বিজ্ঞানের না ফুরানো কথা
বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ জ্ঞান অন্বেষণ ও জ্ঞান সঞ্চয়, তত্ত্ব ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গতিপূর্ণ সমন্বয়, নিত্য নতুন প্রশ্নের সম্মুখীন হওয়া এবং তার ব্যাখ্যা প্রদান ও প্রয়াস - এই সমস্ত চরিত্রের বিভিন্ন দিক নিয়ে আমরা পূর্ব অধ্যায়গুলো তে আলোচনা করেছি। বিভিন্ন প্রসঙ্গে বৈজ্ঞানিক জিজ্ঞাসা ও তাকে কেন্দ্র করে গবেষণার কিছু উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এই অধ্যায়ে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে বিজ্ঞান নিরন্তর জ্ঞান অন্বেষণ, জিজ্ঞাসার উত্তরণ, ও নব পর্যবেক্ষিত তথ্যের দ্বারা কিভাবে ক্রমাগত তার জ্ঞানভাণ্ডার কে সমৃদ্ধ করছে সে বিষয়ে আমরা আলোকপাত করব। বিজ্ঞানের এই গতিশীল চরিত্রই জ্ঞানের অন্যান্য শাখা থেকে তাকে আলাদা করে চিহ্নিত করে।
এখন আমরা প্রায়ই দেখি প্রাচীন গৌরব গাঁথার পুনরুদ্ধারে বিজ্ঞানের প্রতিষ্ঠিত তত্ত্ব গুলিকে ধর্মীয় শাস্ত্র, ও দর্শনের গ্রন্থের লেখাতে খানিকটা গুপ্তধন সন্ধানের উত্তেজনায় খোঁজার প্রয়াসে এক শ্রেণীর পণ্ডিত ও বুদ্ধিজীবী নিয়োজিত। যেমন কোনো পণ্ডিত ব্যক্তি দাবি করতেই পারেন যে তিনি বেদ ও উপনিষদের কোনো অংশে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের খোঁজ পেয়েছেন। এই দাবির সপক্ষে হয়তো কোনো সংস্কৃত শ্লোকের আধিভৌতিক বক্তব্যে তিনি শক্তি ও ভরের সম্মিলিত নিত্যতার সূত্রটির যোগাযোগ স্থাপনে তাঁর পাণ্ডিত্যের মুনশীয়ানা দেখাবেন। কিন্তু এই সমস্ত পান্ডিত্যপুর্ণ আলোচনাতে যে প্রশ্নের উত্তরটা আমি কখনোই পাইনি তা হল, এই উপলব্ধির পরম্পরায় জগৎ সম্পর্কে যে ব্যাখ্যা আসা উচিৎ ছিল সে গুলি শাস্ত্রকথায় অনুপস্থিত কেন? কেনইবা অন্যান্য ব্যাখ্যার সাথে এই ব্যাখ্যা যোগাযোগ বিহীন? এমন আরো নানা অস্বস্তিকর প্রশ্ন থেকে সাময়িক অব্যাহতি পেতে তিনি হয়ত আবার সেই প্রাচীন পুঁথি পত্রে গুপ্তধন খোঁজার পরামর্শই দেবেন। প্রাচীন জ্ঞানের স্থবির চিত্রটি এরই উদাহরণ। এর তত্ত্ব গুলি সেই সময়ের সীমিত পর্যবেক্ষণ এর প্রাসঙ্গিকতার নিরিখে বিচার করা উচিত। কোনো শ্লোক ও মন্ত্রের পুনর্ব্যাখ্যাতে আজকের প্রসঙ্গে তাকে খাপ খাওয়াতে গেলেই গোল বাঁধে। সেটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ব্যতিক্রম হিসাবে হাজির করা আর কালের গহ্বরে এমন কত মনি মানিক্য হারিয়ে যাবার আক্ষেপ ছাড়া এই সব বিদগ্ধ আলোচনাতে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। তাই এই সব পাণ্ডিত্যের অঙ্গনে আইনস্টাইনের শক্তি ও ভরের নিত্যতার সত্য উপলব্ধি ও পরমাত্মার উপলব্ধি সবই সমার্থক। বস্তু জগৎকে ব্যাখ্যা করার ও অন্যান্য ঘটনাবলির নিরিখে বোঝার কোনো নিরবিচ্ছিন্ন প্রয়াসই সেখানে দেখা যায় না।
প্রাচীন স্থবিরত্বের বিপরীতে আমরা এখানে বিজ্ঞানের না ফুরানো কথার বৈশিষ্ট্যটিই বিগত দু’দশকের বিজ্ঞানের গবেষণার অগ্রগতির একটি সাধারণ ও সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনায় পুনরায় বুঝে নেব। পূর্ববর্তী অধ্যায়গুলো আলোচনার সূত্র ধরেই এ কথা বলতে পারি বিজ্ঞান তার জ্ঞানের ভাণ্ডার ক্রমাগত পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বারা বাস্তব সাক্ষ্য প্রমাণ সহ বাড়িয়ে চলে। সেই নবসংযোজিত জ্ঞান অবশ্যই বিজ্ঞান স্বীকৃত বা প্রস্তাবিত তত্ত্বগুলির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। না হলে সেই নতুন উপলব্ধিকে আরো বিশদ ভাবে দেখতে হয় এবং প্রচলিত তত্ত্বের অসম্পুর্ণতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা সচেতন হোন। বিগত দু’দশকে এইরকমই কিছু পূর্বতন অসমাধিত সমস্যার পূর্ণ বা আংশিক সমাধানের কিছু উদাহরণ এখানে রাখা হোলো। এগুলি কখনো কোনো তত্ত্বের সপক্ষে বাস্তব প্রমাণ পেশ করে তাকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে, আবার কখনো চালু বিতর্কের কোনো একটি মতের সপক্ষে আরো জোরালো প্রমাণ হাজির করেছে।
∙ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (Gravitational Wave) ও হিগ্স বোসোন (Higgs Boson)
এ যাবৎ বিজ্ঞানের অনুসন্ধানে প্রকৃতিতে ক্রিয়াশীল কেবল চারটি মৌলিক বলের খোঁজ মিলেছে। এগুলি হোলো মহাকর্ষ বল (Gravitational Force), তড়িচ্চুম্বকীয় বল (Electromagnetic Force), দৃঢ় নিউক্লিয়ার বল (Strong Nuclear Force) ও মৃদু নিউক্লিয়ার বল (Weak Nuclear Force)। মহাকর্ষ বল দুটি বস্তুর পারষ্পরিক আকর্ষণের বল। তড়িচ্চুম্বকীয় বল দুটি তড়িতদাহিত কণার পারষ্পরিক আকর্ষণ বা বিকর্ষণের বল। আবার গতিশীল আহিত কণার দ্বারা চৌম্বকীয় বলেরও প্রকাশ প্রায়। প্রাথমিকভাবে বিজ্ঞানীরা এই দুটিকে ভিন্ন শ্রেণীর মনে করলেও, পরবর্তীকালে এরা যে একত্রেই সর্বদা ক্রিয়াশীল তার ব্যাখ্যা মেলে এবং এদের দুজনকে একই বলের যুগপৎ প্রকাশের দরুন তড়িচ্চুম্বকীয় বল হিসাবে চিহ্নিত করা হয়। মৃদু নিউক্লিয়ার বল পরমাণুর নিউক্লিয়াসের কণা গুলি ভেঙ্গে যাওয়ার প্রক্রিয়াতে ক্রিয়াশীল। যেমন নিউট্রনের অত্যন্ত নিকটে একটি নিউট্রিনো কণার অবস্থানে নিউট্রন একটি প্রোটনে রূপান্তরিত হয়, এবং নিউট্রিনোটি ইলেকট্রনে পরিবর্তিত হয়ে নিউক্লিয়াস থেকে নিষ্ক্রান্ত হয়। দৃঢ় নিউক্লিয়ার বল আবার নিউক্লিয়ারের অভ্যন্তরে প্রোটন ও নিউট্রনকে বেঁধে রাখে।
তবে বিজ্ঞানীরা এই সমস্ত বলের ক্রিয়াশীলতা একটি মৌলিক তত্ত্বের আধারে ব্যাখ্যা করা যাবে বলে মনে করেন। অ্যালবার্ট আইনস্টাইন তাঁর পরিণত বয়সে এই সমস্যার সমাধানেই মগ্ন ছিলেন, এবং অন্যান্য বিজ্ঞানীদেরও দৃষ্টি আকর্ষন করেন। তাঁর সার্বিক আপেক্ষিকতার তত্ত্ব দ্বারা তিনি দেখিয়েছিলেন, মহাকর্ষ বলের প্রভাবে গ্রহ নক্ষত্রের গতিপথ আদতে সময় ও ত্রিমাত্রিক ক্ষেত্র সম্মিলিত চতুর্মাত্রিক ক্ষেত্রের (পরবর্তী আলোচনাতে একে আমরা ক্ষেত্র-কাল হিসাবে অভিহিত করব) বক্রতা দ্বারা নির্ণীত। আইনস্টাইন অনুরূপে তড়িচ্চুম্বকীয় বলের ব্যাখ্যাও সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বের আধারে আনতে সচেষ্ট ছিলেন। কিন্তু তাঁর এই অন্বেষণ সফল হয়নি। এখানে উল্লেখ্য তড়িচ্চুম্বকীয় বলের ব্যাখ্যা আবার কোয়ান্টাম তত্ত্বে মেলে, এবং সেটিও আইনস্টাইনেরই অবদান। তিনি আলোকের অভিক্রিয়া (Photo electric effect) ব্যাখ্যাতে ইলেকট্রনগুলির কক্ষচ্যুতি নির্দিষ্ট শক্তি বিশিষ্ট ফোটন কণার আদান প্রদানে হয়ে থাকে এই তত্ত্বের অবতারণা করেন। এটিও আদতে তড়িচ্চুম্বকীয় বলেরই প্রকাশ। এখনো পর্যন্ত আপেক্ষিকতাবাদ ও কোয়ান্টাম তত্ত্বের সংযোগ বিজ্ঞানে অধরা থেকে গেছে। তাই মহাকর্ষ বলের ব্যাখ্যা এখনো অন্যান্য বলের ব্যাখ্যার সাথে এক সূত্রে বাঁধা পড়েনি।
এই সমস্ত মৌলিক বলের ক্রিয়াশীলতার নিউটনীয় ব্যাখ্যার সীমাবদ্ধতা এই যে, আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের স্বীকৃতিতে, কোনো প্রাকৃতিক বস্তু ও তরঙ্গের গতিবেগের সর্বোচ্চ সীমা শূন্য মাধ্যমে আলোকের গতিবেগ দ্বারা বেঁধে রাখা হয়। এর ফলে এই মৌলিক বলগুলি তৎক্ষণাতই দুটি বস্তুর দূরত্ব অতিক্রম করে ক্রিয়াশীল, এই নিউটনীয় চিত্র বিজ্ঞানীদের কাছে গ্রহণযোগ্য হয় না। মহাকর্ষ বলের ক্রিয়াশীলতায় তাই আইনস্টাইন তাঁর সার্বিক আপেক্ষিকতা তত্ত্বের সহায়তায় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সৃষ্টির ব্যাখ্যা দেন। তিনি দেখান যে যদি কখনো দুটি বৃহৎ ভরের দুটি বস্তু, যেমন দুটি নক্ষত্র, অত্যন্ত কাছাকাছি চলে আসে, তখন ক্ষেত্র-কালে যে কম্পন সৃষ্টি হয়, সেটি তরঙ্গের আধারে প্রায় আলোকের সর্বোচ্চ গতিবেগে সমস্ত দিকেই ছড়িয়ে যায়। এতে ওই সম্মিলিত বস্তুদ্বয়ের শক্তি ও ভরের ক্ষয় হয়। এই তরঙ্গই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ। তাই এই ধরণের সমকালীন মহাজাগতিক ঘটনাতে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের খোঁজ মেলার পূর্বাভাস তিনি দেন। যদিও এই অতি মৃদু তরঙ্গ কোনোভাবে ধরা যাবে কিনা, সে ব্যাপারে তিনি সন্দিহান ছিলেন।
মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই তত্ত্ব পরবর্তীকালে পরোক্ষ প্রমাণ দ্বারা সমর্থিত হয়। ১৯৭৪ সালে রাসেল এ. হালস এবং যোসেফ হুটন টেলর (জুনিয়র) একটি পালসার-যুগ্মের (Binary Pulsar) কক্ষপথের ক্ষয় মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বিকিরণের দ্বারা হওয়ার গাণিতিক ব্যাখ্যা দেন। এ জন্য তাঁরা ১৯৯৩ সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরষ্কার পান। তবুও বিজ্ঞানীরা বাস্তবে এই তরঙ্গ পর্য্যবেক্ষণ-এর জন্য সদা সচেষ্ট থাকেন। এর দুটি সমস্যা ছিল। এক, এই অতি দুর্বল শক্তি সম্পন্ন তরঙ্গের উপস্থিতিকে চিহ্নিত করা, আর অন্যটি ছিল পর্য্যবেক্ষন কালে মহাজাগতিক ঘটনার সময় ও সুযোগের উপলব্ধতা। প্রথম সমস্যাটির সমাধানের জন্য আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের দুটি স্থানে লেজার ইন্টারফেরোমিটার মহাকর্ষ তরঙ্গ মাণকেন্দ্র (Laser Interferometer Gravitational Wave Observatory (LIGO) ) নির্মাণ করা হয়। একে আমরা লাইগো বলে অভিহিত করব। লাইগোতে ৪ কিলোমিটার ব্যাপী দুটি পৃথক পথে একই লেজার রশ্মিকে বিভক্ত করে পরিচালিত করা হয়। তাদের সমপাতের (interference) সাহায্যে এই দুটি পথের দৈর্ঘ্যের পার্থক্য মাপা হয়। একটি প্রোটন আধানের ব্যাসের এক সহস্রাংশের দৈর্ঘ্য মাপতেও এই যন্ত্র সক্ষম। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতিতে লেজার রশ্মির ভ্রমণপথের দৈর্ঘ্যের এই তারতম্য বিচারেই তরঙ্গের চিহ্নিতকরণ হয়। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের যে দুটি স্থানে এই মাণকেন্দ্র নির্মান করা হয় তাদের দূরত্ব ছিল ৩০০২ কিলোমিটার। একটি ছিল লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে ও অন্যটি ওয়াশিংটনের রিচল্যান্ড-এর কাছে। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের উপস্থিতিতে এই দুটি ভিন্ন স্থানে একই ভাবে দৈর্ঘ্যের পরিবর্তন এবং সেটি যুগপৎ কিনা তার বিচারের জন্যই এই দুটি মাণকেন্দ্র পর্য্যবেক্ষণে রাখা হয়।অতঃপর যেভাবে মৎস্যশিকারী ছিপ ফেলে মাছ ধরার প্রতীক্ষাতে বসে থাকে, লক্ষ্য রাখে কখন মাছে বঁড়শির টোপে ঠোক্কর খায় আর ফাতনা নড়ে ওঠে। এই যন্ত্রদুটিও অপেক্ষা করতে থাকে কখন সুদূর ব্রম্ভাণ্ডে তেমন কোনো মহাজাগতিক ঘটনা ঘটবে, যার ফলে মহাকর্ষ তরঙ্গের উদ্ভব হবে এবং দুই মাণকেন্দ্রের লাইগোর রেকর্ডারে ধরা পরবে। ২০০২ থেকে ২০১০ পর্যন্ত্য অবশ্য এই তরঙ্গের কোনো হদিশ মেলেনি। এরপর কয়েক বছর এটিকে পরীক্ষায় না ব্যবহার করে এর চিহ্নিতকরণের ব্যবস্থাকে আরো নিখুঁত করা হয় এবং ২০১৫ সাল থেকে এই উন্নত ব্যবস্থা কার্য্যকরী হয়। অবশেষে ২০১৫ সালের ১৪ই সেপ্টেম্বের তরঙ্গ সংকেত যুগপৎ ধরা পড়ে। সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বের প্রয়োগে বিজ্ঞানীরা দেখান যে দুটি কৃষ্ণ গহ্বরের মিলনে সৃষ্ট মহাকর্ষীয় তরঙ্গের প্রভাবে যে ফলাফল মেলা উচিত, পরীক্ষাগারেও সেইরকমই মিলেছে। এই বস্তুদুটির ভর ছিল প্রায় ৩৬ টি ও ২৯টি সূর্যের সমান। ২০১৬ সালের ১১ই ফেব্রুয়ারী সমস্ত রকম ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণে সন্তুষ্ট হয়ে তবেই তাঁরা মহাকর্ষীয় তরঙ্গের বাস্তব অস্তিত্বের ঘোষণা করেন এবং আইনস্টাইন যে এ ব্যাপারে সঠিক ছিলেন সেটির স্বীকৃতি মেলে। বস্তুজগৎ কে পর্য্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি এমনি বস্তুনিষ্ঠ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গের এই চিহ্নিত করণের প্রক্রিয়া উদ্ভাবনের জন্য ২০১৭ সালে রাইনার ভাইস, কিপ থর্ণ ও ব্যারি বারিশ কে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত করা হয়।
মৌলিক বলের ক্রিয়াশীলতায় শুধু তরঙ্গের প্রবাহই নয়, অতিপারমাণবিক কণিকাদের আদান প্রদানের তত্ত্বও বিজ্ঞানীরা উপস্থিত করেছেন। যেমন মহাকর্ষ বলের ক্রিয়াতে একটি প্রকল্পিত কণিকার কথা তাঁরা ভেবেছেন । একে গ্রাভিটন নামে তাঁরা চিহ্নিত করেন। কিন্তু যদিও মহাকর্ষ তরঙ্গের অস্তিত্বের প্রমাণ মিলেছে, এর কণিকা স্বত্বা এখনো অপর্য্যবেক্ষিত। আপেক্ষিকতাবাদ ও কোয়ান্টাম তত্বের একত্রিত ব্যাখ্যাও যেমন আজও অধরা, তেমনি এই কণাটিও পরীক্ষাগারে অপ্রমাণিত।
তবে মহাকর্ষ বল ব্যতিরেকে অন্য বলগুলির ব্যাখ্যাতে এই ধরণের এক বা একাধিক অতিপারমাণবিক কণিকার আদান প্রদানের তত্ত্ব তার বাস্তব প্রমাণ সহ আজ আমাদের কাছে হাজির। যেমন আগেই আলোচনা করা হয়েছে যে ফোটন কণিকার আদান প্রদানে তড়িচ্চুম্বকীয় বল ক্রিয়াশীল। পরবর্তীকালে অন্য আরো কিছু কণিকার অস্তিত্বের ব্যাখ্যা বিজ্ঞানীরা দেন, যেগুলি অন্য মৌলিক বলগুলির ক্রিয়াশীলতায় ভূমিকা নেয়। দৃঢ় নিউক্লিয়ার বলের ব্যাখ্যা দেওয়া হয় গ্লুওন নামক একটি কণিকার সাহায্যে। মৃদু বলের ক্রিয়াশীলতার ব্যাখ্যায় W-বোসোন ও Z-বোসোন নামক দুধরণের কণিকার প্রস্তাব করা হয়। এখানে উল্লেখ্য ফোটোন, গ্লুওন, W-বোসোন ও Z-বোসোন এই অতিপারমাণবিক কণিকাগুলির কোয়ান্টাম দশা ও ধর্ম বোস-আইনস্টাইন সংখ্যাতত্ত্বর নিয়ম মেনে চলে। তাই এগুলিকে বোসোন বলা হয়। এগুলির কোয়ান্টাম স্পিন একটি সংখ্যা হয় (০, ১, অথবা ২)। অন্যদিকে আরেকধরণের অতিপারমাণবিক মৌলিক কণিকা রয়েছে, যেগুল পরমাণুর নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরের প্রোটন ও নিউট্রন, এবং নিউল্কিয়াসকে কেন্দ্র করে আবর্তিত ইলেকট্রনের গঠন ও ভর প্রদানে ভূমিকা নেয়। এই কণিকাগুলির কোয়ান্টাম দশা ফার্মি সংখ্যাতত্ত্ব দ্বারা বিবৃত হয়।এই শ্রেণির কণিকা গুলির কোয়ান্টাম স্পিন অর্ধ-সাংখ্যিক।এদের বলা হয় ফার্মিয়ন, যেমন কোয়ার্ক ও লেপ্টন শ্রেণির কণিকাগুলি। একটি প্রোটন দুটি আপ কোয়ার্ক এবং একটি ডাউন কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। একটি নিউট্রন আবার দুটি ডাউন কোয়ার্ক ও একটি আপ কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। একটি আপ কোয়ার্কের আধান ধনাত্মক এবং তার মাণ একটি ইলেকট্রনের তড়িতাধানের মানের দুই-তৃতীয়াংশ, অন্যদিকে একটি ডাউন কোয়ার্কের আধান ঋণাত্মক ও ইলেকট্রনের আধানের এক-তৃতীয়াংশ। এর থেকে প্রোটন ও নিউট্রনের আধানের ব্যাখ্যা মেলে, অর্থাৎ একটি প্রোটন একটি ইলেকট্রনের সমপরিমাণ আধান সম্পন্ন, কিন্তু সেটি ধনাত্মক, যেখানে ইলেকট্রন ঋণাত্মক। একটি নিউট্রন আবার শূন্য তড়িতাধান সম্পন্ন।এ ছাড়া আরো নানা শ্রেণীর কোয়ার্ক আছে। ইলেকট্রন লেপ্টন শ্রেণির কণিকার একটি উদাহরণ।
এই ভাবেই প্রকৃতিতে পরমাণু গঠণে এবং সেই সাথে বস্তুগুলির মধ্যে ক্রিয়াশীল বলের ব্যাখ্যাতে ১৭ টি মৌলিক কণিকার (ও সেই সাথে তাদের বিপরীত কণিকাগুলিরও) অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা মেনে নেন, এবং এই কণিকা গুলির তালিকা তাদের ধর্ম ও চরিত্র অনু্যায়ী বিভিন্ন শ্রেণীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই তালিকাকে কোয়ান্টাম তত্ত্বের স্ট্যান্ডার্ড মডেল (Standard Model) বলা হয়। এই তালিকার মধ্যে হিগস বোসোন একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছে। যে প্রক্রিয়াতে মৃদু নিউক্লিয়ার বল ক্রিয়াশীল হয়, সেটি পিটার হিগস ও আরো কয়েকজন বিজ্ঞানী কোয়ান্টাম ক্ষেত্র তত্ত্ব দ্বারা ব্যাখ্যা করেন। সেই ক্ষেত্র কে সাধারণ ভাবে হিগস ক্ষেত্র বলা হয়। এই প্রক্রিয়াতে একটি বিশেষ বোসোন কণিকার ভূমিকা বিজ্ঞানীরা অনুধাবন করেন। সেটির কোয়ান্টাম বৈশিষ্ট্যগুলিও চিহ্নিত করেন।এই কণিকাটিকেই হিগস বোসোন বলা হয়। ১৯৬৮ সালে হিগস বোসোনের অস্তিত্বের ব্যাখ্যা আরো বিস্তৃত করেন বিজ্ঞানী আব্দুস সালাম, জেফ্রী গোল্ডস্টোন, এবং শেল্ডন গ্লাসো। এই কাজের ধারাবাহিকতাতেই আব্দুস সালাম, স্টিভেন ভাইনবার্গ ও শেল্ডন গ্লাসো হিগস ক্ষেত্রতত্ত্বের ব্যবহার করে তড়িচ্চুম্বকীয় বল ও মৃদু নিউক্লিয়ার বল উচ্চশক্তিতে একই ভাবে কাজ করে তার তাত্ত্বিক ব্যাখ্যা দেন। এই কারণে তাঁরা ১৯৭৯ সালে পদার্থ বিদ্যায় নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হোন।
তত্ত্বগত ভাবে হিগস বোসোনের অস্তিত্ব স্বীকৃত হলেও, এটির বাস্তব পর্য্যবেক্ষণ বিনা বিজ্ঞানীরা প্রকৃতির মৌলিক কণার স্বীকৃতি দিতে নারাজ। কিন্তু স্ট্যান্ডার্ড মডেলের আর সমস্ত কণিকার অস্তিত্ত্ব পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণিত হলেও হিগস বোসোন বহুদিনই অনাবিষ্কৃত ছিল। এই কণিকার অস্তিত্ত্ব প্রমাণের প্রয়াসের ইতিহাসও কম চমকপ্রদ নয়। হিগস কণিকার সন্ধান গত শতকের আশির দশক থেকেই শুরু। সেই সময় থেকেই পরমাণুর অভ্যন্তরের কণাগুলিকে উচ্চশক্তিতে উত্থাপিত করে মুখোমুখি সংঘর্ষের মাধ্যমে তাদের ভেঙ্গে ফেলার ও সংঘর্ষ জনিত উৎপন্ন অতিপারমাণবিক কণা ও তরঙ্গের চিহ্নিতকরণের যন্ত্র নির্মিত হয় ও বিশেষ পরীক্ষা চালানোর কার্য্যক্রম চালু হয়। বিভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা এই আন্তর্জাতিক যৌথ বিজ্ঞান গবেষণায় সামিল হোন। ইউরোপীয় নিউক্লিয়ার গবেষণা সংস্থা (European Organization for Nuclear Research), যাকে সংক্ষেপে সার্ণ (CERN) বলা হয়, তার পরিচালনায় এই পরীক্ষাদি চলে।এই কর্মকাণ্ডে সামিল হোন শতাধিক দেশের শতাধিক গবেষণাগারের সহস্রাধিক বিজ্ঞানীরা। আমাদের দেশের বিজ্ঞানীরাও তাতে যোগ দেন। সুইজারল্যান্ড-এর জেনেভাতে গঠন করা হয় বৃহৎ হেড্রণ সংঘর্ষক (Large Hedron Collider (LHC))। এটি গড়ে তুলতে দশ বছর সময় লাগে। এটি গড়ে তোলা হয় পূর্বতন একটি কণিকা সংঘর্ষকের জন্য নির্মিত সুরঙ্গের বিস্তারে। সেই সুরঙ্গটির খনন ১৯৮৩তে শুরু হয়েছিল ও শেষ হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। এটি তখন ইলেকট্রন ও পজিট্রন কণিকার সংঘর্ষের পরীক্ষায় ব্যবহৃত হোতো। এর নাম ছিল বৃহৎ ইলেকট্রন-পজিট্রন সংঘর্ষক (Large Electron-Positron Collider (LPC))। বর্তমান LHC’র সুরঙ্গটি বৃত্তাকার, যার পরিধি ২৬.৭ কিলোমিটার। মাটির ৫০ থেকে ১৭৫ মিটার নীচে এটির অবস্থান। সুইজারল্যান্ড ও ফ্রান্স এই দুটি দেশের মধ্য দিয়ে সুরঙ্গটি গেছে। ২০০৮ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হয় এবং ২০১০ সাল থেকে এটি কণিকা সংঘর্ষের পরীক্ষায় ব্যবহার হতে থাকে। এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল হিগস বোসোন-এর বাস্তব প্রমাণের জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষাদি চালানো। অবশেষে প্রায় চল্লিশ বছরের আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণার প্রয়াসের সাফল্য আসে। ২০১২ সালের ৪ঠা জুলাই হিগস বোসোনের অস্তিত্বের প্রমাণ মেলে।তবে তৎক্ষণাৎ সেই পর্যবেক্ষণে বিজ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে উপনীত হননি। পরীক্ষা উপলব্ধ ফলাফলের বিচার ও তত্ত্ব নির্ধারিত মৌলিক কণাটির চরিত্র ও ধর্ম (যেমন ভর, আধার, কোয়ান্টাম স্পিনের মান, প্রভৃতি) সম্পর্কে প্রায় পুরোপুরি নিঃসন্দিহান হলে পরে ২০১৩ সালের মার্চ মাসে এই ঘোষণা করা হয়। তারপরই ২০১৩’র অক্টোবরে পিটার হিগস ও ফ্রাঁসোয় এংলার্টকে তাঁদের হিগস বোসোনের অস্তিত্বের ও ভূমিকার সঠিক তাত্ত্বিক অবদানের স্বীকৃতিতে নোবেল পুরষ্কার দ্বারা সম্মানিত করা হয়। হিগস বোসোন ও অন্যান্য অতিপারমাণবিক কণিকাগুলির অনুসন্ধানের আন্তর্জাতিক সম্মিলিত বিজ্ঞানীদের এই প্রয়াসে আধুনিক বিজ্ঞানে আন্তর্জাতিক যৌথ গবেষণার গুরুত্ব ও ভূমিকা আমরা বুঝতে পারি।
∙ কৃষ্ণগহ্বর (Black Hole)
কৃষ্ণ গহ্বর-এর অস্তিত্বের সম্ভাবনা আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্বের প্রকাশকালেই মিলেছিল। কার্ল শোয়ার্যচাইল্ড ১৯১৬ সালেই দেখান যে সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদ সত্য হলে বস্তুর ঘনত্ব এমন হতে পারে যে ক্ষেত্র-কালের জ্যামিতিতে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের অতিসংকোচনে সংজ্ঞাহীনতার (Singularity) সৃষ্টি হয়। এর ফলে সেই বস্তু থেকে কোনো বস্তুকণাই এমনকি আলোক রশ্মিও নির্গত হতে পারেনা। সেই কারণেই এগুলিকে পর্য্যবেক্ষণ করা সম্ভব নয়। তাই সেই ধরণের বস্তুকে কৃষ্ণ গহ্বর নামে অভিহিত করা হয়। আইনস্টাইন যদিও এই গাণিতিক ব্যাখ্যাকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন, তবুও তিনি মনে করেছিলেন প্রকৃতি বাস্তবে বস্তুর এই দশা প্রাপ্তির অন্তরায় হবে, অর্থাৎ কৃষ্ণ গহ্বর কেবল গাণিতিক যুক্তিতেই বিরাজমান। বাস্তবে বস্তুর অবস্থা কখনই এমন হবেনা।
কিন্তু ক্রমশই কৃষ্ণ গহ্বরের বাস্তব অস্তিত্বের সমর্থনে নানা ঘটনা ও বস্তু বিজ্ঞানীদের নজরে আসে। ১৯৬৭ সালে জোসেলিন বেল বুর্ণেল নিউট্রন নক্ষত্র আবিষ্কার করলে, এই ধরণের অতিঘন বস্তু ও তার প্রভাবে মহাকর্ষ ক্ষেত্রের সঙ্কোচনের বিষয়টি প্রামাণ্যতা পায়।১৯৭১ সালে বিভিন্ন বিজ্ঞানীরাই পৃথকভাবে সিগ্নাস এক্স -১ নামক একটি এক্সরে বিকিরণের মহাজাগতিক বস্তুকে সম্ভাব্য কৃষ্ণ গহ্বর হিসাবে চিহ্নিত করেন। এই সমস্ত সাক্ষ্য থেকে কৃষ্ণ গহ্বর গঠনের যে প্রকল্পটি বিজ্ঞানীদের আকৃষ্ট করে তা এই যে এটি নক্ষত্রের সর্বশেষ দশা। নক্ষত্রের জ্বালানি ফুরিয়ে গেলে তার আয়তনের যে সঙ্কোচন হয় সেটাই কৃষ্ণ গহ্বর দশাতে নিয়ে যায়। এর আশেপাশের অন্য সমস্ত বস্তুই এর মহাকর্ষ ক্ষেত্রের আওতায় এলে, এর অভ্যন্তরে গমন করে। অন্য দিকে কৃষ্ণ গহ্বর বস্তুটি থেকে কিছুই নির্গত হতে পারেনা। তবে কৃষ্ণ গহ্বরের ঘুর্ণনের প্রভাবে যে বস্তুগুলি এর অভ্যন্তরে যায় তাদের সীমান্ত অতিক্রমণে তড়িচ্চুম্বকীয় বিকিরণ পর্য্যবেক্ষণ করা যায়।কৃষ্ণ গহ্বরের এই সীমানাকে তার জাগতিক দিগন্ত (Event Horizon) নামে অভিহিত করা হয়। এ ছাড়াও আরো নানা ভাবে এই বস্তুর পরোক্ষ প্রমাণ মেলে। একে ঘিরে ঘূর্ণায়মান নক্ষত্রের হদিশ মিললে, সেই নক্ষত্রের ভর ও গতির বিশ্লেষণে কেন্দ্রস্থ বস্তুটির স্থান ও ভরের হিসাবও পাওয়া যায়। যে বস্তুগুলি এই গহ্বরে নিক্ষিপ্ত হয়, তাদের নিক্ষেপণজনিত ঘর্ষণের প্রভাবে এক ধরণের তপ্ত বলয় এটিকে ঘিরে থাকে। এগুলির কোনো কোনোটি কোয়াসার গঠন করে, যেগুলি মহাকাশের অত্যুজ্জ্বল বস্তুগুলির নিদর্শন। এই কৃষ্ণ গহ্বর কোনো নিকটে আসা নক্ষত্রকে আকর্ষিত করে আত্মস্থ করার কালে সেই নক্ষত্রটির ক্ষয়ের বস্তুধারা অস্বাভাবিক উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। সেই ঘটনার পর্যবেক্ষনেও কৃষ্ণ গহ্বরের উপস্থিতি বোঝা যায়। এইভাবে বিভিন্ন ধরণের পর্য্যবেক্ষণের ফলে বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন যে প্রতিটি গ্যালাক্সির কেন্দ্রেই একটি অতি বৃহৎ কৃষ্ণ গহ্বর (Super Massive Black Hole) আছে। যেমন আমাদের এই গ্যালাক্সির কেন্দ্রের কৃষ্ণ গহ্বরটি সিগ্নাস এক্স-১, এমনি ভাবা হয়।
তবে বিজ্ঞান যেকোনো তাত্ত্বিক বা প্রকল্পিত ধারণার বাস্তব প্রমাণ যতক্ষণ না পায়, তার স্বীকৃতি দেয়না। সেই কারণেই কৃষ্ণ গহ্বরের এতো শত পরোক্ষ সমর্থন মিললে, এটির প্রত্যক্ষ প্রমাণ না পাওয়া অবধি, এটি কল্পনার জগতেই থেকে যায়। বিজ্ঞানীরা তাই সচেষ্ট হোন এই বস্তুটির অস্তিত্বের আরো প্রত্যক্ষ প্রমাণ সংগ্রহে। এখানেও যেভাবে হিগস বোসোন আবিষ্কারে আন্তর্জাতিক মহল জোট বাঁধেন, সে ভাবেই নানা দেশের বিজ্ঞানীরা যৌথ গবেষণায় অংশগ্রহণ করতে এগিয়ে আসেন।কৃষ্ণ গহ্বরের মহাজাগতিক দিগন্তের ছবি তুলতে তাঁরা সচেষ্ট হোন। সেই ছবিতে যদি এই দিগন্তের সাক্ষ্য মেলে, যেটি একটি কৃষ্ণকায় বৃত্তকে ঘিরে থাকে, তবে কৃষ্ণ গহ্বরের উপস্থিতির প্রত্যক্ষ প্রমাণ মেলে। সমস্যা এই যে বস্তুটি এতোই ক্ষুদ্র (মহাজাগতিক মানদণ্ডে), যে তাকে সাধারণ রেডিও টেলিস্কোপে প্রয়োজনীয় দৃশ্যমানতা ও স্বচ্ছতায় ধরা সম্ভব নয়। এই কারণে বিজ্ঞানীরা মহাজাগতিক দিগন্ত টেলিস্কোপ বা ইভেন্ট হরাইজন টেলিস্কোপ (Event Horizon Telescope (EHT)) নির্মান করেন। এই ব্যবস্থায় ৮টি অতি বৃহৎ রেডিও টেলিস্কোপ চার মহাদেশের ৬টি পর্বত শিখরে বসানো হয়, এবং সেগুলি দিয়ে যুগপৎ একই বস্তুর অতি উচ্চ কম্পাঙ্কের রেডিও চিত্র গ্রহণ করা হয়। এর মাধ্যমে কার্য্যত একটি অতি বৃহৎ টেলিস্কোপ-এর মাধ্যমে ছবি তুললে যে গুণমান পাওয়া সম্ভব, সেটি অর্জন করা যায়। সেটি একটি অতি বৃহৎ কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্রগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় কৌণিক দৃশ্যমান বজায় রাখে। মহাজাগতিক দিগন্ত টেলিস্কোপ ২০১৭ সালের এপ্রিল মাসে দশবার একটি অনুমিত কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্র গ্রহণ করে।যে বস্তুটির চিত্র নেওয়া হয় সেটি ছিল এম-৮৭* (M-87*)। এটি মিথুন (Virgo) রাশিতে মেসিয়ার ৮৭’র (Messier-87) কেন্দ্রে অবস্থিত।এটি কৃষ্ণ গহ্বরের পরোক্ষ প্রমাণাদির দ্বারা সমর্থিত। সেই চিত্রগুলিকে তারপর প্রায় দু’বছর বিশ্লেষণ করে এবং কম্পিউটার গণনার সাহায্য নিয়ে কৃষ্ণ গহ্বরের চিত্রটি নির্মান করা হয়। অবশেষে ২০১৯এর ১০ই এপ্রিল এই কৃষ্ণ গহ্বরের ছদ্ম-বর্ণ (Pseudo color) সহ একটি চিত্র প্রকাশ করা হয়। সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব সমর্থিত চিত্রটির কেন্দ্রে একটি কৃষ্ণ ছায়া দেখা যায়, সেই সাথে তার চার পাশে অত্যূজ্জ্বল মহাজাগতিক দিগন্তের বিকিরণ লক্ষ্য করা যায়। এই বিকিরণের কম্পাঙ্কের হ্রাস বৃদ্ধির ডপলার (Doppler) বিশ্লেষণে কৃষ্ণ গহ্বরটি ঘড়ির কাঁটার আবর্তন (Clock-wise rotation) অনুযায়ী যে ঘূর্ণায়মাণ সেটিও বোঝা যায়। এইভাবেই বস্তুর বাস্তব পর্য্যবেক্ষণে আইনস্টাইনের সার্বিক আপেক্ষিকতাবাদ তত্ত্বের সঠিকতা এমন চরম শর্তাবলীতেও প্রমাণিত হয়। স্বয়ং আইনস্টাইনও এ ব্যাপারে নিশ্চিত ছিলেন না।
∙ বিসৌর গ্রহ (Exoplanet)
এই ব্রহ্মাণ্ডে পৃথিবীর মত অন্য কোনো গ্রহে প্রাণ আছে কিনা সে বিষয়ে মানুষের কৌতূহল চিরকালীন।আমাদের ছোটোবেলাতে মঙ্গল গ্রহ নিয়ে কল্পবিজ্ঞানের এমন গল্প আমরা অনেক পড়েছি। এখন অবশ্য সেই মঙ্গলে পাড়ি দিচ্ছে মহাকাশযান।সেখানকার জমিতে স্বয়ংক্রিয় ও পৃথিবী থেকে পরিচালিত রোবটযান (Rover) ঘুরে বেড়াচ্ছে। কয়েক বছর পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিজ্ঞান সংস্থা নাসা (NASA) মহাকাশচারী মানুষ পাঠাবার পরিকল্পনা করছে। তাই মঙ্গল নিয়ে সেই কল্পনার উত্তেজনা আজ স্তিমিত। তবুও মঙ্গলের মাটিতে অল্প হলেও জল ও প্রাণের আদিম আভাসবাহী কোনো জীবাণুর সন্ধানে সেখানে বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধান চলছে।
কিন্তু এই সৌর জগতের বাইরে যে বিপুল বৈচিত্র্য ও বহু নক্ষত্র-গ্যালাক্সির সমাবেশ, সেখানে কি কোনো নক্ষত্রকে ঘিরে ঘুরে চলা গ্রহতে প্রাণ থাকতে পারেনা? কয়েক বছর পূর্বে হলিউডে নির্মিত ‘অবতার’ নামে একটি জনপ্রিয় সিনেমাতে এমনি একটি গ্রহের কম্পিউটার অ্যানিমেশন আমাদের কল্পনার জগতকে নাড়া দিয়েছিল। তবে বিজ্ঞান কল্পবিলাসী নয়। বিজ্ঞানের মৌল প্রস্তাবনাতে এটি গৃহীত যে, জাগতিক নিয়মগুলি এই ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্রই সমান। সে কারণে অন্য নক্ষত্রগুলির যে গ্রহ থাকবে ও তাদের কেউ কেউ এই পৃথিবীর মতই জীবন ধারণের সহায়ক এ কথা বিজ্ঞানীরা অনুমান করেন। কিন্তু বাস্তব প্রমাণ ছাড়া এই বক্তব্যের স্বীকৃতি দিতে অপারগ।
বিসৌর গ্রহ অর্থাৎ সৌর জগত বহির্ভূত গ্রহের সন্ধানে জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরেই সচেষ্ট।এই গ্রহগুলি পৃথিবী থেকে সরাসরি পর্য্যবেক্ষণ করার মত শক্তিশালী টেলিস্কোপ বানানো শক্ত। তবুও সেরকম কিছু টেলিস্কোপ দিয়েই বিজ্ঞানীরা এই গ্রহের সন্ধান করেছেন। সে ক্ষেত্রে কেবল বৃহৎ গ্রহগুলিই এই টেলিস্কোপগুলিতে ধরা পরেছে। সেই গ্রহগুলি আবার পৃথিবীর থেকে বহুগুণে বড়, এবং নক্ষত্র থেকে বহুগুণ দূরে আবর্তিত হয়। ফলে পৃথিবীসম গ্রহের সন্ধান এই সমস্ত টেলিস্কোপ দ্বারা সম্ভব নয়। সেই কারণে বিসৌর গ্রহ পর্য্যবেক্ষণে পরোক্ষ প্রমাণাদির সাহায্য বিজ্ঞানীরা নেন।যেমন নক্ষত্রকে আবর্তন কালে গ্রহটি তার সামনে দিয়ে গেলে নক্ষত্রের ঔজ্জ্বল্যের যে পর্য্যায়ক্রমিক তারতম্য হয়, তার বিশ্লেষণে এই ধরণের আবর্তিত গ্রহের উপস্থিতি বোঝা সম্ভব। এছাড়া আবর্তনের গতি, কাল, গ্রহের ভর এই রকম আরো অন্যান্য তথ্যের বিচারে তবেই গ্রহের প্রামাণ্যতা মেলে।এর সাথে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর কক্ষে মহাকাশে উপগ্রহের মাধ্যমে টেলিস্কোপ স্থাপন করে তাদের পর্য্যবেক্ষণ ক্ষমতা বহুগুণে বাড়িয়ে নিয়েছেন। ২০০৯ সালে নাসা পৃথিবীর মত বিসৌর গ্রহের অনুসন্ধানে কেপলার মহাকাশ টেলিস্কোপ (Kepler Space Telescope) মহাকাশে স্থাপন করে।এই টেলিস্কোপটি আমাদের গ্যালাক্সির সূর্য্যসম নক্ষত্রগুলিকে (Main Sequence Stars) পর্য্যবেক্ষণে নিয়োজিত হয় । প্রায় দেড় লক্ষ এইরকম নক্ষত্র কে দেখার জন্য মহাকাশের একটি নির্দিষ্ট অভিমুখে টেলিস্কোপটিকে রাখা হয়। এটি দিয়ে আড়াই হাজারেরও বেশী গ্রহের সন্ধান মেলে। ২০১৮ সালে কেপলার টেলিস্কোপের কার্য্যকারিতা শেষ হয়। তারপর টেস (Transiting Exoplanet Survey Satellite (TESS)) নামক আরো একটি টেলিস্কোপ মহাকাশে একই উদ্দেশ্যে স্থাপন করা হয়। এটা প্রতি নিয়তই মহাকাশের নক্ষত্রগুলির ছবি পাঠিয়ে যাচ্ছে। এ যাবৎ পাঁচ সহস্রাধিক বিসৌর গ্রহের সন্ধান এই সমস্ত টেলিস্কোপ সহযোগে পাওয়া গেছে। এই গ্রহগুলির মধ্যে কতকগুলিকে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর মতই বাসযোগ্য বলে অনুমান করেন।২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর সমান আয়তনের এবং সম্ভাব্য জীবনধারণের উপযোগী একটি গ্রহের প্রথম খোঁজ মেলার ঘোষণা করেন। এটির নাম রাখা হয় TOI-700 d । এইভাবে প্রতিবছরই বিজ্ঞানীরা নিত্য নতুন বিসৌর গ্রহের সন্ধান পাচ্ছেন। প্রযুক্তির বিকাশের সাথে সাথে সৌর বা বিসৌর গ্রহে প্রাণের অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা আরো তীব্র হবে ও এ বিষয়ে বহু রহস্যের উন্মোচন হবে।কল্পবিজ্ঞানের গল্পের তুলনাতে বিজ্ঞানীদের এই অনুসন্ধানের কর্মকাণ্ড্য ও নতুন নতুন ভিন্ নক্ষত্রদুনিয়ার আবিষ্কার কোনো অংশেই কম রোমহর্ষক নয়।
∙ প্রাণের সংকেতোদ্ধার
প্রাণের উন্মেষ ও উৎপত্তির কারণ জানার কৌতূহল মানুষের সভ্যতার ঊষা লগ্ন থেকেই। বিভিন্ন প্রাচীন ও অপেক্ষাকৃত নবীন ধর্মের দার্শনিক ব্যাখ্যাতে ও পৌরাণিক আখ্যানে এই পৃথিবী ও দূরাকাশের গ্রহ-নক্ষত্র, সূর্য, চাঁদ এ সবের সৃষ্টির সাথেই প্রাণের আবির্ভাবের প্রশ্নটিও সমোচ্চারে আলোকিত। বিশেষ করে অন্যান্য প্রাণীদের মাঝে চিন্তাশীল ও সৃষ্টিশীল মানুষের উদ্ভব কীভাবে হয়েছে এই জিজ্ঞাসা আমাদের পূর্বপুরুষদের ভাবিয়েছিল।প্রাণের সংজ্ঞা জড়বস্তুর মত অত সরল নয়। জড়বস্তুকে যেমন ভর ও শক্তির সমন্বয়ে বোঝা ও বোঝানো সম্ভব, জৈববস্তুর প্রাণের বাস্তবতার রহস্য এখনো অনেকটাই বোঝা বাকী।
প্রাণ সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞানের ধারণা গড়ে ওঠে সপ্তদশ শতক থেকে। ১৬৫৫ সালে ইংল্যান্ডের বিজ্ঞানী রবার্ট হুক সদ্য উদ্ভাবিত অণুবীক্ষণ যন্ত্রে একটি বোতোলের গাছের বাকল থেকে তৈরি ছিপিতে (Cork) কোষকক্ষের জাল দেখতে পান। এই অণুবীক্ষণ যন্ত্রের স্রষ্টা ছিলেন হল্যান্ডের নাগরিক অ্যান্টনি ভ্যান লিউভেনহোয়েক। তিনিও রবার্ট হুকের আবিষ্কারে উৎসাহিত হয়ে আরো অন্যান্য বস্তু এই ভাবে পর্য্যবেক্ষণ করতে উৎসাহী হয়ে ওঠেন, এবং জলকণাতে ব্যাক্টিরিয়া ও জীবাণুকোষ প্রত্যক্ষ করেন। ১৮৩৯ সালে জার্মানীর ম্যাথিয়াস জ্যাকব শ্লাইডেন ও থিওডর শোয়ান প্রাণের অস্তিত্বে কোষতত্ত্বের অবতারণা করেন। তাঁরাই প্রথম বলেন যে সমস্ত জীবই এক বা একাধিক স্বতন্ত্র কোষের সমাহারে গঠিত। জীবের গঠন ও প্রাণের স্পন্দনের ক্ষুদ্রতম আধার একটি কোষ। ১৮৫৮ সালে জার্মান জীববিজ্ঞানী রুডলফ ভির্শো এই তত্ত্বের অবতারণা করেন যে একটি কোষের বিভাজন থেকেই অন্য কোষের উৎপত্তি। ক্রমশ কোষের অভ্যন্তরে নিউক্লিয়াস (Nucleus), সাইটোপ্লাজম (Cytoplasm) ইত্যাদি বিভিন্ন উপাঙ্গের (Organelle) ভূমিকাও বিজ্ঞানীরা বুঝতে পারেন।
এই সময় দুটি যুগান্তকারী তত্ত্বের ব্যাখ্যা পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ও বিকাশ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণায় আমূল পরিবর্তন আনে।এর একটি ছিল ব্রিটিশ জীববিজ্ঞানী চার্লস ডারউইন প্রবর্তিত প্রাণিজগতে প্রাকৃতিক নির্বাচনের দ্বারা বিবর্তনের তত্ত্ব। এই তত্ত্বের ব্যাখ্যাতে পৃথিবীতে সরল বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন জীব থেকে আরো জটিলতর জীবের আবির্ভাব ও উত্তরণের স্বীকৃতি মেলে। তাই এই তত্ত্ব অনুযায়ী পৃথিবীতে প্রাণের আবির্ভাব ও শুরু এককোষী জীব থেকে হয়। ১৮৭৭ সালে ডারউইন তাঁর বিখ্যাত বই ‘On the origin of species ’ প্রকাশ করেন। এই বইটির সম্পুর্ণ নাম ছিল ‘On the origin of species by natural selection or the preservation of favored races in the struggle for life’ অর্থাৎ ‘প্রাকৃতিক নির্বাচন দ্বারা প্রাণী জগতের উদ্ভব অথবা জীবন ধারণের প্রাকৃতিক সংগ্রামে অনুকূল প্রজাতির অস্তিত্ব রক্ষা’। বইটি প্রকাশের সাথে সাথেই ডারউইন তীব্র সমালোচনার সম্মুখীন হোন, বিশেষ করে ধর্মীয় যাজকেরা ও তাঁদের সমর্থক বিজ্ঞানীদের বিরোধিতার সামনে পরেন। কিন্তু বিজ্ঞানের বস্তুনিষ্ঠ অবস্থান পরবর্তী কালে তাঁর তত্ত্বের মৌলিক ব্যখ্যাগুলির সঠিকতার পক্ষে রায় দেয়।
অন্য যুগান্তকারী ঘটনা ছিল অস্ট্রিয়ান যাজক ও জীববিজ্ঞানী গ্রেগর যোহান মেন্ডেলের বংশপরম্পরায় উত্তরাধিকার প্রবাহের সূত্র (Laws of inheritance)। ১৮৫৬ থেকে ১৮৬৩ সাল এই সাত বছর ধরে তিনি কড়াইশুঁটির প্রজাতির সঙ্করপ্রজননের পরীক্ষা চালান ও অবশেষে পরীক্ষালব্ধ ফলের ব্যাখ্যা উপস্থাপিত করেন। এই ব্যাখ্যাতে তিনি বলেন যে জীবদেহের বৈশিষ্ট্যগুলি এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে স্বতন্ত্র এককে (Discrete unit) প্রবাহিত হয়। একই ধর্মের বহিঃপ্রকাশে একাধিক বৈশিষ্ট্য তাদের স্বতন্ত্র এককে অবস্থান করে এবং তাদের কেবল একটির বাহ্যিক প্রকাশ হয়, ও অন্যগুলি সুপ্ত থাকে। মেণ্ডেল তাঁর এই ব্যাখ্যার সপক্ষে বিভিন্ন প্রজন্মের প্রজাতি গুলির বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য প্রকাশের সংখ্যার অনুপাতগুলির তাত্ত্বিক মানের সাথে পর্য্যবেক্ষিত মানের তুলনা করেন। পরীক্ষা লব্ধ ফল তাত্ত্বিক মাণগুলির খুবই কাছে থাকে। মেন্ডেলের এই যুগান্তকারী পর্য্যবেক্ষণ ও তত্ত্ব অবশ্য সমসাময়িক বিজ্ঞানজগত উপেক্ষা করেছিল। যেখানে ডারউইনকে প্রবল বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়েছিল, মেন্ডেল-এর তত্ত্ব নিয়ে বিজ্ঞানীরা কোনো উৎসাহই দেখান নি। সমসাময়িক ধারণায় প্রজাতি পরম্পরায় বৈশিষ্ট্যগুলির মিশ্র প্রবাহের তত্ত্বকে প্রাধান্য দেওয়া হোতো। এমন কি ডারউইন মেণ্ডেলের পরীক্ষার ফলাফলের বিষয়ে অজ্ঞাত ছিলেন। মেণ্ডেলের স্বতন্ত্র এককে বংশপরম্পরায় বৈশিষ্ট্যের উত্তরাধিকারের তত্ত্বের তাৎপর্য্য অনুভব করা হয় প্রায় আরো পঞ্চাশ বছর পরে বিংশ শতকের গোড়াতে। যদিও মেণ্ডেল জীবদ্দশায় যথাযথ স্বীকৃতি থেকে বঞ্চিত ছিলেন, তাঁর এই বৈপ্লবিক তত্ত্বই আধুনিক জিনবিদ্যার (Genetics) সূচনা করে। বিবর্তন ও বংশগতির উত্তরাধিকার জীবের অস্তিত্ব বজায় রাখতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। সেই কারণেই আধুনিক বিজ্ঞানে প্রাণের ব্যাখ্যায় আমেরিকান মহাকাশ সংস্থা নাসা প্রাণসম্পন্ন কোনো বস্তুকে এইভাবেই সংজ্ঞায়িত করে, ‘এটি একটি স্বয়ংরক্ষিত রাসয়ানিক বিক্রিয়া ঋদ্ধ ব্যবস্থা, যা ডারউইনের তত্ত্বানুসারী বিবর্তণে সক্ষম’ (A self-sustainable chemical system capable of undergoing Darwinian Evolution’) ।
ঊনবিংশ শতকের আশির দশকে জার্মান বিজ্ঞানী থিওডর বোভেরি নিউক্লিয়াসের অভ্যন্তরের ক্রোমোজোমগুলিতে বংশগতির উত্তরাধিকার প্রবাহিত এই তত্ত্ব প্রবর্তন করেন। পরবর্তীকালে উনিশ শতকের গোড়াতেই মেণ্ডেলের সূত্রের প্রতি তাঁর দৃষ্টি যায়। সেই সূত্রের ব্যাখ্যাতে তিনি
অনুমান করেন যে বংশগতির উত্তরাধিকারের স্বতন্ত্র এককগুলি কোষের নিউক্লিয়াসে অবস্থিত ক্রোমোজোমগুলিতে অবস্থান করে। একই প্রজাতির সমস্ত জীবের কোষে সমসংখ্যক ক্রোমোজোম থাকে এবং সেই সংখ্যাটিও প্রকৃতিতে নির্দিষ্ট। যেমন মানুষের কোষে এই সংখ্যাটি ৪৬ বা তেইশ জোড়া। জোড়া বলার কারণ এই যে মানব কোষে একই ধরণের ক্রোমোজোম দুটি করে থাকে। এটা মেণ্ডেলের সূত্রের একই বৈশিষ্ট্যের একাধিক রূপের (যেমন কড়াইশুঁটির ফুলের পাঁপড়ির বর্ণ সাদা, হলুদ, বেগুনী প্রভৃতি হয়) স্বতন্ত্র এককের অবস্থানকেই সমর্থন করে। একই ধরনের ক্রোমোজোমের সমষ্টিকে বলা হয় ‘সমগোত্রীয় ক্রোমোজোম’ (Homologus chromosome) সমষ্টি। জীবজগতের অন্যান্য প্রাণীদের কোষে ক্রোমোজোমের সংখ্যা ভিন্ন হতে পারে। সেই সাথে ‘সমগোত্রীয় ক্রোমোজোমের সমষ্টির’ সংখ্যাও ভিন্ন হতে পারে। সাধারণত এই সমষ্টির সংখ্যা ২, এবং এই ধররণের জীবকোষকে বলা হয় ডিপ্লয়েড (Diploid) । তবে কোনো কোনো জীবের ক্ষেত্রে এটি দুয়ের বেশীও হতে পারে। যেমন শিম্পাঞ্জির ক্রোমোজোমের সংখ্যা ৪৮ ও সমগোত্রীয় ক্রোমোজোম জোড়ায় অবস্থান করে। কিন্তু গমের কোষে প্রতিটি সমগোত্রীয় ক্রোমোজোম ৬ টি সংখ্যায় রয়েছে। তাই সেক্ষেত্রে ক্রোমোজোমের সংখ্যা ৪২ হলেও, কেবল সাতটি ভিন্ন ক্রোমোজোম রয়েছে। তাই গমের কোষ হেক্সাপ্লয়েড (Hexaploid)। এমন জীবও আছে যেখানে প্রতিটি ক্রোমোজোমই ভিন্ন, অর্থাৎ সেই জীবকোষ হ্যাপ্লয়েড (Haploid)। তবে সরল জীবের কোষে নিউক্লিয়াস নাও থাকতে পারে। এই ধরণের জীবকে বলা হয় প্রোক্যারিয়ট (Prokaryot)। যেমন, ব্যাক্টিরিয়া। সেক্ষেত্রে এই জীবকোষে কেবল একটি ক্রোমোজোমই থাকে। সেটির আকৃতি বৃত্তাকার। সাধারণত সরল জীবকোষের তুলনায় জটিল জীবকোষের ক্রোমোজোম সংখ্যা বেশী। যেমন ইউক্যারিয়ট (Eukaryot) জীবের কোষে অর্থাৎ নিউক্লিয়াস সম্পন্ন জীবকোষে এই সংখ্যা একাধিক। এমনকি এককোষী ঈষ্ট-এর (Yeast) ক্রোমোজোমের সংখ্যা ১৬। তবে জীবজগতের বিবর্তনের বহুমুখী ধারায় ক্রোমোজোমের সংখ্যা বিচারে জীবেদের আবির্ভাবের অগ্রপশ্চাৎ নির্ণয় করা উচিত নয়। প্রাণিজগতের অপেক্ষাকৃত সরল জীবন চক্রের প্রজাতির কোষে অধিক সংখ্যক ক্রোমোজোম থাকতে পারে। যেমন শামুকের কোষে ৫৪টি ক্রোমোজোম আছে, যেখানে মানুষের আছে ৪৬টি। তবুও জীবজগতের উৎপত্তি ও বিকাশে এবং বিবর্তনের ধারায় মানুষের আবির্ভাবে ক্রোমোজোমের যে ভূমিকা আছে, বিজ্ঞানীরা সেটি গত শতকের প্রথম দশক থেকেই অনুধাবন করেছিলেন।
বর্তমানে আমরা এই ক্রোমোজোমের গঠন আরো বিস্তারিত জানি। এই ক্রোমোজোমে ডি-অক্সি রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (Dioxyribonucleic acid) বা DNA রয়েছে। DNA একটি জৈব অণু। এটির চারটি মৌলিক এককাণু (Nucleotide) আছে যার সংকলনে এটি গঠিত। এই চার ধরণের মৌলিক এককের সংক্ষিপ্ত নাম অ্যাডেনিন (Adenine), গুয়ানিন (Guanine), থায়ামিন (Thymine), ও সাইটোসিন (Cytosine)। এদের যথাক্রমে ইংরেজি অক্ষরের A, G, T ও C দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। একটি ক্রোমোজোম দুটি সর্পিল সুতার সমন্বয়ে গঠিত, যার প্রতিটি সুতাই DNAর এককাণুতে গ্রন্থিত।তবে একটি সুতার অণু অন্য সুতাটিতে গ্রন্থিত অণুর সাথে রাসয়ানিক বন্ধনে যুক্ত। এদের জোড় বাঁধারও একটি নিয়ম আছে। অ্যাডেনিন ও থায়ামিন দুইটি সুতার মাঝে পরস্পরের সাথে যুক্ত থাকে। সেরকমই সম্পর্ক দেখা যায় গুয়ানিন ও সাইটোসিনের জোড়ে। যদি কোনো DNA কে টান টান খাড়াখাড়ি দাঁড় করানো যেত, তবে সেটি অনেকটা ঘোরানো মইয়ের আকৃতি নিত। মইয়ের দু ধারের শক্ত দণ্ডদুটির মত DNAর দুটি সুতা অবস্থান করে ও মইয়ের সিঁড়িগুলির ন্যায় জোড় বাঁধা নিউক্লিক এককাণুগুলির সারি অবস্থান করে। অবশ্য DNA একটি নমনীয় সুতা যা অতিসঙ্কুচিত ও অনেকটা উলের বলের মতই বিভিন্ন প্রোটিন দ্বারা গঠিত বলগুলিতে জড়ানো থাকে। DNAর এই গঠন ১৯৫৩ সালে ব্রিটিশ বিজ্ঞানীদ্বয় ফ্রান্সিস ক্রিক ও জেমস ওয়াটসন প্রস্তাব করেন। তাঁরা রোজালিন ফ্রাঙ্কলিন ও তাঁর ছাত্র রেমণ্ড গস্লিং দ্বারা DNA অণুর এক্স রে বিচ্যুতির চিত্র বিশ্লেষণ করে DNAর এই গঠন চিত্রের প্রস্তাব করেন। পরবর্তী কালে আরো নানা পরীক্ষাতে তাঁদের এই ব্যাখ্যা সমর্থিত হলে ১৯৬২ সালে তাঁরা চিকিৎসাশাস্ত্রে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত হোন। দুঃখের বিষয় রোসালিন ফ্রাঙ্কলিন সেই সময় বেঁচে না থাকায় তিনি এই সম্মানের ভাগীদার হতে পারেননি।
DNAর সুতাগুলির এককাণুর ক্রমধারাই ক্রোমোজোমটির পরিচয়। যেমন ATACGTG একটি ক্ষুদ্র DNA সুতার অংশ হতে পারে। অবশ্য ক্রোমোজোমে DNA সুতার দৈর্ঘ্য বহুগুণ হয়। DNA র দুটি সুতার একটির ক্রমধারা যে প্রান্ত থেকে শুরু হয়, অন্য সুতাটিতে সেটির শুরু তার বিপরীত প্রান্ত থেকে। যেহেতু দুটি সুতার DNAর এককাণুগুলি জোড় বাঁধে এবং সেও একটি নির্দিষ্ট নিয়মে, যা আগে বলা হয়েছে, তাই একটি সুতার অণুক্রম অন্য সুতার অণুক্রমকে নির্নয় করতে পারে। যেমন পূর্বোদাহরন অনুযায়ী ওই সুতাটির পাঠের দিক বজায় রাখলে এটিকে এইভাবে সাজানো যায় TATGCAC । তবে বিপরীতক্রমের সুতার এই অংশটি পড়তে হবে এইভাবে, CACGTAT।
প্রতিটি প্রজাতির যে কোনো জীবের ক্রোমোজোম গুলির DNAর এককাণুগুলির ক্রমধারা প্রায় এক থাকে। যেটুকু পার্থক্য থাকে তাতেই সেই প্রজাতির সদস্যদের বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ বৈশিষ্ট্যগুলির বৈচিত্র্যের প্রকাশ পায়। যেমন প্রতিটি মানুষের ৪৬টি ক্রোমোজোমের DNA ক্রমধারা প্রায় ৯৯.৯% এক। কেবল ০.১% স্থানে যে বৈচিত্র্য থাকে তাতেই প্রতিটি মানুষের স্বতন্ত্র পরিচিতি। এর ফলেই কারোর গায়ের রং সাদা, কালো, বাদামী বা শ্যামলা, কেউ বা লম্বা, মাঝারি বা বেঁটে, ইত্যাদি। সে কারণেই কোনো প্রজাতির কোনো একজন স্বাভাবিক প্রতিনিধির কোষের ক্রোমোজোমগুলির DNA ক্রমধারার সমষ্টি সেই প্রজাতির অন্য প্রজাতিগুলির সাপেক্ষে স্বাতন্ত্র্যের পরিচায়ক। DNA ক্রমধারার এই সমষ্টিকে বলা হয় জেনোম। তবে DNA শুধু নিউক্লিয়াসের ক্রোমোজোমেই নেই।কোষের অন্য উপাঙ্গেও আছে। যেমন মাইটোকন্ড্রিয়া ও উদ্ভিদ কোষের ক্লোরোপাস্টে। এরাও জেনোম এর অন্তর্ভুক্ত। DNA ক্রমধারা যেহেতু প্রজাতির বৈশিষ্ট্যের সঙ্কেতবাহী, তাই প্রকৃতিতে প্রজাতিগুলির বিবর্তনের চিত্র গঠনে এগুলি গুরুত্বপুর্ণ ভূমিকা নিতে পারে। মানুষ ও শিম্পাঞ্জির পূর্বপুরুষ যে কালের বিচারে অপেক্ষাকৃত অর্বাচীন তা বোঝা যায় এই তথ্য থেকে যে একটি শিম্পাঞ্জির জেনোম সার্বিক ভাবে গড়মানুষের জেনোম থেকে মাত্র ১% আলাদা। ডারউইনের বিবর্তন অধ্যয়নে DNAর এই ক্রমধারা তাই আজ নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
প্রাণের স্পন্দনে DNA ক্রমধারার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা বিজ্ঞানীরা বিগত শতকের প্রথমার্ধেই অনুভব করেছিলেন। এখন সে রহস্যের অনেকটাই উন্মোচিত, যদিও প্রতিনিয়তই নতুন তথ্য এ বিষয়ে বিজ্ঞানের ভাঁড়ারে সঞ্চিত হচ্ছে। আমাদের জীবনধারণে DNA ক্রমধারার এই ভূমিকা বুঝতে গেলে কী প্রক্রিয়াতে DNAর সহায়তায় আমাদের শরীরে প্রোটিন উৎপন্ন হয় তার একটি সাধারণ ধারণা থাকা প্রয়োজন। বহু পরীক্ষা ও পর্য্যবেক্ষণ দ্বারা বিজ্ঞানীরা এই ধারণাটিকে গ্রহণ করেন। একে বলা হয় জৈব তথ্যবিদ্যার কেন্দ্রীয় ধারণা (Central Dogma of Bioinformatics)। এই ধারণা বুঝতে গেলে আরো দুটি জৈব অণুর সংক্ষিপ্ত পরিচিতি থাকা প্রয়োজন। এরা রাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড (RNA) ও প্রোটিন (Protein)। একটি RNA প্রায় একটি DNAর মতোই। তবে এটির একটিই সুতা। DNAর মতোই চারটি একই ধরনের মৌলিক এককাণুর সংকলনে গঠিত।কেবল থায়ামিন এর বদলে প্রায় সমগঠন ও সম রাসয়নিক বৈশিষ্ট্যবাহী অন্য একটি মৌলিক এককাণু থাকে, যার নাম ইউরাসিল (Uracyl)। এটিকে U অক্ষর দ্বারা চিহ্নিত করা হয়। বাকী এককাণুগুলির অক্ষর পরিচিতি একই থাকে। ইউরাসিল থায়ামিন এর মতোই অ্যাডেনিনের সাথে স্বাভাবিক জোড় বাঁধে। পূর্বোল্লিখিত DNA ক্রমধারাটি RNAর সংস্করণে এইরূপ হয়, AUACUG।
এবার দেখা যাক প্রোটিনের গঠনের স্বরূপ। প্রোটিনের মৌলিক এককাণুগুলি (Residue) এক একটি আমাইনো অ্যাসিড (Amino Acid)। প্রকৃতিতে ২০ রকমের অ্যামাইনো অ্যাসিড আছে। যেমন মেথিয়নিন, প্রলিন, লাইসিন, প্রভৃতি। এগুলিকেও ইংরেজি হরফের একটি নির্দিষ্ট অক্ষর দিয়ে চিহ্নিত করা হয়। যেমন মেথিয়নিনকে M দ্বারা বোঝানো হয়। এই প্রোটিনগুলিও তাই এই অ্যামাইনো অ্যাসিডগুলির ক্রমধারাতে প্রকাশ করা যায়। আমাদের শরীরে প্রোটিন নানা গুরুত্বপূর্ন ভূমিকা নেয়। আমাদের পেশীর তন্তু এক ধরনের প্রোটিন। বিভিন্ন শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়াতে প্রোটিন কখনো সরাসরি অংশগ্রহণ করে, কখনো বা উৎসেচকের ভূমিকা পালন করে, আবার কখনো ক্ষতিকারক জীবাণুর আক্রমণ থেকে কোষকে রক্ষা করে। এমনি বহুমুখী ভূমিকা বিভিন্ন প্রোটিন নেয়।
জৈব তথ্যবিদ্যার কেন্দ্রীয় ধারণা ব্যাখ্যা করে কিভাবে DNAর সহায়তায় দেহকোষে প্রোটিন উৎপন্ন হয়।কোষের ক্রোমোজোম বা মাইটোকন্ড্রিয়াতে স্থিত DNA ক্রমধারার কোনো কোনো অংশ এই প্রোটিন সৃষ্টিতে ভূমিকা নেয়। সেই অংশগুলিই সাধারণভাবে জিন নামে পরিচিত। একটি নির্দিষ্ট প্রোটিনের সৃষ্টিতে একটি নির্দিষ্ট ক্রমধারা বিশিষ্ট জিন অগ্রণী ভূমিকা নেয়। তবে একই জিনের একাধিক সংস্করণ DNA ক্রমধারাতে থাকতে পারে। ক্রোমোজোমের যে অংশে জিনটির ক্রমধারা আছে সেই অংশটি প্রোটিন সৃষ্টির প্রারম্ভে রাসয়ানিক বিক্রিয়ায় অংশগ্রহণের জন্য উন্মুক্ত হয়। বিক্রিয়া শেষে সেই অংশটি আবার অপরিবর্তিত থেকেই অতিসঙ্কুচিত দশাতে ফিরে যায়। প্রোটিন সৃষ্টির এই প্রক্রিয়া দুটি ধাপে হয়। প্রথম ধাপে জিনটির DNA ক্রমধারার সমরূপে একটি RNA ক্রমধারা সৃষ্টি হয়। এই ঘটনাকে বলা হয় অনুলিখন (Transcription)। RNA তৈরি হয়ে গেলে DNA আবার তার স্বাভাবিক অতিসঙ্কুচিত মোড়কে গুটিয়ে যায়। উদাহরণস্বরূপ, যদি কোনো জিনের ক্রমধারা হয়, ATGCATTTC, তবে সেটি থেকে যে RNA সৃষ্টি হয় তা এরকম, AUGCAUUUC । এই RNAটি কোষের সাইটোপ্লাজমে আরো কিছু প্রক্রিয়াতে সঙ্কেতবাহী RNAতে (Messanger RNA বা mRNA) রূপান্তরিত হয়। এর পরবর্তী ধাপে সংকেত বাহী RNA থেকে প্রোটিন তৈরি হয়। প্রক্রিয়ার এই পর্য্যায়কে বলা হয় অনুবাদন (Translation) । একটি জিন থেকে প্রোটিন উৎপন্ন হওয়ার ঘটনাকে বলা হয় ‘জিনের সম্প্রকাশ’ (Gene expression)। তবে জিনের সম্প্রকাশ প্রথম ধাপেই থেমে যেতে পারে। অর্থাৎ কেবল RNA সৃষ্টিতে। জীবকোষের বিভিন্ন প্রক্রিয়াতে এই সব RNAও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেয়। ‘জিনের সম্প্রকাশে’ সৃষ্ট প্রোটিন বা RNA ক্ষণস্থায়ী হয়। তারা হয় অন্য কোনো পদার্থে রূপান্তরিত হয় অথবা ভেঙ্গে বিনষ্ট হয়।
সংকেতবাহী RNA থেকে প্রোটিন অনুবাদনে একটি সুনির্দিষ্ট নিয়ম লক্ষ্য করা যায়। এই অনুবাদনের নিয়মগুলিকে একটি সংকেতোদ্ধারের তালিকাতে (Coding Table) লিপিবদ্ধ করা যায়। সংকেত বাহী RNAর একটি অংশে অনুবাদনের সংকেত থাকে। এই অংশটিকে বলা হয় সংকেতাংশ (Coding Section)। সেই সঙ্কেতাংশের ক্রমধারাকে তিনটি একাকাণুর জোটে বা ত্রিজোটে (Triplet) বিভক্ত করা যায়। প্রায় প্রতিটি ত্রিজোট প্রোটিন সৃষ্টিতে কোনো না কোনো অ্যামাইনো অ্যাসিডের এককাণুর সংকলনকে নির্দেশ করে। সঙ্কেতাংশে ত্রিজোটের এই ভূমিকার জন্য একে বলা হয় কোডন (Codon)। তিনটি কোডন আছে, যথা UAA, UAG এবং UGA, যেগুলি অনুবাদন সমাপ্তির নির্দেশ করে। তারা কোনো অ্যামাইনো অ্যাসিডের সংকলন ঘটায়না। আর একটি কোডন আছে (AUG), যেটি অনুবাদন শুরু করে এবং শুরুর এককাণুটি সর্বদাই হয় মেথিওনিন । যেহেতু একটি কোডনে তিনটি RNAর এককানু আছে, ৬৪ ধরণের কোডন আছে। অন্যদিকে ২০ ধরণের অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকায় একাধিক কোডন একই অ্যামাইনো অ্যাসিড সংকলনের বার্তা বহন করে। মজার ব্যাপার এই যে প্রকৃতিতে সংকেতোদ্ধারের তালিকাটি সমস্ত জীবের ক্ষেত্রেই প্রায় এক। এর কোনো রদবদল নেই বললেই চলে। বিজ্ঞানীরা এটাও অনুমান করেন যে ভিন্ গ্রহের প্রাণেও এই একই তালিকা ক্রিয়াশীল।
যেহেতু সংকেতবাহী RNAর ক্রমধারার মূল উৎস ক্রোমোজোম বা অন্য উপাঙ্গের DNAর ক্রমধারা, সেহেতু জীবকোষের DNA ক্রমধারা জানা থাকলে, সেই ক্রমধারায় প্রোটিন সৃষ্টি কারী সংকেতাংশ ও জিনের পরিচয় মেলা সম্ভব। সুতরাং যে কোনো জীবেরই জীবনচক্রে জিনের প্রভাব, বিভিন্ন রোগের কারণ, ইত্যাদি বহু অজানা তথ্য সেই জীবের জেনোমের ক্রমধারাগুলির বিশ্লেষণে মেলা সম্ভব। সেই কারণে জীবকোষের জেনোমের DNA ক্রমধারার পাঠোদ্ধারে বিজ্ঞানীদের প্রয়াস গত শতকের শেষার্ধ থেকে। এ ব্যাপারে পথিকৃৎ মার্কিন বিজ্ঞানী ফ্রেড স্যাঙ্গার ও ওয়াল্টার গিলবার্ট। তাঁরা পৃথক ভাবে স্বল্পদৈর্ঘ্যের DNAর ক্রমধারার পাঠোদ্ধারের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৯৭৩ সালে গিলবার্ট DNAর এককানুর ক্ষয়ের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। ১৯৭৭ সালে স্যাঙ্গার ক্রমধারা গঠনকালে নির্দিষ্ট এককানু দ্বারা সমাপ্তিকরণের পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। এ জন্য ১৯৮০ সালে দুই বিজ্ঞানীকে নোবেল পুরষ্কারে সম্মানিত করা হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য ১৯৫১ ও ১৯৫২তে ফ্রেড স্যাঙ্গার ৫১টি অ্যামাইনো অ্যাসিডের ক্রমধারা বিশিষ্ট গবাদিপশুর ইনসুলিন হর্মোণ, যেটি একটি প্রোটিন, তারও পাঠোদ্ধার করেন। সে জন্যও তাঁকে ১৯৫৮ সালে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। ১৯৮০ পরবর্তী DNAর পাঠোদ্ধারে প্রায় দু’দশক স্যাঙ্গারের পদ্ধতিই জনপ্রিয় হয়। তবে জেনোমের অন্তর্ভুক্ত ক্রোমোজোম ও অন্যান্য উপাঙ্গের DNA ক্রমধারার দৈর্ঘ্য বহুগুণ। সেই কারণে সেই ক্রমধারার একটি দিক থেকে ক্ষুদ্র খণ্ডের এই পাঠ শুরু হোতো, এবং সেটির পাঠোদ্ধারে তার শেষাংশের বিস্তারে লাগোয়া খণ্ডটিকে পড়া হত। এইভাবে ক্রমাগতই ক্রমধারার একটি প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের দিকে পাঠ এগিয়ে চলত। জেনোম পাঠের এই পদ্ধতিকে তাই বলা হয় সংলগ্ন খণ্ড পাঠের পদ্ধতি। অন্য পদ্ধতিতে ক্রমধারাকে বহু খণ্ডে বিভক্ত করে, সেই খণ্ডগুলিকে পৃথকভাবে পাঠ করে এবং তাদের যথাযথ জুড়ে তবেই সেই ক্রমধারার সার্বিক চিত্র মেলে। এটিকে বলা হয় শট গান ক্রমধারা পাঠের পদ্ধতি। ক্রমশ দ্বিতীয় পদ্ধতিটিই জনপ্রিয় হয়। এই সমগ্র জেনোম পাঠের পদ্ধতি তাই শুধু ব্যয় সাপেক্ষই নয়, এটি সময় সাপেক্ষও। প্রথম দিকে তাই জীবদেহের জেনোমের পাঠোদ্ধার ধীর গতিতে শুরু হয়, সে ও শুরু হয় সরল এককোষী ব্যাক্টিরিয়া ও ইউক্যারিয়ট-এর জেনোমের পাঠোদ্ধারে। সমগ্র জেনোম পাঠের শুরু ব্যাক্টিরিও ফাজ ভাইরাস দিয়ে ১৯৭৬ সালে। ১৯৯২ সালে ঈস্ট এর তৃতীয় ক্রোমোজোমের সম্পূর্ণ পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়। এটিই ছিল প্রথম কোনো ক্রোমোজোমের পাঠোদ্ধার। ১৯৯৫ সালে প্রথম একটি জীবকোষের সমগ্র জেনোমের পাঠোদ্ধার হয়। সেটি ছিল হেমোফিলাস ইনফ্লুয়েঞ্জা নামক একটি ব্যাক্টিরিয়ার। ১৯৯৬ তে এককোষী ঈস্ট এর সমগ্র জেনোম জ্ঞাত হয়। ১৯৯৮তে প্রথম বহুকোষী প্রাণী নেমাটোড কৃমির জেনোম পাঠ সম্পূর্ণ হয়। ক্রমে আরো কিছু প্রাণী ও উদ্ভিদ এই তালিকাতে যুক্ত হয়। যেমন ফলের মাছি ও এক ধরণের গুল্ম লতা। ১৯৯৯ তে মানব কোষের ২২ নং ক্রোমোজোমের ক্রমধারা গঠন করা হয়। সম্পূর্ণ মানব জেনোমের প্রথম খসড়া প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। এতে কিছু অসম্পূর্ণতা ছিল। সেই পাঠ সম্পূর্ণ হয় এ বছর ২০২২-এ। ক্রমশ জেনোম পাঠের প্রযুক্তির দ্রুত অগ্রগতি হয়। এর ফলে যে কোনো জীবের জেনোম পাঠ স্বল্প ব্যয়ে ও অতিদ্রুত সম্ভব। এখনো পর্যন্ত সহস্রাধিক জীবের জেনোমের ক্রমধারা বিজ্ঞানের ভাণ্ডারে সঞ্চিত, এবং প্রতিনিয়ত সে ভাণ্ডার সমৃদ্ধ হচ্ছে।
জেনোম পাঠ জীববিজ্ঞানে গবেষণার আরো বহু দিক খুলে দিয়েছে। এই ক্রমধারার বিশ্লেষণ ও জীবনচক্রে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলিকে বোঝা ও চিহ্নিত করণ সেই গবেষণার একটি মুখ্য বিষয়। বিভিন্ন অসুখের সাথে জেনোম বৈচিত্র্যের যোগাযোগ স্থাপন করাও আরও একটি গুরুত্বপুর্ণ বিষয়। এককথায় মহাকাশের নতুন গ্রহ-নক্ষত্র-গ্যালাক্সি আবিষ্কারের মতই জেনোম ক্রমধারায় জীবন ধারণে নির্দিষ্ট ভূমিকায় অংশগ্রহণকারী নির্দিষ্ট অংশ বা স্থান আবিষ্কার সমান উত্তেজনাময়।
∙ পৃথিবীর ঊষ্ণায়ন (Global Warming)
শিল্পবিপ্লবোত্তর সভ্যতার ক্রিয়াকাণ্ডে কার্বণ-ডাই-অক্সাইড গ্যাস বায়ুমণ্ডলে বৃদ্ধি পায় ও তার ফলে এই গ্রহের গড় উষ্ণতা বৃদ্ধি পেতে পারে এই তত্ত্ব ১৮৯৬ সালে সুইডিশ রসায়নবিদ স্ভান্তে আঢ়েনিয়াস (Svante Arrhenius) পেশ করেন। তাঁর এই তত্ত্বের গুরুত্ব ও এর প্রভাব পরিবেশে কী সুদূরপ্রসারী ও মানব জীবনের প্রতিকূল পরিবর্তণ আনতে পারে তার সম্যক উপলব্ধি তখন সভ্য সমাজ ও বিজ্ঞানী মহল করতে পারেনি। তবে পরিবেশ গবেষণার একটি গুরুত্বপুর্ণ আবিষ্কার এর দু দশক পরে হয়। সেটি বায়ুমণ্ডলে ওজোন স্তরের আবিষ্কার ও সূর্য্য রশ্মির অন্তর্গত অতিবেগুনী রশ্মি শোষণে তার ভূমিকা। বায়ুমণ্ডলের দ্বিতীয় স্তরে (স্ট্রাটোস্ফিয়ার) ভূমির উচ্চে ১৬ থেকে ৩০ কিলোমিটার পর্যন্ত বিস্তৃত এই গ্যাসের স্তর। ১৯৭8 সালে দুই ফরাসী বিজ্ঞানী মারিয়া জে মলিনা ও শেরঊড রোল্যান্ড দেখান কিভাবে বাতাসে ভাসমান ক্লোরোফ্লুরোকার্বন বা CFC মিশ্রিত ধূলিকণা স্ট্রাটোস্ফিয়ারে পৌঁছতে পারে ও অতিবেগুনি রশ্মির সাথে বিক্রিয়া করে ক্লোরিন উৎপন্ন করে, যেটি আবার ওজোন অণুকে ভেঙ্গে ফেলে। এর ফলে বায়ুমণ্ডলে ওজোনের স্তর হাল্কা হতে থাকে, এমনকি ওজোনহীন অলিন্দের (Ozone hole) সৃষ্টি হয়, যার মধ্য দিয়ে জীবজগতের ক্ষতিকারক অতিবেগুনী রশ্মি (Ultraviolet ray) পৃথিবীর পরিবেশে প্রবেশ করে। পরবর্তীকালে ১৯৮৫ সালে আন্টার্টিকা অভিযানে ব্রিটিশ অভিযাত্রী দল তিরিশ বছরের নথি ঘেঁটে দেখান যে সেই মহাদেশের উপর এক বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে প্রতি অক্টোবর মাস নাগাদ উল্ল্যেখযোগ্য ভাবে ওজোন হ্রাস পায়। সেটি এই ওজোনহীন অলিন্দের তত্ত্বকেই সমর্থন করে। ১৯৯৫ সালে মারিয়া জে মলিনা ও শেরঊড রোল্যান্ডকে তাদের এই ব্যাখ্যার জন্য রসায়নে নোবেল পুরষ্কার দেওয়া হয়। তাঁদের এই গবেষণার স্বীকৃতিতে পৃথিবীর পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখার জন্য ওজোনস্তরের এই ক্ষয় মেরামতির উদ্দেশ্যে বিভিন্ন দেশের নীতিনির্ধারকেরা ১৯৮৭ সালে ১৬ই সেপ্টেম্বর মন্ট্রিল প্রোটোকল স্বাক্ষর করেন এবং বিশ্ব জুড়ে শিল্পে CFC ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এই সমস্ত নীতির রূপায়ণে ওজোন স্তরের প্রায় ৯৮% পুনরুদ্ধার হয়েছে, এবং আশা করা হচ্ছে এই নীতি চালু থাকলে ২০৭৫ সালে এটি গত শতকের প্রথম দশকের পরিবেশ বান্ধব অবস্থাতে ফিরে যাবে।
ওজোন পুনরুদ্ধারে যতটা সভ্য দুনিয়া তৎপরতা দেখিয়েছে, ততটাই উদাসীন গ্রীন হাউস গ্যাসের ক্রমবর্ধিত উদ্গীরণের বিপদ থেকে। প্রাকৃতিক ভাবেই বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাস জমা হয়, আবার পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাতে সেগুলি নানা ভাবে শোষিত হয়। এই সঞ্চয় ও শোষণের চক্রে একটি ভারসাম্য তৈরি হয়, যা এই পৃথিবীতে প্রাণধারণে সহায়ক। বায়ুমণ্ডলে কার্বণ-ডাই-অক্সাইড (CO2) এর স্বাভাবিক উপস্থিতি না থাকলে এই পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা প্রায় ৪০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (40oC) কম থাকত। গ্রীন হাউস গ্যাসের স্বাভাবিক উপস্থিতিই পৃথিবীর পরিবেশ বাসযোগ্য তাপমাত্রায় থাকে, যার বার্ষিক গড় ১৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড (15oC)। কার্বণ-ডাই-অক্সাইড ছাড়া অন্য গ্রীন হাউস গ্যাসগুলি হল মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড, ফ্লোরাইড যৌগের গ্যাস (F-gas) ও জলীয় বাষ্প। তবে জলীয় বাষ্পের পরিমাণ তাপমাত্রার ওঠানামাতে বাড়ে ও কমে। বাকীগুলির উপর তাপমাত্রার কোনো প্রভাব নেই। প্রায় ১০০০০ বছর ধরে শিল্পবিপ্লবের আগে পর্যন্ত (১৭৫০ সাল) পৃথিবীতে বায়ুমণ্ডলে CO2র পরিমাণ ছিল দশ লক্ষ ভাগের ২৮০ অংশ বা ২৮০ ppm (Parts par million) । প্রকৃতিতে মানুষ সহ এই জীবজগতের জীবনযাপনের সাথে মানিয়ে নেওয়া এই ভারসাম্য বজায় ছিল।
তবে শিল্পবিপ্লব পরবর্তী পৃথিবীতে প্রাকৃতিক সম্পদের উত্তরোত্তর বর্ধিত ব্যবহারে ও পরিবেশের উপর প্রভাব বিস্তারকারী মানুষের নানা কার্যকলাপে এই ভারসাম্য বিঘ্নিত হতে থাকে। এই বিষয়টির উপর প্রথম বস্তুগত পর্যবেক্ষণ দ্বারা আলোকপাত করেন মার্কিন আবহাওয়াবিদ চার্লস ডেভিড কিলিং। তাঁর উদ্যোগে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরিবেশ সংস্থা (National Oceanic and Atmospheric Administration) বা সংক্ষেপে যাকে বলা হয় নোয়া (NOAA) তাদের হাওয়াই দ্বীপের জলবায়ু কেন্দ্র থেকে ১৯৫৮ সাল থেকে বাতাসে CO2র পরিমাণ মাপা শুরু করে। সেই পরিমাপের বার্ষিক গড় থেকে পরিষ্কার বোঝা যায় কিভাবে এই পরিমাণ উত্তরোত্তর বেড়ে চলেছে। কিলিং সান্দিয়াগোর ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের (University of California, Sandiago) স্ক্রিপ্স ইনস্টিটিউট অফ ওসিয়ানোগ্রাফির (Scripps Institute of Oceanography) বিজ্ঞানী ছিলেন। তিনি প্রথম CO2র পরিমাণ ঋতুপরিবর্তনের সাথে কিভাবে ওঠা নামা করে তা লক্ষ্য করেন। ১৯৬০ সালে তিনি দেখান যে উত্তর গোলার্ধের গাছপালার বৃদ্ধির ঋতুতে এই পরিমাণ কমে এবং শীতে পাতা খসানোর সময় এবং গাছগুলি যখন ঠান্ডা বা বরফে কালো হয়ে যায় তখন সেই পরিমাণ বেড়ে যায়। এর ফলে মে মাসে যেখানে এই পরিমাণ সর্বোচ্চ থাকে সেপ্টেম্বরে সেটি হয় সর্বনিম্ন। আর এই ওঠা নামার বিস্তার হয় ৬ ppm। কেবল বছরে ঋতুপরিবর্তনের সাথে এই ওঠা নামার চিত্রই নয়, তিনি এও লক্ষ্য করেন যে দীর্ঘকালীন পরিবর্তনের প্রবণতায় CO2 ক্রমেই বেড়ে যাচ্ছে। সেটি তিনি প্রথম ঘোষণা করেন ১৯৬১ সালে। এই পর্য্যবেক্ষণকে তার গবেষণার আর্থিক সহায়ক সংস্থা আমেরিকার জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান (National Science Foundation) প্রথমে গুরুত্ব দেয়নি ও এ বিষয়ে পরবর্তী কার্য্যক্রমে তাঁকে অর্থ সাহায্য থেকে বিরত থেকেছে। কিন্তু ক্রমশই এই সত্য বিজ্ঞানীদের কাছে পরিষ্কার হয়ে যায়। ১৯৫৮ থেকে কিলিং-এর উদ্যোগে শুরু হওয়া CO2র পরিমাণের পর্য্যবেক্ষণ অবশ্য থেমে থাকেনি। তা এখনও চলছে এবং পরিবর্তনের একটি দীর্ঘকাল ব্যাপী চিত্র আমাদের সামনে হাজির করেছে। সেই পরিবর্তনের রেখচিত্রকে বলা হয় কিলিং রেখ (Keeling curve)। এই রেখচিত্র থেকেই উষ্ণায়নের বাস্তবতা বিজ্ঞানীদের কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে গেছে।উদ্বেগের ব্যাপার এই যে, যত সময় যাচ্ছে এই বৃদ্ধির হারও তীব্র হচ্ছে। ১৭৫০ থেকে ১৯৫৮তে প্রায় দু‘শ বছরে এই পরিমাণের বৃদ্ধি ছিল যেখানে মাত্র ৩৩ ppm, সেখানে ২০০৫ সালে মধ্যবর্তী ৭৪ বছরে এটি বেড়ে হয় ৬৭ ppm । আর ২০১৮তে পরের ১৩বছরে সেটি ২০০৫-এর সাপেক্ষে বেড়েছে ২৬ ppm । এই বছরের মে মাসে মৌনা লোয়ার ওই পর্য্যবেক্ষণ কেন্দ্রের পরিমাপ অনুযায়ী CO2র পরিমাণ ৪২১ ppm । এটি এই বছরের সর্বোচ্চ মান হলেও কিলিং বর্ণিত ঋতুপরিবর্তনের বিস্তার হিসাবে রাখলে এইবছরে গড় পরিমান ৪১৮ ppm এর কাছাকাছি থাকার কথা। এই চার বছরে বেড়েছে ১২ ppm! বছরে গড় বৃদ্ধির হার এখন প্রায় ৩ ppm । ২০১৮তে এটা ছিল ২.৪২ ।
বায়ুমণ্ডলে CO2র বৃদ্ধির সাথে পরিবেশের নানা পরিবর্তন আসে। এর একটি ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রার বৃদ্ধি। CO2 আগত সূর্য্য কিরণ শোষন করে ও দীর্ঘ তরঙ্গ বিশিষ্ট অবলোহিত তরঙ্গ বিকিরণ করে। সেটি আর বহির্মহাকাশে ফেরত না গিয়ে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে আবদ্ধ হয়ে থাকে। গ্রীন হাউস গ্যাস-এর আচ্ছাদনে তাই ভূপৃষ্ঠ উষ্ণ থাকে। এই গ্যাসের পরিমাণ যত বাড়ে ততই সেই তাপমাত্রাও বাড়তেই থাকে। মূলত জীবাশ্ম প্রসূত জ্বালানীর দহনে এই গ্যাস বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করছে ও সঞ্চিত হচ্ছে। এ ছাড়াও অন্যান্য মনুষ্যকৃত কর্মকাণ্ড যেমন, বিভিন্ন শিল্পের বর্জ্য পদার্থের দূষণে, ক্রবর্ধমানভাবে অরণ্যের বিনাশে ও কৃষির বিস্তারে, প্রভৃতিতে এই গ্যাসের সঞ্চয় বেড়েই যাচ্ছে। বিশেষ করে শেষোক্ত কর্মকাণ্ডদুটিতে বায়ুমণ্ডল থেকে CO2র শোষন হ্রাস পায়, এবং এই গ্যাসের সঞ্চয় বাড়ে। এক কথায় সভ্যতার চাকা যত হৈ হৈ করে গড়িয়েছে ততই পরিবেশের ভারসাম্য বিঘ্নিত হয়েছে এবং এক বিপজ্জনক পরিস্থিতির সামনে জীবজগৎকে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। শুধু গ্রীন হাউস গ্যাসের উদগীরণই নয়, শিল্প ও কৃষির সাথে যুক্ত নানান কার্যকলাপে বাতাসে ধূলিকণার পরিমাণ বেড়েই চলে পরিবেশকে দূষিত করছে। যদিও বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে এই ধূলিকণার আস্তরণ সূর্যের আলোর কিছু অংশকে প্রতিফলিত করে ভূপৃষ্ঠে প্রবেশ ব্যাহত করে এবং তার ফলে উষ্ণতাকে প্রশমিত করে, তবুও মানুষের স্বাস্থ্যের পক্ষে এই ধূলিকণার উপস্থিতি ক্ষতিকারক। পরিবেশে যত অধিক পরিমাণে CO2 গ্যাস নি:সরিত হচ্ছে ততই সমুদ্রবক্ষে অধিক পরিমানে সেই গ্যাস শোষিত ও সঞ্চিত হচ্ছে। উদ্গীর্ন গ্যাসের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ এইভাবে সমুদ্রের উপরস্তরে জমা হচ্ছে। এতে সমুদ্রের জলে অম্লত্ব (Acidity) বাড়িয়ে সামুদ্রিক জীবনকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। ২০২০ সালে এই অম্লত্ব শিল্পবিপ্লব পূর্ববর্তী অবস্থার সাপেক্ষে ৩০% বৃদ্ধি পেয়েছে। বায়ুমণ্ডলে CO2র পরিমান ও এই সময়ে বেড়েছে ৫২%।
গত শতকের সাতের দশক থেকে বিশ্ব উষ্ণায়ন নিয়ে উদ্বেগ ও আশঙ্কার বার্তা নিয়ে বিজ্ঞানীরা সমাজের বিভিন্ন স্তরে হাজির হলেও সে বিষয়কে আমল দিতে রাষ্ট্রীয় নেতা ও নীতিনির্ধারকেরা রাজি ছিলেন না। এর অন্যতম কারণ উন্নত জীবনের দাবিতে ক্রবর্ধমানভাবে বৈদ্যুতিক শক্তির চাহিদা। এই শক্তির মূল উৎসই হল জীবাশ্ম প্রসূত জ্বালানী, অর্থাৎ কয়লা, খনিজ তৈল ও খনিজ প্রাকৃতিক গ্যাস। এগুলির বাইরে অন্যান্য উৎসগুলি যেমন সৌরশক্তি, বায়ু ও জলশক্তি নিয়ে তাদের উৎসাহ মূলত ছিল জীবাশ্ম জ্বালানির ভান্ডার ফুরানোর আশঙ্কাকে মান্যতা দিতে। বিভিন্ন নদীর প্রকল্প গ্রহণ করে জল শক্তি ব্যবহারের চল অবশ্য গত শতকের পঞ্চাশের দশক থেকেই ছিল। তবে এই প্রকল্পগুলিকেও ভূমিক্ষয়, নদীর গতিপথ পরিবর্তন সহ পরিবেশের উপর বিভিন্ন ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে দেখা গেছে। অন্য যে বিকল্প আছে, সেটি পারমাণবিক জ্বালানির ব্যবহার। বহু উন্নত দেশই এই ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। আমাদের দেশেও নিউক্লিয়ার তাপচুল্লি আছে।কিন্তু এর থেকে দুর্ঘটনা ও অনিচ্ছাকৃত অনধাবনতা জনিত পরিবেশে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ-এর সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায়না। ১৯৮৬ সালে ইউক্রেনের চের্নবিল ও ২০১১ সালে জাপানের ফুকুসিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুর্ঘটনাদুটির ব্যপক ক্ষয় ক্ষতি এবং বহুবছর ধরে সেই অঞ্চলগুলি মনুষ্যবাসের অযোগ্য হয়ে পরিত্যক্ত রয়ে যাওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা আমাদের রয়েছে। সেই কারণে পারমাণবিক জ্বালানির ব্যবহারও সর্বসম্মত নয়। ইউরোপের কয়েকটি দেশ ছাড়া বর্তমানে বেশীর ভাগ বিদুৎ উৎপন্ন হয় তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলি থেকে, যেখানে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহৃত হয়। তেমনি পরিবহন শিল্পে খনিজ তৈলের ব্যবহারই মুখ্য। এই সব কারণেই জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার কমানোর বিন্দুমাত্র সদিচ্ছা কোনো দেশেরই হয়নি। তাই বিজ্ঞানীদের শত আশঙ্কা ও ভয়ঙ্কর ভবিষ্যতের ইঙ্গিত এইসব দেশের সরকার ও নীতি নির্ধারকদের টলাতে পারেনি।
কিন্তু প্রকৃতির নিয়মকানুন বস্তুজগতের ধর্মানুসারী। বিজ্ঞানীদের ব্যাখ্যাও বস্তুনিষ্ঠ। তাই বিশ্ব উষ্ণায়ন থেমে থাকেনি। আশির দশকের শেষ অর্ধ থেকেই তাই কিছুটা হলেও আন্তর্জাতিক মহল নড়েচড়ে বসলো। ১৯৮৮তে তৈরি হলো পরিবেশ পরিবর্তন অধ্যয়নের আন্তর্রাষ্ট্রীয় প্যানেল, সংক্ষেপে যাকে বলা হয় IPCC (Intergovernmental Panel for Climate change)। এই সংস্থাটি জাতিসংঘের (United Naions) অধীনে স্বাধীন ও নিরপেক্ষ অবস্থানে কাজের স্বীকৃতি পায় এবং সদস্য দেশগুলির প্রতিনিধি বিজ্ঞানীদের দ্বারা পরিবেশ পরিবর্তনের অবস্থার পর্য্যবেক্ষণ করার ও নিয়মিত সেই প্রতিবেদন প্রকাশ করার লক্ষ্যে কাজ শুরু করে। বর্তমানে এর সদস্য সংখ্যা ১৯৫, যার মধ্যে আমাদের দেশও আছে।
১৯৯০ সালে IPCC তার প্রথম রিপোর্ট বার করে এবং খুব স্পষ্টভাবে তুলে ধরে কিভাবে মানুষের কর্মকাণ্ডের প্রভাবে বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাস বৃদ্ধি পাচ্ছে ও ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়ছে। বিগত একশো বছরে অর্থাৎ ১৮৯০ থেকে ১৯৯০তে এই তাপমাত্রা প্রায় ০.৩ থেকে ০.৬ ডিগ্রি সেন্টিগ্রড বেড়েছে। আর যেভাবে অর্থনৈতিক কাজকর্ম, শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্য চলছে সেইরকম চললে সেই বৃদ্ধির হার রইবে প্রতি দশকে ০.৩ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড। IPCCর প্রথম রিপোর্টটি যথেষ্ট সাড়া জাগায়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে সংঘটিত হয় পৃথিবী সম্মেলন (Earth Summit)। সেখানে জলবায়ু পরিবর্তন রুখতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে ১৫৪টি দেশ স্বাক্ষর করে। গঠিত হয় জাতিসঙ্ঘের পরিবেশ পরিবর্তন বিষয়ক সভা (United Nations Framework Convention on Climate Change) বা UNFCC। এর প্রধান কার্য্যালয়ে স্থাপিত হয় জার্মানীর বনে। জলবায়ুর পরিবর্তন রুখতে বিশেষ করে বায়ুমণ্ডলে গ্রীন হাউস গ্যাসের উদগীরণে নিয়ন্ত্রণ আনতে একটি আন্তর্জাতিক চুক্তি সম্পাদনের লক্ষ্যে এই সংস্থা কাজ করতে থাকে। সেই চুক্তি রূপায়ণের উদ্দেশ্যে ১৯৯৫ সাল থেকে সদস্য দেশদের প্রতিনিধিদের নিয়ে বিশেষ করে তাদের রাজনৈতিক নেতাদের অংশ গ্রহণে একটি বার্ষিক কনফারেন্স প্রতিবছর আয়োজন করা হয়। এর নাম অংশীদারদের সম্মেলন (Conference of Parties (COP)) বা সংক্ষেপে কপ। এ পর্যন্ত ২৭বার এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এর মধ্যে দুটি আন্তর্জাতিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। একটি ১৯৯৭তে তৃতীয় কপ সম্মেলনে কিয়োটোতে, যা কিয়োটো প্রটোকল (Kyoto Protocol) নামে পরিচিত। কিন্তু বহু দেশ যেমন ভারত, চিন, এতে স্বাক্ষর না করায়, এমনকি USA স্বাক্ষর করেও চুক্তি থেকে সরে আসায় বহু সদস্য দেশও এর থেকে সরে আসে ও চুক্তি অনুযায়ী ভূমিকা পালনে বিরত হয়। ২০১৫তে প্যারিসে ২১তম কপ সম্মেলনে প্যারিস চুক্তি সম্পাদিত হয়। এতে সদস্য দেশগুলি স্বেচ্ছায় তাদের গ্রীন হাউস গ্যাসের উদগীরণ বন্ধের লক্ষ্যমাত্রা ধারণ করে, যাতে ২১০০ সালের পৃথিবীর উষ্ণতা ২ডিগ্রির বেশি উষ্ণ না হয়। বিশেষ করে সদস্য দেশগুলি সম্মিলিতভাবে ২০৩০এর মধ্যে CO2 গাসের নি:সরণ অর্ধেক করে দেওয়াতে অঙ্গীকারবদ্ধ হয়। শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল প্রধান দেশগুলি এতে স্বাক্ষর করায় পরিবেশবিদ সহ সাধারণ মানুষ আশান্বিত হয়েছিল।
প্যারিস চুক্তির পরে সাত বছর পার হয়ে গেছে। ২০৩০এর দিকে অর্ধেক সময় পেরিয়ে এসেছি আমরা। এ বছরই IPCC তাদের ষষ্ঠ প্রতিবেদন বার করেছে। এই প্রতিবেদন আমাদের সবাইকে এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি এনে দিয়েছে। গ্রীন হাউস গ্যাসের নি:সরণ আরো দ্রুততায় আমাদেরকে বিপজ্জনক পরিবেশে নিয়ে যাচ্ছে। শুধু এই বছরে (২০২২) ভারত এবং ইউরোপের বিভিন্ন দেশে যে চরম দাবদাহের উদাহরণ দেখেছি তা অভূতপূর্ব। ইউরোপের জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে খরার প্রকোপে নদী নালা শুকিয়ে গেছে। ফ্রান্সের বোর্দোর নিকটে বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল ভয়ানক দাবানলে ধ্বংস হয়ে গেছে। বিভিন্ন দেশে হারিকেন, টাইফুন প্রভৃতি সামুদ্রিক তুফানের ভয়াবহতা আগে গত কয়েকশ বছরের ইতিহাসেও পাওয়া যায়নি। পাকিস্তানে বন্যার ভয়াবহতা এমন কখনো আগে দেখা যায়নি। তেমনি আমাদের দেশেই ব্যাঙ্গালোর সহ নানা শহরে হঠাৎ অতিবৃষ্টিতে বন্যার অসীম ক্ষয়ক্ষতির খবরও আমরা প্রায়শই পাচ্ছি। উত্তর মেরু ও দক্ষিণ মেরুর হিমবাহগুলি বিপজ্জনকভাবে গলে যাচ্ছে। এমনকি উত্তর মেরু নৌ-পরিবহন-এরও যোগ্য হয়ে উঠছে। এগুলি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এখন থেকে এই ধরনের চরম দুর্যোগ সহ প্রকৃতির প্রতিকূলতার সম্মুখীন আমাদের প্রায়ই হতে হবে। এসবই বিশ্ব উষ্ণায়ন ও তার প্রভাবে পরিবেশ বিপর্যয়ের অশনি সংকেত। পৃথিবী যতই উষ্ণ হয়ে উঠবে ততই এই ধরণের ধ্বংসলীলা বাড়বে ও সমগ্র মানব প্রজাতিই এইভাবে বিপন্ন হয়ে পরবে।
উপসংহারের বদলে
কিভাবে বিজ্ঞানের কথা বেড়েই চলে তার কিছু নিদর্শন আমরা এখানে পেয়েছি। তবে লেখকের লেখনীতে তো এক সময় দাঁড়ি টানতেই হয়। তাই এই আলোচনারও সমাপ্তি আমাদের করতে হবে। এটাও বলা প্রয়োজন বস্তুজগতের নিয়ম অনুযায়ীই যে কোনো বস্তু ও বিষয়ের শুরুও যেমন থাকে তার শেষও থাকে। বিজ্ঞানের কথাও এর কোনো ব্যতিক্রম নয়। বিজ্ঞান মানব মনীষার ফসল। প্রজাতি হিসাবে সমস্ত জীবজগতের সাথে মানুষও কিভাবে বিপন্ন সে আলোচনা কিছু আগেই করেছি। তাই পরিবেশকে বাসযোগ্য রাখার যে অমোঘ কর্তব্য আজ মানবজাতির সামনে হাজির সেটি কিভাবে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সহায়তায় আমরা পালন করি সেটাই বিজ্ঞানের কাহিনীর কেন্দ্রীয় পটভূমি হতে চলেছে।
_____________________________________________________________________________
লেখাটি কর্ণার স্টোন পাবলিকেশনস্ দ্বারা 2022 সালে প্রকাশিত “বিজ্ঞানঃ জিজ্ঞাসা ও অনুসন্ধান”- বইটির
অষ্টম বা শেষ অধ্যায়। ‘

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home