মুসলমানেরা বিদেশ থেকে আগত অভিবাসী  মুসলমানদের উত্তরসূরী। এটি স্বভাবতই যে বিপুল সংখ্যক স্থানীয় মানুষ মুসলমান ধর্ম গ্রহণ করেছে, সেটিকে ব্যাখ্যা করতে পারেনা।  দ্বিতীয় তত্বটিতে, ইসলামকে  "তরবারির ধর্ম" হিসাবে অভিহিত করা হয়, অর্থাৎ তরবারির আক্রমণের মুখে এই  উপমহাদেশের বাসিন্দাদের ইসলাম গ্রহণ করতে বাধ্য করা হয়েছে। কিন্তু এই তত্বের দুর্বলতা ধরা পড়ে যখন দেখা যায় উত্তর ভারতের রাজ্যগুলিতে মুসলমানদের সংখ্যা হিন্দুদের সাথে আনুপাতিক বিচারে যথেষ্ট নয়। অথচ এই রাজ্যগুলি দীর্ঘকাল দোর্দণ্ডপ্রতাপ মুসলমান শাসকদের দ্বারা শাসিত ছিল। বিপরীতে, পূর্ব বাংলা এবং পশ্চিম পাঞ্জাবের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ইসলাম বিপুল সংখ্যায় দ্রুততমভাবে ছড়িয়ে পড়ে।অথচ এই অঞ্চলগুলিতে অপেক্ষাকৃত নমনীয় ইসলামী শাসন বহাল ছিল। তৃতীয় তত্ব অনুযায়ী ভারতীয় উপমহাদেশে ইসলাম  পৃষ্ঠপোষকতার ধর্ম হিসাবে প্রসার পেয়েছে। অর্থাৎ মুসলিম শাসকদের কাছ থেকে অর্থ, সম্পত্তি, ক্ষমতা, প্রভৃতি অনুগ্রহ লাভের আকাঙ্ক্ষায় এখানকার বাসিন্দারা  ধর্মান্তরিত হয়েছে। কিন্তু এটি কেবল মুষ্টিমেয়কেই সন্তুষ্ট করতে সক্ষম, ও যে ধরণের আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে বাংলা ও পাঞ্জাবের মুসলমানেরা সেই সময় ছিল, তাতে এই দুই অঞ্চলের ব্যাপক ইসলামীকরণের  ব্যাখ্যা মেলে না। চতুর্থটি আমাদের প্রগতিশীলদের দ্বারা সমর্থিত তত্ব, অর্থাৎ ইসলাম  এসেছে  সামাজিক মুক্তির ধর্ম হিসাবে। এই তত্ত্বটি জনপ্রিয়, তবুও এটির সপক্ষে জোরালো  তথ্য প্রমাণ হাজির করা হয় নি, অন্তত বাংলায়। ইটন দেখিয়েছেন যে  "বঙ্গে, মুসলিম ধর্মান্তরিতরা মূলত আদিবাসী গোষ্ঠী থেকে আগত যারা ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির সাথে সামান্যভাবে পরিচিত ছিল, এবং পাঞ্জাবে বিভিন্ন জাট গোষ্ঠীর ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য ছিল যারা অবশেষে মুসলিম সম্প্রদায়ের একটি বিশাল অংশ গঠন করেছিল"।[14]

 

তবে যে প্রক্রিয়াতে এই উপমহাদেশে ইসলামীকরণ হয়েছে সেটি উপরোক্ত চারটি তত্বেই  সীমাবদ্ধ রাখলে চলে না। যেহেতু বাংলাতে এই প্রক্রিয়ার বিবরণ অন্যান্য অঞ্চলের অপেক্ষা বেশী মেলে, সেই বিবরণগুলির ভিত্তি করে ইটন এর একটি চিত্র হাজির করেছেন। সেই তথ্য প্রমাণকে হাজির করে ইটন দেখান যে বাংলার কৃষকদের ব্যাপক ইসলামীকরণ কেবল ষোড়শ শতাব্দীর পর থেকেই দেখা যায়। এটি হয় মুঘল আমলে,  অথচ মুঘলরা ধর্মান্তর করাতে  বিশেষ কোনও আগ্রহ দেখায়নি। এটি কয়েকশ বছর ধরে ধীর প্রক্রিয়াতে ঘটেছে, যার শুরু হয়েছিল পূর্ব সীমান্তে বনাঞ্চল সাফ করে কৃষির  সম্প্রসারণের মাধ্যমে নতুন বসতি স্থাপনেএই উপনিবেশ স্থাপনে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়, এবং পূর্ব-বাংলার সমগ্র  গ্রামাঞ্চলে  মসজিদ এবং মাজার  ছড়িয়ে যায়। সেখানকার জনগোষ্ঠী হিন্দুদের স্বাভাবিক নমনীয়তায় প্রথমে আল্লাহ, মুহাম্মদ এবং মুসলিম পবিত্র পুরুষদের তাদের পূজিত  দেবতা এবং সাধুদের সংযোজন হিসাবে গ্রহণ করেছিল ইটন এই প্রথম পর্যায়টিকে "অন্তর্ভুক্তি" বলে অভিহিত করেন। পরবর্তী পর্যায়ে, এই "পরিচয়" দুটি একত্রিত হয় এইভাবে 'আল্লাহ্‌' 'নিরঞ্জন'-এর সাথে সমার্থকরূপে  ব্যবহৃত হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে, ঘটে "স্থানচ্যুতি"মুসলিম আচার-অনুশাসন  অন্যদের স্থানচ্যুত করে। তবে এই পর্যায়গুলির স্পষ্ট কাল-বিভাজন নির্ণয় করা কঠিন, কিন্তু বর্তমান বাংলাতে “ইসলাম”    যেভাবে কোরাণ-হাদিস দ্বারা নির্দিষ্ট এবং রক্ষণশীল বদ্ধ ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থিত,  সেটি মূলত ঊনবিংশ[15] এবং বিংশ শতাব্দীর ধর্মীয় মৌলবাদী শুদ্ধিকরণ  আন্দোলনের একটি ফসল[16] অথচ  প্রাক-আধুনিক যুগের গ্রামাঞ্চলের বাঙালিদের জন্য ইসলাম  হিন্দু-বৌদ্ধ’ -রীতিনীতির   ভেদাভেদের রেখাটি ছিল অস্পষ্ট ও নমনীয়।[17] 

(৬) এর  আগেই আমরা আলোচনা করছি ভারতের জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার আমদানিতে বৃটিশ সরকার কী ধরণের ইন্ধন জুগিয়েছে। কিন্তু ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার উৎস হিসাবে বৃটিশ আমলকে চিহ্নিত করার কালে, একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের নজর এড়িয়ে যায়। সেটি এই যে ভারতে ধর্মকে  রাষ্ট্র থেকে আলাদা রাখার নীতিটি  ব্রিটিশরাই  প্রথম গ্রহণ করেছিল।[18] ব্যক্তিগতভাবে সরকারী  কর্মকর্তারা হয়তো মিশনারি কার্যকলাপকে সাহায্য করেছিলেন,  কিন্তু এটি নিয়ম ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, নিয়মটি কোনও ধর্মকে সমর্থন না করার বিপরীত ছিল এবং ঔপনিবেশিক আমলে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং কর্মকর্তাদের জন্য সরকারী ভর্তুকি হ্রাসের মাধ্যমে এটি প্রদর্শিত হয়। তাই তাদের এই  সর্বজনীন প্রশাসনের এই চরিত্রটি  উহ্য রেখে কেবল সাম্প্রদায়িক রাজনীতিতে  ঔপনিবেশিক শাসকদের কূটনীতির ভূমিকাকেই তুলে ধরা একধরণের একদেশদর্শিতা।

 

 ঠিক বিপরীতে মুঘল আমলের  ধর্মীয়  সহনশীলতা প্রমাণ করার জন্য তারা মুঘল যুগে ইসলামের প্রতি পক্ষপাতিত্ব ও অমুসলমান জনগণের উপর বৈষম্যমূলক আচরণকে উপেক্ষা করেন। এর একটি উদাহরণ হল,  অমুসলমানদের উপর জিজিয়া কর  আরোপ। সেক্ষেত্রে প্রগতিশীলদের প্রশ্রয়ী যুক্তি এই যে সমস্ত মুঘল সম্রাট 'জিজিয়া' আরোপ করেননি, এবং হিন্দুদের উপর বিশেষ কর বা মন্দির লুটপাট কেবল রাজস্বের আকাঙ্ক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত[19] অন্য আর এক উদাহরণ শিখধর্মের উপর মুঘলদের আক্রমণ। এই ইতিহাস আমরা আগেই আলোচনা করেছি।

 

(৭) ধর্মের সাথে রাষ্ট্রের সম্পর্কের ব্যাপারে মধ্যযুগের  হিন্দু ও মুসলমান শাসকদের রাজনৈতিক দর্শনের তফাত আছে। ইসলামী গ্রন্থগুলি স্পষ্টতই বলে যে রাষ্ট্রের কাজ হল "ইসলাম ধর্ম রক্ষা করা এবং এর বার্তা প্রচার করা"[20] যদিও হিন্দু রাজা অন্যান্য ধর্ম বা সম্প্রদায়কে তার নিজের ধর্মের চেয়ে নিকৃষ্ট বলে মনে করতেন, তবুও হিন্দুদের সম্পর্কে, এটা বলা সম্ভব যে 'রাজাকে তার রাজ্যের সকল ধর্ম রক্ষা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল'[21]  ধর্মান্তরের গতিও  রাষ্ট্রীয় নীতির উপরও নির্ভর করে। 'রাষ্ট্র'ধর্মের বাইরে যে প্রজারা আছে তাদের  প্রতি হিন্দু এবং মুসলিম শাসকদের নীতি ভিন্ন ছিল। এই প্রসঙ্গে ঐতিহাসিক  আজিজ আহমেদ মন্তব্য করেন যে সাধারণভাবে ফিরোজ তুঘলকের মতো কিছু ব্যতিক্রমী শাসক  ছাড়া মুসলমান শাসকেরা অমুসলমানদের ইসলাম গ্রহণের জন্য  বলপ্রয়োগ বা ধর্মান্তরের  জন্য রাষ্ট্রীয় উৎসাহ প্রদান করতেন না। কিন্তু ধর্মত্যাগের শাস্তি দেওয়ার ক্ষেত্রে সমস্ত মুসলিম শাসকই অত্যন্ত কঠোর ছিলেন। কেবল কাশ্মীরের সুলতান জয়নআল আবেদিন এবং মুঘল সম্রাট আকবর সম্ভবত দুইজন শাসক  ছিলেন যারা হিন্দু ও মুসলমানদের ধর্মত্যাগের ও ধর্মগ্রহণের  সমান অধিকার গ্রহণ করেছিলেন। অন্যদিকে ধর্মান্তরকরণ এবং পুনর্ধর্মান্তরের প্রতি হিন্দু শাসকদের মনোভাব ছিল একেবারেই ভিন্ন।[22]

 

ধর্মা কুমারের করা এই তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষণ  দেখিয়ে দেয় তথ্যবিহীন   যুক্তি তর্কের গোলকধাঁধায় কিভাবে  প্রগতিশীলেরাও বিপরীত সাম্প্রদায়িকতার ফাঁদে জড়িয়ে যান। আমাদের বাম ও ধর্মনিরপেক্ষ  ইতিহাসবিদদের মধ্যযুগের ভারতীয় সমাজ জীবনকে জানা ও বোঝার  এই ধরণের বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গির অভাব, এবং হিন্দুত্ববাদের রাজনীতিকে  খণ্ডন করার তাগিদে  ইসলাম ও ভারতীয় ধর্মগুলির চরিত্রগত পার্থক্য জনিত স্বাভাবিক প্রশ্নগুলিকে এড়িয়ে যাওয়া বা লঘু করে দেখানো আদতে একজন পক্ষপাতহীন যুক্তিশীল মানুষের মনে  আরো বিভ্রান্তি বাড়ায়। তাদের এই ব্যাখ্যা মধ্যযুগের হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি ও দ্বন্দ্বের সাধারণ লোকসংস্কৃতির আখ্যানগুলির সাথেও সামঞ্জস্যপূর্ণ  নয়। তাই তাদের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নবিদ্ধ।  আর সেই বিভ্রান্তির সুযোগ নিচ্ছে আজ হিন্দু মুসলমান দুই ধর্মের সাম্প্রদায়িক সংগঠনগুলি। সেই কারণেই আরো বেশি করে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে, এই ধর্মগুলিকে ঘিরে আমাদের ইতিহাস সম্পর্কে আরো জানা, বোঝা,  সঠিক তথ্য-বিবরণ সহ প্রকাশ্যে আনা। সেই বিচারেই  আধুনিক বিশ্বে ধর্মীয় মৌলবাদের পুনরুত্থান ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান নিতে হবে।

 

(লেখকের সাম্প্রতিক একটি লেখা ধর্ম ও আধুনিকতা (অপ্রকাশিত) থেকে গৃহীত।)

28.5.2026



[1] বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে আরো এক ধরণের সাম্প্রদায়িকতা দেখা যায়। মুখে ধর্ম-নিরপেক্ষতা, নাস্তিকতা, প্রভৃতির প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করেও এরা স্বীয় পারিবারিক ধর্ম ও সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাত পোষণ করে। পরিস্থিতি অনুযায়ী সেটি তীব্র সাম্প্রদায়িক চেহারাও ধারণ করে। এই ধরণের সাম্প্রদায়িকতাকে আমরা সুপ্ত সাম্প্রদায়িকতা হিসাবে চিহ্নিত করব। এটি বিপরীত সাম্প্রদায়িকতার বিপরীত মেরুতেই অবস্থান করে। (লেখক)

[2] Irfan Habib, The Left and the National Movement : Social Scientist , May - Jun., 1998, Vol. 26, No. 5/6 (May - Jun., 1998), pp. 3-33. https://www.jstor.org/stable/3517546

[3] Arundhati Roy: ‘No propaganda on Earth can hide the wound that is Palestine’,  Canadian Dimension on October 13, 2024.

https://mronline.org/2024/10/19/arundhati-roy-no-propaganda-on-earth-can-hide-the-wound-that-is-palestine/ , Posted Oct 19, 2024.

(Ack. Google Translate)

[4] Aditya Mukherjee, How Secular Parties Played Their Part in Rise of Communalism, 25th Feb, 2023, https://thewire.in/books/how-secular-parties-played-their-part-in-rise-of-communalism

[5] Dharma Kumar, Left Secularists and Communalism, Economic and Political Weekly, Jul. 9, 1994, Vol. 29, No. 28, pp. 1803-1809.

[6] অন্যদিকে দ্বাদশ শতকে বাংলা ও বিহার (তদানীন্তন মগধ)-এ তুর্কী আক্রমণে বৌদ্ধ বিহার ও মন্দিরগুলির ধ্বংসের বিস্তৃত বিবরণ মুসলমান ঐতিহাসিক ও তিব্বতি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের লেখা থেকে মেলে। যেমন বখতিয়ার খিলজির আক্রমণে নালন্দা ও ওদন্তপুরি মহাবিহার ধ্বংসের বিবরণ ত্রয়োদশ শতকের ঐতিহাসিক মিনহাজুদ্দিন সিরাজির লেখা তবাকত-ই-নাসিরিতে মেলে। তেমনি সমকালীন তিব্বতি ভিক্ষু ধর্মস্বামিন-এর আত্মজীবনী মূলক লেখা থেকে তুর্কী আক্রমণকারীদের দ্বারা বৌদ্ধ বিহার ও মন্দির গুলির ধ্বংস, বৌদ্ধ ভিক্ষুদের উপর অত্যাচার ও হত্যার বিবরণ মেলে। তুর্কী আক্রমণের আতঙ্কের পরিবেশে সেই সময় বহু বৌদ্ধ পণ্ডিত ও ভিক্ষু নেপাল ও তিব্বতে পালিয়ে যান। ধর্মস্বামিন-এর লেখা থেকে জানা যায় এর পরও নালন্দায় বৌদ্ধ পণ্ডিতরা সীমিত ভাবে পুনরায় তাদের পঠন-পাঠন ও বৌদ্ধিক অনুশীলন জারি রাখেন। একজন বিত্তশালী সাধারণ পরিবারের  ব্রাহ্মণ জয়দেব-এর অর্থ আনুকূল্যে তারা নতুন ভাবে সঙ্ঘবদ্ধ হন। এই কারণে জয়দেবকে তুর্কী সেনা গ্রেপ্তার করে হত্যার হুমকি দেয়। একজন স্থানীয় হিন্দু রাজাও বৌদ্ধ বিহার পুনরায় চালু করতে আর্থিক সহায়তা করেন। ধর্মস্বামিনের এই বিবরণও পূর্ব ও উত্তর ভারতে বৌদ্ধধর্ম বিলুপ্তির কারণ হিসাবে  হিন্দুধর্ম বনাম বৌদ্ধধর্মের সংঘর্ষের তত্বকে খারিজ করে। - https://en.wikipedia.org/wiki/Nalanda_mahavihara#cite_note-109

[7] D D Kosambi, 'The Decline of Buddhism in India' (1956) in Exasperating Essays,  India Book Exchange, Calcutta, 1957; re- printed 1977.

[8] নবম শতাব্দীতে কাশ্মীরের নৈয়ায়িক জয়ন্ত ভট্ট  রচিত আগমদম্বর নাটকটি সমসাময়িক বৌদ্ধ, জৈন, তন্ত্র, ও বৈদিক ধর্মের তর্ক বিতর্ক গুলি হাজির করে। নাট্যকার অবশ্য বৈদিক ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে এই তর্ক-বিতর্কের অবতারণা করেন এবং ভিন্ন ধর্মের তার্কিকদের কিছুটা বিদ্রূপাত্মক ভাবে দেখানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু নাটকের শেষ অধ্যায়ে এই সমস্ত ধর্মের বন্ধুত্বমূলক সহাবস্থান ও মিলনের আবেদনে নাটকটির সমাপ্তি ঘটান। এই নাটকটিতে সহিংসতার দ্বারা বৌদ্ধ ধর্মের অবলোপের তত্বটির বিপরীত চিত্রই দেখা যায়। - 'Much Ado About Religion' A Critical Edition and Annotated Translation of the Agamadambara, a Satirical Play by the ninth century Kashmirian philosopher Bhatta Jayanta - D.Phil, thesis, by Csaba Dezso, Balliol College, 15 January 2004.

[9]  তবে বর্ণাশ্রমের সপক্ষে হিন্দুত্ববাদীদের এই দাবীর অসারতা  প্রাচীন হিন্দু ধর্মগ্রন্থ গুলিতেই মেলে।  ঋগ্বেদের একটি স্তোত্রে বর্ণাশ্রমের ব্যাখ্যায় মানবদেহের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে তুলনা করে উচ্চ ও নিম্ন বর্ণের সামাজিক মর্যাদার  ভেদাভেদকেই স্পষ্ট করে। শাস্ত্রে শুভ কর্মফল দ্বারা উঁচু জাতের বংশে জন্মগ্রহণের তত্বকথাও বলা আছে।

[10] ২০২৪ সালের নির্বাচনের পর  বিজেপি কুর্মি সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব কারী নীতিশ কুমারের সংযুক্ত জনতা দল (JD(U)), ও প্রয়াত দলিত নেতা রাম বিলাস পাশোয়ানের ছেলে চিরাগ পাশোয়ানের দল লোক জনশক্তি পার্টি (LJP)’র সমর্থনে কেন্দ্রে সরকার গঠন করে। এদের সমর্থন ছাড়া হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকার গঠন করতে পারতোনা।  

[11] Asim Roy, Islamic Syncretist Tradition, 1937, Princeton, N.J. : Princeton University Press, 1983 p 25.

[12] Paul Brass, Language, Religion and Politics in North India, Vikas Publishing House Pvt. Ltd., 1974, p 222.

[13] Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, University of California Press, Berkeley, 1993.

[14] Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, University of California Press, Berkeley, 1993. P.115.

[15] ঊনবিংশ শতাব্দীর তিরিশ ও চল্লিশের দশকে শরিয়ত উল্লা ও তার মৃত্যুর পর তার পুত্র দুদু মিয়াঁর নেতৃত্বে বাংলার প্রচলিত হিন্দু ধর্ম প্রভাবিত ইসলামী আচার বিচারের বিরুদ্ধে ও কুরআন-হাদিস বর্ণিত ইসলামকে অনুসরণ করার প্রচারে  ফরায়েজি আন্দোলন গড়ে ওঠে। এই আন্দোলন মুসলমান কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, কারণ আন্দোলন বৃটিশ সরকার ও হিন্দু জমিদারদের খাজনা আদায়ের ও অত্যাচারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠেছিল। ১৮৩০-৩১ সালে বারাসাতে তিতুমীরের নেতৃত্বেও অনুরূপ আন্দোলন গড়ে ওঠে। তিতুমীরের অনুসারীদের দমন করা হয়েছিল, অন্যদিকে ফরায়েজিরা ব্রিটিশ শাসন মেনে নিয়েছিল এবং ব্রিটিশদের সহায়তা পেয়েছিল। এই আন্দোলনগুলো বাঙালি মুসলমানদের সাম্প্রদায়িক পরিচয়কে সম্মিলিত ও শক্তিশালী করেছিল, যা বাঙালি হিন্দুদের থেকে একটি বিভেদ তৈরি করে। - Kenneth W. Jones, The new Cambridge history of India III -1: Socio-religious reform movements in British India, Department of History, Kansas State University, Cambridge University Press, 2008.

[16] ২০২৪ জুলাই পরবর্তী বাংলাদেশে ইসলামী সংগঠনগুলির সক্রিয় ও রাষ্ট্রীয় মদতে তৌহিদী জনতার ইসলামী শুদ্ধিকরণ দাঙ্গা হাঙ্গামায় যেভাবে আউল-বাউল-সুফি-মারফতি পন্থী মুসলমানেরা আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই পরিস্থিতিকেও আধুনিক যুগে বাংলাদেশের ইসলামীকরণের একটি নতুন  পর্যায় হিসাবে দেখা হচ্ছে। প্রাগ্‌-ঊনবিংশ শতকগুলিতে বাংলাতে ইসলাম প্রসারিত হয় সুফিবাদ দ্বারা। এর পর হানাফিপন্থীদের দাপট বাড়ে, আর বর্তমান পর্যায়ে আরো রক্ষণশীল সালাফিপন্থা সে দেশে শিকড় ছড়াচ্ছে। (লেখক)

[17] Richard Eaton, The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204-1760, University of California Press, Berkeley, 1993. P.173. (Ack. Google Translate)

[18] ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাতেও লর্ড উইলিয়াম  বেন্টিঙ্ক (১৭৭৪-১৮৩৯) প্রণীত এই ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি বজায় রাখতে বৃটিশ সরকারের বরাবর সচেতন ছিল। - https://jmukhopadhyay.blogspot.com/2024/07/the-colonial-education-in-india.html

[19] Satish Chandra, Mughal Religious Policies, the Rajputs and the Deccan, Vikas Publishing House, Delhi, 1993.

[20] P J Vatikiotis, Islam and the State, Croom Helm, London, 1987. Paperback edition, Routledge, London, 1991.

[21] Heinrich von Stietencron, 'Hinduism, On the Proper Use of a Deceptive Noun" in Gunther D Sontheimer and Herman Kulke (eds), Hinduism Reconsidered, Manohar, Delhi, 1989, pp. 19-20.

[22] Aziz Ahmad, Studies in Islamic Culture in the Indian Environment, Clarendon Press, Oxford, 1964, pp 85-86.

0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home