ফিলোক্টেটিসঃ সফোক্লিসের সময় ও ভাবনা
ফিলোক্টেটিস নাটকটি সফোক্লিস লেখেন তাঁর দীর্ঘ জীবনের অন্তিম লগ্নে। লেখক তখন নব্বই ছুঁই ছুঁই। এথেন্সের স্বর্নযুগের উদয় ও অবক্ষয়- দুয়েরই সাক্ষী। সাধারণভাবে পুরাণভিত্তিক বিয়োগান্তক নাটকগুলিতে (Tragedy) সমসাময়িক ঘটনার ছাপ না থাকলেও ফিলোক্টেটিস-এর মাধ্যমে সফোক্লিস যেন সেই সময়ের অবক্ষয় এবং সেই হেতু তাঁর অন্তর্দহনের ভাবনাসমূহ সামনে এনে ফেলেছেন। এই দিক দিয়ে দেখতে গেলে নাটকটি অন্যান্য গ্রীক ট্রাজেডির থেকে আলাদা।উপস্থাপনার বিচারেও এটি পৃথক আঙ্গিকের দাবীদার। এটি একটি একাঙ্ক নাটক। ঘটনার স্থান হিসাবে নাট্যকার একটি জায়গাকেই বেছে নিয়েছেন। তাই কোনো দৃশ্য পরিবর্তন ছাড়াই এক অঙ্কে নাটকটি পরিবেশিত হয়েছে।সেই সাথে সমবেত কণ্ঠ বা কোরাসের (Chorus) ব্যবহারেও বিশিষ্টতা আনা হয়েছে। নাটকটিতে কোরাসের চরিত্রগুলি যেন স্বতন্ত্র স্বত্বায় প্রতিভাত হয়। এক্ষেত্রে সমবেত উচ্চারণের পরিবর্তে ব্যক্তিমানুষের ভূমিকায় কোরাসের কুশীলবেরা অংশ গ্রহণ করে। যদিও অন্যান্য গ্রীক নাটকে নাট্যকার তাঁর বক্তব্য কোরাসের মাধ্যমেই দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেন, এখানে সফোক্লিস ফিলোক্টেটিস চরিত্রটিকেই তাঁর বক্তব্যের মুখ্যাধার হিসাবে গড়ে তুলেছেন। অন্যায়ভাবে সমাজ থেকে নির্বাসিত, পরিত্যক্ত পঙ্গু ফিলোক্টেটিসের ক্রোধ ও অভিমানের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা সহজেই অনুভব করা যায়। অন্যদিকে অন্যান্য ট্রাজেডিতে ‘কোরাস’ যেভাবে নেপথ্য ঘটনার বিবরণ দিয়ে ঘটনাক্রমের সূত্রধরের ভূমিকা পালন করে, এই নাটকটিতে ‘কোরাস’ সেভাবে অংশগ্রহণ করেনা। বরং চরিত্রগুলির অন্তর্দ্বন্দ ‘কোরাসের’ মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
ফিলোক্টেটিস নাটকটি প্রায় আড়াই হাজার বছর পুর্বে (৪০৮ খৃঃ পূঃ) লেখা হয়। সেই সময়ের গ্রীসের সভ্যসমাজের মূল্যবোধের পরিচয়ও নাটকটিতে মেলে। আকিলিস পুত্র নিওপ্টলেমস যেখানে ব্যক্তিমানুষের সততা ও নীতি নিষ্ঠার প্রতি তাঁর দায়বদ্ধতা ঘোষণা করেন, সেখানে গ্রীক সেনানায়ক অডিসিয়াস (বা ইউলিসিস) ছলে বলে কৌশলে জয়কে করায়ত্ব করাকেই কাম্য মনে করেন। যে কোনো ভাবে আত্মপ্রতিষ্ঠাই তাঁর লক্ষ্য। স্পষ্টতই সফোক্লিস অডিসিয়াসকে খলনায়কের পরিচয়ে মঞ্চে হাজির করেছেন, আর নিওপ্টলেমসকে দেখিয়েছেন সামাজিক অবক্ষয়ের বিরুদ্ধে এক সংগ্রামী চরিত্র হিসাবে। তাঁর অন্তর্দ্বন্দ সেই সততারই প্রতিচ্ছবি।
নাটকটি অন্যান্য গ্রীক ট্রাজেডি থেকে আরো একটি বিষয়ে স্বতন্ত্র। গ্রীক ট্রাজেডিগুলি মূলতঃ ঘটনাকেন্দ্রিক (Action-centric)। চরিত্রগুলি সেক্ষেত্রে ঘটনাপ্রবাহে তাদের ভূমিকা অনুযায়ী সীমিত থাকে। সাধারণত ট্রাজেডিগুলিতে সেই সব পৌরাণিক বীরদের আখ্যান বিষয়বস্তু হয়ে ওঠে যারা তাদের কোনো কৃতকর্মের দরুন দেবতার আশীর্বাদ থেকে বঞ্চিত হোন এবং তার ফল ভোগ করেন। দৈহিক ও মানসিকভাবে যতই শক্তিশালী তারা হোন না কেন, তারা যে দৈবের ক্রীড়নক এই বক্তব্যই নাটকগুলি দর্শকদের কাছে পোঁছে দেয়। ‘ফিলোক্টেটিস’ নাটকটিও মূলতঃ সেই ধারা বজায় রেখেছে। তবুও অন্যান্য ট্রাজেডিতে হিংসা ও ভাগ্যবিপর্যয়ের ঘটনাপ্রবাহ যে ভাবে অঙ্কিত হয়, তার পরিবর্তে এই নাটকটিতে বিভিন্ন চরিত্রের দ্বন্দ্ব ও তাদের ভূমিকার বিশ্লেষণই মুখ্য হয়ে উঠেছে। সেই দিক দিয়ে দেখতে গেলে নাটকটি চরিত্রপ্রধান।
বিভিন্ন সমালোচকও ফিলোক্টেটিস নাটকটির এই বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোকপাত করেছেন। তাঁদের কারো মতে মানুষের চরিত্রের উৎসের সন্ধান নাটকটিতে সফোক্লিস দিতে চেয়েছেন। সেখানে তিনি মানুষের চরিত্রে ‘পরিবেশ বনাম অন্তর্নিহিত সত্ত্বার’ প্রতিফলনের চিরায়ত বিতর্ককে উসকে দিয়েছেন এবং স্পষ্টতই দ্বিতীয় পক্ষ অবলম্বন করেছেন। মানুষের ব্যক্তিত্বের বিকাশ ও পরিবর্তনে পরিবেশের প্রভাবকে তিনি স্বীকৃতি দিতে চাননি। বরং চরিত্রবিরুদ্ধ কাজ আত্মমর্যাদাকে ভীষণভাবে ক্ষুণ্ণ করে এবং আপন স্বাধীনতাকে বিসর্জন দেয় - এই বক্তব্যই তিনি নাটকটিতে তুলে ধরেছেন। সে কারণেই ফিলোক্টেটিসকে প্রতারিত করে নিওপ্টলেমস চরম আত্মগ্লানিতে ভোগে - অন্যদিকে অডিসিয়াসের কাছে এই প্রতারণা তার লক্ষ্যপুরনের অন্যতম শর্ত হওয়ায়, বিষয়টি অতি স্বাভাবিক ও বাস্তবসম্মত।
অন্য আর এক সমালোচক-এর কাছে এই নাটকটিতে ফিলোক্টেটিস-এর মাধ্যমে সফোক্লিসের শিল্পী সত্ত্বার বিলাপধ্বনি মুখরিত হয়েছে। এ যেন সমাজে পরিত্যক্ত পঙ্গু এক শিল্পীর সমাজকে প্রভাবিত করাতে ব্যর্থ হওয়ার বেদনার প্রতিধ্বনি। এরই সাথে মনে করেছেন যে সমসাময়িক ঘটনার প্রভাব নাটকটিতে এসে পরেছে। পুরানো নথী থেকে জানা যায় যে সফোক্লিসের পুত্ররা তাঁর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছিলেন এই বলে যে বার্ধক্যের কারণে তিনি বিষয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণে অপারঙ্গম। আর সেই জন্য তারা উত্তরাধিকারের দাবী জানিয়েছিল। তাদের এই অভিযোগ খণ্ডন করতে আত্মসমর্থনের নজীর হিসাবে এথেন্সের বিচারসভায় বৃদ্ধ সফোক্লিস কেবল নিজের সদ্য রচিত নাটক ‘কোলোনসের আউদিপিয়াসের’ একাংশ আবৃত্তি করে শোনান। তাঁর রচনাপ্রতিভায় মুগ্ধ বিচারকমণ্ডলী তৎক্ষণাতই মামলা খারিজ করে দেন এই বলে যে এমন প্রতিভাবান শিল্পীকে অপ্রকৃতিস্থ আখ্যা দেওয়া অনুচিত। যদিও আধুনিক গবেষকরা এই গল্পের সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেন, তবুও ঘটনাটি সফোক্লিসের শেষ জীবনে মহান পিতামাতার সন্তানদের নীচ প্রবৃত্তির উৎসের ব্যাখ্যা খোঁজার প্রয়াসের ইঙ্গিতবাহী। আভিজাত্যের এই পদস্খলনে তিনি মর্মাহত ও তীক্ষ্ণ বিদ্রূপে পরিপুর্ণ। সমসাময়িক এথেন্সেরর তরুণ অভিজাত সম্প্রদায় - যারা বংশকৌলীন্যে সম্মানীয় ছিলেন অথচ তাদের অর্থগৃধ্নুতা ও স্বার্থপরতা নগরীকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দিতে প্রস্তুত ছিলেন - তাঁদের উদ্দেশ্যে তাঁর অভিযোগ ও তিরস্কার নাটকটির মাধ্যমে ছুঁড়ে দিয়েছিলেন। সমালোচকদের এমনি বিভিন্ন মতামত নাটকটিকে কেন্দ্র করে আলোচিত হয়েছে।
তবুও আমার মনে হয়েছে ফিলোক্টেটিস নাটকটিতে সমসাময়িক ঘটনার প্রভাবের আলোচনা অসম্পূর্ন থাকে যদি না নাটকটিকে সেই সময়কার যুদ্ধবিধ্বস্ত এথেন্সের নগরীর সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিচার না করা হয়। ফিলোক্টেটিস নাটকটি যখন সফোক্লিস লেখেন তখন এথেন্সের সাথে স্পার্টার নেতৃত্বাধীন পেলোপনেশিয়ান জোটের যুদ্ধ চলছে। প্রায় পঁচিশ বছর ধরে যুদ্ধের জয়-পরাজয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে নাগরিক জীবন অতিবাহিত হয়েছে এবং ক্রমশই তাদের অজেয় নৌ-সামরিক শক্তি স্পার্টার নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে পড়ছে। স্বভাবতই এই অবস্থা থেকে পরিত্রাণের বিষয়টি ছিল তাদের সামনে জ্বলন্ত। বারংবারই সুবিধাজনক পরিস্থিতিতে স্পার্টার সাথে সন্ধিস্থাপনের প্রশ্নটি উঠে এসেছে।কিন্তু এথেন্সের জনসাধারণ ক্রমাগতই যুদ্ধের সপক্ষে তাদের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে।পরবর্তীকালে তাদের এই সিদ্ধান্তের ভুলের মাশুলও দিতে হয়েছে। জনগণকে ভ্রান্তপথে পরিচালিত করার জন্য সমাজের বিভিন্ন অংশের স্বার্থও জড়িত ছিল। বিশেষে কিছু ব্যক্তির ভূমিকা এই সমস্ত প্রাচীন সমাজে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ণ হয়ে ওঠে। সেরকমই কিছু স্বার্থপরায়ণ মানুষের দ্বারা বিভ্রান্ত জনগণ বিভিন্ন হঠকারী সিদ্ধান্তও অনেক সময় গ্রহণ করেছে। তার একটি ছিল ‘সিসিলি অভিযান’ - যেটি অযথাই যুদ্ধকালীন পরিস্থিতির দাবীকে উপেক্ষা করে গ্রহণ করা হয়েছিল। তদানীন্তন গণতান্ত্রিক দলের নেতা আলসিবিয়াডিস আপন উচ্চাভিলাষ পূরণে জনগণকে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্ররোচিত করেছিলেন। অন্যদিকে অভিজাত দলের নেতা নিসিয়াস প্রমূখের সতর্কবার্তা সত্ত্বেও এই আগ্রাসনে এথেন্স পা বাড়িয়েছিল। এই অভিযানে এথেন্সের নৌ-বাহিনীর অগ্রণী অংশ, যার মধ্যে নিসিয়াস ও দেমোস্থিনিসের মত অভিজ্ঞ সেনানায়কেরা ছিলেন, ধ্বংস হয়ে যায়। অভিযানচলাকালীন অন্যতম সেনানায়ক আলসিবিয়াডিস দেবতাদের অবমাননার দায়ে অভিযুক্ত হোন এবং বিচারকেরা তাঁর মৃত্যুদণ্ড জারী করেন। সেই বার্তা পেয়ে তিনি পালিয়ে গিয়ে স্পার্টার জোটে যোগ দেন এবং এথেন্সের বহু সর্বনাশের কাণ্ডারী হোন। এইভাবে অযথা সমাজের অগ্রণী অংশের ঝরে যাওয়ার মর্মবেদনা সফোক্লিসের নাটকটিতে ফুটে ওঠে, যখন ফিলোক্টেটিস একে একে ট্রয় যুদ্ধের বিভিন্ন মহান বীরদের খোঁজ নিচ্ছেন আর তাঁদের দুঃখজনক পরিণতির কথা জানতে পারছেন। দেবতাদের প্রতিও তাঁর সে আক্ষেপ তিনি চেপে রাখেননি।
[
নিওপ্টলেমসঃ মহান আইয়াসও আমাদের মধ্যে আর নেই। যদি তিনি বেঁচে থাকতেন আমাকে হয়তো এ অপমানের জ্বালা সইতে হোতোনা।
ফিলক্টেটিস ঃ ওঃ! আইয়াস মৃত!
নি ঃ তাই সত্য বটে!
ফি ঃ কি নিষ্ঠুর বিধাতার পরিহাস! যাঁদের বেঁচে থাকার কথা তাঁরা মৃত।ঘৃণ্য টিডিয়াস পুত্র আর লায়েট্রেসের পুত্র অডিসিয়াস, শুনেছি তাকে সিসিফোস লায়েট্রেস এর কাছে বেচে দিয়েছিল, তারাই জীবিত!
নি ঃ শুধু তাই নয়! সসম্মানে! গ্রীকদের অন্যতম নায়ক তারা।
ফি ঃ আর নেস্টর! আমার প্রবীণ বন্ধুটি! পাইলসের রাজা? তিনিও কি বেঁচে নেই? তিনি তো জানি ওদের কুকর্মকে যতদূর পারতেন সুপরামর্শ দিয়ে প্রতিরোধ করতেন।
নি ঃ নেস্টরের এখন দুঃসময়! তাঁর বীর পুত্র অ্যান্টিলোখোস যুদ্ধে নিহত।
ফি ঃ হায়রে বালক! এ কি কথা শুনাচ্ছ পরের পর? আইয়াস আর অ্যান্টিলোখোস - দুই মহান ব্যক্তি - তাঁরা মৃত? আর ওই ঘৃণ্য কীট অডিসিয়াস এখনো মাটির উপর চরে বেড়াচ্ছে? ওকেই তো মরতে হোতো সবার আগে! ওঃ বিধাতা ! এ কী বিধান তোমার?
নি ঃ সে খুবই ধূর্ত! ভাগ্যকে ধূর্ততায় বশ করে! তবে এর পরিণাম তাকেও একদিন সইতে হবে নিশ্চয়!
ফি ঃ আর পাট্রোক্লোস! তাঁর কি খবর? তোমার পিতার অতি অন্তরঙ্গ সুহৃদ যিনি?
নি ঃ উনিও মৃত! যুদ্ধ কখনো মন্দ লোকেদের গ্রাস করেনা।
ফি ঃ তবুও আর একজনের কথা জিজ্ঞাসা করি। যে অধমেরও অধম! নরকের কীট! ধূর্ত, কপট, শঠ -
নি ঃ এতো আপনি অডিসিয়াসের কথাই বলছেন!
ফি ঃ না না ! সে নয়! আমি বলছি থার্মাইটের কথা! যার মুখে বড় বড় কথা লেগেই থাকত! সে কি জীবিত?
নি ঃ আমি তাকে চিনিনা। তবে শুনেছি সে বেঁচে আছে।
ফি ঃ বাঁচবেই তো! বাঁচবেই তো! কোনো দুরাত্মাই মরেনি। দেবতারাই ওদের সুখী রাখেন। এতেই বোধ হয় দেবতাদের সুখ! যত বেইমান আর প্রবঞ্চকদের মৃত্যু থেকে দূরে রাখা! আর এই পৃথিবীর যত ভালো লোকেদের বিদায় দেওয়া! এই তো তাঁদের বিচার! কি করে তাহলে ওঁদের উপর ভরসা রাখি বলো?
]
অন্যান্য গ্রীক ট্রাজেডি থেকে এইখানেও নাটকটি অনন্য হয়ে উঠেছে। সাধারণভাবে ট্রাজেডিগুলিতে দেবতার অনুগ্রহ এবং প্রতিহিংসার পটপরিবর্তনে গ্রীকনায়কদের জীবনে ভাগ্যবিপর্যয় নেমে আসে। কিন্তু ফিলোক্টেটিসের ‘ভাগ্যবিপর্যয়ে’ কেবল দেবতার অভিশাপের সেই বৈধতার স্বীকৃতি দিতে নাট্যকার নারাজ। বরং তার প্রতি তার সহযাত্রীদের অন্যায়কে সমর্থন করা নিয়ে তিনি দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন রেখেছেন। জীবন সায়াহ্নে এসে দেবতাদের প্রতি তার আনুগত্যের এই সংশয় খুব সূক্ষ্মভাবে হলেও নাটকটিতে ফুটে উঠেছে।
...
সমসাময়িক এথেন্সের ব্যক্তি ও জনসাধারণের ভূমিকা অনুধাবন করতে হলে আমাদের তদানীন্তন এথেন্সের রাজনীতি ও সমাজজীবন সম্পর্কেও কিছু ধারনা থাকা প্রয়োজন। নাট্যকার তাঁর দর্শকের কাছে কী বার্তা পৌঁছে দিতে চাইছেন সেটি বুঝতে হলে আমাদের সেই দর্শকদের আশা আকাঙ্ক্ষা বা শঙ্কার গুরুত্বপুর্ণ দিকগুলিকে অনুসন্ধান করা উচিত। আর সে কারণেই সে যুগের গণতান্ত্রিক এথেন্সের সামজিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার এক সংক্ষিপ্ত পরিচিতি এখানে তুলে ধরা হোলো।
এথেন্সের জনসাধারণ দশটি গোষ্ঠীতে বিভক্ত ছিল। এথেন্সকে কেন্দ্র করে যে জনপদ বা ক্ষুদ্র রাষ্ট্র গড়ে উঠেছিল যাকে অ্যাটিকা বলে অভিহিত করা হোতো, সেটি ৩০ টি অঞ্চলে বিভক্ত ছিল। গ্রীক ভাষায় এই অঞ্চলগুলিকে ‘ডেমো’ (Demos) আখ্যা দেওয়া হয়। প্রতিটি গোষ্ঠীর জন্য ৩টি ডেমো নির্দিষ্ট ছিল। প্রতিটি নাগরিককেই কোনো না কোনো ডেমোর সদস্য বা অন্তর্ভুক্ত হোতে হোতো। ডেমোর সদস্যদের শাসনব্যবস্থার সমানাধিকার ছিল এবং সেই শাসনই চিহ্নিত হয়েছিল ডেমোক্রাসি নামে। বর্তমান শব্দকোষে যেটি সাধারণ অর্থে ‘গণতন্ত্র’কে সূচিত করে। কেমন ছিল এই এথেন্সীয় গণতন্ত্র? এক অর্থে দীর্ঘ সময় ধরে জনসাধারণের সক্রিয় রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রদর্শনের এমন চরমতম নিদর্শন পৃথিবীর ইতিহাসে অনন্য। অবশ্য খেয়াল রাখা প্রয়োজন এথেন্সের সমাজ মুক্তমানুষ ও দাস - এই দুভাগে বিভক্ত ছিল। মুক্তমানুষদের মধ্যে আবার কেবল পুরুষ নাগরিকরাই এই গণতন্ত্রের অংশীদার ছিল। সেখানে দাস ও নারী - উভয়েরই অধিকার প্রায় কিছুই ছিলনা বলেই চলে। কিন্তু ধনী দরিদ্র নির্বিশেষে মুক্ত (পুরুষ) নাগরিকরা সেই সমাজের শাসনব্যবস্থার যে কোনো সিদ্ধান্তেরই শরিক ছিল এবং সামরিক বা অসামরিক (প্রায়) যে কোনো প্রশাসনিক পদেরই যোগ্য ছিল।সে যুগের লেখকদের লেখা থেকে গনতান্ত্রিক এথেন্সের শাসনব্যবস্থা ও সমাজজীবনের নানা চিত্র আমরা পেয়ে থাকি। এর অন্যতম একটি দলিল অ্যারিস্টোটল-এর ‘এথেন্সীয় সংবিধান’এর উপরে লেখা একটি রচনা। সেই প্রবন্ধে অ্যারিস্টোটল প্রায় দেড়শ বছর ধরে নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে তদানীন্তন এথেন্সের গণতন্ত্রের যে বিকাশ ঘটেছিল তার বর্ননা দিয়েছেন এবং সেই সাথে শাসনব্যবস্থার একটি সুনির্দিষ্ট চিত্র তুলে ধরেছেন। তাঁর ভাষাতেই সেই শাসনব্যবস্থার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ তুলে ধরা যাক।
“গণতন্ত্র সমস্ত বিষয়ে তার কর্তৃত্ব জারী রেখেছিল, এবং সমস্ত প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই ‘গণ পরিষদে’ (assembly) ও বিচারসভাতে (Law courts) ভোটের মাধ্যমে গ্রহণ করা হোতো। এমনকি প্রতিনিধিসভার (Council) আইন প্রণয়নের ক্ষমতা মূলত জনগণের হাতেই ছিল। এই পরিবর্তন অবশ্যই বিচক্ষণতার পরিচয় - কারণ ক্ষুদ্র গোষ্ঠীতে এই ক্ষমতা আবদ্ধ থাকলে তারা দুর্নীতির আখড়া হয়ে উঠত এবং প্রকৃতভাবেই অর্থ ও সামাজিক প্রতিপত্তি দ্বারা পরিচালিত হোতো। বৃহত্তর জনসমাজ উপেক্ষিত হোতো। প্রথম প্রথম গণপরিষদের সভায় উপস্থিতির জন্য কোনো অর্থ প্রদান করা হোতো না। কিন্তু প্রাইটেনদের (Prytane) যাবতীয় প্রচেষ্টা বিফল হওয়ায় জনগণকে সভায় হাজির করাতে ও ভোটে অংশগ্রহণ করাতে অ্যাগিরিয়াস (Agyrrhius) সর্বপ্রথম জন প্রতি এক ওবোল (Obol) প্রতি হাজিরাতে নির্দিষ্ট করেন। পরবর্তীকালে ক্লাজোমিনাল হেরাক্লাইডিস (Clazominal Heracleidis), যাকে ‘মহারাজ’ বলে ডাকা হোতো, তিনি এটিকে দুই ওবোলে বর্ধিত করেন। অ্যাগিরিয়াস (Agyrrhius) সেটিকে ফের তিন ওবোলে নিয়ে যান।”
অ্যারিস্টোটল-এর এই রচনা যদিও ফিলোক্টেটিস-এর রচনাকালের পঞ্চাশ বছর পরে লেখা, তবুও এথেন্সের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাতে সময়ের এই ব্যবধান বিশেষ কোনো ফারাক তৈরি করেনি। অ্যারিস্টোটল-এর রচনাতেই সেটির উল্লেখ আছে। এথেন্সের শাসনব্যবস্থার মুল দুই স্তম্ভ ছিল ‘গণপরিষদ’ (Assembly) এবং ‘প্রতিনিধিসভা’ (Council)। গণপরিষদে সমস্ত নাগিরিকই অংশগ্রহণ করতে পারতেন। পাঁচশ জনের প্রতিনিধিসভায় প্রতিটি গোষ্ঠী পঞ্চাশ জনের সদস্য এক বছরের জন্য নির্বাচিত করে প্রেরণ করত। এই নির্বাচন হোতো ভোটের মাধ্যমে নয়, লটারিতে। মজার ব্যাপার এথেন্সের প্রায় সমস্ত পদেই এই ধরনের নির্বাচন ছিল লটারিতে, এবং সমস্ত পদেই নিয়োগ এক বছরের জন্য বহাল থাকত। তবে সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা, যেমন সেনাধ্যক্ষেরা ও অশ্ববাহিনীর প্রধানেরা ভোটের দ্বারা এক বছরের জন্য নির্বাচিত হতেন। প্রতিনিধিসভা ও গণপরিষদের সমাবেশের আহ্বান ও পরিচালনার ভার ছিল প্রাইটেনদের হাতে। প্রতিটি গোষ্ঠী থেকেই পর্যায়ক্রমে প্রাইটেন-এর পদে নিয়োগ করা হোতো। এই পর্যায়ক্রমও লটারির মাধ্যমে নির্ধারিত হোতো। এক এক জন প্রাইটেন-এর মেয়াদ কালে (৩৬ বা ৩৫ দিন) চারবার গণপরিষদের আহ্বান করা হোতো। প্রতিনিধি সভা ছুটির দিন বাদ দিয়ে প্রতিদিনই আহুত হোতো। প্রতিনিধিসভা ও গণপরিষদের কর্মসূচী (ও আলোচ্যবিষয়ের সূচী) প্রাইটেনরাই নির্ধারিত করতেন। তবে চারটি গণপরিষদের সভার একটি নির্দিষ্ট ছিল জনসাধারণের কাছ থেকে যে কোনো আলোচনার বিষয়কে গ্রহণ করার জন্য। এই সভাতে যে কোনো বিষয়, সে ব্যক্তিগত বা সার্বজনীন (Public) হোক না কেন, আলোচনার জন্য গৃহীত হতে পারত। এই গণপরিষদগুলি রাজনৈতিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র ছিল। সমাজের প্রতিপত্তি সম্পন্ন যে কোনো ব্যক্তিকেই তার আচরণ ও সিদ্ধান্তের জবাবদিহি এই পরিষদে করতে হোতো। জনগণ সন্তুষ্ট না হলে সঙ্খ্যাগরিষ্ঠের ভোটে তাদেরকে নির্বাসনে যেতে হোতো - এমনকী মৃত্যুদণ্ডও দেওয়া হোতো। স্বভাবতই এই ধরণের সমাবেশে বাগ্মিতা ও বাক্-চাতুর্য্যের বিশেষ ভূমিকা ছিল। সেই সময়কার এথেন্সে দুটি দলের মধ্যে রাজনৈতিক ক্ষমতার লড়াই চলত। একটি দল ছিল অভিজাতদের দ্বারা পরিচালিত এবং অভিজাতদের স্বাতন্ত্র্য রক্ষাতে সচেষ্ট। এর বিরোধী দলটি ছিল গণতন্ত্রের প্রতি বিশ্বস্ত। শুরুতে এই দলটির নেতৃত্বও অভিজাত বংশের মানুষজনের হাতেই ছিল। ক্রমেই সেটি সমাজের বিভিন্ন অংশে প্রসারিত হয়। পেলোপনেশিয়ান যুদ্ধ চলাকালীনই গণতান্ত্রিক নেতৃত্বের এই চরিত্রবদল ঘটে।
...
এথেন্সের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার বিপরীতে স্পার্টার অভিজাত - পারিবারিক (Oligarchy) শাসনব্যবস্থাও বিচার করে দেখা যেতে পারে।সেখানে অভিজাতগোষ্ঠীরা শাসন চালাতেন, যদিও শাসনব্যবস্থায় সেই অভিজাতবর্গের মধ্যে কোনো ব্যক্তিবিশেষের একনায়কত্বের সম্ভাবনাকে খর্বিত করার প্রয়াস ছিল। সাধারণ নাগরিকদের দ্বারা অভিজাতগোষ্ঠীর প্রশাসকদের নির্বাচিত করা হোতো। স্পার্টায় রাজনৈতিক ক্ষমতার মূলত তিনটি কেন্দ্র ছিল - ‘গণপরিষদ’ (Popular assembly), তিরিশ সদস্যের সেনেট যার মধ্যে স্পার্টার দুইজন রাজা অন্তর্ভুক্ত ছিলেন, এবং পাঁচ জন ইফর (Ephor) বা জনপ্রতিনিধি। এর মধ্যে গণপরিষদের প্রায় কোনো ক্ষমতাই ছিলনা। জনগণ কেবল সেনেট সদস্যদের ও ইফরদের নির্বাচন করতে পারত। কেবলমাত্র ষাট বছরের ঊর্ধের ব্যক্তিরাই সেনেটের সদস্য হতে পারতেন এবং আমৃত্যূ সেই সদস্যপদ বজায় থাকত। ইফররা প্রতিবছরই নির্বাচিত হতেন। ক্ষমতার মূল কেন্দ্রে ছিল সেনেট; অবশ্য পরবর্তী সময়ে ইফররা ভীষণভাবে ক্ষমতাবান হয়ে ওঠেন। কোনো গুরুত্বপুর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন হলে গণপরিষদ আহূত হোতো এবং সেখানে জনসাধারণ কেবল ধ্বনি ভোটের মাধ্যমে সিদ্ধান্তের সপক্ষে বা বিপক্ষে মতামত দিত। তাদের কোনো ধরণের আলোচনাতেও অংশগ্রহণ করার অধিকার ছিলনা, ছিলনা সিদ্ধান্তের ভাষায় কোনো রদবদল ঘটানোর।ঐতিহাসিক কারণেই স্পার্টায় দুটি রাজপরিবার ছিল এবং তাদের মধ্য থেকেই রাজা নির্বাচিত হতেন। এর সাথে উল্লেখ করা প্রয়োজন স্পার্টায় এক ধরণের সাম্যবাদী ব্যবস্থা বহাল ছিল। ‘ফিলোক্টেটিস’ নাটকটির রচনাকালেরও প্রায় চার’শ বছর পূর্বে স্পার্টার আইন প্রণেতা লিকুরগাস (Lycurgus) এই রাজনৈতিক ও সামাজিক ব্যবস্থার প্রণয়ন করেন। সুদীর্ঘ সময়ে স্পার্টার সমাজে এর বিশেষ কোনো হেরফের হয়নি। এই সমাজে মুক্ত মানুষদের ব্যক্তিগত ধনোপার্জনের প্রবণতাকে নিরুৎসাহিত করা হোতো। নাগরিকদের শিক্ষা থেকে শুরু করে জীবনধারণের যাবতীয় দায়িত্ব সমাজ গ্রহণ করেছিল। এমনকি পারিবারিক রন্ধন ও ভোজনের পরিবর্তে সমস্ত নাগরিকরা, রাজা- প্রজা - প্রশাসক নির্বিশেষে একই স্থানে খাদ্য গ্রহণ করত। প্রতিটি নাগরিকে কোনো একটি খাবার টেবিলের সদস্য হতে হোতো। এক একটি টেবিলে প্রায় ১৫ জন সদস্য থাকত এবং তাদের যৌথ সম্মতিতে নতুন সদস্যকে অন্তর্ভুক্ত করা হোতো। প্রতিটি সদস্যকেই নির্দিষ্ট পরিমাণের খাবারের উপকরণের যোগান দিতে হোতো। স্পার্টার নারীরাও শিক্ষা ও শরীরচর্চায় পুরুষদের সাথে সমানভাবে অংশগ্রহণ করত, যদিও সামরিক বা রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপ তাদের ভূমিকা বিশেষ ছিল না। এখানেও খেয়াল রাখা প্রয়োজন স্পার্টার সমাজও ছিল দাস সমাজ। সেই সমাজে ক্রীতদাসদের সাথে ভূমিদাসদেরও একটি বৃহত্তর অংশ বাস করত। এদের প্রায় কোনো অধিকারই ছিলনা। সামাজিক সমস্ত উৎপাদনই এদের দ্বারা সম্পন্ন হোতো। সেই বিচারে গণতান্ত্রিক এথেন্স ক্রীতদাসদের প্রতি অনেক বেশি মানবিক। জেনোফোনের লেখা থেকে জানা যায় যে এথেন্সে ক্রীতদাসদের প্রহার করা দণ্ডনীয় ছিল এবং প্রকাশ্যে ক্রীতদাস ও মুক্তমানুষদের মধ্যে বেশভূষা - চলাফেরা প্রভৃতিতে কোনো পার্থক্য ছিলনা। স্পার্টার নাগরিকেরা মূলত সামরিক জাতি হিসাবেই নিজেদের দেখতে অভ্যস্ত ছিল। যে কোনো ব্যবসা বাণিজ্যে তাদের অংশগ্রহণ রীতিবিরুদ্ধ ছিল। সমাজে স্বর্ণ বা রৌপ্য মুদ্রার বদলে লোহার এক ধরনের মুদ্রার প্রচলন ছিল। ফলে স্পার্টার সাথে বহির্বিশ্বের বাণিজ্যও প্রলোভনজনক ছিলনা। স্পার্টার এই সামরিক শক্তিকে গ্রীসের বিভিন্ন জনপদ সসম্ভ্রমে সমঝে চলত। সেই কারণেই প্রয়োজন পরলে তারা বিভিন্ন বিবাদে স্পার্টার মধ্যস্থতা চাইত।
স্পার্টার সাথে এথেন্সের বিবাদও এই প্রতিপত্তি ও মর্যাদাকে কেন্দ্র করে। প্রায় সমস্ত গ্রীস ঐক্যবদ্ধ ভাবে স্পার্টা ও এথেন্সের সম্মিলিত নেতৃত্বে প্রবল পরাক্রম পারসিক শক্তিকে প্রতিহত করার পর পরই, এথেন্স একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে এবং গ্রীসের বিভিন্ন জনপদে স্পার্টার প্রভাবকে খর্বিত করে স্বীয় সাম্রাজ্যের বিস্তার করে। শুরুতে স্পার্টান শৃঙ্খলার শৃঙ্খলকে উপেক্ষা করে এথেন্সের মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে এই জনপদগুলি এথেন্সের মিত্রতা ও সেই সাথে আনুগত্য স্বীকার করে। কিন্তু পরবর্তীকালে এথেন্সের সাম্রাজ্যবাদী শাসন ও অর্থনৈতিক শোষণের প্রতিবাদে বিদ্রোহও করতে থাকে। এথেন্সের পতনের বীজও এই সাম্রাজ্যবাদী নীতির মধ্যেই নিহিত ছিল।
এর সাথে যুক্ত হয়েছিল স্পার্টার বিরুদ্ধতা। সেই সময় এই দুই সমান্তরাল শাসনব্যবস্থার (অভিজাততন্ত্র বনাম গণতন্ত্র) দ্বন্দ্ব সমস্ত জনপদগুলিতেই ছিল। সেখানে অভিজাতগোষ্ঠী বনাম গণতান্ত্রিক গোষ্ঠীর বিবাদ লেগেই থাকত। স্বভাবতই অভিজাত গোষ্ঠী স্পার্টার মুখাপেক্ষী হোতো আর গণতন্ত্রের সমর্থকেরা এথেন্সের সহায়তা চাইত। এই দুই বিবদমান গোষ্ঠীর কাজিয়াতে স্পার্টা আর এথেন্সও জড়িয়ে পড়ত। পেলোপনেশীয় যুদ্ধের সূত্রপাতও সেই ধরণের গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব থেকে।
...
পেলপনেশীয় যুদ্ধের শুরুতে এথেন্স ঐশ্বর্য্য ও সামরিকশক্তি দুয়েই প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। বিশেষতঃ এথেন্সের নৌসামরিক তখন অজেয় বলেই পরিগণিত। প্রাচীন সভ্যতায় গ্রীস ও এশিয়া মাইনর অঞ্চলের ব্যবসা বাণিজ্যে সমুদ্রপথের অপরিসীম গুরুত্ব ছিল। সেই সমুদ্রপথ তখন নিয়ন্ত্রণ করত এথেন্স। সে কারণে সেকালের সভ্য পৃথিবীর বাণিজ্যের চাবিকাঠি তার হাতে ছিল। ফলে এথেন্সের বিরুদ্ধতা চারণ করে সাধারণভাবে কোনো জনপদই (বিশেষত যেগুলি সমুদ্রলাগোয়া বা সমুদ্রবেষ্টিত দ্বীপ) অর্থনৈতিকভাবে বিপর্য্যস্ত হতে চাইতনা। এই কারণে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান এথেন্স এই যুদ্ধে আপন প্রভাব প্রতিপত্তি টিকিয়ে রাখা ও বিস্তারের লক্ষ্যে কোমর বেঁধে নেমেছিল। অন্যদিকে স্পার্টার মুল শক্তি ছিল তার স্থলবাহিনী - তাদের শৃঙ্খলাপরায়ন সৈন্যদল যারা শৈশব থেকেই যোদ্ধা হিসাবে গড়ে উঠেছিল। এথেন্স ও স্পার্টার তুলনামূলক অবস্থার বিচারে থুসিডেডিস (Thucydedis) তাঁর পেলোপনেশীয় যুদ্ধের ইতিহাস বর্ননাতে তদানীন্তন জনপ্রতিনিধিদের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। স্পার্টার রাজা আর্কিদামুস স্পার্টার গণসমাবেশে যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে তাঁর সংশয় ব্যক্ত করেন এইভাবে -
“ স্পার্টার অধিবাসীবৃন্দ বহুযুদ্ধের অভিজ্ঞতা আমার আছে। এমন অনেকেই এখানে আছেন যারা আমার সমবয়সী ও সম অভিজ্ঞতাসম্পন্ন। আমি নিশ্চিত তারাও আমার মতই যুদ্ধজয়ের প্রত্যয়ে ও যুদ্ধোত্তর দিনগুলির সুখস্বপ্নে যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার হঠকারিতায় রাজী নন। এখন যে যুদ্ধ নিয়ে আপনারা আলোচনা করছেন, একটু ভেবে দেখলেই সেটির ব্যপকতা উপলব্ধি করা যায়। পেলপনেশীয় ও অন্যান্য প্রতিবেশী দেশের সাথে আমাদের তুল্য মূল্য বিচার চলে। কিন্তু এক দুরবর্তী দেশের সাথে লড়াই-এ এ কথা খাটেনা। বিশেষ করে সেই দেশটি যদি সমুদ্র অভিযানে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করে থাকে। অন্য সমস্ত বিভাগেও তারা ভীষণভাবে প্রস্তুত। ব্যক্তি বা জাতীয় সম্পদে, সমুদ্রতরণীতে, অশ্বশক্তিতে, সশস্ত্র সৈন্যদলে এবং এক বিশাল সংখ্যক নাগরিকের অংশগ্রহণ - এদের তুলনা গ্রীসের অন্যান্য কোনো জনপদের সাথে করা চলেনা। এর সাথে আছে তাদের করদ মিত্ররা। সুতরাং এই যুদ্ধ শুরু করার হঠকারিতা আমরা কেন করতে যাব? এমন অপ্রস্তুত অবস্থায় এতো তাড়াহুড়োই বা কেন করব? আমাদের যুদ্ধ তরণীসজ্জা? সেখানে আমরা দুর্বল। যদি সে ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হয় ও সমতুল্য হতে হয় তবে আমাদের সময় দরকার। আমাদের অর্থের যোগান? আমাদের কোনো অর্থভান্ডার নেই। না আছে, কোনো ব্যক্তিগত সম্পদ। সম্ভবত আমাদের আত্মবিশ্বাসের মুল উৎস আমাদের সশস্ত্র বাহিনী ও বিশাল জনসম্পদ। কিন্তু এথেন্সের আরো অনেক উপনিবেশ আছে এবং তারা সমুদ্রপথে যা চাইবে তাই আমদানী করতে পারে। অন্যদিকে যদি এথেন্সের মিত্রদের মধ্যে বিদ্রোহ জাগাতে চাই, তবে আমাদেরও শক্তিশালী নৌবাহিনীর প্রয়োজন। তারা বেশীরভাগই দ্বীপের বাসিন্দা। যতক্ষন না তাদের নৌযুদ্ধে পরাস্ত করছি কিম্বা তাদের দ্বীপগুলি থেকে আয়ের উৎস বন্ধ করা যাচ্ছে ততক্ষণ আমাদের দুর্ভোগ ছাড়া আর কিছুই মিলবেনা। অন্যদিকে যুদ্ধ শুরু করার দায়িত্ব নেওয়াতে আমাদের মর্যাদার লড়াই চালিয়ে যেতেই হবে। কখনোই ভাবা উচিত হবে না, এ যুদ্ধ তাড়াতাড়ি শেষ হবে। বরং আমার ভয় যে উত্তরসূরীদের কাছে এই যুদ্ধকেও আমরা রেখে যাব। ভবিষ্যতে হয়তো এথেন্স অভিযানের দুঃখজনক স্মৃতি তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে।”
যুদ্ধ শুরু করার ব্যাপারে আর্কিদামুস যতখানি দ্বিধান্বিত, ঠিক তটটাই আত্মবিশ্বাসে ভরপুর পেরিক্লিস, এথেন্সের তদানীন্তন প্রধান জননেতা। যুদ্ধের সপক্ষে তাঁর বক্তব্য-
“ এথেন্সের অধিবাসীবৃন্দ, আমার এক এবং কেবল একমাত্র নীতি এই যে পেলোপনেশীয়ানদের কোনো ছাড় দেওয়া চলবে না। আমি জানি যুদ্ধের শুরুতে মানুষের যে উগ্র সমর্থন থাকে পরিস্থিতির চাপে কার্য্যকালে তা সদা বজায় থাকেনা। তবুও আমি আগের মতোই প্রতিটি অক্ষর শব্দ মিলিয়ে যুদ্ধের পক্ষে একই পরামর্শ দেব। ...
এর আগেও স্পষ্ট হচ্ছিল যে স্পার্টা পরিকল্পিতভাবেই আমাদের বিরুদ্ধে এগোচ্ছে - বর্তমান মুহূর্তে সেটা আরো পরিষ্কার হয়ে গেল। তাদের সাথে চুক্তি অনুযায়ী আমাদের যাবতীয় দ্বন্দ্বের ফয়সালা আইনের পথে হওয়া উচিত ছিল। আর যতক্ষণ সেটি না হচ্ছে আমরা পরস্পরের অধিকার বিঘ্নিত করতে পারি না। কিন্তু স্পার্টা এই দ্বন্দ্বে কখনোই সেই পথ গ্রহণ করেনি - আইনের পথে তা নিরসনের কোনো আবেদনও জানায়নি। বরং চ তারা চাইছে যুদ্ধ - কোনো আলোচনায় তারা রাজী নয়। তারা আজ আমাদের পটিডিয়ার অবরোধ তুলে নিতে বলছে, তো কাল বলছে এজিনাকে স্বাধীনতা দিতে। আশা করছি আপনারা নিশ্চয়ই ভাববেন না যে কেবলমাত্র মেগারা ডিক্রী তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের যুদ্ধে যেতে হচ্ছে। আপাততঃ সেটাই তাদের মুখ্য দাবী। কিন্তু এই ধরণের চিন্তা ভুলেও মনে আনবেন না - এই তুচ্ছ দাবীর মাধ্যমে আমাদের মানসিক দৃঢ়তার পরীক্ষা নেওয়া হচ্ছে। এখনি যদি আপনারা এতো সহজে নতি স্বীকার করেন - পর মুহূর্তে আরো বড়সড় ছাড় দেয়ার জন্য তৈরী থাকুন। অন্যদিকে দৃঢ় সংকল্পে ‘না’ জানিয়ে দেওয়া হলে তাদের কাছে এটা পরিষ্কার করে দেওয়া যাবে যে আমরাও সমানভাবে যুঝতে তৈরী। সেই কারণেই আমাদের এই মুহূর্তে দেরী না করে যুদ্ধের পক্ষেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। হয় কোনো ক্ষতি স্বীকার করার আগে নতি স্বীকার করুন - নয় যুদ্ধে যেতে তৈরী হোন। ভবিষ্যতের কঠোর পরিস্থিতি মোকাবিলা করার ভয়ে পিছিয়ে গেলে চলবে না। কোনো ধরণের ছাড় দেয়ার বিরুদ্ধেই আমাদের সিদ্ধান্ত বহাল থাকা উচিত। আমরা চাই সমকক্ষের মর্যাদা। প্রতিবেশীর দুয়ারে আইনী সমঝোতার বার্তা না লয়ে এসে, রণদামামা নিয়ে কেউ যদি এসে দাঁড়ায়, আর সেই আদেশকে মেনে নিতে হয়, তবে এর চাইতে বড় দাসত্ব কী থাকতে পারে?
এমনিতেই যদি দুটি পক্ষের শক্তি ও সম্পদের বিচার করা হয় তবে দেখা যাবে এথেন্স কোনো অংশেই বিপক্ষের থেকে দুর্বল নয়। পেলোপনেশীয়ানদের অধিকাংশই কৃষিকার্য্যে স্বনিযুক্ত। তাদের ব্যক্তিগত বা জাতীয় সম্পদ অপ্রতুল। এ ছাড়াও দীর্ঘ নৌযুদ্ধের কোনো অভিজ্ঞতা তাদের নেই। তাদের এই দারিদ্র্যই যুদ্ধ চালানোর বড় প্রতিবন্ধকতা। কোনো ধরণের নৌবাহিনী রক্ষণাবেক্ষণ বা তাদের সহায়তায় অতিরিক্ত সৈন্য প্রেরণ তাদের দুঃসাধ্য। কারণ গৃহ থেকে দীর্ঘ অনুপস্থিতি তাদের কাম্য নয়। যুদ্ধের ব্যয় বহনও হবে কষ্টকর। সমুদ্রপথের কোনো নিয়ন্ত্রণ তাদের নেই। কেবলমাত্র সঞ্চিত ধনসম্পদই যুদ্ধকে চালিয়ে নিয়ে যেতে সক্ষম। হঠাৎ করে জরুরীভিত্তিক ব্যক্তিগত দানে এত দীর্ঘ যুদ্ধ চালানো যায় না। কৃষকেরা সর্বদাই যুদ্ধে অর্থপ্রদানের বদলে স্বীয় অংশগ্রহণ বেছে নেয়। কারণ সবাই ধরে নেয় যুদ্ধ থেকে অক্ষত দেহেই তারা ফিরবে। আর সম্পদ কখন নিঃশেষিত হয়ে যাবে তাই বা কে বলতে পারে? বিশেষ করে যুদ্ধ যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়। এক্ষেত্রে তাই হবার সম্ভাবনা। কোনো এক বিশেষ যুদ্ধে পেলোপনেশীয়ানরা হয়তো সারা গ্রীসের বিরুদ্ধে সফল হতেই পারে - কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ চালাতে তারা সক্ষম নয়।বিশেষ করে এমন একটা শক্তির বিরুদ্ধে যা সম্পুর্ণ তাদের ভিন্নধর্মী। তাদের কোনো ঐক্যবদ্ধ যুদ্ধ পরিচালনার কেন্দ্র গড়ে ওঠাও মুশকিল। আর বিভিন্ন জাতির মিশ্রণে গড়ে ওঠা সৈন্যবাহিনীর পরিপোষণও সোজা ব্যাপার নয়। বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন রকম উদ্দেশ্য থাকবে। কেউ বা তাদের বিশেষ কোনো শত্রুর শেষ চাইবে - কেউ বা যুদ্ধের উত্তাপ থেকে পরিত্রাণের উপায় খুঁজবে। জোট বাঁধতে এদের সময় লেগে যাবে। যৌথ লক্ষ্য স্থির করাও ততোধিক কঠিন হবে। সর্বদাই একে অপরের উপর দায়িত্ব চাপিয়ে দিতে চাইবে।
তবে প্রধানত আর্থিক প্রতিবন্ধকতাই তাদের বড় বাঁধা। তাদের অর্থের যোগান পেতে সময় লাগবে। কিন্তু যুদ্ধে ‘সুযোগ’ তো আর অপেক্ষা করে বসে থাকেনা? আমাদের এ নিয়েও শঙ্কিত হবার কারণ নেই যে তারা অ্যাটিকা জুড়ে অবরোধ জাড়ি রাখবে। তাদের নৌশক্তি নিয়েও আমাদের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। শান্তির সময়ও কোনো বিপক্ষ নগরীতে অবরোধ জাড়ি রাখা সোজা ব্যাপার নয়। তারা কোনোমতেই সমুদ্রপথে আমাদের হানা দেওয়াকে আটকাতে পারবেনা। কারণ আমাদের নৌ-অভিযানের দক্ষতা আমাদের স্থলজীবনকে যেভাবে পরিপুষ্ট করে, ওদের স্থলবাহিনী সমুদ্রবক্ষের জীবনকে সেভাবে সাহায্য করতে পারবেনা। পারস্যের সাথে যুদ্ধ হওয়ার দিন থেকে নৌযুদ্ধে আমরা যদি সেই দক্ষতা অর্জন না করে থাকি - তবে কি কৃষিজীবী, সমুদ্রযাত্রায় অনভ্যস্ত জনপদগুলির পক্ষে সেটি সহজ হবে? এ ছাড়া এই সমস্ত ক্ষুদ্র শক্তির নগরীগুলিতে আমাদের সৈন্যবাহিনীর উপস্থিতিই যথেষ্ট হবে। তারা যুদ্ধে যেতে ভরসা পাবেনা, এবং ক্রমশই ভীরু ও অসামরিক হয়ে উঠবে।... এমনকি এরা যদি ডেলফি বা অলিম্পিয়ার মন্দিরের ধনরত্নকে ব্যবহার করতে চায় এবং বিদেশী নাগরিকদের আরো অর্থ দিয়ে প্রলুব্ধ করতে চায় - যা আমাদের শিরঃপীড়ার বিষয় হতে পারে, সেক্ষেত্রেও আমরা এদের সাথে যুঝতে সক্ষম। তার কারণ আমাদের জনসাধারণের মধ্যেই সুদক্ষ নাবিকের সংখ্যা বেশী। আর আমাদের বিদেশী নাগরিকেরাও তাদের দেশে অচ্ছুত হবার ভয়ে আমাদের সঙ্গেই থাকবে।
এ সবই পেলোপনেশিয়ানদের থেকে আমাদের অবস্থার পার্থক্য। এথেন্সের তুলনায় তারা অনেক ধরণের বাধার সম্মুখীন। যদি তারা আমাদের দেশের বিরুদ্ধে স্থলপথে সৈন্যবাহিনী নিয়ে এগিয়ে আসে, তবে আমরা নৌবাহিনী নিয়ে জলপথে বেড়িয়ে পড়ব ও তাদের ভূভাগ আক্রমণ করব। আর সেক্ষেত্রে সমস্ত অ্যাটিকা জনশূন্য হলেও আমাদের যা ক্ষতি হবে, তার তুলনায় তাদের জনপদের একাংশের উপর এই আঘাত হানার প্রভাব অনেক বেশী হবে। তাদের স্বীয় বাসভূমি ছেড়ে যাওয়ার কোনো রাস্তা নেই। আর আমরা তো নানা দেশে ও দ্বীপে আমাদের বসতি স্থাপন করতে সক্ষম। ... সুতরাং ভবিষ্যতে আমাদের এই নীতিকেই প্রয়োগ করতে হবে। আমাদের স্থলভাগ ও সম্পত্তির উপর মায়া করা চলবেনা। বরং আমাদের সমুদ্র ও নগরীকে রক্ষায় অতন্দ্র থাকতে হবে। পেলোপনেশিয়ানদের সংখ্যাধিক্যের দরুন তাদের স্থলযুদ্ধের সামনাসামনি আমরা কোনো ভাবেই হবোনা। একটি যুদ্ধে জয় মিললেও পরবর্তী যুদ্ধেও ঠিক ততোধিক শত্রুসৈন্যের মুখোমুখি আমাদের হতে হবে। অন্যদিকে এমন যে কোনো যুদ্ধের পরাজয়ে সমূহ ক্ষতি। আমাদের জমিজায়গার উপর মায়া না রেখে, আমাদের জনসম্পদকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। কারণ গৃহ-সম্পত্তি মানুষকে দখল করে না - বরং মানুষই তাদের ছিনিয়ে নেয়। আর তাই আমি পরামর্শ দেব, আপনাদের গৃহ-সম্পত্তিকে বরং ধ্বংস করে ফেলুন। পেলোপনেশিয়ানদের দেখান আপনারা নতি স্বীকারের পাত্র নন।
এই যুদ্ধজয়ের বিষয়ে আমি অনেক আশাবাদী। বিশেষ করে যদি আপনারা কতকগুলি বিষয়ে আমার সাথে একমত হোন। এই সময়ে কোনো নতুন অভিযানে বেরোনো চলবে না। ন্যূনতম বিপদের সম্ভাবনায় স্বেচ্ছায় পা বাড়াবেন না। আসলে যত না শত্রুর শক্তি কে আমার ভয়, তার চাইতেও আমার ভয় নিজেদের হঠকারিতাকে। ...
... এটা পরিষ্কার বুঝে নিতে হবে যুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী। যত শীঘ্র আমরা সেই বাস্তবতাকে গ্রহণ করি, ততই আমাদের শত্রুপক্ষের মনোবলে চিড় খাওয়ানো সম্ভব। এই ধরণের চরম বিপদে জাতি ও ব্যক্তি চরম গৌরব লাভ করে। আমাদের পূর্বজরা কী পারস্যের বিরুদ্ধে তাদের অপেক্ষাকৃত দুর্বল অবস্থান থেকেও সংগ্রাম করেননি? তাদের সম্পত্তি ত্যাগ করে তাদের বুদ্ধিমত্তা ও সাহসের বলে তারা কি যুদ্ধে জেতেননি? সেটা কী শুধুই ভাগ্যের প্রসন্নতা ছিল? আমাদের তাদের অনুসরণই করা উচিত। শত্রুকে যে কোনো মূল্যে সর্বতোভাবে বিরোধিতা করতে হবে। তবেই আমাদের উত্তরপুরুষকে আমাদের ক্ষমতা বিকিয়ে দেবার গ্লানি থেকে মুক্ত রাখতে পারব।”
এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে এথেন্সের শক্তির বিস্তারে ও তার গণতন্ত্রের বিকাশে পেরিক্লিসের অন্যতম ভূমিকা ছিল। প্রায় চল্লিশ বছর ধরে তিনি জনগণের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন, এবং প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্তকেই প্রভাবিত করতে সক্ষম ছিলেন। সেকালের গণতন্ত্রে ব্যক্তিবিশেষের ভূমিকার এমন দীর্ঘকালীন প্রভাবের নজির মেলা ভার। তাঁর সময়কে তাই ‘পেরিক্লিসের শাসনকাল’ হিসাবেই অভিহিত করা হয়, যদিও তিনি সর্বদাই জনপ্রতিনিধি হিসাবেই এই শাসনকার্য্যে অংশগ্রহণ করেছেন। তাঁর শাসনকালের প্রথমভাগে তিনি এথেন্সের সাম্রাজ্য বিস্তারে বিশেষ মনোযোগ দেন এবং পরিশেষে স্পার্টার সাথে ত্রিশ বছরের এক শান্তিচুক্তি স্থাপন করেন, যার দরুন এথেন্সে শান্তি ও সুস্থিতি বজায় ছিল। এই চৌদ্দ বছরের শাসনকালে তিনি এথেন্সকে কলা ও সংস্কৃতির অন্যতম পীঠস্থানে পরিণত করাতে উদ্যোগী হোন। গণতান্ত্রিক এথেন্সের শক্তির প্রতি ছিল তাঁর অগাধ আস্থা। থুসিডেসিসের লেখনীতেই তাঁর মুখে গণতন্ত্রের তাঁর এই বক্তব্যকে তুলে ধরা হয়েছে -
“আমাদের সংবিধান কোনো প্রতিবেশী রাষ্ট্রের কাছ থেকে নকল করা হয় নি। বরং অন্যদের কাছে আমাদের সংবিধান অনুপ্রেরনীয়। এর শাসনব্যবস্থা মুষ্টিমেয়র বদলে সংখ্যাগরিষ্ঠতাকে তোষণ করে - আর তাই একে গণতন্ত্র বলা হয়। আমরা যদি আইনব্যবস্থাকে বিচার করি, দেখব সেগুলি নাগরিকদের ব্যক্তিগত বিবাদে নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে। সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ছাড়া আমাদের শাসনব্যবস্থায় অংশগ্রহণ সম্ভব নয়। শ্রেণীভেদে যোগ্যতার মানদণ্ড নিরূপিত হয় না। তাই দারিদ্র্য যোগ্য ব্যক্তিকে রাষ্ট্রের কাজে যোগ দেওয়াতে প্রতিবন্ধক নয়। আমাদের শাসনব্যবস্থায় যে স্বাধীনতা আমরা ভোগ করি ব্যক্তি জীবনেও তা প্রসারিত। প্রতিবেশীরা একে অপরের কাজকর্মে অকারণ অনুসন্ধিৎসা প্রকাশ করেনা। অন্যদিকে ব্যক্তিসম্পর্কের এই সহজ সরল দিকটি কোনো নৈরাজ্যের সৃষ্টি করে না। নৈরাজ্যকে আমরা সবাই ভয় পাই - আর সেটাই আমাদের নিরাপত্তার চাবিকাঠি। ভয়ই আমাদের শিক্ষা দেয় বিচারক ও আইনসমূহকে মান্য করে চলতে। বিশেষ করে আর্তের রক্ষাতে আমরা সদা সতর্ক - সে আইনের বইতে যাই লেখা থাকুক না কেন? ... আমাদের বৈদেশিক নীতিতেও আমরা আমাদের বিরুদ্ধপক্ষের থেকে সম্পুর্ণ আলাদা। আমরা আমাদের নগরীকে পৃথিবীর সামনে উন্মুক্ত করে রেখেছি - কোনো বিদেশী-নিয়ন্ত্রণ আইনের দ্বারা বিদেশীদের শিক্ষা বা ভ্রমণ থেকে বিরত করা হয়নি, যদিও এতে শত্রুরা লাভবান হচ্ছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও - যেখানে আমাদের বিরোধীরা তাদের শৈশব থেকে কঠোর শৃঙ্খলায় যৌবনে উপনীত হয় - এথেন্সে আমরা যেভাবে চাই সেভাবেই বড় হতে পারি। তবুও যে কোনো বিপদ মোকাবিলায় আমরা তৈরী। এর প্রমাণ হিসাবে দেখবেন স্পার্টা একাকী আমাদের রাজ্য আক্রমণ করেনি - বরং তাদের বন্ধুজোটদের নিয়ে এই আক্রমণ হেনেছে। সে ক্ষেত্রে আমরা এথেন্সের মানুষেরা প্রতিবেশী দেশের কোনো সাহায্য ছাড়াই বিদেশের যুদ্ধক্ষেত্রে জয়লাভ করি। (তাও তো ) আমাদের সম্মিলিত শক্তির সম্মুখীন শত্রুরা কখনো হয়নি। কারণ আমাদের নাগরিকদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে যুদ্ধকালেও নিযুক্ত করা হয় ও বিভিন্ন দেশে প্রেরণ করা হয়। ... সংক্ষেপে বলতে গেলে আমাদের নগরী এই গ্রীস দেশের শিক্ষায়তন। আমার সন্দেহ আছে সারা বিশ্বে আমাদের তুল্য কোনো মানুষ এত বৈচিত্র্যের মাঝে স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারে কিনা?”
পেলোপনেশীয় যুদ্ধের গোড়াতে তাই এথেন্স ছিল আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। কিন্তু শুরুতেই তাদের এক দারুণ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হয়। আর সেই বিপর্য্যয় শত্রুর তরবারীর ঝলকে এলোনা - এলো মহামারীর রূপ নিয়ে। প্রায় দুবছর এথেন্স নগরীতে চলল প্লেগের উপদ্রব। নগরীর জীবনশক্তির দারুণ ক্ষতি হোলো। পেরিক্লিস যে জনসম্পদকে রক্ষা করতে অ্যাটিকা শূন্য করে নগরীর নিরাপদ প্রাচীরের বেষ্টনীতে নিয়ে এসেছিলেন, মহামারী এসে তাঁর সেই হিসাবকে ওলটপালট করে দিয়ে গেল। আর বিদায়কালে মরণকামড় দিয়ে নিয়ে গেল পেরিক্লিসকেও। পেরক্লিসের শূন্যতা পরবর্তীকালে এথেন্স কখনোই ভরাট করতে পারেনি। সেই কারণে যুদ্ধোত্তর বিজিত এথেন্সের ইতিহাসকারের কলমে সেই আক্ষেপই ফুটে ওঠে -
“শান্তির সময়ে যতক্ষণ তিনি রাষ্ট্রের শীর্ষ নেতা ছিলেন, তিনি রক্ষণাত্মক ও ঝুঁকিবিহীন নীতির অনুসারী ছিলেন। তাঁর সময়েই রাষ্ট্রও সর্বোচ্চ মহত্বের শিখরে উন্নীত হয়েছিল। যখন যুদ্ধ শুরু হোলো সেখানেও সম্ভবতঃ তিনি তাঁর দেশের শক্তি অনুধাবনে সঠিকই ছিলেন। তিনি যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরও আড়াই বছর বেঁচে ছিলেন। তাঁর বিচার বিশ্লেষণের সঠিকতা পরবর্তীকালে প্রমাণিতও হয়। তিনি এথেন্সের অধিবাসীদের বলেছিলেন, ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করতে, তাদের নৌবাহিনীকে রক্ষা ও উন্নত করতে। নতুন কোনো অভিযানে অংশগ্রহণ না করতে এবং নগরীকে অযথা কোনো বিপদের সামনে উন্মুক্ত না করতে। এই নীতি অনুসরণ করা হলে তিনি অনুকূল ফলের আশ্বাস দিয়েছিলেন। তারা যা করল তা অবশ্য এর পুরোপুরি বিপরীত। তাদের ব্যক্তিগত উচ্চাশা ও স্বার্থকে তারা অগ্রাধিকার দিয়েছিল। যুদ্ধের সাথে যুক্ত নয় এমন সমস্ত অভিযানে বা কর্মকান্ডে তারা যোগ দিয়েছিল যা তাদের অনুচিত ছিল। এই সমস্ত কাজকর্ম সফল হলে কেবল কোনো ব্যক্তির উচ্চাশা ও স্বার্থ পুষ্ট হোতো - অন্যদিকে এদের ব্যর্থতায় দেশকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়। অবশ্য (জনগণকে প্ররোচিত করতে) এই সমস্ত ব্যক্তিদের সফল হওয়ার কারণ খুঁজে পাওয়াও কষ্টকর নয়। পেরিক্লিস তাঁর পদাধিকার, সামর্থ্য, প্রশ্নাতীত সততা ও বিচক্ষণতায় জনসাধারণের উপরে এক স্বতন্ত্র নিয়ন্ত্রণের অধিকারী ছিলেন। কারণ তিনি কখনো অনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করতে চাননি। তিনি তাই কখনোই তাদের তোষামোদ করতে বাধ্য ছিলেন না। বরং বিপরীতে তিনি এতো বিপুল সম্মানের অধিকারী ছিলেন যে প্রয়োজনে জনসাধারণের বিপক্ষে গিয়ে তাদের ক্রুদ্ধ করে তুলতেও পিছপা হতেন না। যখনি তিনি তাদের অকারণে ঔদ্ধত্য ও আত্মবিশ্বাসে ভেসে যেতে দেখতেন, তখনি কয়েকটি কথা বলেই সতর্ক করে দিতেন। অন্যদিকে তারা যদি আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে যেত, তিনি কয়েকমুহূর্তেই তাদের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতেন। এক কথায় গণতন্ত্রের বকলমে তাঁর আমলে শাসন পরিচালিত হোতো প্রথম নাগরিকের এককেচ্ছায়। তাঁর পরবর্তী উত্তরসূরীদের ক্ষেত্রে সেটি বদলে গেল। তখন সবাই একে অন্যের প্রতিযোগী হয়ে উঠল। ফলে রাষ্ট্র জনতার খামখেয়ালীপনার শিকার পরিণত হোলো। সম্ভবতঃ এক মহান স্বাধীন রাষ্ট্রে এমনই হয়। এর কারণে একের পর এক ভুলের মাশুল এথেন্সকে দিতে হয়, যার মধ্যে ছিল সিসিলি অভিযান। কিন্তু এতো (ক্ষতি) সত্বেও এথেন্স বহুদিন যাবৎ লড়াই চালাতে সক্ষম হয়েছিল এবং শেষ পর্যন্ত আত্মসমর্পন করে নিজেদের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির কারণে। এমনই ভীষণভাবে সে সম্পদশালী ছিল, যা থেকে পেরিক্লিসের প্রতিভা পেলোপনেশীয়ানদের সহায়তাবিহীন শক্তিকে সহজে জয় করার নিশ্চয়তায় উপনীত হয়েছিল।”
পেলোপনেশীয় যুদ্ধে এথেন্সের এই ব্যর্থতার আক্ষেপ সফোক্লিসের কলমেও সম্ভবত ছুঁয়ে গেছে। বিশেষ করে ভীষণভাবে অনুকূল পরিস্থিতি থাকা সত্বেও যেভাবে তাদের এই প্রতিকূলতায় পড়তে হয়েছে সেই অভিজ্ঞতার নিরিখেই হয়তো ফিলোক্টেটিসের মুখে নিওপ্টলেমসের প্রতি এই সতর্কবার্তা তিনি শুনিয়েছেন -
[
ফিলোক্টেটিসঃ ... দেখো এই তুচ্ছ মানব জীবনে কী ভয়ানক অভিশাপই না নেমে আসতে পারে। তোমার আপাত নিরাপত্তায় নিশ্চিন্ত থেকো না। তুমি জানো না কখন ভয়ঙ্কর বিপদ তোমার সামনে হাজির হবে। তাই সদা সতর্ক থেকো।
]
আর সেই সাথে রয়েছে ফিলোক্টেটিসের হাহাকার, “দেবতারা কেন ভালো মানুষদের টেনে নেন?”
নিঃসন্দেহে সফোক্লিসের হৃদয়ে পেরিক্লিস সেই ভালো মানুষদেরই একজন ছিলেন।
...
নাটকটির সমাপ্তিতে তবু নাট্যকার আশার বাণীই শুনিয়েছেন। এমনিতেও ট্রয় যুদ্ধের পৌরাণিক গল্পের সূত্র অনুযায়ীই ফিলোক্টেটিস তার ব্যাধিমুক্তি ও বিজয়ের পথে অগ্রসর হয়েছেন। সেদিক থেকে এই সমাপ্তি কাহিনীর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। তবুও কাহিনীর পরিচিতি সীমানা ছাড়িয়েও নাট্যকারের আশাবাদী ব্যঞ্জনা ফিলোক্টেটিস ও সমবেত কণ্ঠের ভাষাতে ফুটে উঠেছে। তাঁর আশা এথেন্স তার অবক্ষয়কে রুখে আবার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধার করবে। এ বিশ্বাস সমসাময়িক এথেন্সের জনসাধারণের মননেরও প্রতিফলন। তারই এক খন্ডচিত্র মেলে পেরিক্লিসের পুত্রের (যার নামও রাখা হয়েছিল পেরিক্লিস) সাথে সক্রেটিসের কথোপকথনে। জেনোফোন (Xenophon) সক্রেটিসের স্মৃতিচারণায় এই কথোপকথনের অংশবিশেষ লিপিবদ্ধ করে গিয়েছেন। সেখানে পেরিক্লিস (দ্বিতীয় প্রজন্মের) এথেন্সের অবক্ষয়ে যখন হতাশ এবং ভাবী বিপর্যয়ের পূর্বাভাসে বিচলিত, তখন সক্রেটিস এথেন্সের সৃষ্টিশীল জনসাধারণের অদম্য আত্মবিশ্বাস ও উৎসাহের পরিচয় তুলে তাকে উৎসাহিত করে তুলতে সচেষ্ট এবং যোগ্য নেতৃত্ব দেবার আহ্বান জানাচ্ছেন। সেই সময় যুদ্ধের দশজন জেনেরালদের একজন ছিলেন এই পেরিক্লিস। তিনি জেনেরাল নির্বাচিত হওয়ায় সক্রেটিস তাকে অভিনন্দন জানিয়ে যুদ্ধের ফলাফল এথেন্সের অনুকূলে আসার আশা ব্যক্ত করলে, পেরিক্লিস এক জায়গায় তার হতাশাকে আড়াল করতে পারেননি। তিনি বলছেন,
“আপনি সম্ভবত এই বলতে চাইছেন যে মনুষ্যত্ব তার সৌন্দর্য্য ও সাহসের দুই ডানা মেলে আমাদের নগরীকে পরিত্যাগ করে উড়ে গিয়েছে। যেমন ধরুন, কবে আবার এথেন্সবাসীরা স্পার্টানদের মতো বৃদ্ধদের শ্রদ্ধা করতে শিখবে? এখন তো তারা শুরুই করে আপন বৃদ্ধ পিতাকে অসম্মানের, ঘৃণা আর বিদ্রূপের ধ্বনি আউড়ে। কখন তারা সুস্থ শরীর গড়ে তুলতে সু-অভ্যাসগুলির প্রতি নজর দেবে, আর যারা সেই চর্চায় নিয়ত তাদের ব্যঙ্গ বিদ্রূপ করা বন্ধ করবে? কখন আমরা আবার আমাদের বিচারকদের মান্য করতে শিখব? তাদের কর্তৃত্বকে উপেক্ষা করার মধ্যে গৌরব আনুভব করব না? কবে আমরা ঐক্যবদ্ধ হব? এখন তো সার্বজনীন স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে একে অন্যের চরিত্র হণনে ব্যস্ত। প্রতিবেশীর প্রতি হিংসা যেন বহির্বিশ্বের প্রতি আমাদের বিদ্বেষের চাইতেও বেশী। আর আমাদের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা এই যে, ব্যক্তিগত বা সার্বজনীন আলাপ আলোচনায় আমরা ভিন্নমতে বিভক্ত, আইনি মামলার নাগপাশে আবদ্ধ এবং প্রতিবেশীর দুঃসময়ে তাকে সাহায্য করার বদলে নিজের আখের গোছানোর ফন্দি ফিকিরে ব্যস্ত। আমাদের এই আচরণের দরুনই আজ জাতীয় স্বার্থকেও বিদেশী দেশের স্বার্থের সাথে এক আসনে বসিয়ে দেখার দম্ভ আমাদের পেয়ে বসেছে। এই রকম জাতীয় স্বার্থকে নিয়ে ছেলেখেলা করে আমরা নির্বোধ আনন্দ পেয়ে থাকি। এই বারুদের স্তূপেই আমাদের রাষ্ট্রের অধিষ্ঠান - তার নাগরিকদের অন্ধ মূর্খতা ও ভীরুতা বুকে নিয়ে। নাগরিকদের হৃদয়ে ঘৃণা ও পারস্পরিক অবিশ্বাস জেঁকে বসেছে। সামনের দিনগুলিতে আমাদের জন্য কী অপেক্ষা করছে তা ভেবে আশঙ্কাতে আমার বুক কেঁপে ওঠে।”
দ্বিতীয় প্রজন্মের পেরিক্লিসের এই কথাগুলি যেন যুদ্ধের শুরুতে তার মহান পিতার বক্তব্যকে খণ্ডন করে। প্রসঙ্গত সক্রেটিসের সাথে পেরিক্লিসের এই কথোপকথন ‘ফিলোক্টেটিস’ রচনাকালের সমকালীন। ‘ফিলোক্টেটিস’ লেখার পরের বছরই নৌযুদ্ধের একটি দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করে এথেন্সের জনসাধারণ ছয় জন জেনেরালকে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার হঠকারী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই জেনেরালদের মধ্যে এই পেরিক্লিসও ছিলেন। সক্রেটিস কিন্তু পেরিক্লিসের হতাশায় সুর মেলান নি। বরং সানুনয় আবেদন করেছেন,
“দয়া করে এথেন্সবাসীদের অযথা এমন নীচে নামাবেন না। আপনি কী নৌসেনাদের শৃঙ্খলা দেখছেন না। দেখছেন না কী নাগরিকদের সহজাত শৃঙ্খলাপরায়ণ অনুশীলন জিমনাস্টিক প্রতিযোগিতাতে। তাদের কোরাসের শিক্ষণে শিক্ষকদের প্রতি প্রশ্নাতীত আত্মনিবেদন কী আপনার নজরে পড়েনি?”
সক্রেটিস তাই পেরিক্লিসকে হতাশা ঝেড়ে ফেলে উপযুক্ত নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য আহ্বান জানিয়েছিলেন। এথেন্সের জনগণ যে এতো সহজে পরাজয় স্বীকার করবে না সেই বিশ্বাসের প্রমাণ সক্রেটিসের বক্তব্যে মেলে। তখনো তারা তাদের হৃত সাম্রাজ্য পুনরুদ্ধারের স্বপ্ন দেখে। সম্ভবতঃ সেই স্বপ্নের শরিক সফোক্লিসও ছিলেন। তাই বহু বসন্ত পার হওয়া বৃদ্ধ সক্রেটিসের মতোই তিনিও নব বসন্তের প্রত্যাশী।
৫/১১/২০০৫
