বিস্মরণের প্রহর
একা একাই
এখনো অনেক দূর অনেক পথ,
এখনো অনেকটা হেঁটে যেতে হবে,
এখনো একা একা!
পথ চলতি সঙ্গী আরো মিলবে জানি।
স্বজন সুজন চেনা অচেনার মাঝে
এখনো অনেকটা পথ, তবুও একাই।
স্বপ্ন আর আমি দেখিনে দুঃস্বপনের রাজ্যে।
তবুও চলতে চাই মানুষের মাঝ দিয়ে
মানুষের সাথে সাথে।
এখনো অনেকটা পথ তবুও
একা একাই সঙ্গ ধরা চাই।
১৩.৭.১৯৯০
কোজাগরী
আজো এক কোজাগরী রাত
হেঁকে চলে যাবে।
আজো এক ভরা চাঁদ
মেঘেদের ফাঁক দিয়ে
দেবে উঁকি।
বাতাস উঠবে মেতে
জ্যোৎস্না ছায়াতে
শঙ্খ উলুধ্বনি সাথে।
আজো এক নিরুৎসুক রাত
চলে যাবে অবহেলে
নিরাবেগ বিস্মৃতির আড়ালে।
৩.১০.১৯৯০
নিঃস্বতা
আমার নিঃস্বতা গোপনে যাক ঝরে।
পৃথিবীতো সবুজ সতেজ আরো
নিত্য নবরূপে - প্রাণের স্পন্দনে।
আমার নিঃস্বতা মিশে যাক
শিশিরের নীরব ক্রন্দনে।
বস্তিতে গাঁয়ে শহরের ফুটপাথে
চুল্লিতে আগুন কাঁপে জড় জিজ্ঞাসায়।
মরণের কোল ঘেঁষে জীবন তবু বয়
রক্ত মাখা পায়।
আমার নিঃস্বতা ঝরে যাক
নিঃস্ব নিরালায়।
২৫.১১.৯০
মধুমাস
মধুবাতাসের বুকে ছিল আগুনের জ্বালা -
তবুও আগুনে জ্বলেনি বন।
ফাগুন বাতাসে ছিল রঙের খেলা
তবুও ফাগুনে রাঙ্গেনি মন।
নিবিড় আন্ধার চৈত্র রাতে
আকাশ তারার প্রহরাতে
নিঃস্ব প্রহর বয়ে বেড়ায়
নীরবে নির্জন।
ছিন্ন পাতায় ভরে থাক মোর
শূন্য এ প্রাঙ্গণ।
৩.৩.১৯৯১
বিস্মরণেই বেঁচে থাকি
বিস্মরণে প্রহর কাটাই তাই।
শান্ত স্তব্ধ উদাসীন পৃথিবীতে
এমন নিবিড় নির্জনতা
মেলেনি কখনো।
ভুলেই আছি, ভুলেই থাকি চেয়ে
পলকহীন ধূসর দিনান্তে।
বিস্মরণেই বেঁচে থাকি
মৃতের জড়ত্বে।
৯.৩.১৯৯১
প্রতীক্ষা
সেই বৃদ্ধটিকেই আমি দেখতে চাই।
এক মাথা পাকা চুলে যে হেঁটে যাবে
আমারই সাথে সাথে।
সেই বৃদ্ধটিই নিঃসঙ্গে নির্জনে।
কতটা পথ? আরো কত দিন?
এখনি ক্লান্তি নেমে আসে পৃথিবীর বুকে।
সেই বৃদ্ধটিকে আমি চাই।
ঝাপ্সা দু চোখে যে চেয়ে দেখবে
ভোরের সূর্য্যকে নিরাসক্ত নির্বিকার নির্মোহে।
সেই বৃদ্ধটিই দিন গোনে।
ক্লান্তিকর দিন নীরবে নিভৃতে।
১.৪.১৯৯১
অহংকার
আমিও বাঁচতে পারি নিরাসক্তিতে।
এ আমার অভিমানই নয়
এ আমার অঙ্গীকার।
আমিও অভিনয় করতে পারি
অভিনয় নিজের সাথে বোঝা পড়ার।
এ শুধু প্রবঞ্চনাই নয়
স্বেচ্ছাচারের স্বাধিকার।
দিন তো কেটে যাবেই অমোঘ নির্দিষ্টতায়।
আমিও ঝরে যাব নিমেষে নিঃশেষে।
সে শুধু ফুরিয়ে যাওয়াই নয়।
ধরা না দেওয়ার অহংকার।
৫.৪.১৯৯১
সূর্য্যদিনে
কেন সে বুকে হাজার হাজার প্রশ্ন তোলে?
কার ভরসায় গগন ভাসিয়ে সূর্য্য কিরণ আলো ঝলসায়?
কোন বরষায় পাষাণ মাটি জ্বলে প্রাণের আভায়?
ঝোড়ো হাওয়া উড়িয়ে নিয়েছে আমায়।
পোড়াবুকে নব আশা স্বপ্ন বোনে -
সূর্য্যদিনে নতুন মানুষ মোরে নেবে গো চিনে।
২৯.৪.১৯৯১
সাগরপারে
দুয়ার খুলে রেখেছিলাম সারাটা বেলা।
সাঁঝের আন্ধার নেমে এলো,
আসেনি তবু কেউ।
বাইরে থেকে উঁকি দিল সবার পৃথিবী।
দিনের শেষে গুটিয়ে গেলো
যে যার আপন নীড়ে।
এখন আমি বেড়িয়ে এলাম
অন্ধকারের তীরে।
বিজনবেলায় সাগরপারে
আছড়ে চলে ঢেউ।
২.৭.১৯৯১
বর্ষাদিনে
স্বপ্ন তুমি ঝরে পরো এমনতরো -
কৃষ্ণ ঘন বাদল মেঘে
যাও এঁকে ক্ষিপ্র উজল তনু।
রুনু ঝুনু শব্দ করো, শব্দ করো
বন্ধ্যা মাটির বন্দনায়।
স্বপ্ন তুমি ঝরে পরো ঝড়োঝড়ো
শুষ্ক প্রাণের রুক্ষ চেতনায়।
১০.৮.১৯৯১
প্রতিমা
কোনো প্রতিমাই গড়িনি তোমার।
যতবারই গড়েছি প্রতিমা কারোর
ধ্বসে গেছে নিসার নড়বড়ে কাঠামোতে।
বিবর্ণ রঙে এক ডেলা মাটি
আঘাত করেছে তায় দুঃসহ ভারে।
তবুও বারে বারে গড়েছি প্রতিমা।
তুলিতে দিয়েছি টান।
নিষ্প্রাণ নিঃসাড় মৃণ্ময়ে।
কোনো প্রতিমাই গড়িনি তোমার।
আপনি উঠুক গড়ে সে
আপন সজীবতায় পূর্ণ অবয়বে।
২৭.৮.১৯৯১
দীপমালা
আমি দিনান্তের দীপ জ্বেলে দিলাম দিগন্তে।
আন্ধার নামবে বলে।
তবুও এতো আলো কোথা থেকে এলো?
এত হাসি এত জ্ঞান সুরের লহরী
আমার চার পাশে কিসের আশে?
তবে কী প্রদীপের সলতেখানাই উসকে দিল কেউ
নিভন্ত বেলাতে?
দিনান্তের দীপমালা জ্বেলে বসে থাকি নক্ষত্র রাতে।
১৪.১১.১৯৯১
আশা
সবাই যখন ঘুমিয়ে যাবে
গভীর রাতের কোলে -
জেগে রবে রাতের তারা
মহাবিশ্ব ভালে -
আরো কত সবুজ গ্রহে
অবুঝ প্রাণের সারায়।
নিভে যাওয়া সৌরজগৎ
যদিও বা হারায়
কৃষ্ণ গহ্বরে।
জেগে রবে গভীর রাতে
অন্ধকারের বুকে
অন্য কোনো ধ্রুবতারা
চলার অভিমুখে।
৩১.৩.১৯৯৩
চিরন্তন
দিনে দিনে পাল্টে গেছে মানুষ -
পাল্টে গেছে হাওয়া।
উল্টে গেছে অনেক রীতি নীতি।
জমছে কলের চিমনি বেয়ে ধোঁয়া।
হারিয়ে গেছে সবুজ বনানী -
আরণ্য রাত আরণ্য প্রাণী
জনারণ্যে নির্বাসিত আজ।
বদলে গেছে জঙ্গলের এ রাজ।
নিঝুম রাতে ত্রস্ত নাগরিক
ব্যস্ত পায়ে বাসায় ফিরতে চায়।
দেওয়াল গুলি অন্ধ তামসিক
হিংসা বুকে আব্রু টেনে দেয়।
দিনে দিনে পাল্টে গেছে মন।
পালটে গেছে রাম ও রামায়ণ।
বুদ্ধ যীশু মহম্মদের কথা
বদলিয়ে দেয় নতুন যুগনেতা।
লুব্ধনেত্রে সম্প্রদায়ের ত্রাতা
যোগায় ছুরি অন্ধকারের রাতে।
আর্তনাদে পঙ্গু মানবতা -
ধুর্ত শৃগাল ভোটের অপেক্ষাতে।
পাল্টে গেছে রাজ্য রাজনীতি।
দেশাত্মবোধ, ভাষা- সংস্কৃতি
পালটে গেছে সব, পাল্টায়নি শুধু
স্বপ্নে বিভোর কাজল চোখে
সজল নববধূ।
২৭.৪.১৯৯৩
সেই মেয়েটি
নদীর দিকে তাকিয়ে আছে
উদাস মনে সে।
গাছের পাতা পড়ছে খসে
মাথার চুল এলোমেলো দখিন বাতাসে।
সেই মেয়েটা বলেছিল
তাকে ভালোবাসে।
তখন আকাশ ছেয়ে ছিল
বিজন ঘন মেঘে।
স্তব্ধ বাতাস দুরু দুরু
ধাইবে কখন বেগে?
সেই ভাবনা ঘনীভূত
চরম প্রত্যাশে।
সেই মেয়েটা হঠাৎ বলে
তাকে ভালোবাসে।
তারপর দিন গেছে কেটে
গড়িয়ে গেছে বেলা -
খেলার ছলে ছুঁড়ে ফেলা
নুড়ি পাথর ঢেলা
সমস্তই গুঁড়িয়ে গেছে তরঙ্গোচ্ছ্বাসে।
হারিয়ে গেছে সেই মেয়েটি
বলতো ভালোবাসে।
ছায়া ঘনায় রাতের ছায়া -
দিনান্তে দেয় উঁকি।
দেউলগুলির আঁধাররেখা
রাখে ঢাকি সংসারের এ বিচিত্র আঁকিবুঁকি।
ফাঁকি দেওয়া সেই মেয়েটি তবু ফিরে আসে -
কানের কাছে ফিসফিসায় -
তাকে ভালবাসে।
১৬.১০.১৯৯৫
আন্টার্টিকা
চির তুষার হিম পাহাড়ের দেশ -
তুমি কেমনতরো?
কেমনতরো তোমার বাসিন্দারা?
দীর্ঘ রাত দীর্ঘ দিবস জুড়ে
ক্রীড়ায় মাতে হিমবাহের সাথে।
কেমনতরো তোমার রাতের আকাশ
অন্ধকারে হঠাৎ আলোর বাহার
পথ দেখাবে জনান্তিকে সবে।
চির তুষার হিমগিরির দেশ
ডাক পাঠাবে আমায় তুমি কবে?
৫/২/১৯৯৬
ছুটীর দিনে
রৌদ্র বয়ে যায়।
রৌদ্র নরম নবীন প্রভাতে।
উজ্জ্বল অমল দীঘল দিঘির পারে।
আড়ি পাতে পতঙ্গের সংসারে।
নিশিকান্ত সেই থেকে শুয়ে বিছানাতে।
তার চার দেওয়ালে শুধুই মাকড়সার ঝুল।
বিচিত্র ম্যাপের চিত্রণে বিমূর্ত বিশ্বে
গুঁড়িসুড়ি মেরে ঘুরে বেড়ায় টিকটিকি।
কখনো বা ঢুকে পরে দলছুট নিশিতে পাওয়া চামচিকে।
নিশিকান্ত শুয়ে থাকে বিছানাতে।
আহারের নিরাপত্তার জীয়ন কাঠিটুকু
বালিশের পাশে ফেলে রেখে
নিশিকান্ত দিনকে রাত করে
রাতকে দিন।
রৌদ্র বয়ে যায়।
নরম সোনালী রোদ।
ছুটির দমকা হাওয়া ঘুরে বেড়ায়।
আনাচে কানাচে - রঙ্গিন ফড়িং তিড়িং করে
ফিরে আসে স্রোতের কোল ঘেঁষে।
নিশিকান্তের অফিস নেই আজ।
তাই নিশিকান্তের কোনো কাজ নেই।
২০/৪/১৯৯৬
কবিতা পড়ুক মানুষ
কবিতা পড়ুক মানুষ।
পড়ুক রফিক অমল তাহের।
পড়ুক স্বপ্না সোফিয়া মেহের।
কবিতা পড়ুক শুধুই মানুষ।।
পড়ুক প্রেমের কবিতা মৃদু রুদ্ধস্বরে।
পড়ুক সংগ্রামের কবিতা ঘরবাঁধার স্বপ্ন বিভোরে।
পড়ুক বিরহ মথিত গাঁথা আশাভঙ্গের ব্যথিত অন্তরে।
কবিতা মানুষ পড়ুক নিবিড় চিত্তে নিষ্কলুষ নির্ঝরে।
মসজিদে আজান দিক ধর্মপ্রাণ মুসলমান।
মন্দিরে স্তোত্র পড়ুক নিষ্ঠাবান হিন্দু।
কবিতা পড়ুক শুধুই মানুষ।
সেই স্তোত্র আজান মিলে মিশে
শুধুই কবিতা হয়ে থাক
মানুষের অবাধ আসরে।
২১/৪/১৯৯৬
অমল হাসি
তোর হাসিতেই উছলে ওঠে আনন্দ সংসার।
ঠোঁটের কোণে টোল খাওয়া গাল -
দীঘল নিটোল মিষ্টি হাসি
তোর হাসিতে এতোই নেশা
চেয়েই থাকি চেয়েই থাকি -
আধো ঘুমে পরশ মেশা
ঠোঁটের ফাঁকে উঠছে ভাসি।
সারাদিনে অন্য আমি
হিসেব কষি -
পাওনা দেনা কত বাকি?
কখনো বা ক্লান্ত হতাশ।
জমার ঘরে জমছে ফাঁকি!
সারাদিনের অন্য আমি
তোর শিয়রে বসি এসে
কোলের পরে খিলখিলিয়ে
সমস্ত দায় উড়াস হেসে।
তোর হাসিতে কীসে যাদু -
চেয়েই থাকি চেয়েই থাকি।
১৭/১০/১৯৯৬
লোক
যে নদীকে সাক্ষী রেখে ঘুরত কিশোর চোখ
সে হয়েছে লোক।
চার দেয়ালে কুলুপ এঁটে দিনগুলি তার কাটে।
মন্দ আলোয় মদ্যপায়ী নেশায় রাঙ্গা চোখ।
সে হয়েছে লোক।
দিনগুলি তার বেহুঁশ জ্বরে প্রলাপ বকেই শুধু।
বুকের মধ্যে মরুভূমি খাঁ খাঁ ধুধু ধুধু।
অন্ধকারে আছড়ে পরে মৃত চন্দ্রালোক।
সে হয়েছে লোক।
২১.১০.৯৭
এই ছেলেটা
এদের পিছনে ফেলে
কোথায় যে যাস চলে?
এই ছেলে তুই
পায়ের নুড়ি দিয়ে তুড়ি
উড়াস অবহেলে
কোথায় যাস চলে?
ঠোঙ্গা কাগজ রইল পড়ে।
শিশি বোতল গ্লাস।
রঙ্গিন প্যাকেট ডাবের খোলা
ফেলে দেওয়া তাস।
এদের পিছনে ফেলে
কোথায় যে যাস?
প্যান্টুলুনে কালি ঝুলি
গায়ের গেঞ্জি মেটে
কাগজ ময়লা ঘেঁটে।
পিঠের বোঝা আজ নেই যা
এইটুকু না ফারাক।
এতেই মেজাজ দিলদরিয়া
আর কিছু না থাক!
আরাক বিচ্ছু নিল পিছু।
চলল লুটোপুটি।
গেঞ্জিখানাই মাটী!
হ্যাঁচকা টানে গেল ছিঁড়ে
উঠে দাঁড়াস ফিরে।
সিঁথিটুকু হাতের গোছে
সামলে উঠিস ধীরে।
ইস্টিশনে হরেক মজা।
হরেক রঙের খোরাক।
রাজা উজির ঘুরে বেড়াক
তাকাস অবহেলে।
পায়ের নুড়ি তুড়ি মেরে
কোথায় যাস চলে?
৫/১১/১৯৯৮

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home