Thursday, 19 September 2019

আমার দাবী



লেখাটা লিখেছিলাম প্রায় দশ বছর আগে ২০০৬-এর ফেব্রুয়ারীতে৷ সেই সময়কার আশংকা ও সঙ্কট বর্তমানে আরো ঘণীভূত৷ শুধু ভারতবর্ষেই নয় গোটা বিশ্ব জুড়েই সভ্যতার সঙ্কট প্রকট৷ তবু এক দশক আগের অভিমুখটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ধরে রাখতেই লেখাটিকে অপরিবর্তিত রাখা হোলো৷

১ (ভূমিকা)

দাবী কার কাছে?  যদি বলি সমাজ, তবে বলবে তুমিতো সমাজের অংশ৷ যদি বলি 'সরকার', তবে বলবে সরকার তো তোমার নির্বাচিত৷ যদি বলি 'রাষ্ট্র', তবে বলবে রাষ্ট্রতো সে সরকারের৷ আমি জানি কথাগুলি অর্বাচীনের আত্মপ্রলাপের মতই শোনায়৷ তবুও যখনি কোনো দাবী জানাতে চাই - ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই আশ্বাসবাণীই প্রতিধ্বনিত হয় আমাদের নেতা, প্রশাসক, গণমাধ্যমগুলির বিদগ্ধ আলোচকদের কণ্ঠে৷ যদিও এদের কেউই অস্বীকার করেননা যে নাগরিকদের 'শিক্ষা', 'স্বাস্থ্য', 'পরিবেশ রক্ষা'তে রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে৷ এরা সম্ভবত এও অস্বীকার করেননা যে 'কর্মহীন' শ্রমিকের দিন গুজরানের বন্দোবস্ত করাও 'রাষ্ট্রের' শুভ উদ্যোগের একটি৷ কিম্বা প্রকৃতি নির্ভর কৃষি জীবনের অনিশ্চয়তাকে দূর করতে রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে - দিতে হবে দরিদ্র কৃষিমজুর ও জনমজুরদের ন্যূনতম মজুরীর অধিকার৷ তবুও এই দাবীগুলি যদি কেউ 'সুষ্পষ্ট'ভাবে তুলে ধরতে চায় - তখন সুচাতুরীতে সেগুলিকে 'নিজস্ব' দাবী দাওয়ায় পরিণত করতে এদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই৷ জনকল্যানমূলক কোনো প্রকল্পে 'রাষ্ট্রীয়' উদ্যোগকে তখন ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করে তারা সেই প্রকল্পকে খারিজ করার 'বিশেষজ্ঞ'  পরামর্শ দেবে, এবং সেগুলি মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যক্তি উদ্যোগের মোড়কে পরিবেশন করার তদ্বির করবে৷ শ্রমিকের কর্মহীনতার দায় আরো বেশী করে শ্রমিকের অপদার্থতা ও অবিমৃষ্যকারী আন্দোলনের মানসিকতার উপর চাপিয়ে দেবে৷ সেখানেও দাবী উঠবে ট্রেড ইউনিয়নের অধিকার হরণ ও সামাজিক নিরাপত্তাজনিত ন্যূনতম সুবিধাগুলির অবলোপনের৷ প্রকৃতপক্ষে গত শতকের অন্তিমেও যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা ঢাক গুড় গুড় করে এসব কথা বলতেন, আজ খোলাখুলিই সমস্যা সমাধানের এমন উদ্ভুতূড়ে তত্ত্ব তারা কপচে যাচ্ছেন৷ এদের শ্লোগান, মন্ত্র, বাণী - যাই বলুন, একটাই - 'সামাজিক পরিষেবায় রাষ্ট্র হাত ওঠাও - উন্মুক্ত করে দাও সেগুলিকে 'মুনাফা' কামানোর জন্য৷ সুতরাং মানুষ সরকারী হাসপাতাল ছেড়ে চিকিৎসার জন্য যাবে নার্সিং হোমে৷ সরকারী স্কুলে পড়াশুনা না করে ছাত্র ছাত্রীরা সামিল হোক বেসরকারী শিক্ষাঙ্গণে৷ বিশুদ্ধ পাণীয় জলের যোগান পেতে হলে খেতে হবে বোতোল ভর্তি বাজারের জল৷ এখন থেকে চাকুরীতে থাকবেনা কোনো নিরাপত্তা - থাকবেনা পেনশন-প্রভিডেন্ড ফান্ড - গ্রাচ্যুটি - বিভিন্ন ছুটির সুবিধা৷ এ সব তত্ত্বের প্রচারের সাথে রয়েছে বিনোদনের হরেক উপাচার৷ নানান কেব্ল্ চ্যানেলে দিবারাত্র তারকাদের ও বিত্তবানদের জীবনশৈলীর নানান উপাখ্যান৷ সেই রুপকথার আসরে আমার দাবীগুলির স্থান কোথায়?

অথচ সবকিছু ঠিকঠাক যে চলছে, তা'ওতো নয়৷ দিনে রাতে সন্ত্রাসবাদের জুজুতে আমাদের তটস্থ থাকতে হয়৷ অন্তত গণমাধ্যমগুলিতে সেইতো শিরোনামে৷ নাগাল্যাণ্ড, মণিপুর, আসাম, কাশ্মীর - এক এক অঞ্চলে যেন সমান্তরাল শাসন চলছে৷ এর কোনো কোনো স্থানে হাজারে হাজারে মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে নানান বিষয়কে কেন্দ্র করে৷ কখনো সামরিক বাহিনীর দাপটের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে, কখনো বা আবার সেই অঞ্চলের সস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও৷ এমনকী নাগাল্যাণ্ড, মণিপুরের মতো রাজ্যের অধিবাসীদের বিদ্রোহীদের করও দিতে হয়৷ অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে নাগাল্যাণ্ডের মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানাতে হয় যে ভারতসরকারের রাজস্ব ব্যবস্থা থেকে সে দেশের মানুষকে যন ছাড় দেওয়া হয়৷ দু'মুখী রাজস্ব প্রদানে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে৷

সমাজের উপরতলার 'দুর্নীতি'র চিত্র মাঝেমধ্যেই বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে৷ যদিও সেই দুর্নীতিবাজদের সামাজিক মর্যাদা ও প্রতিপত্তি এতটুক হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হয়নি৷ 'রাষ্ট্র' যে এদের সামনে কত অসহায় প্রতিমুহূর্তেই সেটি প্রমাণিত হচ্ছে৷ বিভিন্ন মাফিয়া ডনদের কাছেও রাষ্ট্রের এ অসহায়ত্ব ধরা পড়েছে৷ দুর্বৃত্তগিরি দ্বারা উপার্জিত ধন ও বলের কৌলিন্যে এরা আইনসভার সদস্য, এমনকী মন্ত্রীর গদীতে আসীন হচ্ছে৷ সমাজের প্রভাবশালী অংশ ও প্রশাসকদের আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷ এমনকী মাননীয় আদালতের হস্তক্ষেপেও তারা বাধ মানছেন না৷ এর ফলে প্রকৃত ন্যায় বিচারের কতটুকু জনসাধারণের কাছে পৌঁছচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা৷

অন্যদিকে ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামির সামনেও রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ চোখে পড়ার মত৷ বিগত কুড়ি বছরের ইতিহাসে কখনো শাহবাণুর মামলাতে, কখনো বা 'বাবরি মসজিদ ধ্বংসে' এবং সর্বোপরি 'গুজরাটের দাঙ্গা' - এর কোনোটাই রাষ্ট্র প্রতিহত করতে পারেনি৷ কখনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, এমন কী সক্রিয় সহযোগিতার প্রমাণও জনসমক্ষে রেখেছে৷

মানুষের শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সুস্থ পরিবেশের মৌলিক অধিকারগুলি অনেকাংশেই খর্বিত৷ এই সমস্ত ক্ষেত্রে যে বিপুল নৈরাজ্য ও নেই রাজ্যের সহাবস্থান - তার স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্র নিজের অসহায়তাকে প্রকারন্তরে কবুল করে নিয়েছে৷ বিভিন্ন প্রশাসকের কণ্ঠে অহরহ সে ব্যর্থতার গ্লানি বা ঘোষণা প্রতিধ্বণিত হচ্ছে৷ এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির আব্দার৷ তাদের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবী দাওয়াতে ক্রমশই রাষ্ট্র নমনীয় হয়ে উঠছে, এবং তার স্বতন্ত্রতা ক্ষুণ্ন করে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী হিসেবে বহির্বিশ্বে আত্মপ্রকাশ করছে৷

অবশ্য একটি ব্যাপারে এখনো ভারতীয় রাষ্ট্র তার দক্ষতা প্রমাণ করেছে৷ সেটি নির্বাচন পরিচালনায়৷ এখনো নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দলের পরিবর্তন ঘটে৷ এই বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় গণতন্ত্রকে ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করেছে৷ অন্তত আর পাঁচটি অনুন্নত দেশের মতো ভারতবর্ষে সামরিক শাসনের জগদ্দল চেপে বসেনি৷ ভারতবর্ষের বিশালতা ও বৈচিত্রকে সামরিক শাসনের দ্বারা বেঁধে রাখাও সহজ নয়৷ ভারতবর্ষের এই  ন্যূনতম গণতন্ত্রকে মূলধন করেই এই রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবী৷ এই রাষ্ট্র অন্তত নিজেকে পরিচয় দিতে চায় ধর্মনিরপেক্ষ জনমুখী রাষ্ট্র হিসাবে৷ সেই রাষ্ট্রের কাছেই স্পষ্ট দাবী জানাতে চাই নৈরাজ্যের অবসানের৷ বন্ধ করতে হবে অগণতান্ত্রিক ধর্মীয়  অনুশাসন, গড়ে তুলতে হবে জনজাতিদের মধ্যে স্বেচ্ছামিলনের বাতাবরণ - দখল করতে হবে বেআইনীভাবে অর্জিত ধন সম্পত্তি - সাম্রাজ্যবাদী বৈদেশিক স্বার্থের সামনে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া চলবে না৷ গণতন্ত্রকে আরো ব্যপক করতে হবে - জনগণকে রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার করতে হবে৷
কাগজে কলমে অন্তত রাষ্ট্রের এই দায়িত্বকে কোনো রাজনৈতিক দলই অস্বীকার করবে এমন নয়৷ তবে কথাগুলি বিভিন্ন তাৎপর্য্য নিয়ে তাদের ব্যাখ্যাতে এসে যাবে৷ এদের কাছে হয়তো বা প্রায় কোনো ধর্মীয় অনুশাসনই অগণতান্ত্রিক নয় - সেটি ধর্মীয় অনুভূতির পবিত্রতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার দোহাইতে বৈধ হয়ে যাবে৷ বেআইনি সম্পত্তি চিহ্ণিত করা যে কত দুরূহ সেটাই তারা জানাবে৷ ভূবনীকরণ ও বিশ্ববাজারে অংশীদারীতার নানান ঝলমলে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে এরা দেশীয় অর্থনীতিকে আরো সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেবে৷ ক্রমাগতই আপোষ করে চলবে মার্কিন ও পশ্চিমী দুনিয়ার আগ্রাসী নীতির সাথে৷ সেই সাথে জনসাধারণের আন্দোলনের  বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে দুঃখ প্রকাশ করে সেটির যৌক্তিকতা ও নৈতিকতা নিয়ে নানান আলোচনা করবে৷ তাই আরো স্পষ্ট করে তুলতে চাই আমার দাবী৷ এমনভাবে প্রশ্নগুলিকে সামনে রাখতে চাই যার সাথে আমাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও ভবিষ্যতের ছবিটুকু আঁকা থাকে৷ সেই উদ্দেশ্যেই এই ঘোষণাপত্র৷

২ (শিক্ষা)

আমাদের সন্তানেরা সুস্থ পরিবেশে শিক্ষালাভ করবে - শিক্ষাঙ্গণগুলিতে মুক্ত চিন্তা-বিতর্ক-আলচনার চর্চা চলবে - ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে যোগ্যতা ও আপন আগ্রহে সর্বোত্তম শিক্ষার সূযোগ পাবে - এই আমার দাবী৷ দেশের সমস্ত নাগরিককে শিক্ষার আওতায় আনতে হবে৷ সেই শিক্ষাকে হতে হবে আধুনিক মননের শিক্ষা - বৈজ্ঞানিক মননশীলতার অনুশীলনের শিক্ষা৷ তাকে কোনো ক্রমেই ধর্মীয় সংস্কারে আবৃত রাখা যাবে না৷ বন্ধ করতে হবে মাদ্রাসা প্রভৃতির ধর্মভিত্তিক শিক্ষা৷ ধর্মীয় কথা-উপকথা-পুরাণ শিক্ষার পাঠক্রমের অঙ্গ হতে পারে - কিন্তু সেটি মুখ্য পাঠক্রম যেন না হয়ে ওঠে৷ বৈজ্ঞানিক পাঠক্রমের প্রেক্ষাপটে তাকে স্থান করে দিতে হবে৷

'ভাষা' শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম৷ অবশ্যই মাতৃভাষাকে সেখানে জোড় দিতে হবে৷ প্রতিটি প্রদেশে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলিতও সেই প্রদেশের ভাষাগুলিকে বঞ্চিত করা যাবে না৷ উচ্চশিক্ষাতেও মাতৃভাষার প্রচার চাই৷ বিভিন্ন প্রদেশে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে৷ সেখানে সমান্তরাল মাধ্যমে এই শিক্ষা প্রদান করতে হবে৷ যেমন পশ্চিমবঙ্গের কারিগরী বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে ইংরাজীর পাশাপাশি বাংলাতেও শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চাই৷

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে রাজনৈতিক দলগুলির হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে৷ রাজনৈতিক মতের স্বাধীন অবস্থান ছাত্র ও শিক্ষক সমাজের অধিকার৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে গণতান্ত্রিকতা ও স্বচ্ছতা আনা চাই৷ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা গঠিত বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক সমিতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে৷ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে যে যার ভূমিকা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াতে অংশ নেবে৷ যেমন পাঠক্রমের পরিকল্পনাতে, ল্যাবরেটরী-শ্রেণীকক্ষ উন্নয়ন, পরীক্ষা-ব্যবস্থার সংস্কার প্রভৃতিতে শিক্ষক সমাজ অগ্রণী ভূমিকা নেবে এবং তাদের মতামত গুরুত্ব পাবে৷ তেমনি ছাত্রদের দ্বারা সংগঠিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ছাত্রদের বিভিন্ন সমিতি দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে৷ সময়ে সময়ে বিভিন্ন অংশের সমবেত অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷

বন্ধ করতে হবে পরীক্ষাভিত্তিক সাজেশন-টিউশন কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা৷ বন্ধ হোক অর্ধশিক্ষিত বেকারবাহিনী গড়ে তোলার নৈরাজ্য৷ এই সমাজব্যবস্থায় সেটা কীভাবে সম্ভব আমার জানা নেই৷ তবু দাবীকে তো অস্বীকার করতে পারিনা৷

৩ (ভাষা)

ভাষা নিয়ে আমার ক্ষোভ দিন দিন বেড়েই চলেছে৷ আমার ছেলেবেলাতেও বাংলাভাষা যে মর্যাদা ও গুরুত্বের সাথে জাতীয় জীবনে গৃহীত হোতো (অন্তত আমার কাছে সেটাই মনে হোতো), আজ সে অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে৷ আমি বুঝিনা ভারতবর্ষের প্রতিটি ভাষাই কেন হিন্দীর সমমর্যাদা পাবে না? কেন কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে কেবল হিন্দী আর ইংরাজীর চল থাকবে? আমরা আমাদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ার 'ত্রিভাষিক সূত্র'কে খর্ব করে চলেছি এবং এ ব্যাপারে প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উন্নীত হওয়ার অহংকারে পরম সহিষ্ণুতা অবলম্বনের নীতি গ্রহণ করেছি৷ কিন্তু এও এক ধরণের আত্মখণ্ডনের রাস্তা প্রস্তুত রাখা৷ প্রদেশগুলিতে ত্রিভাষিক সূত্র অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা চাই৷  বিভিন্ন স্তরে দোভাষী বা অনুবাদকের মাধ্যমে সরকারী ও প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে হবে৷ প্রতিটি কর্মী বা মানুষের অধিকার থাকবে তার নিজস্ব ভাষাতে আলাপ-আলোচনা চালাবার ও লেখা-পত্রের যোগাযোগে৷ এ ব্যাপারে ইংরাজী ভাষার গুরুত্ব কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না৷  ঐতিহাসিকভাবেই এই বিদেশী ভাষাটি বর্তমান শিক্ষিত ভারতীয় সমাজে ঐক্যের বন্ধন গড়ে তুলেছে৷ তাকে খর্ব করলে এই একতার সূত্রটি নষ্ট হবে৷ এই সত্যকে ঔপনিবেশিকতার কালিমায় লিপ্ত করা মূর্খামির নামান্তর৷ বরং হিন্দী সেই জায়গা দখল করতে চাইলে ঔপনিবেশিকতার সূত্র সরাসরি সামনে হাজির হবে৷ হিন্দীওয়ালারা এই অনুভূতিটুকু নস্যাৎ করতে চান৷ কিন্তু হিন্দীর বদলে বাংলাকেও জাতীয় জীবনে চাপিয়ে দিলে যে প্রতিক্রিয়া হোতো - অনুরূপ প্রতিক্রিয়াই হিন্দীর সরকারী পৃষ্ঠপোষণ ও প্রসারণে হবে এবং হচ্ছে৷ আজ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ভাষা নিয়ে ক্ষোভ তাই ক্রমবর্ধমান৷ সেই কারণেই চাই হিন্দীর বিশেষ মর্যাদা অবলোপন৷ তাকে রাষ্ট্রভাষা বা রাজভাষা কোনো অভিধাতেই আখ্যায়িত করা উচিত নয়৷ সেটি অন্যান্য জাতীয় ভাষার মতই একই পঙক্তিতে বসুক৷ যোগাযোগকারী ভাষা হিসেবেই ইংরাজী ও হিন্দীর ভূমিকা গৃহীত হোক৷ তেমনি সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে হয় ত্রিভাষিক সূত্রের যথাযথ প্রয়োগ হোক, নয়তো ইংরাজী ও প্রাদেশিক ভাষা প্রয়োগের দ্বিভাষিক নীতি গ্রহণ করা হোক৷

কোনো প্রদেশের অভ্যন্তরেও অন্যভাষার যথেষ্টসংখ্যক মানুষ থাকেন৷ যেমন আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই বাস করেন নেপালী, রাজবংশী ও সাঁওতালী ভাষার বহু মানুষ৷ ঝাড়খণ্ড ও আসামেও তেমনি বাস করেন বহু বাঙালী৷ এই সমস্ত অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাকেও সমমর্যাদা দিতে হবে৷ চাই তাদের প্রশাসনিক স্বীকৃতি ও দোভাষীর সাহায্যে প্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা৷ এই কারণেই জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে প্রশাসনিক স্তরে দোভাষী ও ভাষা-অনুবাদকের পদ সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদের প্রশিক্ষিত করতে কর্মসূচী নিতে হবে৷

শিক্ষাতেও মাতৃভাষার প্রচলন আবশ্যিক করতে হবে৷ উচ্চশিক্ষাতে মাতৃভাষা প্রসারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে৷ যেভাবে স্বাধীন জাতি তাদের ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেই নীতি অবলম্বন করতে হবে৷ এর অর্থ ইংরাজী পরিত্যাগও নয়, আবার স্বদেশী ভাষাকে ব্রাত্য রাখাও নয়৷ প্রয়োজন এই দুইয়েরই মেলবন্ধন৷

বিভিন্ন কার্য্যকরী পদক্ষেপ এই সমস্ত বিষয়েই গ্রহণ করা চাই৷ কোনো প্রদেশের আভ্যন্তরীণ সমস্ত কাজকর্মে সেই প্রদেশের ভাষা বা অঞ্চল বিশেষে অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাকে আবশ্যিক করতে হবে৷ অযথা যেখানে সেখানে ইংরাজীর ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে৷ অফিস-আদালত -প্রশাসন-স্বাস্থ্য বিভিন্ন বিভাগে এই নীতি অবলম্বন করা চাই৷ কেবলমাত্র আন্তর্প্রাদেশিক যোগযোগে ইংরাজী বা উদ্দিষ্ট প্রদেশের ভাষা ব্যবহার করা যাবে৷ এক্ষেত্রে ভাষা অনুবাদকেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন৷ উদাহরণ স্বরূপ, কোনো কেন্দ্রীয় দপ্তরে বা ভিন রাজ্যের কোনো সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে পত্র পাঠালে তার ভাষা হবে নয় বাংলা, অথবা ইংরাজী৷ একই কথা প্রযোজ্য পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রেরিত ভিন রাজ্যের উদ্দেশ্যে পত্রাদির ক্ষেত্রে৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রাদেশিক ভাষায় শিক্ষার সমসূযোগ বর্তমান থাকতে হবে৷ সেই অঞ্চলের কনফারেন্স বা সম্মেলনে প্রাদেশিক ভাষার যোগদানকে স্বাগত জানাতে হবে৷

স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষের অখণ্ডতার সামনে মস্ত চ্যালেঞ্জ এই বহু ভাষাভিত্তিক জনজাতির সমবিকাশের শর্তের পরিপূরণ৷ আমাদের প্রাথমিক নীতিকারেরা যদিও এ ব্যাপারে সংবেদনশীল ছিলেন, তবুও সেই নীতির বহু জায়গায় দুর্বলতা থেকে যায়৷ তার একটি হিন্দীর উপর আলাদা গুরুত্ব আরোপ এবং প্রশাসনে ভাষা অনুবাদকের ভূমিকাকে গুরুত্ব না দেওয়া৷ রাজ্যগুলিতেও এই পরিবেশে শিক্ষার প্রসারে মাতৃভাষা গুরুত্ব পায়নি৷ তবুও প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে বিবেচনা করে ভাষাগুলিকে যে গুরুত্ব দেওয়া হোতো বর্তমানে কেন্দ্রীয় নীতিতে সেটি অনুপস্থিত৷ উপরন্তু হিন্দীকে সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া ও প্রাদেশিক ভাষার গুরুত্ব খর্ব করে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার সরকারী প্রয়াসও নজরে পড়ার মত৷ ভারতবর্ষের ঐক্যের পরিপন্থী এই নীতিকে অবিলম্বে বর্জন করতে হবে৷

৪ (ধর্ম)

যতদিন যাচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে ধর্ম আবার তার পুরানো সামন্ততান্ত্রিক চেহারাতে ব্যক্তি মানুষের জীবনে হাজির হচ্ছে৷ ধর্মীয় নেতারা নানান ফতোয়া জারি করছে - অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণার মনোভাবকে লালন করছে৷ দেশপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের নামে বিধর্মী বা কাফেরদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সমস্ত উসকানি নিয়ে রাজনীতির মঞ্চ আলোকিত করছে৷ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র এই অনৈতিক কাজিয়ায় নিরপেক্ষতার নিষ্ক্রিয় আবরণে ঠুঁটো জগন্নাথের মতোই চেয়ে আছে৷ তার আদালত না দিতে পারে শাস্তি ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধ্বংসের নায়কদের, না পারে প্রশাসন নিরীহ নাগরিকের ধনমানজীবনকে পদদলিত করা দুর্বৃত্তদের রুখতে৷ উপরন্তু প্রশাসনের সক্রিয় সহযোগিতায় যখন হত্যার এই তাণ্ডবলীলা সংগঠিত হয় সেই খলনায়কদের কোনো শাস্তি দিতেও সে অপারগ৷ দেশে এতরকম সন্ত্রাসবিরোধী আইন আছে - সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো এই বিষাক্ত মানুষদের দমনের কোনো আইন নেই৷ খাতায় কলমে তেমন কিছু থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে  সেগুলির কোনো প্রয়োগ চোখে পড়েনা৷

 তাই স্পষ্টতই এই দাবী রাখি যে ধর্মীয় অনুশাসনের নামে কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্বিত করা চলবেনা৷ ব্যক্তির স্বাধীনতা - তার রুচি, শিক্ষা, বিবাহ, সমাজজীবনের স্বাভাবিক অংশগ্রহণ - ধর্মীয় অনুশাসনের বেড়ায় দ্বিখণ্ডিত করা চলবে না৷ সমাজের সমস্ত মানুষের কাছে এই গণতান্ত্রিক অধিকার অবাধ ও আইনের দুয়ারে সমমর্যাদায় স্বীকৃত হতে হবে৷ এ ব্যাপারে ফতোয়া প্রদানকারী তথাকথিত ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে৷ ধর্মীয় সংগঠনগুলির বিপুল সম্পত্তির উৎস ও ব্যবহারকে সমীক্ষা করতে হবে এবং সেগুলির সমাজের জনকল্যানমূলক কাজে ব্যবহার করতে হবে৷ ধর্মীয় সংগঠনগুলি দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে কোনো ধর্মীয় ভেদাভেদ চলবে না৷ তেমনি ধর্মীয় সংগঠন পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে৷ বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় উৎসব যেগুলি জাতীয় জনজীবনকে প্রভাবিত করে, সেগুলিতে সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে৷

 এটা সত্যি যে ধর্মের সাথে আমাদের জনজীবনের সংস্কৃতি ও সমাজজীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷ সেই কারণে ধর্মকে সংস্কৃত করার লক্ষ্যে তার মানবিক আদর্শগুলিকে তুলে ধরতে হবে৷ অন্যদিকে পরধর্ম অসহিষ্ণুতা ও আপন-শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকাকে খর্ব করার যাবতীয় প্রয়াস রাষ্ট্রের তরফ থেকে সচেতনভাবে নিতে হবে৷ সেই সাথে সমাজজীবনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মেলামেশা ও সামাজিক আদান প্রদানের বাতাবরণ গড়ে তুলতে হবে৷ এর জন্য রাষ্ট্রকে যেমন ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে - তেমনি সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে৷

৫ (বেআইনী সম্পত্তির দখল)

সরকারী কোষাগারের ভাঁড়ে মা ভবানী - এ আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায়৷ আর তাই কোষাধ্যক্ষের যাবতীয় রোষ 'ভর্তুকি'প্রাপ্ত জনগনের প্রতি৷ কথায় বলে ন্যাংটার নেই বাটপারের ভয়৷ কিন্তু ন্যাংটার জীবনটাতো থাকে ৷ সেটা নিয়ে যখন টানাটানি চলে, তখন সে যায় কোথা? অথচ কোষাগারে যে বিপুল পরিমান ফাঁকি জমা আছে, তার হিসেব কেই বা রাখে? আমি বলছি আমাদের শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী ও ধনী কৃষকদের অংশটির কথা৷ দেশের পরিকাঠামো উন্নয়নে চলে তাদের নিত্য বায়নাক্কা ও গুরুগম্ভীর ভাষণ - কিন্তু রাজস্ব জমা দেওয়ার ব্যাপারে তারা কুণ্ঠিতহস্ত৷ বরং আপামর জনসাধরণের ভোগের পরিকাঠামোর কড়ি কেন তারা গুনবেন, সেই দর্শনের মহান বাণী ও উপদেশও তারা নিত্য দিয়ে থাকেন৷ আর উপসংহারে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরোয় - 'মুনাফাবাজীর জন্য উন্মুক্ত হোক পথঘাট - নদীনালা- পুষ্করীণী - গোটা দেশটাই'৷ শুধু বেআইনি ঘুষই আর নয়, রাষ্ট্রীয় চৌকিদারির আইনি আশিসে শুদ্ধ হোক তাদের এই নয়া আব্দার৷ এখন এদের পয়সা এত হয়েছে যে রাষ্ট্রকে নিলামে তুলতে পারাই মুক্তবাণিজ্যের অন্যতম শর্ত হিসাবে এরা হাজির করল বলে?
অথচ এই সম্পত্তির উৎস খোঁজাও নিশ্চয়ই অন্যায় নয়৷ প্রতিনিয়ত মাফিয়া ও রাজনৈতিক নেতাদের যা বিপুল সম্পত্তির খবর গণমাধ্যমগুলিতে প্রচারিত হয় রাষ্ট্র কী খোঁজ নেবেনা তার কতখানি বৈধ? বিশেষতঃ আশির দশকের পরে যে সব শিল্পপতিদের অকস্মাৎ উথ্থান -  তাদের নেপথ্যের বেআইনী কারবারের কথা বিভিন্ন সময়েই সামনে এসে গেছে৷ রাষ্ট্রের কাছে আমার এই দাবী যে সেগুলিকে অবশ্যই চিহ্ণিত করতে হবে এবং বাজেয়াপ্ত করতে হবে৷

এর সাথে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পপতি ও শিল্পসংস্থা কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্কগুলি থেকে গৃহীত বিপুল অনাদায়ী ঋণের পরিমান৷ এই ঋণের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে শিল্পপতিদের পরিবারগুলো ও তাদের নানা সম্পত্তির উপর বর্তাতে হবে এবং সেগুলিকে অধিগ্রহণ করতে হবে৷ আমার এই দাবী এই দেশের আইনীব্যবস্থার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো কথা নয়৷ এই ধরণের বেনিয়ম রোখার বিভিন্ন আইন নিশ্চয়ই বর্তমান৷ তবে সেগুলিকে হয় আরো শক্ত করা প্রয়োজন, নয় রাষ্ট্রকে  সেই আইনের প্রয়োগে আরো সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে৷ সন্ত্রাসদমনের নামে গণআন্দোলোনগুলিকে রুখতে রাষ্ট্র যতটা তৎপর তার সিকিভাগ এই ধরণের অসাধু উপার্জনকে কব্জা করার বিষয়ে দেখালে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের 'তথাকথিত' দৈন্যদশা নিয়ে হাহুতাশ করতে হোতো না৷ অবশ্য রক্ষকই যখন ভক্ষক তখন কেই বা কার উপর এই আইন প্রয়োগ করে৷

৬ (স্বাস্থ্য ও পরিবেশ)

সান্তাবারবারাতে কিছু দক্ষিণকোরীয় প্রফেসরের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল৷ কথায় কথায় জেনেছিলাম যে সে দেশের চিকিৎসা-সংক্রান্ত যাবতীয় পরিষেবা সরকারী হাসপাতালগুলিতে উপলভ্য৷ কোনো ধরণের সমান্তরাল বেসরকারী চিকিৎসা পরিকাঠামো সেখানে গড়ে ওঠেনি৷ আমরা জানি দক্ষিণ কোরিয়া একটি শিল্পোন্নত পুঁজিবাদী দেশ৷ তবুও সেখানে স্বাস্থ্য নিয়ে মুনাফাবাজী করার মওকা সরকার বাজারের হাতে ছেড়ে দেয়নি৷ হয়তো কালে সে ব্যবস্থা কায়েম হবে এবং জনসাধারণের অশেষ দুর্গতি বাড়বে৷ এমনটিই তো হচ্ছে অধুনা ব্রিটেনে৷ এক সময় আমাদের রাজ্যেও সরকারী ব্যবস্থার বিশেষ বিকল্প কিছু ছিলনা৷ সে কারণে সরকারী হাসপাতালে উন্নত পরিষেবা প্রদানে সরকার কিছুটা বাধ্য ছিল৷ কিন্তু আজ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানদের রমরমা৷ গ্রামের গরীব মানুষেরাও নার্সিংহোমে ছোটেন বিভিন্ন অসুখ বিসুখে - সরকারী হাসপাতালের এমনই দুর্নাম৷ এতে ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো৷ সরকারী পরিষেবা যত দুর্বল হবে, যত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, ততই বিকল্প খুঁজে বেড়াবে মানুষ৷ যদিও সেখানেও পরিষেবা কতটুকু উন্নত সে নিয়ে বহু প্রশ্ন থেকে যায়৷ তবুও সেই কানামামাই পরিত্রাতার ভূমিকায়৷ এতে সরকারের লাভ - নিজের দায়িত্বকে ঝেড়ে ফেলা৷ আর ব্যবসায়ীদের লাভ - অধিক মুনাফা কামানো৷ মাঝখান থেকে সাধারণের অশেষ দুর্ভোগ৷ শুধু স্বাস্থ্য কেন? যে কোনো সামাজিক পরিষেবার ক্ষেত্রেই এই হালচাল৷ সরকারীবিভাগুলি বেসরকারীকরণের অপেক্ষাতে - যাতে মানুষ সেই অত্যাবশ্যক পরিষেবা পেতে গাঁটের পয়সা গুণে দেয়৷ সরকারী বাজনায় এখন নতুন খাজনা আদায়ের এই বেসরকারী বন্দোবস্ত৷ সে কারণেই শুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহকে অবহেলা করে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হয় 'বোতলে'র জল কিনতে৷ এমন দিনও আসছে পানীয় জলগুলির ঠিকাদারিতে দেশের নদীনালাগুলি নিলাম হয়ে যাবে৷ আর সে কারণেই খুব স্পষ্টভাবে দাবী জানাই জীবনধারণের আবশ্যিক শর্তগুলিকে সরকারী ব্যবস্থায় পূরণ করতে হবে এবং উন্নততর জীবনের লক্ষ্যেই সেই পরিষেবা প্রদান করতে হবে৷ তেমনি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানগুলির স্বেচ্ছাচার বন্ধ করে সেগুলিকে সরকারী পরিষেবার অধীনে আনতে হবে৷ জীবনদায়ী ওষুধ থেকে প্রতিষেধক টীকা সমস্ত কিছুর যোগান নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য নীতি গ্রহণ করতে হবে৷ কিছুদিন আগেই সংবাদে শুনেছিলাম এবার বাজেটে গাড়ির দাম কমছে এবং ওষুধের দাম বাড়ছে৷ এতেই বোঝা যায় আমাদের সরকার কাদের স্বার্থে কাজ করছে৷ অথচ দেশের প্রতিটি জনপদেই চাই উন্নত হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, টেলি যোগাযাগ, স্টেডিয়াম, রঙ্গমঞ্চ, উদ্যান, ইত্যাদি৷ চাই সুস্থ পরিবেশ, দূষণমুক্ত বায়ু, জল ও মাটী ৷ যদি কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ শুধুই সরকারী কোষাগারের দৈন্যদশা ও নানা অজুহাতে আপন অসহায়তা ব্যক্ত করে - তবে চাই সেই রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তন৷


                                                                    ১০/২/২০০৬










0 Comments:

Post a Comment

Subscribe to Post Comments [Atom]

<< Home