Wednesday, 28 April 2021

বিদ্যালয়ে বিজ্ঞান শিক্ষা

 

 

প্রথমেই বলে নেওয়া ভালো যে আমি কোনো শিক্ষাবিদ নই, এবং শিক্ষার প্রসার ও প্রচারের বিভিন্ন পদ্ধতি ও তত্ত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নই। আমি কম্পিউটার সায়েন্স ও ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগে শিক্ষকতা করি। সেই হিসাবে বিজ্ঞান শিক্ষার বর্তমান পরিস্থিতির কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে। আমার ছাত্রাবস্থাও আমাদের দেশের গ্রামীণ ও আধাশহুরে শিক্ষাব্যবস্থার সাথে ওতপ্রোত ভাবে জড়িত ছিল। সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেও দু-চার কথা আমি পেশ করতে চাই।

 

আমাদের জনসাধারণের মধ্যে বিজ্ঞান শিক্ষা গ্রহণের উদ্যোগ দেখা দেয় বৃত্তি বা পেশা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে। ডাক্তারি, ইঞ্জিনিয়ারিং, বিভিন্ন কারিগরী ও প্রযুক্তিগত পেশায় নিযুক্ত হবার আশায় ছাত্রছাত্রীরা এবং তাদের অভিভাবকেরা বিজ্ঞান শাখার উচ্চমাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে বিশেষ  গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। এটা ঠিকই যে শিক্ষার অন্যতম উদ্দেশ্য ভবিষ্যতের নাগরিকদের সমাজজীবনে সক্রিয় ও উপযোগী ভূমিকা সম্পাদনের জন্য প্রস্তুত করা। বর্তমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতির সাথে সাথে বিভিন্ন ধরণের পেশা ও বৃত্তিতে নিয়োজিত হবার সম্ভাবনায় তাই বিজ্ঞানের ডিগ্রি যোগাড় করার  প্রতি ছাত্রছাত্রীদের ঝোঁক বেশি। বিশেষ করে আমাদের এই সমাজে সীমিত চাকরির বাজারে ওই চাহিদা আরো প্রবল।

 

তবে প্রকৃত পক্ষে শিক্ষা কেবল সমাজের প্রয়োজনীয় ভবিষ্যতের শ্রমিকবাহিনীই  গড়ে তুলতে চায় তা নয়, শিক্ষার উদ্দেশ্য সমাজকে নেতৃত্ব দেওয়া ও পরিচালনার জন্য চিন্তাশীল-মননশীল মানুষ গড়ে তোলাও। যে মানুষ কেবলমাত্র সামাজিক প্রয়োজনীয় শ্রমের চাহিদা মেটানো ছাড়াও, সমাজের  কল্যান ও অগ্রগতির জন্য তার বুদ্ধি, বিচার, বিবেচনা সমস্তই প্রয়োগ করতে সক্ষম,  সেই ধরণের বিশ্লেষণক্ষম চিন্তাশীল যুক্তিবাদী মন গড়ে তুলতে বিদ্যালয়স্তরে বিজ্ঞান পাঠের বিশেষ ভূমিকা থাকে। এর অর্থ এই নয় যে বিজ্ঞান বাদে  সাহিত্য, ইতিহাস, ভাষা প্রভৃতি শিক্ষাতে এই ধরণের যুক্তিবাদী মানুষ  গড়ে তোলার উপাদান কম থাকে বা আছে। কিন্তু বিজ্ঞানের বিষয়গুলিতে যেভাবে প্রত্যক্ষভাবেই কী, কেন, কীভাবে, প্রভৃতি প্রশ্নের উত্তর ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি বিধৃত থাকে, অন্য বিষয়গুলিতে আধুনিক বিজ্ঞানসম্মত বিদ্যাচর্চার বর্তমান দুর্বলতার কারণে তার সাথে ঘনিষ্ঠ পরিচয়ের সুযোগ  কম। সে কারণেই বিজ্ঞান শিক্ষার এই সুবিধা আমরা শিক্ষক-শিক্ষিকামাত্রেই গ্রহণ করতে পারি। সেই সাথে শিক্ষার সামগ্রিক উদ্দেশ্য পরিপূরণেও সফল হতে পারি।

 

প্রকৃতিবিজ্ঞান শিক্ষাতে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির বিভিন্ন বস্তু ও ঘটনার বিবরণ থাকে। প্রাকৃতিক বস্তু ও ঘটনাবলীর বিভিন্ন ধর্ম (বা বৈশিষ্ট্য) এবং নিয়মানুবর্তিতার বিবরণ এই শিক্ষার অঙ্গ। দৃশ্য, আপাতদৃশ্য, এবং অদৃশ্য বা নেপথ্যচারী জগতের সাথে ছাত্রছাত্রীদের পরিচয় ঘটানো এবং সেই জগত সম্পর্কে তাদের অনুসন্ধিৎসা জাগিয়ে তোলা এই শিক্ষার উদ্দেশ্য। এই কাজটি যত সঠিকভাবে আমরা করতে পারব, ততই বিশ্লেষনক্ষম, চিন্তাশীল, যুক্তিবাদী মননই বলুন বা ভবিষ্যতের ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ বা বিভিন্ন পেশাতে নিযুক্ত দক্ষ শ্রমিকই বলুন - দুইই গড়ে তুলব।

 

সাধারণভাবে প্রকৃতিবিজ্ঞানের বিষয়বস্তুকে তিনটি বিভাগে বিভক্ত করা হয় - ভৌতবিজ্ঞান, জীববিজ্ঞান, ও গণিত। ভৌতবিজ্ঞান আবার পদার্থবিদ্যা ও রসায়ন - এই দুই ভাগে পড়ানো হয়। জড়জগতের নিয়মাবলী ও বস্তুসমূহের বিবরণ ও ব্যাখ্যা ভৌতবিজ্ঞানের আওতাতে থাকে। তেমনি জীবজগতের বিবরণ ও নিয়মাবলীর ব্যাখ্যা জীববিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। অন্যদিকে বিশ্লেষণমূলক বিচারধারা গড়ে তোলার প্রক্রিয়া  গণিতে নিহিত। এতে পরিমাপ, পরিমাণ, প্রভৃতি নির্ণয়ের পদ্ধতি যেমন বিবৃত থাকে, তেমনি সুনির্দিষ্ট নিয়মাবলীর ব্যবহার করে কোনো সিদ্ধান্ত বা ফলাফলে উপনীত হবার পদ্ধতিগুলিও শেখানো হয়। বিশেষ করে বীজগণিত, জ্যামিতি, ত্রিকোণমিতি, স্থানাঙ্কজ্যামিতি প্রভৃতি বিষয়গুলিতে এই নিয়মাবলীর ব্যাখ্যা, বিবরণ ও তার প্রয়োগ দ্বারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হবার প্রক্রিয়া বা বিচারধারা শিক্ষণীয়। এর সাথে সাথে ভৌতবিজ্ঞানের মূর্ত বিষয়গুলির বিমূর্ত ব্যাখ্যা ও ধারণা গড়ে তোলাও গণিতের উপজীব্য। এছাড়াও আরো বিভিন্ন বিষয়ে আমাদের পরিবেশ ও প্রকৃতির বিষয়গুলি বিস্তৃত থাকে, যেমন ভূগোল, পরিবেশ, স্বাস্থ্য প্রভৃতি বিষয়ে।

 

বিজ্ঞান শিক্ষায় বিষয়বস্তুর স্তরবিন্যাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ছাত্রছাত্রীদের গ্রহণ ও বোঝার ক্ষমতানুযায়ীই এই স্তর নির্ধারণ করা উচিত। একদিকে যেমন বিষয়বস্তুর আধিক্যে অহেতুক মাথা ভারী করা উচিত নয়, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলিকে একেবারেই অবহেলিত রাখা উচিত নয়। এর সাথে বিজ্ঞানের বিষয়গুলির মধ্যে সুসামঞ্জস্য বজায় রাখা প্রয়োজন। যেমন, জীবদেহের কোষের পরিচয় দিতে গিয়ে কোষের খুঁটিনাটি যাবতীয় অঙ্গপ্রত্যঙ্গের বিবরণ শুরুতে পরিহার করা উচিত। সেক্ষেত্রে মূল অংশগুলির ব্যাখ্যা ও মূলত কোষের সাধারণ ভূমিকায় তাদের অংশগ্রহণের বিবরণই প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট। বিভিন্ন বিষয়ের মধ্যে সেই স্তরের বোঝাপড়া রাখা প্রয়োজন।  রসায়নবিদ্যায় অনু-পরমাণুর চিহ্ন সংকেতের পরিচয় না থাকলেও অনেক সময়েই নীচু শ্রেণীগুলির জীবনবিজ্ঞানের পাঠে রাসায়ানিক বিক্রিয়ার সসাংকেতিক বিবরণ থাকে। সেরকমই ক্যালকুলাস, ত্রিকোণমিতি প্রভৃতির পরিচিতি বিনা সেই স্তরের পদার্থবিদ্যার  পাঠে এগুলির ব্যবহার অনুচিত। বিষয়বস্তুর দ্বারা মাথাভারী করার প্রবণতার সাথে উল্টোটিও লক্ষ্য করা যায়। অনেকক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি অবহেলিত থাকে। জ্যোতির্বিদ্যার (Astronomy) প্রাথমিক ধ্যান ধারণা আমাদের বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রায় অচ্ছুৎই  থাকে। আমার তো মনে পড়েনা, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চৌহদ্দিতে আকাশের কতকগুলি তারা ও গ্রহ, দিন-রাত কেন হয়, অথবা চন্দ্রগ্রহণ - সূর্যগ্রহণের কারণের বাইরে আমার স্কুল জীবনে কোথাও জ্যোতির্বিদ্যার চর্চা দেখেছি।  বিষয়গুলির স্তরানুযায়ী সামঞ্জস্য বজায় রাখার সাথে সাথে একটি স্তর থেকে অন্য স্তরে উন্নীত হওয়ার সময় তাদের ধারাবাহিকতাও বজায় রাখা প্রয়োজন। অষ্টম শ্রেণীতে কোষের যাবতীয় খুঁটিনাটি পড়ানোর পর নবম ও দশম শ্রেণীর বিষয়গুলিতে সেগুলির নামমাত্র উল্লেখ থাকলে কোষের ধারণাটি অস্পষ্ট হয়ে যায়। আমার মতে এই সমস্ত বিচার করে বিভিন্ন স্তরে বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু নির্বাচন ও ছাত্রছাত্রীদের কাছে উপস্থিত করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে পুনরায় সমীক্ষা করা প্রয়োজন। আমি যে উদাহরণগুলি এখানে দিলাম, সেগুলো কেবল তর্কের খাতিরে হাজির করা নয়, আমাদের বিদ্যালয়ের চালু পাঠক্রমেই এদের হদিশ পাওয়া যায়।

 

এই প্রসঙ্গে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের  পরিকাঠামোর সমীক্ষাও আবশ্যক। সাধারণভাবেই আমাদের দেশে শিক্ষার পরিকাঠামো দুর্বল। পরিকাঠামো বলতে বিদ্যালয়ের গৃহ, শ্রেণীকক্ষ, চেয়ার টেবিল, ব্ল্যাক বোর্ড, ষ্টেশনারি দ্রব্যাদি, লাইব্রেরি, ল্যাবরেটরি, খেলার মাঠ, এই সমস্ত কিছুকেই বোঝাচ্ছি। বিজ্ঞান শিক্ষার ক্ষেত্রে এই কথাটি আরো প্রযোজ্য এই কারণেই যে ল্যাবরেটরী বস্তুটি প্রায় সমস্ত বিদ্যালয়েই  অনুপস্থিত বা নামে মাত্র উপস্থিত। তবে এই পরিকাঠামোর সবথেকে বড় উপাদান আমাদের শিক্ষাকর্মীদের শিক্ষাপ্রদানের আন্তরিক প্রয়াস। এইটির অভাব থাকলে শিক্ষা প্রাঙ্গণ প্রাণহীন জড়বস্তু। এ প্রসঙ্গে আমার ছাত্রাবস্থার কিছু কথা মনে পড়ছে। আমাদের স্কুলে পুরানো একাদশ শ্রেণীর (হায়ার সেকন্ডারী) শিক্ষাক্রম চালু ছিল, এবং সেই অনুযায়ী বিভিন্ন বিভাগ যথা বিজ্ঞান, কলা, বাণিজ্য প্রভৃতির পাঠক্রম চালু ছিল। স্বভাবতই এই পাঠক্রমের অঙ্গ হিসাবে বিভিন্ন ল্যাবরেটরিও ছিল। আমরা যখন বর্তমানে  প্রচলিত মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমের আওতায় চলে এলাম, স্কুলের ওই ল্যাবরেটরিগুলি এই শিক্ষাসূচির বাইরে  চলে গেল। ফলে সেগুলি কার্যতঃ অব্যবহৃতই রয়ে যায়। অথচ আমাদের মাধ্যমিক স্তরের বিজ্ঞান শিক্ষাতেও এই ল্যাবরেটরিগুলি ব্যবহার করা যেতে পারত।এর দ্বারা বিজ্ঞান শিক্ষাকে আরো প্রাণবন্ত করা যেতে পারত। আমাদের জীবনবিজ্ঞানের শিক্ষক যিনি ছিলেন, তিনি কিন্তু জীবনবিজ্ঞানের পরীক্ষাগার আমাদের জন্য উন্মুক্ত রেখেছিলেন। এমনকী সেখানে আমাদের ক্লাসও নিতেন। এর অর্থ এই নয় যে ভৌতবিজ্ঞানের শিক্ষকেরা তাঁদের পড়ানোতে আন্তরিক ছিলেন না, বা তাঁদের শিক্ষাপ্রদান নিষ্প্রাণ ছিল। তাঁরাও বিভিন্ন বিষয় খুব প্রাঞ্জল ভাষাতেই ও যথেষ্ট আন্তরিক ভাবেই পড়িয়েছিলেন। কিন্তু ল্যাবরেটরি ব্যবহার প্রসঙ্গে উদাসীন ছিলেন। এর কারণও সম্ভবত এই যে আমাদের দৈনন্দিন জীবনের যান্ত্রিকতা আমাদের সৃজনশীল সত্ত্বাকে টুঁটি চেপে ধরে রাখে। আমরা কর্মক্ষেত্রেও যান্ত্রিক নিয়মের ও আদেশের দাসে পরিণত হই। যেহেতু মাধ্যমিক শিক্ষাক্রম ল্যাবরেটরি ব্যবহারকে অন্তর্ভুক্ত করেনি, বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও এবং সেই সাথে শিক্ষকেরাও ল্যাবরেটরিগুলিকে রাতারাতিই তাদের শিক্ষার প্রাঙ্গণ থেকে বনবাসেই পাঠিয়েছিলেন। পরিকাঠামো প্রসঙ্গে এই কথাগুলি তুললাম এই কারণেই যে দুর্বল পরিকাঠামো সবল করে তোলাতে আমাদের উদ্যোগ ও আন্তরিকতা নিতান্তই জরুরি। কেবলমাত্র সরকারি বা বেসরকারি অনুদানই যথেষ্ট নয়।

 

বিংশ শতাব্দীর প্রান্তে বিজ্ঞান শিক্ষা প্রদানের অন্য একটি সুবিধা এই যে যতদিন যাচ্ছে আমাদের সমাজজীবনও  প্রযুক্তি ও আধুনিক বিজ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। এর ফলে এই সমস্ত বিষয়ে আগ্রহ ও সচেতনতা অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। আমাদের স্কুলের ছাত্রজীবনেও দূরদর্শন বস্তুটি দুর্লভ ছিল, টেলিফোনের ব্যবহার সীমিত ছিল, এবং মহাকাশে প্রেরিত উপগ্রহগুলি আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে কীভাবে প্রভাবিত করবে এ সম্পর্কে কোনো স্পষ্ট ধারণা ছিল না। অথচ আজ এই জিনিসগুলি আমাদের জীবনে ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েছে। যে কম্পিউটার কেবলমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে গবেষকদের আওতাতে ছিল, সেগুলিও আজ ব্যাপকভাবে আমাদের চারপাশে ব্যবহৃত হচ্ছে। যতদিন যাবে ততই নানা বিজ্ঞানের ওপরে ভর করে গড়ে ওঠা প্রযুক্তিগুলির  সাথে আমাদের প্রতিদিনের সাধারণ  জীবনের এই যোগাযোগ আরো ঘনিষ্ঠ হবে। অবশ্যই বিজ্ঞানশিক্ষাতে এই ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ প্রতিফলিত করতে হবে। এর প্রভাবে শিশুমনের জিজ্ঞাসা ও ঔৎসুক্য বর্ধিত হবে। চারপাশের প্রাকৃতিক ঘটনাগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও যেমন তাদের সামনে তুলে ধরা জরুরি, তেমনি জরুরি আধুনিক জীবনে ব্যবহৃত বস্তুগুলির কার্য্যকরণের বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যাও শিক্ষার স্তরভেদে প্রদান করা। সুতরাং কেবল প্রথাগত ল্যাবরেটরিতেই নয়, আমাদের দৈনন্দিন জীবনের ভাঁড়ারেও বিজ্ঞান শিক্ষার বহু রসদ জমা রয়ে গেছে।

 

এবার যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে চাই, সেটি এই বিজ্ঞান শিক্ষার সেই চালু পদ্ধতি ও সংস্কারগুলিকে কেন্দ্র করে, যেগুলি বিজ্ঞান শিক্ষার দ্বারা যুক্তিশীল ও বিশ্লেষণমুখী মনন গড়ে তোলার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।  অনেক সময়েই দেখা যায় যে কোনো সমস্যা বা প্রশ্নের সমাধানে বিশ্লেষণমুখী  বিচারধারাকে গুরুত্ব না দিয়ে আমরা জোর দিই তার নির্ভুল সমাধান বা উত্তরের উপর। যেমন, গণিত শিক্ষাতেই দেখা গেছে অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানেই অঙ্কের নির্ভুল উত্তরেই পূর্ণ নম্বর দেওয়া হয়, নয়তো পুরোপুরি গোল্লা দেয়ার রীতি প্রচলিত। এর ফলে অঙ্কটির সমাধানে প্রযুক্ত বিচারধারাটি পুরোপুরি উপেক্ষিত থাকে। তার আংশিক মূল্যায়ণ যথাযথ না হওয়ায় ছাত্রছাত্রীদের এমনকি প্রশ্নবিশেষে উত্তর মুখস্থ করার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। সম্ভবতঃ উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুবিধার্থে এই ধরণের পদ্ধতি চালু   রয়েছে - কিন্তু স্বভাবতই এটি বিজ্ঞান শিক্ষার মূল উদ্দ্যেশ্যের পরিপন্থী।

 

তেমনি আরো একটি উদাহরণ, কোনো বিষয়কে সূত্র বা সংজ্ঞায় সীমিত রাখার প্রয়াস। অথচ এর বিপরীতে বিষয়টিকে সরলভাষায় যুক্তিগ্রাহ্য ব্যাখ্যা বা বিবরণ দ্বারা উপস্থিত করাই আমাদের কর্তব্য। আমাদের এই সংকীর্ণ মনোভাব আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলিতেও প্রতিফলিত হয়। সেখানে বিষয়গুলির উপস্থাপনা খটমট সংজ্ঞায় জড়ানো থাকে। স্থানে স্থানে সেগুলি যথেষ্ট অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হয়। যেমন ধরুন জীববিজ্ঞানে শ্বসন বা নিঃশ্বাস প্রশ্বাস প্রক্রিয়ার   কার্য্যকরণের সহজ সরল চেহারাটিকে একটি সংজ্ঞার মাধ্যমে বিভিন্ন তৎসম শব্দ প্রয়োগ করে হাজির করা হয়ে থাকে। আর এগুলিকে পরীক্ষার্থীরা নম্বর পাবার জন্য প্রাণপণে  মুখস্থ করার প্রয়াস চালিয়ে যায়। এই অপাঠ্য অংশগুলিকে মুখস্থ করার মত নিরানন্দের কাজ দুনিয়ায় খুঁজে পাওয়া ভার। অথচ ছোটোদের বইতে বিষয়গুলি আরো খোলসা করে বলা উচিত। বিষয়টি তাদের ভাষাতে বোঝানো উচিত, এবং সারবস্তু তুলে ধরা উচিত। কিন্তু পাঠ্যপুস্তকগুলির রচয়িতারা তৎসম শব্দ সমন্বিত, গবেষকদের পরিভাষা সম্মিলিত এক দুর্বোধ্য শব্দপ্রবাহে সংক্ষিপ্ত সংজ্ঞায় বিষয়গুলির কৌলীন্য, শুদ্ধতা, পবিত্রতা  বজায় রাখতেই ব্যস্ত। আমাদের শিক্ষক শিক্ষিকারাও পরীক্ষার  খাতাতে হুবহু সেই বাক্যগুলিকেই দেখতে চান। আর তাই সংস্কৃতে কাঁচা  পুরুত মশাই যেভাবে প্রায় না বুঝে মন্ত্র পড়েন ও পড়ান এই সংজ্ঞাগুলির সাথে পড়ুয়াদের সেভাবেই সংঘর্ষ করে যেতে হয়।

 

প্রসঙ্গতই উঠে আসে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের কথা, স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের স্বনামধন্য বিজ্ঞানী ও শিক্ষাবিদেরা এ বিষয়ে যথেষ্ট সচেতন ছিলেন - বিশেষতঃ সত্যেন্দ্রনাথ বসু এই বিষয়ে অগ্রণীর  ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন। এর ফল স্বরূপ বাংলা ভাষাতে বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার ঘটে। দুঃখের বিষয় এর বেশি   আমরা অগ্রসর হতে পারিনি। এখনো কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে মূলতঃ ইংরাজি ভাষাই বিজ্ঞান শিক্ষার মাধ্যম রয়ে গেছে। কেন এই পরিস্থিতি? আমাদের এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে ওঠার প্রক্রিয়া কী? সে বিষয়েই আমার কিছু ব্যক্তিগত চিন্তাভাবনা এখানে রাখতে চাই।

 

প্রথমতঃ আমাদের দেশে শিক্ষার প্রসার অত্যন্ত কম। আমাদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পশ্চাদপদতার এ এক নিদর্শন। সুতরাং আর্থসামাজিক উন্নয়নের সাথে শিক্ষার প্রসার যুক্ত, এবং শিক্ষার ব্যপক প্রসারের সাথে মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রশ্নটিও অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত। এ ছাড়াও আমাদের দেশের চরিত্রও এই প্রশ্নটিকে জটিল করে তুলেছে। আমাদের দেশ বহুভাষিক। ফলে উচ্চশিক্ষার বাহন হিসাবে রাষ্ট্রীয়স্তরে ইংরাজি মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ইংরাজির সাথে সাথে হিন্দি   প্রসারে সরকারি   উদ্যোগ কিয়দংশে থাকলেও বাকি আঞ্চলিক ভাষাগুলি অবহেলিত। সুতরাং এ কারণেই মাতৃভাষায় উচ্চশিক্ষা তথা বিজ্ঞানশিক্ষা প্রসারের রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ প্রায় অনুপস্থিত। প্রসঙ্গতঃ আমাদের পড়শি দেশ বাংলাদেশে এ জাতীয় ভাষা সমস্যা না থাকায় এই ধরণের উদ্যোগ গৃহীত হয়েছে। সেখানে শিক্ষার প্রসার ও আর্থসামাজিক উন্নয়ন আমাদের দেশ অপেক্ষা দুর্বল থাকা সত্ত্বেও মাতৃভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের রাজনৈতিক ও সামাজিক উদ্যোগ বর্তমান।

 

দ্বিতীয়তঃ ইংরাজি ভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা প্রসারের সুবিধা এই যে, আন্তর্জাতিক স্তরে ভাববিনিময় অনেকটাই সহজ হয়ে ওঠে। তবে এক্ষেত্রে উল্লেখ করতেই হয় যে ইংরাজি ভাষা ছাড়াও আন্তর্জাতিক স্তরে ফ্রেঞ্চ, জার্মান, রাশিয়ান, স্প্যানিশ, জাপানি, চিনা, ও আরবি - এ সমস্ত ভাষাতেও যথেষ্ট বিজ্ঞান চর্চা হয় এবং সেই ভাষার বিজ্ঞানীরা তাঁদের স্বভাষাতেই ভাব বিনিময় করে থাকেন। এতদসত্বেও তাঁরাও  আন্তর্জাতিক যোগাযোগের ভাষা হিসাবে ইংরাজিকে বেছে নিয়েছেন। সুতরাং ইংরাজি ভাষা আন্তর্জাতিক দরবারে আমাদের অংশগ্রহণকে সহজ করে তুলেছে এ কথা যেমন অনস্বীকার্য্য, তেমনি বিজ্ঞানচর্চার দুনিয়াতে মাতৃভাষার দাবীকেও অগ্রাহ্য করা যায়না। সে কারণেই মাতৃভাষায় বিজ্ঞানচর্চার দাবি একটি অত্যন্ত মৌলিক ও ন্যায্য দাবি।

 

তৃতীয়তঃ মাতৃভাষায় শিক্ষা প্রসারের অন্যতম বাধা হিসাবে পাঠ্যপুস্তকের অভাবকে খাড়া করা হয়। বিশেষতঃ ইংরাজি ভাষাতে বিভিন্নস্তরেই নানা উন্নতমানের পাঠ্যপুস্তক পর্যাপ্ত পরিমাণে  থাকায়, এই অভাব আরো অনুভূত হতে থাকে। এ  বিষয়ে আমাদের সামাজিক উদ্যোগহীনতাই মূলতঃ  দায়ী।  এর সাথে সাথে অর্থনৈতিক দিক থেকে চাহিদা না থাকায় ভালো পাঠ্যপুস্তকের প্রকাশনাও সীমিত। বিজ্ঞানের পরিভাষা নিয়েও নানা বিতর্ক উঠতে  থাকে। অবশ্য সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ দ্বারা পরিভাষা সংক্রান্ত অসামঞ্জস্য দূর করার প্রয়াস বিদ্যমান। তবুও এ ব্যাপারে দু’রকম ঝোঁকই লক্ষ্যণীয় - একদিকে সমস্ত রকম প্রচলিত ইংরাজি শব্দকে নানান তৎসম (অপ্রচলিত ও দ্ব্যর্থবোধক) শব্দ দ্বারা প্রতিস্থাপন করার প্রবণতা, অন্যদিকে সমস্ত রকম ইংরাজি শব্দকেই হুবহু রেখে দেয়ার ঝোঁক। আমাদের এর মাঝামাঝি রাস্তাটিই বেছে নিতে হবে। যে সমস্ত শব্দ স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের ভাষাতেও ঢুকে পড়েছে - তাদের গ্রহণ করতে হবে এবং মূলতঃ অপরিচিত পরিভাষাগুলিকে যতোদূর  সম্ভব  যথাযথ প্রতিস্থাপন করতে হবে। 

 

মাতৃভাষায় বিজ্ঞান চর্চার প্রসঙ্গতেই এই আলোচনায় ইতি টানতে চাই। যতদিন না মাতৃভাষা বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসারের মাধ্যম হিসাবে যথাযথ ব্যবহৃত না হচ্ছে, ততদিন বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার জনগণের কিয়দাংশেই সীমিত থাকবে। শিক্ষার সার্বজনীনীকরণের সাথে সাথে এই বিষয়টিও সমধিক গুরুত্বের দাবি রাখে।

 

২৬/১/১৯৯৮

 

কৃতজ্ঞতা স্বীকার:  লেখাটি প্রদীপ  বকশি  দ্বারা সংশোধিত ও পরিমার্জিত  (তারিখ:   ১১/৫/২০২১ )। 

 

 

 

 

 

 

Sunday, 11 April 2021

ভারতবাসী ও বাঙ্গালী

 


যে প্রশ্নটা নানাভাবেই আমাদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও সমাজজীবনে ঘুরে ফিরে উঠে আসছে সেটি আমাদের জাতীয় পরিচয়কে কেন্দ্র করে। এই যে আসমুদ্র হিমাচল দেশের নাগরিক তুমি তার কতটুকু আত্মীয়তার ভাগীদার বটে!

আমি শুধু ভারতবর্ষের সীমান্ত প্রদেশগুলির বিচ্ছিন্নতাপন্থী স্বাধীনতাপ্রয়াসী মানুষদের কথা ভেবেই বলছিনা - আমি বলছি প্রশ্নাতীত ভারতীয় আত্মপরিচয়ে গর্বিত মানুষদের কথা ভেবেও। তাদের ভাষার ভিন্নতা, লোকাচারের ভিন্নতা - সমস্ত কিছুরে মাঝেও ভারতবর্ষ স্বপ্নের মত জড়িয়ে আছে মায়াময় মনমাতানো মৌতাতে। কিন্তু শুধু ভাবের ঘোরেই সমাজ চলেনা। তাই ভাবের অভাব ঘটলে কীসের তাগিদে আমাদের ভারতীয়ত্ব বিকশিত হয় তারও বোঝাপড়া প্রয়োজন। কেননা এই বোঝাপড়ার খামতি দেখা দিলেই  ভারতীয়ত্বের ভিত্তিভূমি নড়ে ওঠে।

 

আমরা যারা বাঙ্গালী - যাদের মাতৃভাষা বাংলা - তাদের কাছে প্রশ্নটি গুরুতর। আমরা কতখানি ভারতীয়? আমাদের বাঙ্গালীত্ব ও ভারতীয়ত্ব কী যথার্থই পরিপূরক? আমাদের বাঙ্গালী কবি যখন বলেন, “আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি”, বা “কোন দেশেতে তরুলতা সকল দেশের চাইতে শ্যামল?’ - সেও কী “সারে জাঁহাসে আছা হিন্দোস্তাঁ” -র কুচকাওয়াজে দ্বিধাহীন কণ্ঠ মেলায়? এ কথা নির্দ্বিধায় বলা যায় রবীন্দ্রনাথ, ইকবাল, সুব্রহ্মনিয়াম ভারতীদের দেশবন্দনায় এই দুইই একে অপরের পরিপূরক। সেখানে তামিল জননী থেকে বঙ্গ জননী সবাই ভারতজননীর প্রতিভূ। আবার সেই ভাবজগতের ঐক্য ও নৈকট্য। এর সাথে অবশ্যই ছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামের প্রত্যয়। পরাধীনতার গ্লানি ও অপমান থেকে মুক্তিকামী এক উন্নত  সংস্কৃতির জনগোষ্ঠীর আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রাম। এ কথা অনস্বীকার্য্য আমাদের ভাষা লোকাচারে বিভিন্নতা থাকলেও সংস্কৃত ভাষা, ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতি ও হিন্দু ধর্ম এদের মধ্যে একতার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে।তারা যতই মুষ্টিমেয় অংশ হোন না কেন, তারাই ভারতীয় সমাজে নেতৃত্ব প্রদান করায় ভাষার বিভিন্নতা সত্ত্বেও চিন্তাধারায় সহমর্মিতা  গড়ে উঠেছিল।তবে ভারতীয় জাতীয়তাবাদের দুর্বলতাও সেখানেই নিহিত ছিল, যার কারণে ঔপনিবেশিক শাসনের  সমাপ্তি ঘটে দেশভাগের মধ্য দিয়ে। তবুও সাধারণভাবে বলা চলে রাজনৈতিক ভাবে প্রধানত ইংরেজদের বিরুদ্ধাচরণ ও সমাজগত ভাবে ধর্ম ও সংস্কৃতি ভারতীয় ঐক্যের প্রস্ফুটন ঘটায়। বিভিন্ন প্রদেশই আপন আপন সংস্কৃতি ও ভাষার বিকাশের সাথে এই ঐক্যের সান্নিধ্য অনুভব করত।

 

বিদেশী শাসকদের প্রস্থানে স্বদেশীয় শাসনব্যবস্থায় জাতীয় ঐক্যের ধারণাটি  স্বভাবতই  বিভিন্ন প্রশ্নের সম্মুখীন হয়। বিশেষ করে বহুজাতিক ভারতবর্ষে ভারতীয় জাতীয়তাবাদ বিভিন্ন অঞ্চলের জাতিসত্বার বিকাশের সাথে অঙ্গাঙ্গী ভাবে জড়িত।  স্বাধীনতোত্তর ভারতবর্ষের সেই  জাতীয় ঐক্যের শর্তগুলিকে বরং আমরা সংক্ষেপে দেখে নিই। আমি মূলতঃ এখানে তিনটি শর্তের উল্লেখ করব।

 

প্রথমতঃ  বিভিন্ন ভাষার জনগোষ্ঠী ও তাদের সাংস্কৃতিক বিকাশ যখন পারস্পরিক ভাব বিনিময় দ্বারা সমৃদ্ধ হয়, তখন ভারতবর্ষের ঐক্য সুদৃঢ় হয়। অন্যদিকে এই বিকাশের গতি যখন মন্দ বা রুদ্ধ হয়, তখনি ভারতবর্ষের সাথে তাদের আত্মীয়তার বন্ধনও দুর্বল হয়। এ কথা বিশেষ ভাবে মনে রাখা দরকার, যখন কোনো বিশেষ ভাষা বা সংস্কৃতিকে অন্য একটির উপর জোড় করে চাপিয়ে দিয়ে “এক দেশ, এক ভাষা, এক জাতির’  স্বপ্ন দেখানো হয়, তখনি ভারতবর্ষের অন্তরের ঐক্যে আঘাত হানার প্রক্রিয়াও শুরু হয়।

 

দ্বিতীয় শর্তটি  ভারতীয় চিরায়ত দর্শন, সাহিত্য ও ললিতকলার মেলবন্ধনকে কেন্দ্র করে। এক্ষেত্রে কোনো প্রাদেশিক ভাষার বিশিষ্টতা অপেক্ষা সংস্কৃত ভাষা এবং ললিতকলার আঙ্গিক ও বৌদ্ধিক প্রকাশ এই বিশিষ্টতা প্রদান করেছে। সেটি আরো সুলতানি ও মুঘল আমলের হিন্দুস্তানি ঘরানার সংমিশ্রণে সমৃদ্ধ হয়েছে।বিভিন্ন লোকসংস্কৃতিও এদের দ্বারা পুষ্ট হয়েছে। সুতরাং উত্তরাধিকারের এই ঐতিহ্য এবং তার বিকাশ যতই অবহেলিত হবে, ততই ভারতীয়ত্বের  ভিত্তিভূমি দুর্বল হবে। একথা বিশেষ ভাবে প্রযোজ্য যখন  পশ্চিমী প্রচারমাধ্যমের সংস্কৃতি বিপণনে দেশীয় সংস্কৃতিকে (চিরায়ত ও লোকায়ত দুই বিভাগেই) বিপন্ন দেখায়।

 

 তৃতীয় অন্যতম  শর্তটির ভিত্তি  ভারতবর্ষের বহুত্ববাদ -- বিভিন্ন ধর্মের সহাবস্থান ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতিপূর্ণ আদান-প্রদান।সংস্কৃতির থেকে ধর্মকে আলাদা করা মুশকিল। তবে যতই দিন যাচ্ছে সংস্কৃতির উপর ধর্মের প্রভাব ক্রমশঃই  কমছে (ক্ষেত্র বিশেষে যে বাড়ছে সেটি না বললেও নয়)। ভারতবর্ষে শুধুই হিন্দু বা শুধুই মুসলমান বা শুধুই শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খৃষ্টান ধর্মালম্বীর মানুষেরা থাকবেন তা নয়। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ তাদের পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতি নিয়েই বসবাস করেন। এই শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির ভাঁড়ারে টান পরলেই একতা বিনষ্ট হয়। বর্তমানে এ এক মহাবিপদ।ইংরেজ শাসন ভারতবর্ষকে রাজনৈতিক ভাবে এক করলেও, ধর্মীয় বিভাজনে ভারতীয় জনগোষ্ঠীকে বিভক্ত করেছে।সেই প্রক্রিয়া এখনো সমাজের বিভিন্ন স্তরে বিদ্যমান। বিশেষ করে রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের সমীকরণে ধর্মীয় বিভাজন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছে। সেখানে ভাষা ও সংস্কৃতি পিছু হটে ধর্মের একতাই হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। এমনকি কোনো বিশেষ জাতিসত্বার স্বাধীন আকাঙ্ক্ষাতেও এই ধর্মীয় মোড়ক বিদ্যমান। এ কথা যেমন সত্য যে ভারতীয় সমাজজীবন থেকে ধর্মকে ছেঁটে ফেলা যাবে না, তেমনি এই যুগে ধর্ম যতই গেঁড়ে বসবে ততই ভারতীয় অনৈক্য বিকশিত হবে। অর্থাৎ ধর্ম আজ মিলন অপেক্ষা বিভেদের অন্যতম ভিত্তিভূমি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

...

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক বিকাশের আঞ্চলিক অসাম্য নিরপেক্ষেই আমি পূর্বোক্ত শর্তগুলিকে বিচার করতে চেয়েছি। অর্থনীতির সুষম বিকাশেও প্রশ্নগুলি যে গুরুত্ব দাবী করে, তা নব্বই-এর দশকের বিভিন্ন যুক্তরাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাই (যেমন সোভিয়েত রাশিয়া, চেকোস্লোভাকিয়া ও যুগোস্লাভিয়া) প্রমাণ দেয়। এই বিচারেই দেখা যেতে পারে আমাদের বাঙ্গালীত্ব এই ভারতবর্ষে কতখানি ভারতীয়ত্বের অংশীদার। আমি অতীত ঘাঁটতে এখানে বসিনি। শুধু এই উল্লেখ করাই যথেষ্ট যে এই বাংলাদেশের নবজাগরণেই ভারতীয় জাতীয় চেতনার উন্মেষ ঘটে এবং প্রাক-স্বাধীনতা যুগে বাঙ্গালীর বাংলা ও ভারতমাতা যে এক ও অভিন্ন এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এমন কী স্বাধীনতা পরবর্তী তিন দশকেও এর হেরফের খুব ছিলনা। ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া কিন্তু শুরু হয়ে গেছে। অসচেতনভাবেই; যখন বাংলা তার নিজস্ব সংস্কৃতি ও ভাষাকে অবহেলা করতে শুরু করল। শুরুতে যেন অনেকটা প্রাদেশিক সংকীর্ণতার ঊর্ধে দাঁড়িয়ে বাঙ্গালীয়ানা বিসর্জনের মুগ্ধবোধে আমরা মোহিত ছিলাম। ক্রমেই সেই ঔদার্য্য অক্ষমতায় পরিণত হয়েছে। এখন আমরা আত্মপরিচয়ের আত্মবিশ্বাস খুইয়ে বসেছি। বিশেষত আমাদের শিক্ষিত সমাজের মধ্যে বাংলার অতীত মনীষা নিয়ে যেমন গর্ব, তেমনি বর্তমান সম্পর্কে চরম উন্নাসিকতা ও হীনমন্যতা।

 

এর সরাসরি বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে শিক্ষাক্ষেত্রে। সাধারণ শিক্ষিত পরিবারগুলিতে (উচ্চবিত্ত থেকে নিম্নবিত্ত সমস্ত স্তরেই) প্রচলন হয়েছে “ইংলিশ মিডিয়াম”-এ সন্তানদের পড়ানো। সরকারি “ফ্রী এডুকেশনে” এদের আর ভরসা নেই। আর তাই অলিতে গলিতে কচিকাঁচাদের “ইংলিশ রাইমস” আর “ফেব্লস” মুখরিত স্কুলগুলি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম গড়ে তোলার দায়িত্ব নিয়েছে। এমনকি অধিক সচেতন বাপ মায়েরা এখন ইংরাজির সাথে দ্বিতীয় ভাষা হিসাবে বাংলাকে দুয়োরানীর মর্যাদাটুকু দিতে রাজী নন। সেক্ষেত্রে হিন্দী পঠন পাঠনের ব্যবস্থা থাকলে ছেলেমেয়েদের সেদিকেই ঠেলছেন। এর ফলে শৈশব থেকেই যে উন্নত বঙ্গ সাহিত্য-সংস্কৃতির সাথে শিশু মনের পরিচয় ঘটত তা রুদ্ধ হচ্ছে।এ কারণেই কোনো ছড়া বা কবিতা বলতে বললে এখন শোনা যায় আধো আধো কুণ্ঠিত কণ্ঠে ধ্বনিত হয় ‘জনি জনি ইয়েস পাপা’ বা ‘ব্যা ব্যা ব্ল্যাক শীপ’। ‘হাট্টিমাটিম’এর জগত তাদের অজানা। রবীন্দ্রনাথ- নজরুল- যোগীন্দ্রনাথ- উপেন্দ্রকিশোর- সুকুমার রায় - জসীমুদ্দিন- অবন ঠাকুর - এঁরা সবাই  এদের যে বিচিত্র সম্ভার নিয়ে শিশুমনের কল্পনার জগতকে উন্মোচিত করত - তা থেকে এরা  বঞ্চিত। অথচ শিশু যে ভাষায় কথা বলে, যে ভাষায় জগতকে চেনে - সেই ভাষাতেই তার বৌদ্ধিক মননে আলোড়ন তোলা সম্ভব। সেই ভাষার বুননেই কল্পনার জগত প্রসারিত হয়। কিন্তু বর্তমান বিকল্প শিক্ষায় বিজাতীয় ভাষার পেষণেই শিশুমানস পঙ্গুত্বের শিকার হয়। সে তার আপনজনের আত্মীয়তা থেকে বঞ্চিত হয়, অন্যদিকে বিজাতীয় ভাষার অঙ্গনের সাদর আমন্ত্রণকেও অকুণ্ঠিতে গ্রহণ করতে পারেনা। এর ফল, আপন সংস্কৃতি সম্পর্কে তার ঔদাসীন্য ও হীনমন্যতা। আমাদের আত্মহননের বীজ এইভাবে বপন করা হচ্ছে। এতে যে শুধু বাঙ্গালীত্বই খর্বিত হচ্ছে তা নয়, ভারতবর্ষও দূরত্ব তৈরী করেছে। আমাদের ‘বাঙ্গালী’ পরিচয় বাদ দিলে ‘ভারতবাসী’ শব্দটিও অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। এটি ভারতবর্ষের প্রতিটি জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রেই সত্য।

...

আমাদের জাতীয় ঐক্যের পরিপন্থী বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে সর্বাধিক বিপজ্জনক ভারবর্ষকে ‘এক জাতি এক প্রাণ’ হিসেবে উপস্থাপিত করা। ভারতবর্ষ যে বহু জাতির মিলনভূমি এই সরল সত্য এই  ‘এক জাতি এক প্রাণ’ শ্লোগানে চাপা পরে যায়। বিভিন্ন জাতির বিকাশের অন্তরায় এই ধরণের অতিরিক্ত কেন্দ্রমুখী চিন্তাভাবনা - যার কেন্দ্রস্থলে বিরাজ করছে ‘হিন্দী  ভাষা’ ও ‘বাণিজ্যিক হিন্দী  সংস্কৃতি’। হিন্দী রাষ্ট্রভাষা হতে পারে - কিন্তু হিন্দী এই গোটা রাষ্ট্রের ভাষা নয় সেই সত্য স্বীকার করা অতি আবশ্যক। হিন্দী প্রচারের মাধ্যমে হিন্দীকে গোটা রাষ্ট্রের ভাষা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করার স্বপ্ন যারা দেখেন - তারা আর যাই হোক ‘ভারতবর্ষ’কে নিয়ে স্বপ্ন দেখেন না। অথচ হিন্দীকে ঠিক এই লক্ষ্যেই এতোটাই গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে যে সাধারণভাবে সরকারী অনুষ্ঠান ও প্রচারমঞ্চে  প্রদেশগুলিতেও তিনভাষার রীতিনীতি অর্থাৎ আঞ্চলিক ভাষা, হিন্দী, ও ইংরাজী - এই তিনের সমাবস্থান রক্ষিত হয় না। সে ক্ষেত্রে হিন্দী ও ইংরাজীর পঙক্তি থেকে আঞ্চলিক ভাষাগুলি বিদায় নিয়েছে। কিছুদিন আগেই দূরদর্শনে কোলকাতা মহানগর টেলিফোন নিগমের টেলিফোন ডিরেক্টরি প্রকাশের অনুষ্ঠানের ব্যানারে দেখলাম কেবল হিন্দী আর ইংরাজীটুকুই সেখানে উপস্থিত। বিষয়টি হয়তো ছোটো খাটো ত্রুটির আওতায় পরে, তবে এই ত্রুটি এখন সর্বত্রই। তাই মোটেই উপেক্ষণীয় নয়। এমনকি হিন্দী ভাষী অঞ্চলের বড় বড় রেলস্টেশনগুলিতে দেখা যায় কেবল হিন্দীতেই ঘোষণা হচ্ছে, অথবা অনুসন্ধান বিভাগের বোর্ডটিতে কেবল হিন্দীতেই ট্রেনের খবর লেখা আছে। এও এক ধরণের অসহিষ্ণুতা। এক্ষেত্রে অন্ততঃ ইংরাজীতে লেখা থাকা উচিত। যদি তামিলনাড়ু বা কর্ণাটকে কেবল সেখানকার ভাষাতেই ঘোষণা করা হোতো অথবা ট্রেনের খবরাখবর লেখা থাকত তাহলে ভিন প্রদেশের মানুষদের যেমন অসুবিধে হবে, এই স্টেশনগুলিতেও তেমন অসুবিধে হিন্দী না জানা মানুষের হয়ে থাকে।

আমাদের ভাষানীতির এই অসহিষ্ণু লঙ্ঘন অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত। হিন্দী ও ইংরাজী উভয়েই সংযোগকারী ভাষা হিসাবে ভূমিকা পালন করে। এই ভূমিকায় কোনো ভাষাকেই ছোটো করা উচিত নয়। আবার কাউকেই বাড়িয়ে দেখে সর্বত্র বাধ্যতামূলক করার অপপ্রয়াস বন্ধ করতে হবে। প্রয়োজনে ‘রাষ্ট্রভাষা’ বা ‘রাজভাষার’ এই বিশেষণটুকু ছেঁটে ফেলে কেবল ‘সংযোগ ভাষা’ হিসাবে স্বীকৃতি প্রদান করা উচিত। এর ফলে আমাদের আন্তঃসম্পর্কে স্বচ্ছতা আসবে।

...

সুতরাং  প্রশ্ন উঠতেই পারে কিসের তাগিদে এই বিবিধ জাতির সম্মলেনভূমি হিসাবে ভারতবর্ষ টিঁকে আছে? বিশেষতঃ জাতিগুলির আপন আপন বিকাশ স্বতন্ত্র উদ্যোগেই কী কাম্য নয়? এতো কিছু ‘কষ্টকর’ বোঝাপড়ায় এই বিকাশের গতি কী শ্লথ হয়ে যায়নি?

 

আমাদের বিভিন্ন ধরণের প্রাদেশিক টানাপোড়েন, বোঝাপড়ার অসঙ্গতি সত্বেও আমাদের এই ঐক্য যে কতখানি জরুরী সেটি বোঝা যেতে পারে যদি আমরা তৃতীয় বিশ্বের ক্ষুদ্র দেশগুলির দিকে তাকাই। যদিও ভারতবর্ষ অনেকাংশেই অর্থনৈতিক মানদণ্ডে পশ্চাদপদ, তবুও তার এই বিশালতা ও জাতিসম্মেলনের উন্নত সংস্কৃতির প্রভাব বাইরের দুনিয়ায় যথেষ্ট পরিচিত। সুতরাং ভারতবর্ষের পরিচিতিতে বিশ্বের অঙ্গনে যে স্বাতন্ত্র্যের গৌরব আমরা লাভ করেছি, সেটি আমরা হারাবো। ক্ষুদ্র প্রদেশগুলি সেই গুরুত্ব অর্জনেও অক্ষম হবে। অন্যদিকে এই বিশালতা ও ভারতীয় জাতিসম্মেলনের এই  বৈচিত্র্য আমাদের গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। হঠাৎ করে  কোনো সামরিক অভ্যুত্থান এই দেশের চালু শাসনব্যবস্থাকে উপড়ে ফেলতে পারবে না। ভারতীয় গণতন্ত্রের নানা দুর্বলতা সত্বেও যে কোনো স্বৈরতন্ত্রী একনায়কত্ব অপেক্ষা তা বরণীয়। এছাড়া রাজ্যগুলি নিজেদের অর্থনৈতিক আদান-প্রদান বিভিন্ন ক্রিয়াকলাপেও লাভবান হয়। স্বতন্ত্র উদ্যোগে সেই বোঝাপড়ায় খামতি থেকে যেতো। এমনকি যে কোনো অন্তর্বিরোধই এই পারস্পরিক বোঝাপড়ায় সামলানো সহজ। সাম্প্রতিককালে নদীর জলভাগ নিয়ে তামিলনাড়ু, কর্ণাটক, ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিবাদ বিসম্বাদ লক্ষ্যণীয়। এরা সবাই যদি স্বতন্ত্র দেশ হোতো তবে এই কাজিয়ায় না যুদ্ধ লেগে যেতো?

 

এই বিভিন্ন কারণেই আমাদের ঐক্য অত্যন্ত জরুরী। আমাদের পারস্পরিক বোঝাপড়া রাখা প্রয়োজন। সেক্ষেত্রে ঐক্যের খাতিরে যেমন নিজস্ব জাতীয় স্বাতন্ত্র্য জলাঞ্জলি দেওয়া চলে না, তেমনি বিরোধ আছে বলেই গাঁটছড়া ছিন্ন করা চলে না। প্রকৃত গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে বহুজাতিক ভারতবর্ষের এই সমাধান আবশ্যক। আমাদের বোঝা প্রয়োজন আমাদের বাঙ্গালীত্ব বিনা আমরা ভারতবাসী নই - আমাদের এই দ্বৈতসত্ত্বাই আমাদের সংস্কৃতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।

 

২২/৮/৯৭