বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা
প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে আমি কোনো শিক্ষাবিদ নই, এবং শিক্ষার প্রসার ও প্রচারের বিভিন্ন পদ্ধতি ও তত্ত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই। আমি কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা করি। সেই হিসাবে বিজ্ঞান শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। আমার ছাত্রাবস্থাও আমাদের দেশের গ্রামীণ ও আধাশহুরে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেও দু-চার কথা আমি পেশ করতে চাই।
আমাদের জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ দেখা দেয় বৃত্তি বা পেশা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিভিন্ন কারিগরী ও প্রযুক্তিগত পেশায় নিযুক্ত হবার আশায় ছাত্রছাত্রীরা এবং তাদের অভিভাবকেরা বিজ্ঞান শাখার উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এটা ঠিকই যে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের নাগরিকদের সমাজজীবনে সক্রিয় ও উপযোগী ভূমিকা সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত করা। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরণের পেশা ও বৃত্তিতে নিয়োজিত হবার সম্ভাবনায় তাই বিজ্ঞানের ডিগ্রি যোগাড় করার প্রতি ছাত্রছাত্রীদের ঝোঁক বেশি। বিশেষ করে আমাদের এই সমাজে সীমিত চাকরির বাজারে ওই চাহিদা আরো প্রবল।
তবে প্রকৃত পক্ষে শিক্ষা কেবল সমাজের প্রয়োজনীয় ভবিষ্যতের শ্রমিকবাহিনীই গড়ে তুলতে চায় তা নয়, শিক্ষার উদ্দেশ্য সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়া ও পরিচালনার জন্য চিন্তাশীল-মননশীল মানুষ গড়ে তোলাও। যে মানুষ কেবলমাত্র সামাজিক প্রয়োজনীয় শ্রমের চাহিদা মেটানো ছাড়াও, সমাজের কল্যান ও অগ্রগতির জন্য তার বুদ্ধি, বিচার, বিবেচনা সমস্তই প্রয়োগ করতে সক্ষম, সেই ধরণের বিশ্লেষণক্ষম চিন্তাশীল যুক্তিবাদী মন গড়ে তুলতে বিদ্যালয়স্তরে বিজ্ঞান পাঠের বিশেষ ভূমিকা থাকে। এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞান বাদে সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষা প্রভৃতি শিক্ষাতে এই ধরণের যুক্তিবাদী মানুষ গড়ে তোলার উপাদান কম থাকে বা আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে যেভাবে প্রত্যক্ষভাবেই কী, কেন, কীভাবে, প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি বিধৃত থাকে, অন্য বিষয়গুলিতে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বিদ্যাচর্চার বর্তমান দুর্বলতার কারণে তার সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুযোগ কম। সে কারণেই বিজ্ঞান শিক্ষার এই সুবিধা আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকামাত্রেই গ্রহণ করতে পারি। সেই সাথে শিক্ষার সামগ্রিক উদ্দেশ্য পরিপূরণেও সফল হতে পারি।
প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষাতে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু ও ঘটনার বিবরণ থাকে। প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনাবলীর বিভিন্ন ধর্ম (বা বৈশিষ্ট্য) এবং নিয়মানুবর্তিতার বিবরণ এই শিক্ষার অঙ্গ। দৃশ্য, আপাতদৃশ্য, এবং অদৃশ্য বা নেপথ্যচারী জগতের সাথে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটানো এবং সেই জগত সম্পর্কে তাদের অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলা এই শিক্ষার উদ্দেশ্য। এই কাজটি যত সঠিকভাবে আমরা করতে পারব, ততই বিশ্লেষনক্ষম, চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী মননই বলুন বা ভবিষ্যতের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ বা বিভিন্ন পেশাতে নিযুক্ত দক্ষ শ্রমিকই বলুন - দুইই গড়ে তুলব।
সাধারণভাবে প্রকৃতিবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করা হয় - ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ও গণিত। ভৌতবিজ্ঞান আবার পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন - এই দুই ভাগে পড়ানো হয়। জড়জগতের নিয়মাবলী ও বস্তুসমূহের বিবরণ ও ব্যাখ্যা ভৌতবিজ্ঞানের আওতাতে থাকে। তেমনি জীবজগতের বিবরণ ও নিয়মাবলীর ব্যাখ্যা জীববিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বিশ্লেষণমূলক বিচারধারা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া গণিতে নিহিত। এতে পরিমাপ, পরিমাণ, প্রভৃতি নির্ণয়ের পদ্ধতি যেমন বিবৃত থাকে, তেমনি সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলীর ব্যবহার করে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফলে উপনীত হবার পদ্ধতিগুলিও শেখানো হয়। বিশেষ করে বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, স্থানাঙ্কজ্যামিতি প্রভৃতি বিষয়গুলিতে এই নিয়মাবলীর ব্যাখ্যা, বিবরণ ও তার প্রয়োগ দ্বারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রক্রিয়া বা বিচারধারা শিক্ষণীয়। এর সাথে সাথে ভৌতবিজ্ঞানের মূর্ত বিষয়গুলির বিমূর্ত ব্যাখ্যা ও ধারণা গড়ে তোলাও গণিতের উপজীব্য। এছাড়াও আরো বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির বিষয়গুলি বিস্তৃত থাকে, যেমন ভূগোল, পরিবেশ, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে।
বিজ্ঞান শিক্ষায় বিষয়বস্তুর স্তরবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের গ্রহণ ও বোঝার ক্ষমতানুযায়ীই এই স্তর নির্ধারণ করা উচিত। একদিকে যেমন বিষয়বস্তুর আধিক্যে অহেতুক মাথা ভারী করা উচিত নয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে একেবারেই অবহেলিত রাখা উচিত নয়। এর সাথে বিজ্ঞানের বিষয়গুলির মধ্যে সুসামঞ্জস্য বজায় রাখা প্রয়োজন। যেমন, জীবদেহের কোষের পরিচয় দিতে গিয়ে কোষের খুঁটিনাটি যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিবরণ শুরুতে পরিহার করা উচিত। সেক্ষেত্রে মূল অংশগুলির ব্যাখ্যা ও মূলত কোষের সাধারণ ভূমিকায় তাদের অংশগ্রহণের বিবরণই প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট। বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সেই স্তরের বোঝাপড়া রাখা প্রয়োজন। রসায়নবিদ্যায় অনু-পরমাণুর চিহ্ন সংকেতের পরিচয় না থাকলেও অনেক সময়েই নীচু শ্রেণীগুলির জীবনবিজ্ঞানের পাঠে রাসায়ানিক বিক্রিয়ার সসাংকেতিক বিবরণ থাকে। সেরকমই ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি প্রভৃতির পরিচিতি বিনা সেই স্তরের পদার্থবিদ্যার পাঠে এগুলির ব্যবহার অনুচিত। বিষয়বস্তুর দ্বারা মাথাভারী করার প্রবণতার সাথে উল্টোটিও লক্ষ্য করা যায়। অনেকক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবহেলিত থাকে। জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) প্রাথমিক ধ্যান ধারণা আমাদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় অচ্ছুৎই থাকে। আমার তো মনে পড়েনা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে আকাশের কতকগুলি তারা ও গ্রহ, দিন-রাত কেন হয়, অথবা চন্দ্রগ্রহণ - সূর্যগ্রহণের কারণের বাইরে আমার স্কুল জীবনে কোথাও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা দেখেছি। বিষয়গুলির স্তরানুযায়ী সামঞ্জস্য বজায় রাখার সাথে সাথে একটি স্তর থেকে অন্য স্তরে উন্নীত হওয়ার সময় তাদের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা প্রয়োজন। অষ্টম শ্রেণীতে কোষের যাবতীয় খুঁটিনাটি পড়ানোর পর নবম ও দশম শ্রেণীর বিষয়গুলিতে সেগুলির নামমাত্র উল্লেখ থাকলে কোষের ধারণাটি অস্পষ্ট হয়ে যায়। আমার মতে এই সমস্ত বিচার করে বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু নির্বাচন ও ছাত্রছাত্রীদের কাছে উপস্থিত করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পুনরায় সমীক্ষা করা প্রয়োজন। আমি যে উদাহরণগুলি এখানে দিলাম, সেগুলো কেবল তর্কের খাতিরে হাজির করা নয়, আমাদের বিদ্যালয়ের চালু পাঠক্রমেই এদের হদিশ পাওয়া যায়।
এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের পরিকাঠামোর সমীক্ষাও আবশ্যক। সাধারণভাবেই আমাদের দেশে শিক্ষার পরিকাঠামো দুর্বল। পরিকাঠামো বলতে বিদ্যালয়ের গৃহ, শ্রেণীকক্ষ, চেয়ার টেবিল, ব্ল্যাক বোর্ড, ষ্টেশনারি দ্রব্যাদি, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, খেলার মাঠ, এই সমস্ত কিছুকেই বোঝাচ্ছি। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে এই কথাটি আরো প্রযোজ্য এই কারণেই যে ল্যাবরেটরী বস্তুটি প্রায় সমস্ত বিদ্যালয়েই অনুপস্থিত বা নামে মাত্র উপস্থিত। তবে এই পরিকাঠামোর সবথেকে বড় উপাদান আমাদের শিক্ষাকর্মীদের শিক্ষাপ্রদানের আন্তরিক প্রয়াস। এইটির অভাব থাকলে শিক্ষা প্রাঙ্গণ প্রাণহীন জড়বস্তু। এ প্রসঙ্গে আমার ছাত্রাবস্থার কিছু কথা মনে পড়ছে। আমাদের স্কুলে পুরানো একাদশ শ্রেণীর (হায়ার সেকন্ডারী) শিক্ষাক্রম চালু ছিল, এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগ যথা বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য প্রভৃতির পাঠক্রম চালু ছিল। স্বভাবতই এই পাঠক্রমের অঙ্গ হিসাবে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিও ছিল। আমরা যখন বর্তমানে প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের আওতায় চলে এলাম, স্কুলের ওই ল্যাবরেটরিগুলি এই শিক্ষাসূচির বাইরে চলে গেল। ফলে সেগুলি কার্যতঃ অব্যবহৃতই রয়ে যায়। অথচ আমাদের মাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান শিক্ষাতেও এই ল্যাবরেটরিগুলি ব্যবহার করা যেতে পারত।এর দ্বারা বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরো প্রাণবন্ত করা যেতে পারত। আমাদের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক যিনি ছিলেন, তিনি কিন্তু জীবনবিজ্ঞানের পরীক্ষাগার আমাদের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এমনকী সেখানে আমাদের ক্লাসও নিতেন। এর অর্থ এই নয় যে ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষকেরা তাঁদের পড়ানোতে আন্তরিক ছিলেন না, বা তাঁদের শিক্ষাপ্রদান নিষ্প্রাণ ছিল। তাঁরাও বিভিন্ন বিষয় খুব প্রাঞ্জল ভাষাতেই ও যথেষ্ট আন্তরিক ভাবেই পড়িয়েছিলেন। কিন্তু ল্যাবরেটরি ব্যবহার প্রসঙ্গে উদাসীন ছিলেন। এর কারণও সম্ভবত এই যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যান্ত্রিকতা আমাদের সৃজনশীল সত্ত্বাকে টুঁটি চেপে ধরে রাখে। আমরা কর্মক্ষেত্রেও যান্ত্রিক নিয়মের ও আদেশের দাসে পরিণত হই। যেহেতু মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম ল্যাবরেটরি ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করেনি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এবং সেই সাথে শিক্ষকেরাও ল্যাবরেটরিগুলিকে রাতারাতিই তাদের শিক্ষার প্রাঙ্গণ থেকে বনবাসেই পাঠিয়েছিলেন। পরিকাঠামো প্রসঙ্গে এই কথাগুলি তুললাম এই কারণেই যে দুর্বল পরিকাঠামো সবল করে তোলাতে আমাদের উদ্যোগ ও আন্তরিকতা নিতান্তই জরুরি। কেবলমাত্র সরকারি বা বেসরকারি অনুদানই যথেষ্ট নয়।
বিংশ শতাব্দীর প্রান্তে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের অন্য একটি সুবিধা এই যে যতদিন যাচ্ছে আমাদের সমাজজীবনও প্রযুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে এই সমস্ত বিষয়ে আগ্রহ ও সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের স্কুলের ছাত্রজীবনেও দূরদর্শন বস্তুটি দুর্লভ ছিল, টেলিফোনের ব্যবহার সীমিত ছিল, এবং মহাকাশে প্রেরিত উপগ্রহগুলি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে এ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অথচ আজ এই জিনিসগুলি আমাদের জীবনে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েছে। যে কম্পিউটার কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষকদের আওতাতে ছিল, সেগুলিও আজ ব্যাপকভাবে আমাদের চারপাশে ব্যবহৃত হচ্ছে। যতদিন যাবে ততই নানা বিজ্ঞানের ওপরে ভর করে গড়ে ওঠা প্রযুক্তিগুলির সাথে আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ জীবনের এই যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হবে। অবশ্যই বিজ্ঞানশিক্ষাতে এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রতিফলিত করতে হবে। এর প্রভাবে শিশুমনের জিজ্ঞাসা ও ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে। চারপাশের প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও যেমন তাদের সামনে তুলে ধরা জরুরি, তেমনি জরুরি আধুনিক জীবনে ব্যবহৃত বস্তুগুলির কার্য্যকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও শিক্ষার স্তরভেদে প্রদান করা। সুতরাং কেবল প্রথাগত ল্যাবরেটরিতেই নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাঁড়ারেও বিজ্ঞান শিক্ষার বহু রসদ জমা রয়ে গেছে।
এবার যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই, সেটি এই বিজ্ঞান শিক্ষার সেই চালু পদ্ধতি ও সংস্কারগুলিকে কেন্দ্র করে, যেগুলি বিজ্ঞান শিক্ষার দ্বারা যুক্তিশীল ও বিশ্লেষণমুখী মনন গড়ে তোলার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়। অনেক সময়েই দেখা যায় যে কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের সমাধানে বিশ্লেষণমুখী বিচারধারাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা জোর দিই তার নির্ভুল সমাধান বা উত্তরের উপর। যেমন, গণিত শিক্ষাতেই দেখা গেছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই অঙ্কের নির্ভুল উত্তরেই পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়, নয়তো পুরোপুরি গোল্লা দেয়ার রীতি প্রচলিত। এর ফলে অঙ্কটির সমাধানে প্রযুক্ত বিচারধারাটি পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। তার আংশিক মূল্যায়ণ যথাযথ না হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের এমনকি প্রশ্নবিশেষে উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবতঃ উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুবিধার্থে এই ধরণের পদ্ধতি চালু রয়েছে - কিন্তু স্বভাবতই এটি বিজ্ঞান শিক্ষার মূল উদ্দ্যেশ্যের পরিপন্থী।
তেমনি আরো একটি উদাহরণ, কোনো বিষয়কে সূত্র বা সংজ্ঞায় সীমিত রাখার প্রয়াস। অথচ এর বিপরীতে বিষয়টিকে সরলভাষায় যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা বা বিবরণ দ্বারা উপস্থিত করাই আমাদের কর্তব্য। আমাদের এই সংকীর্ণ মনোভাব আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলিতেও প্রতিফলিত হয়। সেখানে বিষয়গুলির উপস্থাপনা খটমট সংজ্ঞায় জড়ানো থাকে। স্থানে স্থানে সেগুলি যথেষ্ট অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়। যেমন ধরুন জীববিজ্ঞানে শ্বসন বা নিঃশ্বাস প্রশ্বাস প্রক্রিয়ার কার্য্যকরণের সহজ সরল চেহারাটিকে একটি সংজ্ঞার মাধ্যমে বিভিন্ন তৎসম শব্দ প্রয়োগ করে হাজির করা হয়ে থাকে। আর এগুলিকে পরীক্ষার্থীরা নম্বর পাবার জন্য প্রাণপণে মুখস্থ করার প্রয়াস চালিয়ে যায়। এই অপাঠ্য অংশগুলিকে মুখস্থ করার মত নিরানন্দের কাজ দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া ভার। অথচ ছোটোদের বইতে বিষয়গুলি আরো খোলসা করে বলা উচিত। বিষয়টি তাদের ভাষাতে বোঝানো উচিত, এবং সারবস্তু তুলে ধরা উচিত। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকগুলির রচয়িতারা তৎসম শব্দ সমন্বিত, গবেষকদের পরিভাষা সম্মিলিত এক দুর্বোধ্য শব্দপ্রবাহে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায় বিষয়গুলির কৌলীন্য, শুদ্ধতা, পবিত্রতা বজায় রাখতেই ব্যস্ত। আমাদের শিক্ষক শিক্ষিকারাও পরীক্ষার খাতাতে হুবহু সেই বাক্যগুলিকেই দেখতে চান। আর তাই সংস্কৃতে কাঁচা পুরুত মশাই যেভাবে প্রায় না বুঝে মন্ত্র পড়েন ও পড়ান এই সংজ্ঞাগুলির সাথে পড়ুয়াদের সেভাবেই সংঘর্ষ করে যেতে হয়।
প্রসঙ্গতই উঠে আসে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের কথা, স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদেরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন - বিশেষতঃ সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই বিষয়ে অগ্রণীর ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এর ফল স্বরূপ বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটে। দুঃখের বিষয় এর বেশি আমরা অগ্রসর হতে পারিনি। এখনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলতঃ ইংরাজি ভাষাই বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যম রয়ে গেছে। কেন এই পরিস্থিতি? আমাদের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কী? সে বিষয়েই আমার কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা এখানে রাখতে চাই।
প্রথমতঃ আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত কম। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পশ্চাদপদতার এ এক নিদর্শন। সুতরাং আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে শিক্ষার প্রসার যুক্ত, এবং শিক্ষার ব্যপক প্রসারের সাথে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রশ্নটিও অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। এ ছাড়াও আমাদের দেশের চরিত্রও এই প্রশ্নটিকে জটিল করে তুলেছে। আমাদের দেশ বহুভাষিক। ফলে উচ্চশিক্ষার বাহন হিসাবে রাষ্ট্রীয়স্তরে ইংরাজি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইংরাজির সাথে সাথে হিন্দি প্রসারে সরকারি উদ্যোগ কিয়দংশে থাকলেও বাকি আঞ্চলিক ভাষাগুলি অবহেলিত। সুতরাং এ কারণেই মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা তথা বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ প্রায় অনুপস্থিত। প্রসঙ্গতঃ আমাদের পড়শি দেশ বাংলাদেশে এ জাতীয় ভাষা সমস্যা না থাকায় এই ধরণের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। সেখানে শিক্ষার প্রসার ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন আমাদের দেশ অপেক্ষা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ বর্তমান।
দ্বিতীয়তঃ ইংরাজি ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের সুবিধা এই যে, আন্তর্জাতিক স্তরে ভাববিনিময় অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হয় যে ইংরাজি ভাষা ছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্রেঞ্চ, জার্মান, রাশিয়ান, স্প্যানিশ, জাপানি, চিনা, ও আরবি - এ সমস্ত ভাষাতেও যথেষ্ট বিজ্ঞান চর্চা হয় এবং সেই ভাষার বিজ্ঞানীরা তাঁদের স্বভাষাতেই ভাব বিনিময় করে থাকেন। এতদসত্বেও তাঁরাও আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হিসাবে ইংরাজিকে বেছে নিয়েছেন। সুতরাং ইংরাজি ভাষা আন্তর্জাতিক দরবারে আমাদের অংশগ্রহণকে সহজ করে তুলেছে এ কথা যেমন অনস্বীকার্য্য, তেমনি বিজ্ঞানচর্চার দুনিয়াতে মাতৃভাষার দাবীকেও অগ্রাহ্য করা যায়না। সে কারণেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার দাবি একটি অত্যন্ত মৌলিক ও ন্যায্য দাবি।
তৃতীয়তঃ মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রসারের অন্যতম বাধা হিসাবে পাঠ্যপুস্তকের অভাবকে খাড়া করা হয়। বিশেষতঃ ইংরাজি ভাষাতে বিভিন্নস্তরেই নানা উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকায়, এই অভাব আরো অনুভূত হতে থাকে। এ বিষয়ে আমাদের সামাজিক উদ্যোগহীনতাই মূলতঃ দায়ী। এর সাথে সাথে অর্থনৈতিক দিক থেকে চাহিদা না থাকায় ভালো পাঠ্যপুস্তকের প্রকাশনাও সীমিত। বিজ্ঞানের পরিভাষা নিয়েও নানা বিতর্ক উঠতে থাকে। অবশ্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ দ্বারা পরিভাষা সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য দূর করার প্রয়াস বিদ্যমান। তবুও এ ব্যাপারে দু’রকম ঝোঁকই লক্ষ্যণীয় - একদিকে সমস্ত রকম প্রচলিত ইংরাজি শব্দকে নানান তৎসম (অপ্রচলিত ও দ্ব্যর্থবোধক) শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করার প্রবণতা, অন্যদিকে সমস্ত রকম ইংরাজি শব্দকেই হুবহু রেখে দেয়ার ঝোঁক। আমাদের এর মাঝামাঝি রাস্তাটিই বেছে নিতে হবে। যে সমস্ত শব্দ স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাষাতেও ঢুকে পড়েছে - তাদের গ্রহণ করতে হবে এবং মূলতঃ অপরিচিত পরিভাষাগুলিকে যতোদূর সম্ভব যথাযথ প্রতিস্থাপন করতে হবে।
মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রসঙ্গতেই এই আলোচনায় ইতি টানতে চাই। যতদিন না মাতৃভাষা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের মাধ্যম হিসাবে যথাযথ ব্যবহৃত না হচ্ছে, ততদিন বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার জনগণের কিয়দাংশেই সীমিত থাকবে। শিক্ষার সার্বজনীনীকরণের সাথে সাথে এই বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বের দাবি রাখে।
২৬/১/১৯৯৮
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: লেখাটি প্রদীপ বকশি দ্বারা সংশোধিত ও পরিমার্জিত (তারিখ: ১১/৫/২০২১ )।

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home