AI-ML এবং আমাদের সমাজ
নারিতা-র অভিবাসন (immigration) কাউন্টারে অনেক ঝামেলা পোয়ানোর পর শেষ পর্যন্ত নারিতা এক্সপ্রেস-এ নিজের কোচটার কাছে পৌঁছে তবেই ধরে যেন প্রাণ ফিরে পেলাম। এই নারিতা এক্সপ্রেস-এ চেপে আমার শিনাগাওয়া-তে নামার কথা। সেখান থেকে আমায় অন্য ট্রেন ধরে যেতে হবে সুরুমি-তে (ইওকোহামা-র কাছে)। সুরুমির হোটেলেই আমার রাত্রিবাসের ব্যবস্থা। আমি ইওকোহামা-তে একটা কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করতে যাচ্ছিলাম। যখন আমি নারিতা-তে পৌঁছেছিলাম তখন কল্পনাও করিনি যে অভিবাসন সীমানা পেরোতেই আমার দুই ঘন্টা সময় লেগে যাবে। তাই যখন আমি আমার ব্যাগগুলো নিতে গেলাম ততক্ষণে আমি ভীষণ ক্লান্ত, এবং একটু চিন্তিতও বটে, কারণ আমার আই-ফোনে আন্তর্জাতিক সিম কার্ডটা পাল্টে নিয়ে ঘরে একটা ফোন করতে হত। এছাড়াও, সুরুমি-তে যাওয়ার জন্য ট্রেনের টিকিট কাটতে হত। জে আর ইস্ট ট্রাভেল সার্ভিস সেন্টার থেকে সহজেই টিকিট আর পথনির্দেশ পেয়ে যাওয়ার পর কাউন্টারের কাছের সোফাটায় বসে একটা স্বস্তির শ্বাস নিলাম এবং টিকিট আর ভ্রমণ-সংক্রান্ত অন্যান্য কাগজপত্রগুলো গুছোতে শুরু করলাম। আমার ট্রেন ছাড়তে তখনও ১৫ মিনিট দেরী। আমি আরও কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতে পারতাম! কিন্তু হঠাৎই মনে হল যে প্ল্যাটফর্ম আর ট্রেনটা খুঁজে নেওয়া দরকার। উত্তেজনায় আমি চট করে উঠে পড়লাম। জাপানি স্বয়ংক্রিয় টিকিট চেকিং সিস্টেমের মধ্যে দিয়ে যাওয়ার কোনও পূর্ব-অভিজ্ঞতা আমার ছিলনা। তাই কিছুটা ভয়ে ভয়েই তার মধ্যে দিয়ে গিয়ে শেষ পর্যন্ত প্ল্যাটফর্মে পৌঁছালাম। দেখলাম যে আমার ট্রেনটাও সেখানে দাঁড়িয়ে। অনেকটা স্বস্তির সাথে ট্রেনে চড়লাম এবং উপরে ব্যাগ রাখার জায়গায় হাতব্যাগটা রাখলাম। আমার নির্দিষ্ট সিটে বসে প্রথমেই নতুন সিম কার্ডটা লাগানোর চেষ্টা করলাম। দেখলাম যে সেটা ঠিকঠাকই কাজ করছে। বাড়িতে ফোন করে আমার এখানে পৌঁছানোর কথাটা জানালাম। তারপর আমার ছাত্র জিৎ-কে ফোন করলাম। জিৎ গতকাল সন্ধ্যাতেই এখানে পৌঁছেছে, ঐ একই কনফারেন্সে অংশগ্রহণ করার জন্য। অবশেষে ট্রেন ছাড়ল আর আমি এগিয়ে চললাম গন্তব্যের দিকে।
কোচটা অনেকটাই ফাঁকা ছিল। দেখে মনে হচ্ছিল অধিকাংশ যাত্রীই একা একা ভ্রমণ করছেন এবং প্রায় সবাই তরুণ প্রজন্মের। নিজেদের ল্যাপটপ আর স্মার্টফোনেই নিমগ্ন। কয়েকজন আবার বইও পড়ছিলেন। মাথার উপরে একটা ডিসপ্লে বোর্ড ছিল, যেখানে দুটো আলাদা জাপানী হরফে এবং ইংরাজীতেও জায়গার নাম দেখাচ্ছিল । ততক্ষণে পরবর্তী স্টেশন এসে গিয়েছে – নারিতা এয়ারপোর্টের ১ নম্বর টার্মিনাল। কয়েকজন যাত্রী কোচের মধ্যে ঢুকলেন। একটা দ্রুতগতির জাপানী ট্রেনে চড়ার অভিজ্ঞতা অনুভব করার জন্য আমি তখন রীতিমত উত্তেজিত। তবে যখন বুঝতে পারলাম যে নারিতা এক্সপ্রেস সেই ধরণের ট্রেন নয়, তখন একটু হতাশই হলাম। এই ট্রেনটা যথেষ্ট দ্রুতবেগে চললেও জাপানের বিখ্যাত শিনকানসেন-এর (বুলেট ট্রেন) সমগোত্রীয় নয়। আমি আমার কোচটা ঘুরে দেখছিলাম যে টয়লেটটা কোথায়, এবং চলন্ত ট্রেনে সাজানো গোছানো পরিষ্কার ব্যবস্থা দেখে আমি বেশ খুশী হলাম। ফেরার সময় আমি এটাও দেখলাম যে ব্যাগপত্রগুলো কিভাবে দরজার কাছে রাখা হয়েছে এবং সেগুলোর কয়েকটাকে কিভাবে ইলেকট্রনিক লকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে লোহার শিকল দিয়ে বাঁধা হয়েছে। ডিসপ্লে বোর্ডটিতে মাঝে মাঝেই দেখাচ্ছিল এই তালা কিভাবে ব্যবহার করতে হবে এবং সেই সাথে এই সতর্কবার্তাও দেওয়া হচ্ছিল যে তালা খোলা না গেলে ব্যাগপত্র শেষ গন্তব্যস্থল থেকে নিতে হবে। আমি আবার নিজের সিটে ফিরে এলাম এবং নিজের গন্তব্য স্টেশনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। ট্রেনটা যখন পরবর্তী স্টেশনের দিকে যাচ্ছিল তখন আমি সেই স্টেশনের নামোল্লেখের ঘোষণা শুনতে পেলাম যেখানে বলা হল যে যাত্রীরা যেন নামার জন্য প্রস্তুত হন এবং নিজেদের ব্যাগপত্রগুলো যেন দরজার কাছে নিয়ে চলে আসেন। আমি নিজের মনে মনেই বলে উঠলাম – “আমায় অন্তত নিজের ব্যাগপত্র নিয়ে ভাবতে হবেনা”, এবং আমার সিটের উপরে বাঙ্কে রাখা নিজের ছোট্টো ব্যাগটার দিকে তাকালাম। আমি শুধুমাত্র আমার হাতব্যাগটা নিয়েই যাচ্ছিলাম । মুহুর্তের মধ্যে একটা অস্বস্তিকর অনুভূতি আমাকে গ্রাস করল। আমার মনে হল যেন আমি কিছু একটা ভুলে যাচ্ছি। মনে পড়ল যে আমার সাথে তো একটা বড় বাক্স থাকার কথা, যেটা আমি এয়ারপোর্ট থেকে সংগ্রহও করেছিলাম, কিন্তু ভুলে গিয়ে জে আর ইস্ট ট্রাভেল সার্ভিস ডেস্ক-এই সেটি ফেলে এসেছি । নিজের উপর ভীষণ রাগ হওয়ার থেকেও আমি অবাক হলাম বেশী। কিভাবে আধ ঘন্টা ধরে আমি এভাবে স্মৃতিভ্রংশ হয়ে বসে আছি! বিদেশের মাটিতে আমি আমার একটা আস্ত ব্যাগ হারিয়ে ফেললাম যেটায় আমার জামাকাপড় সমেত অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রও ছিল। সেই সময় আমার একমাত্র সান্ত্বনা এটাই যে আমার কাছে আমার নগদ টাকা আর ভ্রমণের কাগজপত্র সব সুরক্ষিত ছিল!
আমি ভাবছিলাম যে সেইসময় আমার কি করা উচিত! নির্বিকার চিত্তে যে ক্ষতিটা হয়েছে সেটা মেনে নিয়ে কিছু প্রয়োজনীয় জামাকাপড়ের ব্যবস্থা করব কিনা ভাবছি, যেটা আমি জানতাম যে বেশ খরচসাপেক্ষ একটা ব্যাপার। তাই মুহুর্তের দুর্বলতাকে কাটিয়ে উঠে মনে জোড় এনে সমস্যাটাকে মোকাবিলা করার তাগিদ অনুভব করলাম। ব্যাগ ফেলে আসার ব্যাপারটা জানাবো বলে আমি কোচের কন্ডাকটারকে খুঁজতে বেরোলাম। একদম প্রথমে কোচে ঢোকার সময়ে নীল-সাদা ড্রেসে কয়েকজন রেলওয়ে কর্মীকে আমি দেখতে পেয়েছিলাম। সৌভাগ্যক্রমে তখন সেই রকমই অফিসিয়াল ড্রেস পড়া একজন লোক আমাদের কোচের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলেন। তাঁকে দেখে বুঝলাম যে তিনি একজন রেলওয়ে নিরাপত্তা কর্মী। আমি তাঁকে আমার ব্যাগ হারানোর ব্যাপারটা জানানোর চেষ্টা করলাম, কিন্তু তিনি আমার কথা কিছুই বুঝতে পারলেন না। বাকি যাত্রীরাও আমার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁরা আমার ইংরাজী বুঝতে পারছেন কিনা সেই বিষয়ে আমি খুব একটা নিশ্চিত ছিলাম না। খুবই অসহায় লাগছিল নিজেকে। ট্রেনের যেখানে সকলের ব্যাগপত্র রাখা ছিল আমি সেই ব্যক্তিকে সেখানে নিয়ে গেলাম এবং ব্যাগগুলোর দিকে হাত নেড়ে বোঝানোর চেষ্টা করলাম যে আমি আমার নিজের ব্যাগটা হারিয়ে ফেলেছি।
ঐ নিরাপত্তা কর্মী কয়েক মিনিটের মধ্যে কোচের কন্ডাক্টারকে ডেকে নিয়ে এলেন। তিনি এসে আমার সাথে ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজীতে কথা বলার চেষ্টা করলেন। কিছুটা ভাবভঙ্গি মারফৎ আর কিছুটা ঐ ভাঙ্গা ভাঙ্গা ইংরাজীর মাধ্যমেই তিনি শেষ পর্যন্ত বুঝতে পারলেন যে আমি এয়ারপোর্ট টার্মিনাল স্টেশনে নিজের ব্যগটা হারিয়েছি। তিনি আমাকে তাঁর সাথে আসতে বললেন, আমার বাকি জিনিসপত্রগুলো নিয়ে। একটা অন্য কোচে নিয়ে গিয়ে একটা ফাঁকা সিটে তিনি আমাকে বসালেন এবং অপেক্ষা করতে বলে কোথাও একটা চলে গেলেন (সবটাই হাত নেড়ে ভাবভঙ্গি করে)। শূন্য দৃষ্টি আর খালি পেট নিয়ে আমি বসে থাকলাম। আধা-স্বচ্ছ কাঁচের জানলা দিয়ে দ্রুতবেগে চলে যেতে থাকা বাইরের দুনিয়া, বিশেষ করে জাপানের আলো ঝলমলে সান্ধ্য শহুরে জীবনের আভাস ছুঁয়ে যাচ্ছিল। আমার ছাত্রটিও আমায় ফোন করে জানল যে আমি কোথায় আছি। টার্মিনালে ব্যাগ ফেলে এসেছি শুনে তারা (জিৎ আর তার বন্ধু) সম্পূর্ণ হতবাক ! তারা তখন সবেমাত্র তাদের নৈশভোজ সেরে ইয়োকোহামা-তে সমুদ্রের ধারে একটা পার্কে হেঁটে বেড়াচ্ছিল।
“আমি কি তাহলে চলে আসব স্যর ?”
“না না, একদম না ! তাতে কোনও লাভ হবেনা। বরং আমাকেই দেখতে দাও যে কি হয়। আমি তোমায় জানাবো।”
শেষ পর্যন্ত কন্ডাক্টার ভদ্রলোকটি নিজের সাথে একটা যন্ত্র নিয়ে ফিরে এলেন। যন্ত্রটা দেখতে কিছুটা ওয়াকি-টকির মতো। সেটায় তিনি জাপানী ভাষায় কিছু বললেন। আমি ভাবলাম যে তিনি তাহলে নারিতা টার্মিনাল-২ স্টেশনের একজন রেলওয়ে কর্মীর সাথে কথা বলছেন এবং আমার হারিয়ে যাওয়া ব্যাগের কথা জানাচ্ছেন। কিন্তু নিজের কথা বলার পর তিনি যন্ত্রটাকে আমার সামনে ধরলেন। আমার তরফ থেকে কিছু একটা প্রত্যাশা করছিলেন তিনি। কিন্তু আমি কিছুই বুঝতে না পেরে তাঁর দিকে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলাম। তিনি আবার যন্ত্রটাকে নিজের মুখের সামনে এনে জাপানী ভাষায় কিছু একটা বললেন এবং তারপর আবার আমার সামনে ধরলেন। এবার আমি দেখতে পেলাম যে সেখানে ইংরাজীতে কিছু একটা লেখা আছে।
“আপনার ব্যাগের রঙ কি ?”
বুঝলাম এটা এমন একটা যন্ত্র যেটা জাপানী কথার ভাষান্তর করে ইংরাজী লেখায় পরিণত করে।
আমি উত্তর দিলাম – “নীল”।
যন্ত্রটা আমার ইংরাজী উত্তরটার ভাষান্তর ঘটিয়ে জাপানী লেখায় পরিণত করে দিল।
“ব্যাগে কি ছিল ?”
“জামাকাপড় এবং একটা ফাইল।”
কন্ডাক্টার ভদ্রলোকটি আবার কিছু একটা বললেন। এবার “আমরা যাই” ধরণের কি একটা লেখা এল। আমি কিছুটা ভেবাচেকা খেয়ে তাঁর দিকে তাকালাম। তিনি আবার কিছু একটা বললেন।
“পরবর্তী স্টেশনে নামবেন।”
তারপর আবার একটা কি বলে যন্ত্রটাকে আমার দিকে দেখিয়ে আশ্বস্ত করলেন – “আমিও আপনার সাথে নামব।”
আমি বললাম – “ঠিক আছে। অসংখ্য ধন্যবাদ।”
সদয় কন্ডাক্টার ভদ্রলোকটি আমায় আবার সেই যন্ত্রের মাধ্যমে জানালেন যে পরবর্তী স্টেশন হল টোকিও এবং সেখানে পোঁছাতে আরও ৪০ মিনিট সময় লাগবে।
যখন ট্রেন টোকিও-তে পৌঁছালো, তখন আমি কিছুটা বিভ্রান্ত এবং অনিশ্চিত ছিলাম, কারণ কোচ থেকে বের হওয়ার সময় আমার কন্ডাক্টার বন্ধুকে আমি খুঁজে পাইনি। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে নামার পরেই আমি তাঁকে খুঁজে পেলাম, আমার পিছনেই দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। আরও দুজন প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদের একজন আমার দিকে এগিয়ে এসে বললেন – “আপনার ব্যাগ ঠিক আছে।”
আমি বললাম – “ঠিক আছে? বাহ্। তবে সেটা পাবো কিকরে?”
ঐ কর্মীটি তারপর নিজের কথা থেকে লেখায় ভাষান্তরের যন্ত্রটা ব্যবহার করলেন এবং আমায় লেখাটা দেখালেন। আমি দেখলাম লেখা ফুটে উঠেছে – “ব্যাগটা পাওয়া গেছে।”
আমি একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে জিজ্ঞাসা করলাম – “ব্যাগটা কোথায়?”
আবার ঐ যন্ত্রের মাধ্যমে জানতে পারলাম – “ওটা এখনও নারিতা এয়ারপোর্ট টার্মিনাল-২ স্টেশনে আছে। আপনাকে ফিরে গিয়ে ব্যাগটা সংগ্রহ করতে হবে।”
নারিতা এয়ারপোর্ট টার্মিনাল-২ স্টেশনে যাচ্ছে এমন একটা ট্রেন ধরিয়ে দিতে আমাকে সাহায্য করলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত ঐ স্টেশনের ‘লস্ট অ্যান্ড ফাউন্ড’ সেকশন থেকে আমি আমার ব্যাগটা সংগ্রহ করলাম। আমি ভাগ্যবান যে এই ঘটনাটা জাপানে ঘটেছিল, যে দেশের সততা আর বন্ধুত্ব দিয়ে তৈরী সামাজিক বুননটা এতটাই দৃঢ় যে সেখানে ভ্রমণ করাটা ভীষণ রকমের নিরাপদ।
আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স (AI) এবং মেশিন লার্নিং (ML) যে কিভাবে আমাদের সামাজিক মেলামেশার পরিবর্তন ঘটাতে পারে এবং ভাষা আর দূরত্বের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করতে পারে তার একটা উদাহরণ হিসাবে আমি উপরের ঘটনাটা বললাম। এক ভাষার কথা থেকে অন্য ভাষার লেখায় রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াটা এখন এতটাই উন্নত আর নির্ভরযোগ্য হয়ে উঠেছে যে সেটাকে এখন আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা যেতে পারে, যার সুফল আমি হৃত ব্যাগ পুনরুদ্ধারের ঘটনাটিতে প্রত্যক্ষ করেছি।
এই ধরণের অনেক উদাহরণই দেওয়া যেতে পারে। সত্যি বলতে, তরুণ মিলেনিয়াল প্রজন্মের কাছে ইন্টারনেট পরিচালিত বিভিন্ন ব্যবসা এবং সামাজিক মেলামেশা ও বিনিময়ের যোগাযোগটা খুবই স্বাভাবিক। এগুলোর অধিকাংশই মূলত AI আর ML-এর প্রয়োগের মাধ্যমে নিত্যনতুন উদ্ভাবনীর হাত ধরে প্রতিদিন আরও সমৃদ্ধ হচ্ছে। একটা নতুন জায়গা, হোটেল, রেস্তোঁরা, মিউজিয়াম ইত্যাদি খুঁজে বের করার জন্য গুগ্ল ম্যাপের ব্যবহার করা; হোটেলের রুম বুক করা, ট্যাক্সি, বিমান আর ট্রেনের টিকিট কাটা; পিৎজা থেকে শুরু করে কম্পিউটার পর্যন্ত বিভিন্ন জিনিস অর্ডার করা এবং এই ধরণের বিভিন্ন কাজকর্মে মানুষজন এখন অভ্যস্ত।
কথা থেকে লেখায় রূপান্তরের মতো, লেখা থেকে কথায় রূপান্তরের প্রক্রিয়াটাও কিছু কিছু ভাষার ক্ষেত্রে যথেষ্ট উন্নত হয়েছে এবং বিভিন্ন কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশানে তার ব্যবহার হচ্ছে। ধরুন ঐ ভাষান্তরের যন্ত্রটা (cross-lingual gadget), যেটা জাপান-এ আমায় বাঁচিয়েছিল, সেটাতে যদি লেখা থেকে কথায় রূপান্তরের আরেকটা মডিউল যোগ করা হয় তাহলে সেটাই একটা মানব-দোভাষীর মতো কাজ করবে এবং দুটো ভিন্ন ভাষাভাষীর দুইজন মানুষ এই যন্ত্রটা ব্যবহার করে নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারবেন। ভারত-এর মতো একটা দেশে, যেখানে যোগাযোগের জন্য বাইশটা সংবিধান-স্বীকৃত ভাষা আছে, সেখানে এর ব্যবহারিক প্রয়োগটা যে কি দারুণ একটা ব্যাপার হবে সেটা ভাবলেই শিহরণ জাগে। সম্প্রতি আমার ছেলে আমাকে একটা ভিডিও ক্লিপ ফরোয়ার্ড করেছে। সেই ভিডিওতে দেখানো হয়েছে যে তারা ডিপ লার্নিং (Deep learning) কৌশল ব্যবহার করে এমন একটা প্রযুক্তি তৈরী করেছে যার মাধ্যমে ইংরাজী বলিয়ে বক্তার শুধুমাত্র ঠোঁটের নড়াচড়া থেকেই বাগ্-পুনরুদ্ধার সম্ভব। এই ভিডিও প্রদর্শনীটা ছিল বেশ চমৎকার, এবং আমার ছেলের কথা অনুযায়ী এমনকি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যান্ড্রু জিস্সারম্যান এই প্রদর্শনীর প্রশংসা করেছেন। কম্পিউটার ভিসন বিষয়ে গবেষণাকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অ্যান্ড্রু একজন পথিকৃৎ। তরুণ গবেষকদের উৎসাহিত করার ব্যাপারে তিনি হয়তো স্বভাবগতভাবেই মহানুভব, কিন্তু তাদের ঐ যন্ত্রের মাধ্যমে কথা তৈরীর (speech synthesis) গুণমান দেখে আমি নিজেও বিস্মিত হয়েছিলাম । এই গোটা ভিডিওতে বিষয়বস্তুর এমন পেশাদারী বর্ণনা দেখেও আমি মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাই আমি ভিডিওর নেপথ্য কণ্ঠের প্রবক্তার পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম। আমি এটা জেনে অবাক হয়েছিলাম যে ঐ গোটা বক্তব্যটাই লেখা থেকে কথায় রূপান্তরের মাধ্যমে তৈরী করা হয়েছে। তারা শুধুমাত্র বর্ণনার একটা লেখা তৈরী করেছিল এবং সেটাকে তারা ঐ কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশানের মাধ্যমেই একটা দারুণ বক্তব্যে রূপান্তরিত করেছে। ঐ আওয়াজটা যে কৃত্রিম এবং যান্ত্রিক সেটা আমি বুঝতেই পারিনি, অথচ তাদের অ্যালগরিদ্ম দিয়ে ঠোঁটের নড়াচড়া থেকে উদ্ধার করা বচনের কৃত্রিমতা সহজেই ধরা যাচ্ছিল।
এই হল আজকের পরিস্থিতি। এক দশক আগেও যা কল্পনাও করা যেতনা সেটাই এখন দারুণভাবে বাস্তব ও বিশ্বাসযোগ্য। কেউ যে এগুলো নিয়ে আগে ভাবেনি সেটা একেবারেই সত্যি নয়। দীর্ঘ সময় ধরে (অন্তত গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে) গবেষকরা এইসমস্ত প্রতিবন্ধকতার উর্দ্ধে ওঠার চেষ্টা করে চলেছেন। মুখের কথা থেকে লেখার ভাষায় বা লেখার ভাষা থেকে মুখের কথায় রূপান্তর, মুখমন্ডল সণাক্তকরণ (face recognition), যন্ত্র দ্বারা বিভিন্ন বস্তুর সণাক্তকরণ, দৃশ্য এবং ঘটনার বর্ণনা তৈরী করা, রোগ নির্ণয়, ছাপা কাগজপত্রের ছবি থেকে সেগুলোকে ইলেকট্রনিক মাধ্যমে রূপান্তর, ভূতল যানবাহনের স্বয়ংক্রিয় পথ ও দিক নির্দেশ ব্যবস্থা (autonomous ground vehicle navigation), বিভিন্ন পরিষেবার জন্য রোবটদের নির্দেশ দেওয়া এবং আরও অন্যান্য অনেক কঠিন সমস্যার বিশ্বাসযোগ্য ও নির্ভরযোগ্য সমাধানে তাদের মনঃপ্রাণ নিয়োগ করেছেন। বিশেষতঃ সেন্সিং প্রযুক্তি, ডিজিটাল মাধ্যমে ডেটা (Data) পাওয়ার সুযোগ, এবং সাধারণ কম্পিউটিং প্ল্যাটফর্মে সেগুলোকে বিশ্লেষণ করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে উন্নতির ফলে গত শতাব্দীর নব্বইয়ের দশকে ডিজিটাল বিপ্লবের সূচনার সময় থেকে এই ধরণের প্রচেষ্টাগুলো আরও অনেক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ধরণের প্রচেষ্টার মধ্যে কিছু কম্পিউটার অ্যাপ্লিকেশান নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (restricted environment) এই সমস্যাগুলোর সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে। তবে প্রধান সমস্যাটা হল অনিয়ন্ত্রিত পরিবেশে (unrestricted environment) এগুলিকে নির্ভরযোগ্য ভাবে কার্যকরী করে তোলা। কিন্তু গত দশকে প্রযুক্তির জগতে যে অগ্রগতি ঘটেছে তাতে এই সমাধানগুলোতে একটা গুণগত পরিবর্তন এসেছে এবং বেশ কিছু ক্ষেত্রে এই সীমাবদ্ধতা অনেকাংশেই দূর করা সম্ভব হয়েছে। পরিণামে এই সমাধানগুলো গবেষণাগার ছেড়ে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করেছে।
প্রযুক্তি বিপ্লবের একটা নতুন যুগ ?
স্বাভাবিকভাবেই, এই পরিস্থতিতে একটা প্রশ্ন উঠছে যে আমরা কি তাহলে প্রযুক্তি বিপ্লবের একটা নতুন যুগে প্রবেশ করছি? যে বিপ্লবটা ঘটিয়েছে AI এবং ML। যদি তাই হয়, তাহলে আমাদের সমাজে এর কিরকম প্রভাব পড়তে পারে? এই প্রযুক্তি কি বদলে দেবে সামাজিক রীতিনীতি? বদলে দেবে উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে মানুষের সম্পর্ক? মাত্র কিছু দশক আগেও আমরা শিল্প বিপ্লবের একটা নতুন অধ্যায় দেখেছি, যা ডিজিটাল বিপ্লব নামে পরিচিত। এই বিপ্লব আমাদের সমাজের এমন রূপান্তর ঘটিয়েছে যে মোবাইল ফোন এবং ইন্টারনেট পরিষেবার আগের দিনগুলো আমাদের এখন প্রাগৈতিহাসিক বলে মনে হয়। একটা ক্রেডিট কার্ড, ইমেল আইডি এবং মোবাইল নাম্বার না থাকলে আমাদের অনেকেই যেন বর্তমান প্রজন্মের কাছে জীবন্ত জীবাশ্ম। এগুলো ছাড়া যেন মনে হয় আমরা এই মানবসমাজের বাইরের কেউ।
শিল্প ও প্রযুক্তির বিস্ময়কর বিকাশ ও অগ্রগতি নিয়ে এসেছিল ডিজিটাল বিপ্লব। বিশেষতঃ সেমিকন্ডাকটার শিল্পে ইন্টিগ্রেটেড চিপ্সের উৎপাদন, সেন্সর (Sensor) ও মাল্টিমিডিয়া প্রযুক্তি সহ ডিজিটাল ইলেক্ট্রনিক্সের বিকাশ, দূরসঞ্চার (Communication) এবং কম্পিউটিং প্রযুক্তির বিস্তার এই বিপ্লবে মুখ্য ভূমিকা নেয়। একসময়ে অত্যধিক দাম এবং প্রযুক্তির ব্যবহারের জটিলতার দরুন বিভিন্ন গ্যাজেট, যেমন – ফোন, ক্যামেরা, কম্পিউটার ইত্যাদি সমাজে মাত্র কিছুজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকত। সেগুলোই এখন অনেক কম দামে, আরও ভালো মানের পরিষেবা সমেত, এবং আগের থেকে ছোট আকারে-আয়তনে ব্যাপকভাবে পাওয়া যেতে লাগল। প্রযুক্তির মাধ্যমে বৈদ্যুতিন যোগাযোগ (Tele-communication) পরিকাঠামোতেও বিপ্লব এসেছে, যা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করেছে আমাদের সমাজে সেলুলার ওয়্যারলেস পরিষেবা, ডেটা কমিউনিকেশান এবং ইন্টারনেট পরিষেবা ইত্যাদির ব্যাপক প্রসারের মাধ্যমে। এই ধরণের প্রযুক্তির হাত ধরে আমরা ইনফরমেশান প্রসেসিং-এ নতুন উদ্ভাবনীর একটা যুগে প্রবেশ করেছি, যেখানে স্টোরেজ আর কম্পিউটিং ক্ষমতা প্রভূত পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে বিপুল পরিমাণ ডেটা নিয়ে কাজকর্ম করার সুযোগও বৃদ্ধি পেয়েছে। এইসমস্ত অগ্রগতি আর উন্নতি তো ডিজিটাল বিপ্লবের একটা স্বাভাবিক ফলশ্রুতি হিসাবেও বিবেচনা করা যেতে পারে। তাহলে উৎপাদন ব্যবস্থায় আর কোন ধরণের গুণগত পরিবর্তন এসেছে যার প্রভাবে আমরা প্রযুক্তি জগতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনার ইঙ্গিত অনুভব করছি?
অতীতের শিল্প বিপ্লবগুলোর কথা যদি আমরা খেয়াল করি তাহলে দেখা যাবে যে সেগুলোর প্রতিটাই ছিল প্রযুক্তিক্ষেত্রে একটা নতুন উদ্ভাবনের ফলশ্রুতি, যে উদ্ভাবন চিরাচরিত উৎপাদন ব্যবস্থায় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের রীতিনীতিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল। এর পাশাপাশি এগুলো আমাদের সামাজিক জীবন যাপনে আর সামাজিক সম্পর্কের মধ্যেও কিছু লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন এনেছিল। যে সমাজ এই নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ করেছিল আর যে সমাজ করেনি তাদের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্যও তৈরী হয়েছিল। প্রথম শিল্প বিপ্লবের (১৭৬০-১৮৩০) কান্ডারী ছিল বাষ্পচালিত ইঞ্জিন। আমরা লক্ষ্য করতে পারি যে এই সময়েই বৃহৎ পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থা বিকশিত হতে শুরু করে এবং নতুন সামাজিক সম্পর্কের সূচনা ঘটে । নতুন বুর্জোয়াদের অভিঘাতে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয় পুরানো সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থা। এরপর কয়েক দশক মূলতঃ যান্ত্রিক শক্তিনির্ভর শিল্পের বিকাশ ঘটে। তড়িৎ-চুম্বকীয় শক্তির আবিষ্কার এবং উৎপাদন ব্যবস্থায় বিদ্যুতের ব্যবহারের সাথে শিল্প বিপ্লবের দ্বিতীয় পর্যায় (১৮৬০-১৯১৪) শুরু হয়। প্রকৃতি এবং প্রাকৃতিক ঘটনাবলী সম্বন্ধে আমাদের যা ধারণা ছিল তার বৈপ্লবিক পরিবর্তন ঘটেছিল এই সময়ে। খনিজ তৈলের আবিষ্কার এবং অটোমোবাইল ক্ষেত্রে তার ব্যবহারের ফলে বিকাশের গতি আরও বৃদ্ধি পায়। এই পর্যায়ে পুঁজিবাদের অবাধ রাজত্ব কায়েম হয়। তেমনি বাড়তে থাকে পুঁজিবাদী শিল্পোন্নত দেশগুলির মধ্যে বিরোধ। উপনিবেশের বাজার দখলকে কেন্দ্র করে তারা নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষে লিপ্ত হল, যার ফলশ্রুতি হল পর পর দুইবার বিশ্বযুদ্ধ। কার্ল মার্ক্স এবং ফ্রেডরিক এঙ্গেল্স প্রমুখদের হাত ধরে নতুন সমাজব্যবস্থার ধারণাও শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল এই সময়ে, যে ধারণাকে কেন্দ্র করে সংগঠিত একাধিক বিপ্লবী আন্দোলনের মাধ্যমে প্রথমে রাশিয়া ও পরে চীন-এ এবং তারও পরে অন্যান্য আরও দেশে নতুন রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে ওঠে।
দ্বিতীয় শিল্প বিপ্লবের পর শিল্প এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্রম-বিকাশ ঘটে, কিন্তু কারখানা-কেন্দ্রিক উৎপাদন ব্যবস্থার মধ্যে কোনও বিরাট পরিবর্তন আসেনা। ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতির মাধ্যমে এই প্রক্রিয়ার গতিবেগ আরও বৃদ্ধি পায়। কিন্তু কম্পিউটিং এবং কমিউনিকেশান প্রযুক্তির দ্রুত বিকাশের মাধ্যমে এটি বহুগুণে ত্বরান্বিত হোয়। এই পরিবর্তনের জন্য যেকোনো একখানা উদ্ভাবনীকে চিহ্নিত করা অত্যন্ত কঠিন একটা কাজ। প্রযুক্তির ক্ষেত্রে একের পর এক অগ্রগতির চূড়ান্ত পরিণাম ছিল এই পরিবর্তন, যেমন – সেমিকন্ডাকটার ডিভাইস-এর ফ্যাব্রিকেশান, স্পেস টেকনোলজি এবং রিমোট সেন্সিং, কম্পিউটার হার্ডওয়্যার এবং সফ্টওয়্যার, ওয়্যারলেস এবং ডিজিটাল ডেটা কমিউনিকেশান, অডিও-ভিসুয়াল এবং ইমেজিং, মেডিকাল ইমেজিং, বায়োমেডিকাল ডিভাইস ইত্যাদি আরও অনেক কিছু। গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুর দিক থেকে শুরু করে বর্তমান শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি সময়ে প্রযুক্তিক্ষেত্রে যে অগ্রগতি ঘটেছে তাকে আমরা ‘ডিজিটাল বিপ্লব’ বলতে পারি (মোটামুটি ১৯৮৪ থেকে শুরু করে ২০০৪ পর্যন্ত)। তারপর আছে ডিজিটাল-পরবর্তী যুগে অগ্রগতি, যেগুলো আমাদের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক আদান প্রদান এবং উৎপাদন ব্যবস্থার সাথে আমাদের সম্পর্কের মধ্যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এই সময়ের মধ্যেই আমরা দেখতে পেয়েছি ইন্টারনেট পরিষেবা, গণনার পরিকাঠামো, মোবাইল নেটওয়ার্ক ইত্যাদির প্রভূত বিস্তার এবং এমনকি সমাজের কম-রোজগেরে অংশের মধ্যেও স্মার্টফোনের অনুপ্রবেশ।
মাঝখানে হয়তো খুব বেশী হলে বছর পনেরো সময় পেরিয়েছে। এখন AI আর ML-এর যে যুগ এসেছে সেটাকে প্রযুক্তি বিপ্লবের অন্য একটা নতুন যুগ হিসাবে ঘোষণা করাটা কি খুব তাড়াহুড়ো হয়ে যাবেনা ? আমরা কি বর্তমানের এই প্রযুক্তিগত উন্নতিকে অতীতের ডিজিটাল যুগের ধারাবাহিকতা হিসাবে বিবেচনা করতে পারিনা ? উৎপাদন ব্যবস্থায় আমাদের অংশগ্রহণের কি কোনও রকম মৌলিক পরিবর্তন এসেছে? সামাজিক রীতিনীতির কি কোনও লক্ষ্যণীয় পরিবর্তন হতে চলেছে ? আজকের ও ভবিষ্যতের সমাজে AI আর ML-এর কি প্রভাব পড়ছে এবং পড়বে সেটা বিশ্লেষণ করতে গেলে আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির বিকাশকে প্রভাবিত করার ক্ষেত্রে একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি হিসাবে আমাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ। কিন্তু আমরা এই সমাজজীবনেরই অংশ। তাই আমাদের সচেতন থাকা উচিত যে প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব প্রগতির ফলশ্রুতিতে আমরা কোথায় চলেছি। কীভাবেই বা এই নতুন অগ্রগতি আমাদের সমাজের সার্বিক মঙ্গলে নিয়োজিত হবে।
বর্তমান যুগ – প্রত্যাশা এবং পরিণাম
এবার পর্যালোচনা করে দেখা যাক যে ডিজিটাল প্রযুক্তি, ইন্টারনেট, মোবাইল যোগাযোগ মাধ্যম, স্মার্ট ফোন, সোসাল নেটওয়ার্কিং, ই-কমার্স ইত্যাদির আবির্ভাবকে আমরা কিভাবে নিয়েছিলাম। নিঃসন্দেহে বলা যায় যে আমরা সবাই খুব আশাবাদী ছিলাম, এবং তার যথেষ্ট কারণও ছিল। একবার অত্যন্ত বিশিষ্ট একজন গবেষকের বক্তব্য শুনেছিলাম। তিনি ইন্টারনেটের বিস্তারে সমাজে জ্ঞান ও শিক্ষার সার্বিক প্রসারে ভীষণ ভাবে আশাবাদী ছিলেন। বিশেষতঃ এই মহান যজ্ঞে ইন্টারনেটের তিনটি পরিষেবার ভূমিকা তিনি উল্লেখ করেছিলেন – গুগ্ল সার্চ ইঞ্জিন, উইকিপিডিয়া এবং ইউটিউব। অনুষ্ঠানটা ছিল আমাদের প্রতিষ্ঠানের হীরক জয়ন্তী বর্ষ (২০১১-২০১২) উদ্যাপনকে কেন্দ্র করে। তাঁর মত অনুযায়ী এগুলোর মাধ্যমে শিক্ষার্জন আগের থেকে অনেক সহজ ও সুলভ হয়েছে। সেই কারণে একজন ব্যক্তিমানুষকে তার অজ্ঞানতা থেকে দূর করে তাকে জীবন ও অজানা বিষয় সম্পর্কে আরও বেশী আত্মবিশ্বাসী করে তোলাতে এগুলো ভীষণ ভাবে কার্যকরী। সেই মুহুর্তে হয়তো আমরা সকলেই এই কথা শুনে সহমত পোষণ করেছিলাম। তাঁর পর্যবেক্ষণকে সন্দেহ করার মতো কোনও কারণ ছিলনা, কেননা ইন্টারনেট এবং ডিজিটাল পরিকাঠামোর বিস্তারের সাথে সাথে আমরা সকলেই এইসমস্ত পরিষেবার সুবিধাগুলো পেতে শুরু করেছিলাম। কিন্তু সেদিন আমরা এই মুদ্রার উল্টো পিঠে কি আছে সেটা বুঝিনি। এক দশক পরে আজকে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে কিভাবে এইসমস্ত পরিষেবা ব্যবহারের বদলে ব্যক্তিগত মুক্তি এবং স্বাধীনতা একটা পণ্যে পরিণত হয়েছে, এবং আমাদেরকে ঠেলে দিয়েছে একটা ক্রমবর্ধমান তীব্র নজরদারি ব্যবস্থার দিকে।
আমাদের আরেকটা প্রত্যাশা ছিল যে এই নতুন প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে প্রশাসক এবং সাধারণ মানুষের ভিতরকার ব্যবধানকে কমিয়ে এনে গণতন্ত্রকে আরও দৃঢ় করে তোলা হবে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের সুবিধার্থে নীতি নির্ধারণের জন্য জনগণের বক্তব্য এবং মতামতকে আরও কার্যকরীভাবে গ্রহণ ও গুরুত্ব দেওয়ার বিষয়ে আমরা অনেকেই আশাবাদী ছিলাম। যদিও সংবাদমাধ্যম কিভাবে ধনী আর প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হবে সেই বিষয়ে মতভেদ ছিল। এ নিয়ে আমার সাথে আমার এক বন্ধুর বিতর্ক হয়, যিনি বর্তমানে আমাদের একটা বিখ্যাত প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা। আমার বন্ধু ভীষণভাবে ইন্টারনেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র নিয়ে উচ্ছ্বসিত ছিলেন। সময়টা ছিল এই শতাব্দীর শুরুর দিক। সত্যি বলতে, এক দশক পরে ২০১০-১১ সালে মধ্য-পূর্ব এশিয়া-তে স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং আন্দোলন সংগঠিত করার ব্যাপারে সোসাল মিডিয়া এবং ইলেক্ট্রনিক মিডিয়াকে ইতিবাচক ভূমিকা নিতে দেখেছি আমরা। কিছু স্বৈরাচারী শাসন এবং শাসকের ক্ষমতা খর্ব করার ক্ষেত্রে প্রাথমিক সাফল্যও মিলেছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষী আছে যে খুব শীঘ্রই সেখানকার জনসাধারণের উল্লাস রূপান্তরিত হয়েছিল দুঃস্বপ্নে। কোনওরকম প্রগতিশীল মতাদর্শের অভাবে খুব শীঘ্রই এই অঞ্চলগুলো ধর্মোন্মাদদের এবং বর্তমান পৃথিবীর নয়া-উদারনৈতিক শাসক ও তাদের পৃষ্ঠপোষক বহুজাতিক কর্পোরেট সংস্থাগুলোর মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হল।
আমরা যদি বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকাই তাহলে দেখতে পাবো যে ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া এবং সোসাল নেটওয়ার্কিং-এর মঞ্চে সাধারণ মানুষের কন্ঠস্বর পৌঁছায়না বললেই চলে। আমাদের রাজনৈতিক প্রভুদের হারজিত, যুদ্ধ ও হিংসা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও মাঝেমাঝে পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ, এবং সেলেব্রিটিদের রংচঙে দুনিয়া ইত্যাদি সমস্ত রকম খবর আমরা সেখানে পাই। কিন্তু সাধারণ মানুষের সাথে সম্পর্কযুক্ত কোনও বিষয় নিয়ে চিন্তাভাবনা সেখানে খুঁজে পাইনা বললেই চলে ! অর্থনৈতিক সঙ্কটের সময়ে তাঁদের দুর্দশাগ্রস্ত অবস্থা, তাঁদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দাবিদাওয়া এবং সরকারী অপশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, অগণতান্ত্রিক আইন এবং কাজকর্মের বিরুদ্ধে তাঁদের লড়াই আর আন্দোলন ইত্যাদি বিষয়ে কোনও লেখালেখি সেখানে চোখে পড়েনা। এগুলো যে শুধুমাত্র সংবাদমাধ্যমে শাসক শ্রেণীর প্রচারমূলক খবরের বন্যা বইয়ে দেওয়ার মারফৎ হয়ে থাকে তা নয়, পাশাপাশি দমনমূলক আইন এবং ইন্টারনেট বন্ধ করে দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে সক্রিয়ভাবে দমন করা হয়। কোনও রকম দায়বদ্ধতার তোয়াক্কা না করে, কোনও রকম বাধার সম্মুখীন না হয়ে, একই গল্পকথা এবং বিদ্বেষ বিষাণো বক্তৃতার কয়েক লক্ষবার পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে মানুষজনকে সম্মোহিত করার ব্যাপারে হিটলার এবং গোয়েব্বেল্স-রা হয়তো আজকের পৃথিবীতে অনেক বেশী সফল হতেন ! বহু গণতান্ত্রিক দেশেই আজ দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই ধরণের ঘটনা ঘটছে। এমনকি অনেক ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকেও এই ধরণের প্রচার করার বিনিময়ে অর্থ প্রদান করা হচ্ছে ! অতীতে যেটা ছিল ছাপা হরফে প্রকাশিত কিছু সংবাদমাধ্যমে টাকার বিনিময়ে বিজ্ঞাপন এবং সেটাও কিছু আইনের নিয়ন্ত্রণাধীন থেকে, সেটাই এখন পরিণত হয়েছে আমাদের সমাজের ক্ষমতালিপ্সু শাসকদের স্বার্থ রক্ষাকারী একটা শতমুখী দানবের মুখপত্রে, যাকে সহজেই সংগঠিত ভাবে ব্যবহার করা যায়। কার্যত ডিজিটাল বিপ্লব প্রচারমাধ্যমের পুরাতন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে অর্থহীন করে তুলেছে। পরিণামে আমরা এটাই দেখছি যে সোশ্যাল মিডিয়া, ও নানা প্রচারমাধ্যমে হিংসা-বিদ্বেষের বিষাক্ত পরিমণ্ডল। বিশ্ব-জোড়া এই যোগাযোগ ব্যবস্থার আপাত সুবিধাভোগী প্রতিটি ব্যক্তিমানুষই এই ধরনের অর্ধ-সত্য এবং মিথ্যা খবরের শিকার।
ডিজিটাল বিপ্লবের তৃতীয় ইতিবাচক ভূমিকাটা ছিল দূরত্ব আর জাতীয় সীমানার প্রতিবন্ধকতাকে দূরে সরিয়ে পৃথিবীকে আরও বেশী করে সংহত করে তোলা। সত্যি বলতে, এই যুগের নয়া-উদারনৈতিক নীতি নির্ধারকেরা প্রযুক্তিক্ষেত্রে এই অগ্রগতি থেকে মতাদর্শগত সমর্থন পেয়ে বিশ্ব-জোড়া একটা বাজারে জনমানসের মুক্ত চলাচলকে স্বাগত জানিয়েছেন। জাতীয় সীমানাহীন সহমর্মিতা এবং সৌভ্রাতৃত্ব, শান্তি এবং উন্নতিতে সমৃদ্ধ এমন একটা বিশ্বের কথা ভেবে আমরা বিমুগ্ধ হয়েছিলাম। কিন্তু আমরা যদি বর্তমান পরিস্থিতির দিকে তাকাই তাহলে আমরা এমন একটা বিশ্বকে দেখতে পাবো যেখানে চারিদিকে পরিযায়ী (migrant) জনগণের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ আর ঘৃণা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এবং পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে উগ্র-জাতীয়তাবাদের উত্থান ঘটছে। বিশ্বজনীন বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক এবং সৌভ্রাতৃত্বের বদলে যুদ্ধ, হিংসা, এবং সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ বর্তমান দিনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে !
পরিশেষে আমরা যদি সমাজে সম্পদ এবং আয়ের বন্টনের কথা ভাবি তাহলে সেক্ষেত্রেও আমরা একটা অন্য হতাশাজনক ছবি দেখতে পাবো। ডিজিটাল বিপ্লবকে সাগ্রহে গ্রহণ করার সাথে সাথে সমাজেও যে সমৃদ্ধি আর উন্নতি আসবে সেটা যথেষ্ট স্বাভাবিক একটা প্রত্যশা। সে কারণেই উৎপাদন শক্তির এই বহুগুণ বৃদ্ধির ফলে সমাজের প্রতিটা সদস্যেরই উপকৃত হওয়ার স্বপ্ন আমরা দেখেছি। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখতে পাচ্ছি যে প্রায় প্রতিটা দেশেই জনগণের মধ্যে সম্পদ এবং উপার্জনের বৈষম্য ক্রমবর্ধমান। আরও নির্দ্দিষ্ট করে বলতে গেলে আমাদের দেশ ভারত-এর উদাহরণই ধরা যাক। ২০১১ সালে ভারত-এর গিনি ইন্ডেক্স (Gini Index) ছিল ৩৫.২, যেটা ২০১৮ সালে সাঙ্ঘাতিক মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪৭.৫, যা আফ্রিকা-র স্বৈরাচার ও সন্ত্রাসে দীর্ণ কয়েকটি সাব-সাহারান দেশের খুব কাছাকাছি! এটা খুবই চিন্তার ব্যাপার, কারণ একটা সমাজে এই মাত্রায় বৈষম্য বর্তমান থাকলে সেখানে গণতন্ত্র কখনও কার্যকর হতে পারেনা। হয় বৃহৎ কর্পোরেট সংস্থাগুলোর একচেটিয়া প্রবণতাকে খর্ব করে আরও ন্যায়সঙ্গত বন্টনের দিকে রাজনীতিকে এগিয়ে যেতে হবে, নয়তো সেই কর্পোরেট সংস্থাগুলোর আদেশ মেনেই তাদের স্বার্থরক্ষাকারী অর্থনৈতিক নীতি এবং রাজনৈতিক নিয়মকানুন চালু করতে হবে !
আমার কথা নিরাশাজনক মনে হতে পারে। আমাদের ঝলমলে পৃথিবীর একটা হাসিখুশী আর উজ্বল ছবি যদি আমি আঁকতে পারতাম তাহলে আমি নিজেই খুব খুশী হতাম ! আমার স্বপ্নের দিনগুলো আমি অনেক আগেই পিছনে ফেলে এসেছি। তবুও একটা আরও যুক্তিসঙ্গত এবং মানবিক পৃথিবী খুঁজে পাওয়ার ব্যাপারে আমি আশাবাদী ছিলাম ! কিন্তু তার বদলে আমরা পেলাম তিক্ততা আর দুঃখে ভরা, বিক্ষোভ পুঞ্জিভূত, অথচ সার্বজনীন মানবিক আদর্শ দ্বারা পরিচালিত কোনও রাজনৈতিক কন্ঠস্বরের অভাবপুষ্ট একটা পৃথিবী ! এছাড়াও, বিপুল পরিমাণে এবং তীব্র গতিতে প্রাকৃতিক সম্পদের শোষণ, বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইত্যাদির কারণে আমাদের সভ্যতার নিছক অস্তিত্বটাই এখন লাল সতর্কতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে। এই সঙ্কটপূর্ণ সন্ধিক্ষণে বিষণ্ণ হৃদয়ে দাঁড়িয়ে AI আর ML-এর জাদুর দুনিয়ার দিকে একবার তাকানো যাক এবং বোঝার চেষ্টা করা যাক যে বর্তমান প্রবণতা যদি চলতেই থাকে তাহলে তার স্বাভাবিক পরিণতি কিরকম হতে পারে !
AI-ML: উৎপত্তি এবং বিকাশ
ইলেক্ট্রনিক সার্কিটের মাধ্যমে কম্পিউটিং-এর শুরুর দিন থেকেই গবেষকরা কোনো যন্ত্রে গণনার মাধ্যমে মেধা (আর্টিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্স) আরোপের বিষয়টি নিয়ে চিন্তা ভাবনা শুরু করে দেন। কম্পিউটিং-এর প্রথম যুগ থেকেই একাধিক দূরদৃষ্টিসম্পন্ন গবেষক, যেমন – অ্যালান টিউরিং, অ্যালেন নিউওয়েল, হার্বার্ট সাইমন, জন ম্যাকার্থি, মারভিন মিন্স্কি এবং অন্যান্য অনেকেই স্বপ্ন দেখতেন যে মানুষের মতোই চিন্তা করতে, খেলা ধুলায় অংশ নিতে, রোগ নির্ণয় করতে এবং রোগীর চিকিৎসা করতে এমন নানা কাজ করতে পারবে যন্ত্র। ১৯৫৬ সালে USA-র ডার্টমাউথ কলেজের একটা ওয়ার্কশপে AI শব্দটা প্রথম উদ্ভাবন করেন জন ম্যাকার্থি। সেখানে গবেষণার একটা বিষয় হিসাবে স্বীকৃতি পায় AI। মেশিন লার্নিং বা যান্ত্রিক জ্ঞানাহরণ (ML) হল AI-এর একটা বিশেষ বিভাগ। এর উদ্দেশ্য কোনও কাজের জন্য নির্ধারিত একটা কম্পিউটার প্রোগ্রামের কার্যক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরও বেশী করে ইনপুট ডেটার সাথে কাজ করার অভিজ্ঞতাকে ব্যবহার করা। IBM-এর আর্থার স্যামুয়েল ১৯৫৯ সালে এই শব্দটা উদ্ভাবন করেন। এই বিষয়গুলো নিয়ে গবেষণা অনেক উত্থান-পতনের সাক্ষ্মী থেকেছে। অনেক আশার সাথে শুরু হলেও গত শতাব্দীর সত্তরের দশক ও আশির দশকের শুরুর দিকে প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা এবং বস্তুগত শর্তের (material condition) কারণে এই বিষয়ে গবেষণার অগ্রগতি কিছুটা থমকে যায়। পরবর্তীকালে, ডিজিটাল ও কম্পিউটিং প্রযুক্তির বিকাশ এবং ডেটা কমিউনিকেশান পরিকাঠামোর বিস্তারের সাথে সাথে এই বিষয়ে গবেষণার লক্ষ্যণীয় অগ্রগতি ঘটে। বিভিন্ন জটিল সমস্যা, যেগুলো চিরাচরিত কম্পিউটিং পদ্ধতির বিভিন্ন পূর্বনির্ধারক অ্যালগরিদ্ম (Deterministic algorithm) দিয়ে সমাধান করা কঠিন, সেগুলোর সমাধানের জন্য “সাপোর্ট ভেক্টর মেশিন”, “ডিসিসন ট্রি”, “র্যান্ডম ফরেস্ট”, “আর্টিফিসিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক”, “বেইসিয়ান নেটওয়ার্ক”, “হিডেন মার্কভ ও কন্ডিশানাল র্যান্ডম ফিল্ড ব্যবহৃত মডেল” ইত্যাদি বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহৃত হতে লাগল। ১৯৯৭ সালে IBM-এর দাবা খেলিয়ে কম্পিউটার প্যারালাল কম্পিউটিং চালিত AI-ভিত্তিক সার্চ প্রযুক্তি ব্যবহার করে দাবা খেলার তৎকালীন বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন গ্যারি কাস্পারভ-কে হারিয়ে দিতে পেরেছিল। ছয় গেমের একটা সিরিজে কম্পিউটার জিতেছিল তিনটে, হেরেছিল দুটো, এবং একটা গেম ড্র হয়েছিল। এক বছর আগে যদিও এই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন গ্র্যান্ড মাস্টার দাবা খেলার এই কম্পিউটার প্রোগ্রামের আগের ভার্সানকে হারিয়ে দিয়েছিলেন।
ডিজিটাল বিপ্লব পরবর্তী সময়ে এই সমস্ত বিষয়ের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দুই দিকেই সুস্থির বিকাশ ঘটে। এই পর্যায়ে প্রযুক্তিক্ষেত্রে গুগ্ল, ফেসবুক, ট্যুইটার, আমাজন ইত্যাদি নতুন পথপ্রদর্শকের আবির্ভাব ঘটে। এই সংস্থাগুলো তাদের পরিষেবা ব্যবহারকারীদের বিপুল পরিমাণ তথ্য জোগার করা শুরু করল। সেই তথ্যের বিপণনে তারা সম্পূর্ণ অন্য ধরণের একটা ব্যবসার ছক তৈরী করল, যাতে একদিকে ছিল সাধারণ ব্যবহারকারীদের জন্য কিছু পরিষেবা বিনামূল্যে প্রদান করার ব্যবস্থা, কিন্তু অন্যান্য ক্লায়েন্টদের (মূলত কর্পোরেট হাউস এবং সরকারী সংস্থা) থেকে বিজ্ঞাপনের বদলে এবং বিপনণ সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার বদলে তাদের থেকে অর্থ নেওয়ার ব্যবস্থা। এই ধরণের বিভিন্ন বিশেষ তথ্য সমৃদ্ধ ডেটা রিপোসিটরি যেমন স্যাটেলাইট ইমেজ, অনলাইন কেনাকাটা এবং ট্রেডিং সিস্টেম থেকে ব্যবসা-সংক্রান্ত তথ্য ইত্যাদি উপলব্ধ হওয়ায় এই প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়। এই বিপুল পরিমাণ তথ্য বিশ্লেষণ করে আরও বিভিন্ন ধরণের পরিষেবা বিপণনের বাজারে ক্রমাগতই হাজির হতে থাকল। এইসমস্ত প্রযুক্তি এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য AI এবং ML মুল হাতিয়ার হয়ে উঠল। এই দশকের শুরু থেকেই জেনারেল পারপাস গ্রাফিক্স প্রসেসিং ইউনিট (GPGPU)-ভিত্তিক কম্পিউটিং এর হাত ধরে ডিপ লার্নিং (Deep learning) ভিত্তিক প্রযুক্তির আবির্ভাব ঘটে। দেখা গেছে বিভিন্ন সমস্যার আরও উন্নত সমাধান প্রদান করছে এই নতুন প্রযুক্তি, এবং পরিণামে বাস্তব জীবনে সেইসব উদ্ভাবনের ব্যবহারও সম্ভব হয়ে উঠছে। ২০১৫ সালের পর থেকে ডিপ লার্নিং-ভিত্তিক নিউরাল আর্কিটেকচার ব্যবহার করে AI-ML প্রযুক্তি বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুরূহ সমস্যার সমাধানে অভাবনীয় সাফল্য এনে দিয়েছে, যেমন – ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং, অডিও-ভিসুয়াল এবং স্পিচ প্রসেসিং, কম্পিউটার ভিসন, রোবোটিক্স এবং বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্র যেখানে বিপুল পরিমাণ লেবেল্ড বা শ্রেণী-চিহ্নিত ডেটার উপস্থিতির পূর্বশর্তে একটা প্রসেসকে মডেল করার প্রয়োজন আছে। এখানে ধরে নেওয়া হয় যে এই বিপুল পরিমাণ ডেটা এই একই প্রসেস থেকেই তৈরী হয়। এই গোটা কম্পিউটিং বা পরিগণনার মধ্যে প্রধান বিষয়টা হল প্রায় লক্ষাধিক প্যারামিটার সমন্বিত একটা বিরাট বড় মডেলের ইনপুট আর আউটপুটের অবজেকটিভ ফাংশানের অপ্টিমাইজেশান। এই কারণে বিরাট পরিমাণ লেবেল্ড ডেটার প্রয়োজন, এবং প্রয়োজন একটা অত্যন্ত শক্তিশালী প্যারালাল কম্পিউটিং এনভায়রনমেন্ট যার মাধ্যমে পরিগণনার কাজটা একটা যুক্তিযুক্ত সময়ের মধ্যে শেষ করা যায় (কয়েক দিন না হলেও, অন্তত কয়েক সপ্তাহের থেকে বেশী হওয়াটা উচিত নয়!)। এই ধরণের পরিগণনার তত্ত্ব ও কৌশল গত শতাব্দীর আশির দশক থেকেই গড়ে ওঠে। ১৯৮৬ সালে ডেভিড রুমেলহার্ট, জিওফ্রে হিন্টন এবং রোনাল্ড উইলিয়াম্স আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্ক-এর অপ্টিমাইজেশান-এর জন্য ব্যাক প্রোপাগেশান অ্যালগরিদ্ম প্রণয়ন করেন। পরবর্তীকালে, ১৯৯০-এর দশকে ইয়ান লেকুন এবং তাঁর সহ-গবেষকেরা বস্তুর শ্রেণীবিভাগের (object classification) জন্য জীববিদ্যা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে কনভলিউশান নিউরাল নেটওয়ার্ক (CNN) এর ধারণার উদ্ভাবন করেন। কিন্তু তখন এই তত্ব ও কৌশল সেভাবে ব্যবহৃত হয়নি। কারণ বিপুল পরিমাণ লেবেল্ড ডেটাসেট পাওয়ার জন্য প্রযুক্তি এবং বস্তুগত শর্ত কোনওটাই তখন প্রস্তুত ছিলনা ! এর প্রায় দু-দশক পর ২০১২ সালে জিওফ্রে হিন্টন-এর তৎকালীন ছাত্র অ্যালেক্স ক্রিঝেভ্স্কি ‘অ্যালেক্সনেট’ নামে এক বহুস্তরীয় (Deep) নিউরাল আর্কিটেকচার প্রবর্তন করলেন। কিভাবে চিরাচরিত ML প্রযুক্তিগুলোর থেকে লক্ষ্যণীয় মাত্রায় অধিক নিখুঁতভাবে ১০০০ ধরণের বস্তুর ছবি (ইমেজনেট ডেটাসেট) শ্রেণীবিভক্ত করার মতো কঠিন সমস্যারও সমাধান সম্ভব তার পথপ্রদর্শক এই ‘অ্যালেক্সনেট’। এর ফলে ডিপ লার্নিং-এর ম্যাজিক বাক্সটা খুলে গেল এবং তারপর থেকে গবেষকরা এই ধরণের বিভিন্ন রকম নিউরাল আর্কিটেকচারের প্রস্তাব দিতে থাকলেন যেগুলো ঐ একই এবং অন্যান্য ডেটাসেটের উপর নিজেদের অধিক কার্যক্ষমতা প্রমাণ করল। এর ফলে বস্তুর স্থান নির্ণয় এবং শ্রেনীবিভাগ (object localization and classification), মুখমন্ডল সণাক্তকরণ (face recognition), কাজকর্ম সণাক্তকরণ (action recognition), ছবির শিরোনাম দেওয়া (image captioning), কোনও দৃশ্য থেকে তার বর্ণনা তৈরী করা, ভাষার অনুবাদ (language translation), কথা থেকে লেখা তৈরী (speech to text synthesis) ইত্যাদি বিভিন্ন কাজের সমাধান সম্ভব হয়ে উঠল। সত্যি বলতে, এই আলোচনার শুরুতে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় অনুবাদের যে স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রের কথা বলেছিলাম সেটা তৈরী করার ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তিটাই কাজে লেগেছে। এই ধরণের বহু অভাবনীয় উদ্ভাবন হয় ইতিমধ্যেই তৈরী হয়েছে বা অদূর ভবিষ্যতেই বিপণনের জগতে ঢুকে পরার অপেক্ষায় আছে। গাড়ি নিয়ে ঘোরার সময় বা রাস্তা দিয়ে হেঁটে ঘুরে বেরানোর সময় ম্যাপ ব্যবহার করে পথনির্দেশের সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে আমরা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি। কখনো কখনো আমরা কম্পিউটার বা মোবাইল ফোনে চ্যাট বট (chat bot)-এর সাথে কথা বলি যেগুলো আমাদের সমস্যার কথা জেনে সমাধানের চেষ্টা করে। এমনকি এই ধরণের টেক্সট্-ভিত্তিক ইন্টারফেসগুলোর বদলে কেবল স্বাভাবিক কথোপকথনের আজ্ঞাবাহী সিরি, অ্যালেক্সা ইত্যাদি নানান প্রযুক্তি উপলভ্য। চালকহীন স্বয়ংক্রিয় গাড়ী রাস্তায় বেশ অনেক মাইল পথ চলার পরীক্ষায় সফল হয়েছে। যদিও কিছু দুর্ঘটনা বা সমস্যার সৃষ্টিও হয়েছে, তবুও আশা করা যায় যে কিছু বছরের মধ্যে এই ধরণের গাড়ী আমাদের রাস্তাঘাটে চলবে। দ্রোন-ভিত্তিক সামগ্রী বিলি সরবরাহ করার ব্যবস্থা এবং নজরদারি ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যেতে পারে। মহানগরের আকাশপথে এয়ার-ট্যাক্সিকেও হয়তো এই দশকেই উড়তে দেখা যাবে। সমাজ জীবনের প্রতিটা ক্ষেত্রে আমরা এমন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা দেখতে পাবো যা সেই ক্ষেত্রে একজন বুদ্ধিমান পেশাদার ব্যক্তির মতোই কাজ করবে। উদাহরণ স্বরূপ বলা যেতে পারে যে হাসপাতালে বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের সাথে দেখা করার আগে আমাদের প্রাথমিক দেখাশোনাটা হয়তো করবে কোনো রোবোট-চিকিৎসক। বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে হয়তো একটা অপটিকাল ক্যারেক্টার রিকগনিশান (OCR) এবং ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (NLP)-ভিত্তিক ব্যবস্থা একাধিক কাগজপত্র থেকে মামলার একটা সংক্ষিপ্ত বিবরণী তৈরী করে দেবে একজন আইনজীবীর কাছে।
ভবিষ্যৎ বেশ রোমাঞ্চকর বলেই মনে হয় ! অতীতের কল্পবিজ্ঞানের বইগুলোর পাতা উল্টালে আমরা প্রায় সেখানেই নিজেদের খুঁজে পাবো ! তবে এর পাশাপাশি অন্য এক অশনি সঙ্কেতও চোখ রাঙ্গাচ্ছে। এর একদিকে আছে পরিবেশ বিজ্ঞানীদের তরফ থেকে জানানো শেষের সে দিনের বারতা যা কোনমতেই শাস্ত্র কথার আপ্তবাক্য নয়, আর অন্যদিকে বর্তমান পৃথিবীর শাসকদের মধ্যে অস্ত্র প্রতিযোগিতা আর পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত হওয়ার তীব্র আকাঙ্খা - এই মানবসভ্যতা ও প্রজাতির অস্তিত্বের সঙ্কট ক্রমশই তীব্র হচ্ছে। নিঃসন্দেহে AI-ML প্রযুক্তি আমাদের সভ্যতার বিকাশে ও সমাজের সার্বিক কল্যাণে বিপুল সম্ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই প্রযুক্তি ব্যপকভাবে যুদ্ধপ্রেমীদের স্বার্থ রক্ষা করে চলেছে এবং তাদের তাসের ঘর অক্ষত রাখতে তাদের নিজ নিজ অস্ত্রাগারকে আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
ব্যক্তিমানুষের উপর শাসন
আধুনিক ডিজিটাল বিশ্বের একটা মূলমন্ত্র হল চূড়ান্ত ব্যক্তিবাদের লালনপালন। এমনকি একজন ব্যক্তিমানুষ যে সমাজে বাস করেন সেই সমাজ থেকে তাকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করে দেয়ার ক্ষমতাও রাখে এই প্রযুক্তি। একজন ব্যক্তিমানুষকে তার অজ্ঞতা থেকে মুক্তি দিতে গোটা বিশ্বকে তার দোরগড়ায় এনে যে প্রযুক্তি একটা ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করতে সক্ষম, সেই প্রযুক্তিই আবার তাকে একটা ঝলমলে কৃত্রিম দুনিয়াতে কার্যত বন্দীও করে রাখতে পারে। নির্মাণ শিল্প ও উৎপাদন ক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়তার (Automation) আগমনে, এবং ছোটোখাটো, বহন করতে সুবিধাজনক অথচ শক্তিশালী সরঞ্জাম আর যন্ত্রপাতি উপলব্ধ হওয়াতে শিল্পে সংগঠিত শ্রমের প্রয়োজনীয়তা ভীষণভাবে কমেছে। ঘর থেকে কাজ করার ব্যবস্থা, স্থায়ী চাকরিকে অস্থায়ী চাকরি দিয়ে প্রতিস্থাপিত করা, একাধিক-স্তরে বিস্তৃত সাবকনট্র্যাক্টিং ব্যবস্থার মাধ্যমে বড় ব্যবসা চালানো ইত্যাদির প্রবণতা শিল্পক্ষেত্রে স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। এই একই সময়ে আবার অপরিহার্য পরিষেবা এবং সম্পদের অবাধ বেসরকারীকরণের পথ প্রস্তুত করে দেওয়া নয়া-উদারনৈতিক নীতি নির্ধারকদের আক্রমণে সমাজকল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা (social welfare states) ভেঙ্গে পড়ছে। পরিণামে বিপুল সংখ্যক জনগণের মধ্যে কেবলমাত্র একটা ছোট্টো অংশ – যেমন বড় বড় ব্যবসায়ী এবং কর্পোরেট সংস্থার মালিকেরা - প্রায় সমস্ত সম্পদ কুক্ষিগত করছে। স্বাভাবিকভাবেই, গোটা পৃথিবী জুড়েই সমাজে উত্তেজনা এবং বিক্ষোভের আগুন ধিকিধিকি জ্বলছে। এই অবস্থায় একজন ব্যক্তিমানুষকে শাসন করার উপায় হিসাবে সমাজের শাসকদের হাতে একটা বিরাট অস্ত্রে পরিণত হয়েছে AI-ML প্রযুক্তি। আজকের পৃথিবীতে আমরা যদি AI-ML প্রযুক্তির কয়েকটা বহুল ব্যবহারের নাম করি, তাহলে সবার আগে প্রথমেই বলতে হবে এই নজরদারির কথা। তথ্যের অধিগ্রহণ এবং তারপর তাকে ব্যবসায়িক কাজে ব্যবহার করা এইসমস্ত বিষয়ে কোনও রকম আইনকানুন বা নিয়ন্ত্রণ না থাকায় বিভিন্ন পরিষেবা গ্রাহকদের প্রোফাইলিং করাটা বড় বড় কর্পোরেশানগুলোর একটা সাধারণ ব্যবসায়িক কৌশলে পরিণত হয়েছে। পরবর্তীকালে, পশ্চিমের কিছু দেশে এই ব্যাপারে কিছু নিয়মকানুন চালু হয়। তবে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু স্বল্পপরিমাণ জরিমানা দেওয়ার ঝুঁকি নিয়ে এই নিয়মকানুন লঙ্ঘন করা হয়েছে। কিছুক্ষেত্রে পরিষেবা ব্যবহার করার জন্য গ্রাহকদের তাদের ব্যক্তিগোপনীয়তার সীমানা লঙ্ঘনের অনুমতি দিতে এবং পরিষেবা প্রদানকারী সংস্থার হাতে নিজেদের ব্যক্তিগত তথ্য তুলে দিতে উৎসাহ প্রদান করা হয়েছে বা বাধ্য করা হয়েছে। এইভাবে কার্যত তারা নিজেদেরকে ডেটা পণ্যে পরিণত করেছে। অনেক সরকারই ডিজিটাল পরিচিতি গ্রহণ করার ব্যাপারে এবং অনলাইন বিনিময়ের (Transactions) মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পরিষেবা গ্রহণ করার ব্যাপারে নাগরিকদের উপর প্রতিনিয়ত চাপ সৃষ্টি করছে। নিজেদের ডিজিটাল পদচিহ্নের মাধ্যমে জনগণ খুব সহজেই রাষ্ট্রের নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় চলে আসে। বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে জনগণের উপর নজর রাখা হবে যাতে কোনও রকম প্রতিষ্ঠান বিরোধিতার ক্ষেত্রে সহজেই কোনও ব্যক্তিমানুষকে চিহ্নিত করা যায়। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার নজরদারি সংস্থা এবং স্বৈরাচারীদের পরিষেবা প্রদান করার জন্য এভাবেই AI-ML প্রযুক্তিকে কাজে লাগানো হচ্ছে। বিরুদ্ধ মত পোষণকারী কোনও একক কন্ঠস্বরকে চিহ্নিত করা এবং ইচ্ছামতো সেই কন্ঠস্বরকে দমন করার ব্যাপারে এই প্রযুক্তি বেশ ভালোভাবেই সাহায্য করতে সক্ষম। আজকের সংঘর্ষ কবলিত পৃথিবীতে সন্ত্রাসবাদ এবং নৈরাজ্যবাদের বিস্তারের কারণে শাসকরা খুব সহজেই তাঁদের নাগরিকদের বুঝিয়েসুঝিয়ে এই নজরদারি ব্যবস্থার আওতায় আনতে পেরেছে। ইন্টারনেট পরিষেবা প্রদানকারী বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে পরিষেবা ব্যবহারকারীদের প্রোফাইলিং এবং আইনের মাধ্যমে সরকারী সংস্থার সাথে তথ্য ভাগ করে নেওয়া ছাড়াও সারা পৃথিবী জুড়ে জায়গায় জায়গায় ভিডিও নজরদারি (Video Surveilance) ব্যবস্থা লাগু হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এই ভিডিও নজরদারি ব্যবসার দিকে তাকালে আমরা এর একটা সুস্থির বিকাশের ছবি দেখতে পাবো। ২০১৪ সালে পৃথিবীর প্রতি ৩০ জন মানুষের জন্য একটা করে CCTV নজরদারিতে নিযুক্ত ছিল। আমার কাছে সাম্প্রতিক কোনও তথ্য নেই, তবে এই ধরণের নজরদারি ব্যবস্থার সংখ্যা যদি আজ দ্বিগুণও হয়ে গিয়ে থাকে তাহলেও আমি অবাক হবনা।
আমাদের সমাজের রূপান্তর
AI-ML প্রযুক্তি এক নতুন শিল্প-বিপ্লবের সূচনা করেছে এমন একটা মূল্যায়ন এই মুহুর্তে করাটা হয়তো কঠিন হবে, তবে একটুও ইতস্তত না করে আমরা বলতেই পারি যে যেসমস্ত সামাজিক রীতিনীতি এবং আদানপ্রদানের আঙ্গিকের উপর নির্ভর করে এখন আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পরিষেবা ভোগ করি সেগুলো আগামী বছরগুলোতে আমূলভাবে পরিবর্তিত হবে। বিভিন্ন কাজকর্ম এবং বিনিময়ের জন্য স্ব-সেবিত (Self-seving) কিয়স্ক-এর ব্যবস্থা থাকবে ভবিষ্যতে। এই ধরণের কিছু ইতিমধ্যেই এয়ারপোর্ট, রেলওয়ে কাউন্টারে আমরা দেখতে পাচ্ছি। মানসিক এবং বুদ্ধিগত শ্রম-নির্ভর কাজের ক্ষেত্রেও এগুলো বিস্তৃত হবে। যেমন – জাপান-এ স্কুল, হাসপাতাল ইত্যাদি বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বিভিন্ন রকমের রোবোটের ব্যবহার প্রতিনিয়ত বেড়েই চলেছে। কোনও এলাকার পর্যায়ক্রমে পরিদর্শনের কাজে মানব নিরাপত্তা কর্মীর বদলে এই ধরণের রোবোটের ব্যবহার হচ্ছে। বয়স্ক মানুষদের জন্য বিভিন্নরকম গৃহস্থালীর পরিষেবা প্রদান করার জন্যও রোবোট বানানো হচ্ছে। শিল্পক্ষেত্রও বিভিন্ন ধরণের রোবোটের মাধ্যমে প্রতি মুহুর্তে আরও বেশী করে স্বয়ংক্রিয়করণের (Automation) দিকে ঝুঁকছে। বিভিন্ন অর্থনৈতিক রিপোর্টে প্রকাশিত যে অদূরভবিষ্যতে চাকুরীক্ষেত্রের বহু কাজ বিলুপ্ত হতে চলেছে।
এমনকি উচ্চমানের পেশাদারী কাজগুলোও ভবিষ্যতে প্রতিস্থাপিত করতে পারে রোবোট আর সাইবর্গ। হাসপাতালে হয়তো আপনাকে প্রথমে একটা সাইবার-ডাক্তারের কাছে রিপোর্ট করতে হবে। ক্লাসরুমে মানব-শিক্ষকের স্থান নেবে সাইবার-ইন্সট্রাকটর, যারা ভিডিও লেকচার বা বিশেষজ্ঞদের তৈরী করা জ্ঞানভান্ডার (knowledge base) থেকে অনলাইন বিষয়বস্তুর মাধ্যমে ক্লাস নেবে। এমনকি সাংস্কৃতিক জগতেও নির্দেশক এবং পরিচালকরা খরচ বাঁচাতে মানব-শিল্পীর বদলে বেছে নেবেন রোবোট শিল্পী। একজন সঙ্গীত-বিশেষজ্ঞ বা সুরকারের সমান দক্ষতাসম্পন্ন এক রোবোট সঙ্গীতস্রস্টা হয়তো নতুন নতুন জনপ্রিয় সুর সৃষ্টি করবে। খেলাধুলার জগতে বিভিন্ন রোবোট দল একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করবে। এটা ঠিক যে এগুলো প্রধানত মানুষের বুদ্ধিমত্তারই ফলশ্রুতি, কিন্তু একটা বাজার-কেন্দ্রিক অর্থনীতিতে তারা ক্রমেই মানুষকেই ব্রাত্য করে দেবে।
যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং বাণিজ্যের পরিকাঠামোতে আগামী বছরগুলোতে অনেক পরিবর্তন আসবে। প্রযুক্তির নিত্যনতুন অগ্রগতিকে সমাজজীবনে আবশ্যিক করে তোলার জন্য নতুন নিয়মকানুন এবং নিয়ন্ত্রণবিধি তৈরী হবে। রাস্তায় স্বয়ংক্রিয় গাড়ীর চলাচল শুরু করতে রাস্তা, সিগনালিং এবং ট্রাফিক-সংক্রান্ত নিয়মকানুনের পরিবর্তন আনা হবে। পণ্যদ্রব্য সরবরাহের জন্য ব্যবহৃত হবে দ্রোন এবং আকাশপথে চলা যানবাহন। রাস্তাঘাটে পুলিশের কাজকর্ম এবং জনগণকে নিয়ন্ত্রণ করার কাজে থাকবে বিভিন্নরকম স্বয়ংক্রিয় নজরদারি ব্যবস্থা এবং পদাতিক রোবোটের শাসন। বিমানে ওড়ার আগে এয়ারপোর্টে স্বয়ংক্রিয় ব্যক্তিমানুষের পরিচিতি যাচাইয়ের কাজে ছবিসমেত আইডেন্টিটি কার্ডকে মেলাতে মুখমন্ডলও স্ক্যান করা হতে পারে। এমনকি ব্যাঙ্কিং, ভ্রমণ, কেনাকাটা, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ইত্যাদি জরুরী পরিষেবা পাওয়ার জন্য মানুষজনকে হয়তো নিজেদের মুখমন্ডল, আঙ্গুলের ছাপ, DNA ইত্যাদি বায়োমেট্রিক স্বাক্ষর প্রদান করতে হবে এবং কদিন অন্তর অন্তর সেগুলো কোনো ইলেক্ট্রনিক তথ্যভান্ডারে আপডেট করাতে হবে। এই ধরণের ডিজিটাল পরিচিতি ছাড়া একজন ব্যক্তি সমাজে অপাংক্তেয় হয়ে যাবে। ব্যবসার জগতে ব্যক্তিবিশেষের ডিজিটাল পরিচিতিও পণ্য হয়ে উঠবে। একজনের পরিচিতিকে চুরি করার জন্য এবং সুরক্ষিত রাখার জন্য একাধিক প্রযুক্তি এবং পালটা-প্রযুক্তি তৈরী হবে।
আমরা দেখতে পাচ্ছি যে বর্তমান পৃথিবীতে কিভাবে ডিজিটাল প্রযুক্তির অগ্রগতি যুদ্ধের প্রকৃতির পরিবর্তন ঘটিয়েছে এবং প্রযুক্তির দিক থেকে উন্নত আর পিছিয়ে থাকা দেশগুলোর মধ্যে একটা বিস্তর ব্যবধান তৈরী করেছে। প্রথম উপসাগরীয় যুদ্ধে (১৯৯০-৯১) (Gulf war) যেটা পরীক্ষামূলক প্রয়োগ ছিল সেটাই আধুনিক যুদ্ধবিগ্রহের ক্ষেত্রে নিয়মিত ব্যাপারে পরিণত হয়েছে এবং সংঘর্ষ কবলিত এলাকায় জনগণের চরম দুর্দশার সৃষ্টি করছে। নিজেদের ধ্বংস হয়ে যাওয়া ঘরবাড়ি এবং বিধ্বস্ত জমিজমা ছেড়ে অন্য দেশের অপেক্ষাকৃত সুরক্ষিত অংশে চলে যাওয়া ছাড়া পরাজিত দেশগুলোর জনগণের কাছে আর কোনও উপায় থাকছেনা। বিশ্বজুড়ে যুদ্ধের কারণে শরণার্থীদের অভিগমন (migration) এবং অর্থনীতির ভেঙে পড়াই আজকের দিনের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। AI এবং ML প্রযুক্তিতে সাম্প্রতিক বিকাশ বর্তমান পরিস্থিতির কোনও পরিবর্তন আনতে পারেনি। অবশ্য এমনটা প্রত্যাশাও করা উচিত নয়। কারণ কেবলমাত্র প্রযুক্তি কখনও এককভাবে কোনো রাজনৈতিক সমাধানে সক্ষম নয়। বরং উল্টে সেটি শাসকদের কর্তৃত্ব বিস্তারের আরেকটা হাতিয়ারে পরিণত হয়। এই প্রযুক্তির ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে শাসকশ্রেণীর সাঁজোয়াতে আরও বেশী অস্ত্র মজুত থাকবে। তাদের সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হবে রোবট সেনানী। সেই দিন আর বেশী দূরে নেই যেদিন যুদ্ধক্ষেত্রে মানুষ আর যন্ত্র একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে। আমরা ইতিমধ্যেই দেখেছি বিনামেঘে বজ্রপাত যেমন ঘটে তেমনভাবেই স্যাটেলাইট মারফৎ পাওয়া উন্নতমানের ছবি এবং দূরবর্তী স্থান থেকে নিয়ন্ত্রিত পথনির্দেশ (Navigation) দ্বারা নিখুঁতভাবে আঘাত হেনে সভ্য দুনিয়ার নীতি-নিয়মের তোয়াক্কা না করে কিভাবে একটা দেশের জেনারেলকে হত্যা করা যায়! মহাকাব্য মহাভারতে বর্ণিত আছে কীভাবে যুযুধান দুইপক্ষের যুদ্ধে অভিমন্যুর মৃত্যু সেই পৌরাণিক যুগে যুদ্ধক্ষেত্রে স্বীকৃত সৌজন্যতা ও নৈতিকতার সীমানা লঙ্ঘন করেছিল। এরপর সে যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল আরও মর্মান্তিক ও নিষ্করুন। একবিংশ শতাব্দীতে এই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা হয়তো তেমনি কোন যুদ্ধের নতুন রীতিনীতি সমেত আমাদের এমন এক যুগের দিকে ঠেলে দিল যা গোটা মানবজাতির জন্যই ভয়ঙ্কর !
উদ্বেগ এবং আশা
প্রযুক্তির যেকোনো নতুন অগ্রগতিই আমাদের জীবনকে আরও সুখ ও স্বাছন্দ্যে ভরিয়ে দেওয়ার নতুন আশা-আকাঙ্খা নিয়ে আসে। প্রকৃতি এবং জীবজগৎ সম্বন্ধে আমাদের নতুন উপলব্ধি এবং বিভিন্ন কঠিন ও জটিল সমস্যা সমাধানে সেই জ্ঞানের প্রয়োগের দ্বারা আমরা ভাবী অনিশ্চয়তা ও সঙ্কটের মোকাবিলা করার জন্য আরও ভালভাবে প্রস্তুত থাকি। আমাদের জীবন এবং সমাজের কল্যাণে AI-ML ভিত্তিক প্রযুক্তির যথেষ্ট সামর্থ্য আর সম্ভাবনা আছে। মানুষের হিতসাধনে তার ভূমিকার একাধিক প্রমাণ ইতিমধ্যেই আমরা পেয়েছি। বিভিন্ন মারণরোগের চিকিৎসার জন্য নতুন ওষুধ আর টীকা-প্রতিষেধক (Vaccine) আবিষ্কারকে ত্বরাণ্বিত করেছে এই প্রযুক্তি। সামাজিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তি শুধু যে দূরত্ব আর সময়ের প্রতিবন্ধকতাকে দূর করেছে তা নয়, তার সাথে ভাষা, শারীরিক অক্ষমতা, এবং আরও অন্যান্য কঠিন প্রতিবন্ধকতাকেও দূর করেছে। আরও সূক্ষ্মভাবে আর নিখুঁতভাবে আবওহাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়ার ফলে আরও ভালোভাবে সংগঠিত করে, পরিকল্পনা করে বিভিন্ন কাজকর্মের আয়োজন করা সম্ভব হয়েছে। বিভিন্ন কঠিন সমস্যা যেমন বিশ্ব-উষ্ণায়ণের আসন্ন সঙ্কট, খনিজ তৈলের উপর নির্ভরতা, পানীয় জলের ক্রমহ্রাসমান ভাণ্ডার ইত্যাদির সম্মুখে ইতিবাচক ভূমিকা গ্রহণ করার ক্ষমতা আছে এই AI এবং ML প্রযুক্তির।
কিন্তু কঠিন বাস্তবটা হল প্রযুক্তির এই সমস্ত অগ্রগতি হওয়া সত্ত্বেও আমাদের সমাজের বিশৃঙ্খলা এবং নৈরাজ্য ক্রমে বেড়েই চলেছে। আমরা খেয়াল করলে দেখতে পাবো যে প্রযুক্তির অগ্রগতিতে একটা চালিকা শক্তি হিসাবে AI এবং ML-এর আবির্ভাবের সাথে সাথে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এই ধরণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। এটাকে নিছক ঘটনার সমাপতন ভাবলে চলবেনা। বরং এই বিশৃঙ্খলা আমাদের সভ্যতার ভবিষ্যৎকে নানা প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। AI-ML-এর যাদু দুনিয়ার অমোঘ আকর্ষণের এই মুহূর্তে এই প্রশ্নগুলি মোটেই উপেক্ষেনীয় নয়।
এই উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে একটা হল সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার ও তার উপর নির্ভরশীলতা। সাইবর্গ এবং স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার উপর অন্ধবিশ্বাস মানুষকে আরও যুক্তিহীন করে তুলবে। দর্শনের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় যে কোনো বিতর্ক বা প্রস্তাবনার (Hypothesis) মীমাংসার ক্ষেত্রে যুক্তির উপরেও প্রাধান্য বিস্তার করবে অভিজ্ঞতাবাদ (Empiricism)। প্রযুক্তির অগ্রগতিতে মেশিন লার্নিং (ML)-এর প্রাধান্য এই চিন্তাভাবনাকে সুদৃঢ় করবে। কোন সমস্যার সামগ্রিক বিচার ও পরিপ্রেক্ষিত অবহেলিত হবে এবং যুক্তিযুক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে সরল সাধারণীকরণ (Trivial generalization)। পরিণামে জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির পথটাই রুদ্ধ হবে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও আমরা এই প্রবণতা লক্ষ্য করতে পারি। আমাদের শিক্ষাজগতে প্রায়ই প্রার্থী বাছাই এবং নির্বাচনের সময় প্রার্থীর গবেষণাতে অবদানের তুলনায় তার সাইটেশান সংখ্যা, বিশিষ্ট জার্নাল এবং কনফারেন্সে প্রকাশিত গবেষণা নিবন্ধের সংখ্যা ইত্যাদিকে বেশী প্রাধান্য দেওয়া হয়ে থাকে। বিভিন্ন স্বয়ংক্রিয় ইন্ডেক্সিং ডেটাবেসের রিপোর্টে লক্ষ্যণীয় মাত্রায় ভুলভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও এতটুকু ইতস্তত বোধ না করে সেগুলোকেই এই ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময় বিবেচনা করা হয়। ML-এর এই অভিজ্ঞতাবাদী দর্শনের আরেকটা সমস্যা আছে। জ্ঞান আহরণের ইনপুট ডেটা-র বিদ্যমান বৈশিষ্ট্যকে অপরিবর্তনীয় হিসাবে গ্রহণ করা হয়। কার্যত এই প্রযুক্তি আমাদের সমাজের মধ্যে বিদ্যমান পক্ষপাতিত্বকেই বৈধতা প্রদান করে। সেই কারণে বর্তমান সামাজিক অবস্থায় সমাজের বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত অংশটাই এই প্রযুক্তির সুফলের বেশি ভাগীদার।
স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কার্যপদ্ধতির উপর অন্ধবিশ্বাসের প্রাণঘাতী উদাহরণগুলোর একটা হল US বহুজাতিক সংস্থা বোয়িং-এর তাদের নতুন এয়ারক্র্যাফ্ট মডেল বোয়িং ৭৩৭ ম্যাক্স-এ ম্যানিউভারং ক্যারেক্টারিস্টিক্স অগমেন্টেশান সিস্টেম (MCAS) নামে একটা নতুন স্বয়ংক্রিয় দিকনিয়ন্ত্রনের যন্ত্রাংশের ব্যবহার। ২০১৮ সালের ২৯-এ অক্টোবর ইন্দোনেশিয়া-তে এবং ২০১৯ সালের ১১-ই মার্চ কেনিয়া-তে পরপর দুটো বিমান দুর্ঘটনার কারণ হিসাবে চিহ্নিত হয়েছে বোয়িং-এর এই যন্ত্রাংশের ঠিকমত কাজ না করা। বিমান যাতে বেশী উচ্চতায় না উঠে গিয়ে থেমে যায়, তার জন্য এটি স্বয়ংক্রিয় ভাবে বিমানের মুখকে প্রয়োজনানুযায়ী নিম্নাভিমুখী করে। এই যন্ত্রাংশের সঠিক কার্যকারিতার ব্যাপারে এই সংস্থাটা এতটাই আত্মবিশ্বাসী ছিল যে এই বৈশিষ্ট্যের কথা তারা প্রথমে যথেষ্ট স্বচ্ছতার সাথে নিয়ন্ত্রকদের (regulators) জানায়নি। প্রথম দুর্ঘটনার আগে তাদের বিমানচালনার নির্দেশনামায় (manual) উড়ানকালে এই সিস্টেমের কোনোরকম ব্যর্থতা বা ত্রুটি দেখা দিলে পাইলটদের কি করনীয় সে ব্যাপারে কোনো উল্লেখ ছিলনা। এমনকি প্রথম দুর্ঘটনার পরেও এই ব্যর্থতাকে তারা পুরোপুরি স্বীকার করেনি। এটিকে ব্যতিক্রমী বিরল ঘটনা হিসাবে ধরা হয় এবং এর মোকাবিলায় বিমান চালকদের কিছু প্রতিকারমূলক পরামর্শ দেওয়া হয়। সেই সময় এই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপর বোয়িং যদি নিজেদের আত্মবিশ্বাস এবং ভরসাকে ত্যাগ করত, এবং খোলা মনে দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধান করত, তাহলে কেনিয়া-তে ঘটা দ্বিতীয় দুর্ঘটনাটা হয়তো এড়ানো যেত !
আরেকটা চিন্তার ব্যাপার হল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার মাধ্যমে নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের দায় যে কার তার নির্দিষ্টতার অভাব। শেষ অবধি এর শিকার হন পরিষেবা ব্যবহারকারী বা ক্রেতারা। দেখা গেছে এই ধরণের ব্যবস্থায় কোনও রকম গন্ডগোল দেখা গেলে, তা সে যত গুরুতর গন্ডগোলই হোক না কেন, অপারেটর বা ইম্প্লিমেন্টাররা তার কোনও রকম দায় নেয়না। এমনকি দায় চাপানোর ব্যাপারেও যে স্বচ্ছতা থাকা দরকার সেটাও মেলেনা। এর ফলে ক্রেতাদের অভিযোগের প্রতিকার করা এবং প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করার ব্যাপারগুলোর মধ্যে অনেক জটিলতার সৃষ্টি হয়। পূর্বোল্লিখিত বোয়িং প্লেন দুর্ঘটনার দুর্ভাগ্যজনক ঘটনাদুটো এটাও দেখিয়ে দেয় যে এইসমস্ত ক্ষেত্রে কোনও একজন ব্যক্তি বা সংস্থাকে দায়ী করাটাও কতটা কঠিন। প্রথম কিছু মাস বিমান সংস্থা এবং তাদের সমর্থকেরা বিমানচালক এবং এয়ারলাইনের উপর দায় চাপানোর যাবতীয় চেষ্টা করেছিল। বিমান ভ্রমণের নিরাপত্তা এবং পরপর ঐ একই মডেলের বিমানের দুর্ঘটনার ফলে বিশ্বব্যাপী যে উদ্বেগ তৈরী হয়েছিল তার চাপে এই সংস্থা শেষ পর্যন্ত পিছু হঠে এবং নিজেদের নকশায় (Design) যান্ত্রিক গোলোযোগের বিষয়টা স্বীকার করে।
উদ্বেগের এই তালিকার শেষ অথচ অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হল বেকারত্ব। AI-ML এর প্রভাবে বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ যুগে জনগণের মধ্যে বেকারত্বের চিত্র বুঝে নেওয়ার প্রয়োজন আছে।চাকরি ধ্বংসের বিবর্ণ ছবিটা এখনি আমাদের সামনে যথেষ্ট পরিষ্কার। কিন্তু ভবিষ্যতের শিল্পগুলিতে নতুন চাকরি কিরকম হারে তৈরী হবে সেটাই দেখার। পূর্বের শিল্প বিপ্লবগুলোর ক্ষেত্রেও এই উদ্বেগ সবসময়ই মাথাচাড়া দিয়ে উঠত। কিন্তু নতুন চাকরির আবির্ভাবের সাথে নতুন কর্মীবাহিনীও তৈরী হয়েছিল। প্রযুক্তিক্ষেত্রে নতুন অগ্রগতির জন্য দরকার বেশী করে শিক্ষিত এবং দক্ষ শ্রমিকদের অংশগ্রহণ, কায়িক এবং বৌদ্ধিক শ্রম উভয়েরই। একটা কারখানায় স্বয়ংক্রিয়তা যেমন অনেক কায়িক শ্রমের চাকরিকে ধ্বংস করে, তেমনি আবার আনুষঙ্গিক শিল্পও তৈরী করে যেখানে নতুন দক্ষ শ্রমিকের দরকার হয়। কিন্তু এই সহস্রাব্দের শুরু থেকেই ডিজিটাল বিপ্লবোত্তর বিশ্বে প্রতিনিয়ত এটা আরও স্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে যে স্বয়ংক্রিয়তার জন্য উৎপাদনশীলতা যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, চাকরির বৃদ্ধির সংখ্যা সে হারে নয়। এই দুয়ের ব্যবধান ক্রমবর্ধমান। ২০১১ সালে MIT স্লোয়ান স্কুল অফ ম্যানেজমেন্ট-এর ব্রিঞ্জল্ফসন এবং অ্যান্ড্রিউ ম্যাকাফে নিজেদের বই “রেস এগেইন্সট দি মেশিন”-এ দেখিয়েছেন যে কিভাবে USA-তে AI-ML প্রযুক্তির হাত ধরে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, কিন্তু চাকরি বৃদ্ধির হারটা থমকে যাচ্ছে। বিগত শতাব্দীগুলোতে ঘটা শিল্পক্ষেত্রে স্বয়ংক্রিয়তা এবং AI-ML-এর মাধ্যমে অর্জিত স্বয়ংক্রিয়তার মধ্যে পার্থক্যটা এই যে দ্বিতীয়টা কায়িক শ্রমের অনেক চাকরিকে প্রতিস্থাপিতই শুধু করবে না, তার সাথে অনেক বৌদ্ধিক চাকরিও ছিনিয়ে নেবে। এই ধরণের একটা পরিস্থিতিতে মূলত দুই প্রকারের কর্মীবাহিনীর প্রয়োজন হবে। এর পুরোভাগে থাকবে মুষ্টিমেয় বিশেষজ্ঞের দল - স্বাভাবিকভাবেই যাদের সংখ্যা হবে অনেক কম। আর অন্যভাগে এক বিপুল সংখ্যক কর্মী পরিষেবা ক্ষেত্রের সাথে যুক্ত থেকে তাদেরকে সাহায্য করবে। কিন্তু আশঙ্কা এই যে আরও অনেক বেশী সংখ্যক জনগণ বেকার বা আধা বেকার হয়েই থাকবে। পরিণামে শুধু যে এই দুই অংশের মধ্যে উপার্জনের বৈষম্য তৈরী হবে তা নয়, তার সাথে এটা এমন একটা পরিস্থিতির দিকে আমাদের ঠেলে নিয়ে যাবে যেখানে স্বল্প আয়-সম্পন্ন বিপুল জনসাধারনের কাছে উচ্চশিক্ষার সুযোগটাও আর থাকবেনা। উচ্চশিক্ষা শুধুমাত্র আর্থিকভাবে স্বচ্ছল একটা ছোট্টো অংশের আওতাতেই থাকবে এবং এই সামাজিক বৈষম্য বজায় রাখার একটা হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হবে। সমাজে প্রভু-ভৃত্য সম্পর্ক পরিব্যপ্ত হবে। এই ব্যবস্থায় সমাজে দুই স্তরের মানুষ থাকবে। এক স্তরে রইবে প্রায় সমস্ত সামাজিক সম্পদের মালিকেরা এবং তাদের ছায়াসঙ্গীরা, যারা সমাজের মধ্যে ধনী আর গরীবের মধ্যে বিভেদটাকে আরও বাড়াবে। এরা সংখ্যায় হবে অত্যন্ত কম। আর সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ ভৃত্যের স্তরে জীবনযাপন করবে! অর্থাৎ প্রযুক্তির এই অগ্রগতির শুরুতে আমরা এর যা ফলশ্রুতি আশা করেছিলাম, বাস্তবে হবে তার ঠিক বিপরীত! অনেক আশা নিয়ে আমরা ডিজিটাল বিপ্লবকে সাদরে বরণ করেছিলাম, এই ভেবে যে এই বিপ্লব একজন ব্যক্তিমানুষকে তার নিজস্ব কূপমন্ডুকতা থেকে বেড়িয়ে আসতে সাহায্য করবে। কিন্তু প্রযুক্তির এই নতুন অগ্রগতিতে এবং তার নজরদারির বহু-বিস্তৃত জটাজালে স্বাধীনতা এবং মুক্তির ধারণা সেই অতীতের ছায়ার মতই ম্লান রইবে! এই পরিস্থিতিতে আমরা হয়তো সমাজ বিকাশের মার্ক্সবাদী বিশ্লেষণের একটা ব্যতিক্রম দেখতে পাবো, যেখানে পুঁজিবাদ আমাদের এগিয়ে নিয়ে যাবে একটা দাস সমাজের দিকে !
স্বাভাবিকভাবেই প্রভুদের জলসার এ আয়োজন নির্বিঘ্ন হবেনা! এই রূপান্তরের সময় বিভিন্ন দিক থেকে প্রতিরোধ আসবে। প্রতিক্রিয়ায় রাষ্ট্র আরও স্বৈরাচারী চরিত্র ধারণ করে জর্জ অরওয়েল বর্ণিত এক দমন-নিপীড়ন-সন্ত্রাস কবলিত (Dystopian) সমাজের দিকে এগিয়ে যাবে। তাও আমাদের একমাত্র আশা জনগণের এই প্রতিরোধ, যেমনটা আজ আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন কোণে দেখতে পাচ্ছি। স্বৈরাচারী শাসন আর নিপীড়ণের বিরুদ্ধে এই প্রতিরোধ প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাবে এবং আমরা আশা করব যে একদিন একটা রাজনৈতিক আকার নিয়ে এই প্রতিরোধের ঢেউ সমাজতন্ত্র ও জনগণের গণতন্ত্রের দিকে পরিচালিত হবে !
১৪/০২/২০২০

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home