আমার দাবী
লেখাটা
লিখেছিলাম প্রায় দশ বছর আগে ২০০৬-এর ফেব্রুয়ারীতে৷ সেই সময়কার আশংকা ও সঙ্কট বর্তমানে
আরো ঘণীভূত৷ শুধু ভারতবর্ষেই নয় গোটা বিশ্ব জুড়েই সভ্যতার সঙ্কট প্রকট৷ তবু এক দশক
আগের অভিমুখটির ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট ধরে রাখতেই লেখাটিকে অপরিবর্তিত রাখা হোলো৷
১
(ভূমিকা)
দাবী
কার কাছে? যদি বলি সমাজ, তবে বলবে তুমিতো সমাজের অংশ৷ যদি বলি 'সরকার', তবে
বলবে সরকার তো তোমার নির্বাচিত৷ যদি বলি 'রাষ্ট্র', তবে বলবে ‘রাষ্ট্র’তো সে সরকারের৷ আমি জানি কথাগুলি অর্বাচীনের
আত্মপ্রলাপের মতই শোনায়৷ তবুও যখনি কোনো দাবী জানাতে চাই - ঘুরিয়ে ফিরিয়ে এই আশ্বাসবাণীই
প্রতিধ্বনিত হয় আমাদের নেতা, প্রশাসক, গণমাধ্যমগুলির বিদগ্ধ আলোচকদের কণ্ঠে৷ যদিও
এদের কেউই অস্বীকার করেননা যে নাগরিকদের 'শিক্ষা', 'স্বাস্থ্য', 'পরিবেশ রক্ষা'তে রাষ্ট্রের ভূমিকা রয়েছে৷ এরা সম্ভবত এও
অস্বীকার করেননা যে 'কর্মহীন' শ্রমিকের দিন গুজরানের বন্দোবস্ত করাও 'রাষ্ট্রের' শুভ
উদ্যোগের একটি৷ কিম্বা প্রকৃতি নির্ভর কৃষি জীবনের অনিশ্চয়তাকে দূর করতে রাষ্ট্রকে
এগিয়ে আসতে হবে - দিতে হবে দরিদ্র কৃষিমজুর ও জনমজুরদের ন্যূনতম মজুরীর অধিকার৷ তবুও
এই দাবীগুলি যদি কেউ 'সুষ্পষ্ট'ভাবে তুলে ধরতে চায় - তখন সুচাতুরীতে সেগুলিকে
'নিজস্ব' দাবী
দাওয়ায় পরিণত করতে এদের বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই৷ জনকল্যানমূলক কোনো প্রকল্পে 'রাষ্ট্রীয়' উদ্যোগকে
তখন ব্যর্থতার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্ণিত করে তারা সেই প্রকল্পকে খারিজ করার 'বিশেষজ্ঞ' পরামর্শ দেবে, এবং সেগুলি মুনাফাকেন্দ্রিক ব্যক্তি উদ্যোগের
মোড়কে পরিবেশন করার তদ্বির করবে৷ শ্রমিকের কর্মহীনতার দায় আরো বেশী করে শ্রমিকের অপদার্থতা
ও অবিমৃষ্যকারী আন্দোলনের মানসিকতার উপর চাপিয়ে দেবে৷ সেখানেও দাবী উঠবে ট্রেড ইউনিয়নের
অধিকার হরণ ও সামাজিক নিরাপত্তাজনিত ন্যূনতম সুবিধাগুলির অবলোপনের৷ প্রকৃতপক্ষে গত
শতকের অন্তিমেও যে সমস্ত বুদ্ধিজীবীরা ঢাক গুড় গুড় করে এসব কথা বলতেন, আজ
খোলাখুলিই সমস্যা সমাধানের এমন উদ্ভুতূড়ে তত্ত্ব তারা কপচে যাচ্ছেন৷ এদের শ্লোগান, মন্ত্র, বাণী
- যাই বলুন, একটাই - 'সামাজিক পরিষেবায় রাষ্ট্র হাত ওঠাও - উন্মুক্ত
করে দাও সেগুলিকে 'মুনাফা' কামানোর জন্য৷ সুতরাং মানুষ সরকারী হাসপাতাল
ছেড়ে চিকিৎসার জন্য যাবে নার্সিং হোমে৷ সরকারী স্কুলে পড়াশুনা না করে ছাত্র ছাত্রীরা
সামিল হোক বেসরকারী শিক্ষাঙ্গণে৷ বিশুদ্ধ পাণীয় জলের যোগান পেতে হলে খেতে হবে ‘বোতোল’ ভর্তি বাজারের জল৷ এখন থেকে চাকুরীতে থাকবেনা
কোনো নিরাপত্তা - থাকবেনা পেনশন-প্রভিডেন্ড ফান্ড - গ্রাচ্যুটি - বিভিন্ন ছুটির সুবিধা৷
এ সব তত্ত্বের প্রচারের সাথে রয়েছে বিনোদনের হরেক উপাচার৷ নানান কেব্ল্ চ্যানেলে দিবারাত্র
তারকাদের ও বিত্তবানদের জীবনশৈলীর নানান উপাখ্যান৷ সেই রুপকথার আসরে আমার দাবীগুলির
স্থান কোথায়?
অথচ
সবকিছু ঠিকঠাক যে চলছে, তা'ওতো নয়৷ দিনে রাতে সন্ত্রাসবাদের জুজুতে
আমাদের তটস্থ থাকতে হয়৷ অন্তত গণমাধ্যমগুলিতে সেইতো শিরোনামে৷ নাগাল্যাণ্ড, মণিপুর, আসাম, কাশ্মীর
- এক এক অঞ্চলে যেন সমান্তরাল শাসন চলছে৷ এর কোনো কোনো স্থানে হাজারে হাজারে মানুষ, ছাত্র, শিক্ষক, কর্মচারী
বিক্ষোভে ফেটে পড়ছে নানান বিষয়কে কেন্দ্র করে৷ কখনো সামরিক বাহিনীর দাপটের বিরুদ্ধে
দাঁড়িয়ে, কখনো
বা আবার সেই অঞ্চলের সশস্ত্র বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধেও৷ এমনকী নাগাল্যাণ্ড, মণিপুরের
মতো রাজ্যের অধিবাসীদের বিদ্রোহীদের করও দিতে হয়৷ অবস্থা এমনই দাঁড়িয়েছে যে নাগাল্যাণ্ডের
মুখ্যমন্ত্রীকে কেন্দ্রের কাছে আবেদন জানাতে হয় যে ভারতসরকারের রাজস্ব ব্যবস্থা থেকে
সে দেশের মানুষকে যেন ছাড় দেওয়া হয়৷ দু'মুখী
রাজস্ব প্রদানে জনসাধারণের নাভিশ্বাস উঠছে৷
সমাজের
উপরতলার 'দুর্নীতি'র
চিত্র মাঝেমধ্যেই বৈদ্যুতিন মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাচ্ছে৷ যদিও সেই দুর্নীতিবাজদের সামাজিক
মর্যাদা ও প্রতিপত্তি এতটুক হ্রাস পেয়েছে বলে মনে হয়নি৷ 'রাষ্ট্র' যে এদের সামনে কত অসহায় প্রতিমুহূর্তেই সেটি
প্রমাণিত হচ্ছে৷ বিভিন্ন মাফিয়া ডনদের কাছেও রাষ্ট্রের এ অসহায়ত্ব ধরা পড়েছে৷ দুর্বৃত্তগিরি
দ্বারা উপার্জিত ধন ও বলের কৌলিন্যে এরা আইনসভার সদস্য, এমনকী মন্ত্রীর গদীতে আসীন হচ্ছে৷ সমাজের
প্রভাবশালী অংশ ও প্রশাসকদের আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখানো প্রায় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে৷
এমনকী মাননীয় আদালতের হস্তক্ষেপেও তারা বাধ মানছেন না৷ এর ফলে প্রকৃত ন্যায় বিচারের
কতটুকু জনসাধারণের কাছে পৌঁছচ্ছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা৷
অন্যদিকে
ধর্মীয় কুসংস্কার ও গোঁড়ামির সামনেও রাষ্ট্রের আত্মসমর্পণ চোখে পড়ার মত৷ বিগত কুড়ি
বছরের ইতিহাসে কখনো শাহবাণুর মামলাতে, কখনো বা 'বাবরি মসজিদ ধ্বংসে' এবং
সর্বোপরি 'গুজরাটের
দাঙ্গা' - এর
কোনোটাই রাষ্ট্র প্রতিহত করতে পারেনি৷ কখনো নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছে, এমন
কী সক্রিয় সহযোগিতার প্রমাণও জনসমক্ষে রেখেছে৷
মানুষের
শিক্ষা-স্বাস্থ্য-সুস্থ পরিবেশের মৌলিক অধিকারগুলি অনেকাংশেই খর্বিত৷ এই সমস্ত ক্ষেত্রে
যে বিপুল নৈরাজ্য ও নেই রাজ্যের সহাবস্থান - তার স্বীকৃতি দিয়ে রাষ্ট্র নিজের অসহায়তাকে
প্রকারন্তরে কবুল করে নিয়েছে৷ বিভিন্ন প্রশাসকের কণ্ঠে অহরহ সে ব্যর্থতার গ্লানি বা
ঘোষণা প্রতিধ্বণিত হচ্ছে৷ এর সাথে যুক্ত হয়েছে সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলির আব্দার৷ তাদের
বিভিন্ন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবী দাওয়াতে ক্রমশই রাষ্ট্র নমনীয় হয়ে উঠছে, এবং
তার স্বতন্ত্রতা ক্ষুণ্ন করে সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী হিসেবে বহির্বিশ্বে আত্মপ্রকাশ
করছে৷
অবশ্য
একটি ব্যাপারে এখনো ভারতীয় রাষ্ট্র তার দক্ষতা প্রমাণ করেছে৷ সেটি নির্বাচন পরিচালনায়৷
এখনো নির্বাচনের মাধ্যমে শাসক দলের পরিবর্তন ঘটে৷ এই বৈশিষ্ট্যই ভারতীয় গণতন্ত্রকে
ন্যূনতম বিশ্বাসযোগ্যতা প্রদান করেছে৷ অন্তত আর পাঁচটি অনুন্নত দেশের মতো ভারতবর্ষে
সামরিক শাসনের জগদ্দল চেপে বসেনি৷ ভারতবর্ষের বিশালতা ও বৈচিত্রকে সামরিক শাসনের দ্বারা
বেঁধে রাখাও সহজ নয়৷ ভারতবর্ষের এই ন্যূনতম
গণতন্ত্রকে মূলধন করেই এই রাষ্ট্রের কাছে আমার দাবী৷ এই রাষ্ট্র অন্তত নিজেকে পরিচয়
দিতে চায় ধর্মনিরপেক্ষ জনমুখী রাষ্ট্র হিসাবে৷ সেই রাষ্ট্রের কাছেই স্পষ্ট দাবী জানাতে
চাই নৈরাজ্যের অবসানের৷ বন্ধ করতে হবে অগণতান্ত্রিক ধর্মীয় অনুশাসন, গড়ে তুলতে হবে জনজাতিদের মধ্যে স্বেচ্ছামিলনের
বাতাবরণ - দখল করতে হবে বেআইনীভাবে অর্জিত ধন সম্পত্তি - সাম্রাজ্যবাদী বৈদেশিক স্বার্থের
সামনে জাতীয় স্বার্থ জলাঞ্জলি দেওয়া চলবে না৷ গণতন্ত্রকে আরো ব্যপক করতে হবে - জনগণকে
রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার করতে হবে৷
কাগজে
কলমে অন্তত রাষ্ট্রের এই দায়িত্বকে কোনো রাজনৈতিক দলই অস্বীকার করবে এমন নয়৷ তবে কথাগুলি
বিভিন্ন তাৎপর্য্য নিয়ে তাদের ব্যাখ্যাতে এসে যাবে৷ এদের কাছে হয়তো বা প্রায় কোনো ধর্মীয়
অনুশাসনই অগণতান্ত্রিক নয় - সেটি ধর্মীয় অনুভূতির পবিত্রতা ও সংস্কৃতির ধারাবাহিকতার
দোহাইতে বৈধ হয়ে যাবে৷ বেআইনি সম্পত্তি চিহ্ণিত করা যে কত দুরূহ সেটাই তারা জানাবে৷
ভূবনীকরণ ও বিশ্ববাজারে অংশীদারীতার নানান ঝলমলে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে এরা দেশীয় অর্থনীতিকে
আরো সঙ্কটের মুখে ঠেলে দেবে৷ ক্রমাগতই আপোষ করে চলবে মার্কিন ও পশ্চিমী দুনিয়ার আগ্রাসী
নীতির সাথে৷ সেই সাথে জনসাধারণের আন্দোলনের
বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের বর্বর আক্রমণের বিরুদ্ধে দুঃখ প্রকাশ করে সেটির যৌক্তিকতা
ও নৈতিকতা নিয়ে নানান আলোচনা করবে৷ তাই আরো স্পষ্ট করে তুলতে চাই আমার দাবী৷ এমনভাবে
প্রশ্নগুলিকে সামনে রাখতে চাই যার সাথে আমাদের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও ভবিষ্যতের ছবিটুকু
আঁকা থাকে৷ সেই উদ্দেশ্যেই এই ঘোষণাপত্র৷
২ (শিক্ষা)
আমাদের
সন্তানেরা সুস্থ পরিবেশে শিক্ষালাভ করবে - শিক্ষাঙ্গণগুলিতে মুক্ত চিন্তা-বিতর্ক-আলোচনার চর্চা চলবে - ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে
যোগ্যতা ও আপন আগ্রহে সর্বোত্তম শিক্ষার সূযোগ পাবে - এই আমার দাবী৷ দেশের সমস্ত নাগরিককে
শিক্ষার আওতায় আনতে হবে৷ সেই শিক্ষাকে হতে হবে আধুনিক মননের শিক্ষা - বৈজ্ঞানিক মননশীলতার
অনুশীলনের শিক্ষা৷ তাকে কোনো ক্রমেই ধর্মীয় সংস্কারে আবৃত রাখা যাবে না৷ বন্ধ করতে
হবে মাদ্রাসা প্রভৃতির ধর্মভিত্তিক শিক্ষা৷ ধর্মীয় কথা-উপকথা-পুরাণ শিক্ষার পাঠক্রমের
অঙ্গ হতে পারে - কিন্তু সেটি মুখ্য পাঠক্রম যেন না হয়ে ওঠে৷ বৈজ্ঞানিক পাঠক্রমের প্রেক্ষাপটে
তাকে স্থান করে দিতে হবে৷
'ভাষা' শিক্ষার অন্যতম মাধ্যম৷ অবশ্যই মাতৃভাষাকে
সেখানে জোড় দিতে হবে৷ প্রতিটি প্রদেশে কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়গুলিতও সেই প্রদেশের ভাষাগুলিকে
বঞ্চিত করা যাবে না৷ উচ্চশিক্ষাতেও মাতৃভাষার প্রচার চাই৷ বিভিন্ন প্রদেশে কেন্দ্রীয়
বিশ্ববিদ্যালয়গুলিকেও এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে৷ সেখানে সমান্তরাল মাধ্যমে
এই শিক্ষা প্রদান করতে হবে৷ যেমন পশ্চিমবঙ্গের কারিগরী বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে
ইংরাজীর পাশাপাশি বাংলাতেও শিক্ষাদানের ব্যবস্থা চাই৷
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে
রাজনৈতিক দলগুলির হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে৷ রাজনৈতিক মতের স্বাধীন অবস্থান ছাত্র ও
শিক্ষক সমাজের অধিকার৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনে গণতান্ত্রিকতা ও স্বচ্ছতা আনা
চাই৷ শিক্ষক, অশিক্ষক কর্মচারী ও ছাত্রছাত্রীদের দ্বারা গঠিত বিভিন্ন প্রতিনিধিত্বমূলক
সমিতির মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া চালু রাখতে হবে৷ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্মকাণ্ডে
যে যার ভূমিকা অনুযায়ী এই প্রক্রিয়াতে অংশ নেবে৷ যেমন পাঠক্রমের পরিকল্পনাতে, ল্যাবরেটরী-শ্রেণীকক্ষ
উন্নয়ন, পরীক্ষা-ব্যবস্থার
সংস্কার প্রভৃতিতে শিক্ষক সমাজ অগ্রণী ভূমিকা নেবে এবং তাদের মতামত গুরুত্ব পাবে৷ তেমনি
ছাত্রদের দ্বারা সংগঠিত বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা ছাত্রদের
বিভিন্ন সমিতি দ্বারা সম্পন্ন করতে হবে৷ সময়ে সময়ে বিভিন্ন অংশের সমবেত অংশগ্রহণে গুরুত্বপূর্ণ
সিদ্ধান্তগুলি নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে৷
বন্ধ
করতে হবে পরীক্ষাভিত্তিক সাজেশন-টিউশন কেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা৷ বন্ধ হোক অর্ধশিক্ষিত
বেকারবাহিনী গড়ে তোলার নৈরাজ্য৷ এই সমাজব্যবস্থায় সেটা কীভাবে সম্ভব আমার জানা নেই৷
তবু দাবীকে তো অস্বীকার করতে পারিনা৷
৩ (ভাষা)
ভাষা
নিয়ে আমার ক্ষোভ দিন দিন বেড়েই চলেছে৷ আমার ছেলেবেলাতেও বাংলাভাষা যে মর্যাদা ও গুরুত্বের
সাথে জাতীয় জীবনে গৃহীত হোতো (অন্তত আমার কাছে সেটাই মনে হোতো), আজ
সে অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে৷ আমি বুঝিনা ভারতবর্ষের প্রতিটি ভাষাই কেন হিন্দীর সমমর্যাদা
পাবে না? কেন
কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে কেবল হিন্দী আর ইংরাজীর চল থাকবে? আমরা আমাদের পারষ্পরিক বোঝাপড়ার 'ত্রিভাষিক
সূত্র'কে
খর্ব করে চলেছি এবং এ ব্যাপারে প্রাদেশিকতার ঊর্ধ্বে উন্নীত হওয়ার অহংকারে পরম সহিষ্ণুতা
অবলম্বনের নীতি গ্রহণ করেছি৷ কিন্তু এও এক ধরণের আত্মখণ্ডনের রাস্তা প্রস্তুত রাখা৷
প্রদেশগুলিতে ত্রিভাষিক সূত্র অত্যন্ত কঠোরভাবে প্রয়োগ করা চাই৷ বিভিন্ন স্তরে দোভাষী বা অনুবাদকের মাধ্যমে সরকারী
ও প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে হবে৷ প্রতিটি কর্মী বা মানুষের অধিকার থাকবে তার নিজস্ব
ভাষাতে আলাপ-আলোচনা চালাবার ও লেখা-পত্রের যোগাযোগে৷ এ ব্যাপারে ইংরাজী ভাষার গুরুত্ব
কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না৷ ঐতিহাসিকভাবেই
এই বিদেশী ভাষাটি বর্তমান শিক্ষিত ভারতীয় সমাজে ঐক্যের বন্ধন গড়ে তুলেছে৷ তাকে খর্ব
করলে এই একতার সূত্রটি নষ্ট হবে৷ এই সত্যকে ঔপনিবেশিকতার কালিমায় লিপ্ত করা মূর্খামির
নামান্তর৷ বরং হিন্দী সেই জায়গা দখল করতে চাইলে ঔপনিবেশিকতার সূত্র সরাসরি সামনে হাজির
হবে৷ হিন্দীওয়ালারা এই অনুভূতিটুকু নস্যাৎ করতে চান৷ কিন্তু হিন্দীর বদলে বাংলাকেও
জাতীয় জীবনে চাপিয়ে দিলে যে প্রতিক্রিয়া হোতো - অনুরূপ প্রতিক্রিয়াই হিন্দীর সরকারী
পৃষ্ঠপোষণ ও প্রসারণে হবে এবং হচ্ছে৷ আজ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ভাষা নিয়ে ক্ষোভ
তাই ক্রমবর্ধমান৷ সেই কারণেই চাই হিন্দীর বিশেষ মর্যাদা অবলোপন৷ তাকে রাষ্ট্রভাষা বা
রাজভাষা কোনো অভিধাতেই আখ্যায়িত করা উচিত নয়৷ সেটি অন্যান্য জাতীয় ভাষার মতই একই পঙক্তিতে
বসুক৷ যোগাযোগকারী ভাষা হিসেবেই ইংরাজী ও হিন্দীর ভূমিকা গৃহীত হোক৷ তেমনি সমস্ত কেন্দ্রীয়
প্রতিষ্ঠানগুলিতে হয় ত্রিভাষিক সূত্রের যথাযথ প্রয়োগ হোক,
নয়তো ইংরাজী ও প্রাদেশিক
ভাষা প্রয়োগের দ্বিভাষিক নীতি গ্রহণ করা হোক৷
কোনো
প্রদেশের অভ্যন্তরেও অন্যভাষার যথেষ্টসংখ্যক মানুষ থাকেন৷ যেমন আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই
বাস করেন নেপালী, রাজবংশী ও সাঁওতালী ভাষার বহু মানুষ৷ ঝাড়খণ্ড ও আসামেও তেমনি বাস
করেন বহু বাঙালী৷ এই সমস্ত অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাকেও সমমর্যাদা দিতে হবে৷ চাই তাদের
প্রশাসনিক স্বীকৃতি ও দোভাষীর সাহায্যে প্রদেশের অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ গড়ে
তোলার পরিকল্পনা৷ এই কারণেই জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে প্রশাসনিক স্তরে দোভাষী ও ভাষা-অনুবাদকের
পদ সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদের প্রশিক্ষিত করতে কর্মসূচী নিতে হবে৷
শিক্ষাতেও
মাতৃভাষার প্রচলন আবশ্যিক করতে হবে৷ উচ্চশিক্ষাতে মাতৃভাষা প্রসারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ
করতে হবে৷ যেভাবে স্বাধীন জাতি তাদের ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেই
নীতি অবলম্বন করতে হবে৷ এর অর্থ ইংরাজী পরিত্যাগও নয়, আবার স্বদেশী ভাষাকে ব্রাত্য রাখাও নয়৷ প্রয়োজন
এই দুইয়েরই মেলবন্ধন৷
বিভিন্ন
কার্য্যকরী পদক্ষেপ এই সমস্ত বিষয়েই গ্রহণ করা চাই৷ কোনো প্রদেশের আভ্যন্তরীণ সমস্ত
কাজকর্মে সেই প্রদেশের ভাষা বা অঞ্চল বিশেষে অঞ্চলের স্থানীয় ভাষাকে আবশ্যিক করতে হবে৷
অযথা যেখানে সেখানে ইংরাজীর ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে হবে৷ অফিস-আদালত -প্রশাসন-স্বাস্থ্য
বিভিন্ন বিভাগে এই নীতি অবলম্বন করা চাই৷ কেবলমাত্র আন্তর্প্রাদেশিক যোগযোগে ইংরাজী
বা উদ্দিষ্ট প্রদেশের ভাষা ব্যবহার করা যাবে৷ এক্ষেত্রে ভাষা অনুবাদকেরা গুরুত্বপূর্ণ
ভূমিকা গ্রহণ করতে পারেন৷ উদাহরণ স্বরূপ, কোনো কেন্দ্রীয় দপ্তরে বা ভিন রাজ্যের কোনো
সংস্থা পশ্চিমবঙ্গে পত্র পাঠালে তার ভাষা হবে নয় বাংলা, অথবা ইংরাজী৷ একই কথা প্রযোজ্য পশ্চিমবঙ্গ
থেকে প্রেরিত ভিন রাজ্যের উদ্দেশ্যে পত্রাদির ক্ষেত্রে৷ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে প্রাদেশিক
ভাষায় শিক্ষার সমসূযোগ বর্তমান থাকতে হবে৷ সেই অঞ্চলের কনফারেন্স বা সম্মেলনে প্রাদেশিক
ভাষার যোগদানকে স্বাগত জানাতে হবে৷
স্বাধীনতার
পর ভারতবর্ষের অখণ্ডতার সামনে মস্ত চ্যালেঞ্জ এই বহু ভাষাভিত্তিক জনজাতির সমবিকাশের
শর্তের পরিপূরণ৷ আমাদের প্রাথমিক নীতিকারেরা যদিও এ ব্যাপারে সংবেদনশীল ছিলেন, তবুও
সেই নীতির বহু জায়গায় দুর্বলতা থেকে যায়৷ তার একটি হিন্দীর উপর আলাদা গুরুত্ব আরোপ
এবং প্রশাসনে ভাষা অনুবাদকের ভূমিকাকে গুরুত্ব না দেওয়া৷ রাজ্যগুলিতেও এই পরিবেশে শিক্ষার
প্রসারে মাতৃভাষা গুরুত্ব পায়নি৷ তবুও প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে বিবেচনা
করে ভাষাগুলিকে যে গুরুত্ব দেওয়া হোতো বর্তমানে কেন্দ্রীয় নীতিতে সেটি অনুপস্থিত৷ উপরন্তু
হিন্দীকে সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া ও প্রাদেশিক ভাষার গুরুত্ব খর্ব করে তাকে প্রতিষ্ঠিত
করার সরকারী প্রয়াসও নজরে পড়ার মত৷ ভারতবর্ষের ঐক্যের পরিপন্থী এই নীতিকে অবিলম্বে
বর্জন করতে হবে৷
৪ (ধর্ম)
যতদিন
যাচ্ছে ততই দেখা যাচ্ছে ধর্ম আবার তার পুরানো সামন্ততান্ত্রিক চেহারাতে ব্যক্তি মানুষের
জীবনে হাজির হচ্ছে৷ ধর্মীয় নেতারা নানান ফতোয়া জারি করছে - অন্য ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ
ও ঘৃণার মনোভাবকে লালন করছে৷ দেশপ্রেম ও ঈশ্বরপ্রেমের নামে বিধর্মী বা কাফেরদের বিরুদ্ধে
সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সমস্ত উসকানি নিয়ে রাজনীতির মঞ্চ আলোকিত করছে৷ ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র
এই অনৈতিক কাজিয়ায় নিরপেক্ষতার নিষ্ক্রিয় আবরণে ঠুঁটো জগন্নাথের মতোই চেয়ে আছে৷ তার
আদালত না দিতে পারে শাস্তি ঐতিহাসিক স্থাপত্য ধ্বংসের নায়কদের, না
পারে প্রশাসন নিরীহ নাগরিকের ধনমানজীবনকে পদদলিত করা দুর্বৃত্তদের রুখতে৷ উপরন্তু প্রশাসনের
সক্রিয় সহযোগিতায় যখন হত্যার এই তাণ্ডবলীলা সংগঠিত হয় সেই খলনায়কদের কোনো শাস্তি দিতেও
সে অপারগ৷ দেশে এতরকম সন্ত্রাসবিরোধী আইন আছে - সাম্প্রদায়িকতার বিষ ছড়ানো এই বিষাক্ত
মানুষদের দমনের কোনো আইন নেই৷ খাতায় কলমে তেমন কিছু থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে সেগুলির কোনো প্রয়োগ চোখে পড়েনা৷
তাই
স্পষ্টতই এই দাবী রাখি যে ধর্মীয় অনুশাসনের নামে কোনো গণতান্ত্রিক অধিকারকে খর্বিত
করা চলবেনা৷ ব্যক্তির স্বাধীনতা - তার রুচি, শিক্ষা, বিবাহ, সমাজজীবনের স্বাভাবিক অংশগ্রহণ - ধর্মীয়
অনুশাসনের বেড়ায় দ্বিখণ্ডিত করা চলবে না৷ সমাজের সমস্ত মানুষের কাছে এই গণতান্ত্রিক
অধিকার অবাধ ও আইনের দুয়ারে সমমর্যাদায় স্বীকৃত হতে হবে৷ এ ব্যাপারে ফতোয়া প্রদানকারী
তথাকথিত ধর্মগুরুদের বিরুদ্ধে আইন মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে৷ ধর্মীয় সংগঠনগুলির
বিপুল সম্পত্তির উৎস ও ব্যবহারকে সমীক্ষা করতে হবে এবং সেগুলির সমাজের জনকল্যানমূলক
কাজে ব্যবহার করতে হবে৷ ধর্মীয় সংগঠনগুলি দ্বারা পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলিতে কোনো ধর্মীয়
ভেদাভেদ চলবে না৷ তেমনি ধর্মীয় সংগঠন পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থাকে বৈজ্ঞানিক ধর্মনিরপেক্ষ
শিক্ষাব্যবস্থার অধীনে আনতে হবে৷ বিশেষ বিশেষ ধর্মীয় উৎসব যেগুলি জাতীয় জনজীবনকে প্রভাবিত
করে, সেগুলিতে
সকল সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণকে উৎসাহিত করতে হবে৷
এটা
সত্যি যে ধর্মের সাথে আমাদের জনজীবনের সংস্কৃতি ও সমাজজীবন অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত৷ সেই
কারণে ধর্মকে সংস্কৃত করার লক্ষ্যে তার মানবিক আদর্শগুলিকে তুলে ধরতে হবে৷ অন্যদিকে
পরধর্ম অসহিষ্ণুতা ও আপন-শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকাকে খর্ব করার যাবতীয় প্রয়াস রাষ্ট্রের
তরফ থেকে সচেতনভাবে নিতে হবে৷ সেই সাথে সমাজজীবনে ভিন্ন ধর্মের মানুষের মেলামেশা ও
সামাজিক আদান প্রদানের বাতাবরণ গড়ে তুলতে হবে৷ এর জন্য রাষ্ট্রকে যেমন ধর্মান্ধতার
বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকারগুলি রক্ষা করার দায়িত্ব নিতে হবে - তেমনি
সাম্প্রদায়িক রাজনীতিকে কঠোরভাবে দমন করতে হবে৷
৫ (বেআইনী সম্পত্তির দখল)
সরকারী
কোষাগারের ভাঁড়ে মা ভবানী - এ আক্ষেপ প্রায়ই শোনা যায়৷ আর তাই কোষাধ্যক্ষের যাবতীয়
রোষ 'ভর্তুকি'প্রাপ্ত
জনগনের প্রতি৷ কথায় বলে ন্যাংটার নেই বাটপারের ভয়৷ কিন্তু ন্যাংটার জীবনটাতো থাকে ৷
সেটা নিয়ে যখন টানাটানি চলে, তখন সে যায় কোথা? অথচ
কোষাগারে যে বিপুল পরিমান ফাঁকি জমা আছে, তার হিসেব কেই বা রাখে? আমি
বলছি আমাদের শিল্পপতি, বড় ব্যবসায়ী ও ধনী কৃষকদের অংশটির কথা৷ দেশের
পরিকাঠামো উন্নয়নে চলে তাদের নিত্য বায়নাক্কা ও গুরুগম্ভীর ভাষণ - কিন্তু রাজস্ব জমা
দেওয়ার ব্যাপারে তারা কুণ্ঠিতহস্ত৷ বরং আপামর জনসাধরণের ভোগের পরিকাঠামোর কড়ি কেন তারা
গুনবেন, সেই
দর্শনের মহান বাণী ও উপদেশও তারা নিত্য দিয়ে থাকেন৷ আর উপসংহারে ঝুলি থেকে বেড়াল বেরোয়
- 'মুনাফাবাজীর
জন্য উন্মুক্ত হোক পথঘাট - নদীনালা- পুষ্করীণী - গোটা দেশটাই'৷
শুধু বেআইনি ঘুষই আর নয়, রাষ্ট্রীয় চৌকিদারির আইনি আশিসে শুদ্ধ হোক
তাদের এই নয়া আব্দার৷ এখন এদের পয়সা এত হয়েছে যে রাষ্ট্রকে নিলামে তুলতে পারাই মুক্তবাণিজ্যের
অন্যতম শর্ত হিসাবে এরা হাজির করল বলে?
অথচ
এই সম্পত্তির উৎস খোঁজাও নিশ্চয়ই অন্যায় নয়৷ প্রতিনিয়ত মাফিয়া ও রাজনৈতিক নেতাদের যা
বিপুল সম্পত্তির খবর গণমাধ্যমগুলিতে প্রচারিত হয় রাষ্ট্র কী খোঁজ নেবেনা তার কতখানি
বৈধ? বিশেষতঃ
আশির দশকের পরে যে সব শিল্পপতিদের অকস্মাৎ উথ্থান - তাদের নেপথ্যের বেআইনী কারবারের কথা বিভিন্ন সময়েই
সামনে এসে গেছে৷ রাষ্ট্রের কাছে আমার এই দাবী যে সেগুলিকে অবশ্যই চিহ্ণিত করতে হবে
এবং বাজেয়াপ্ত করতে হবে৷
এর
সাথে রয়েছে বিভিন্ন শিল্পপতি ও শিল্পসংস্থা কর্তৃক রাষ্ট্রীয় ব্যঙ্কগুলি থেকে গৃহীত
বিপুল অনাদায়ী ঋণের পরিমান৷ এই ঋণের দায় উত্তরাধিকারসূত্রে শিল্পপতিদের পরিবারগুলো
ও তাদের নানা সম্পত্তির উপর বর্তাতে হবে এবং সেগুলিকে অধিগ্রহণ করতে হবে৷ আমার এই দাবী
এই দেশের আইনীব্যবস্থার বিপক্ষে দাঁড়িয়ে নতুন কোনো কথা নয়৷ এই ধরণের বেনিয়ম রোখার বিভিন্ন
আইন নিশ্চয়ই বর্তমান৷ তবে সেগুলিকে হয় আরো শক্ত করা প্রয়োজন, নয়
রাষ্ট্রকে সেই আইনের প্রয়োগে আরো সক্রিয় ভূমিকা
নিতে হবে৷ সন্ত্রাসদমনের নামে গণআন্দোলোনগুলিকে রুখতে রাষ্ট্র যতটা তৎপর তার সিকিভাগ
এই ধরণের অসাধু উপার্জনকে কব্জা করার বিষয়ে দেখালে, রাষ্ট্রীয় কোষাগারের 'তথাকথিত' দৈন্যদশা
নিয়ে হাহুতাশ করতে হোতো না৷ অবশ্য রক্ষকই যখন ভক্ষক তখন কেই বা কার উপর এই আইন প্রয়োগ
করে৷
৬ (স্বাস্থ্য ও পরিবেশ)
সান্তাবারবারাতে
কিছু দক্ষিণকোরীয় প্রফেসরের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল৷ কথায় কথায় জেনেছিলাম যে সে দেশের
চিকিৎসা-সংক্রান্ত যাবতীয় পরিষেবা সরকারী হাসপাতালগুলিতে উপলভ্য৷ কোনো ধরণের সমান্তরাল
বেসরকারী চিকিৎসা পরিকাঠামো সেখানে গড়ে ওঠেনি৷ আমরা জানি দক্ষিণ কোরিয়া একটি শিল্পোন্নত
পুঁজিবাদী দেশ৷ তবুও সেখানে স্বাস্থ্য নিয়ে মুনাফাবাজী করার মওকা সরকার বাজারের হাতে
ছেড়ে দেয়নি৷ হয়তো কালে সে ব্যবস্থা কায়েম হবে এবং জনসাধারণের অশেষ দুর্গতি বাড়বে৷ এমনটিই
তো হচ্ছে অধুনা ব্রিটেনে৷ এক সময় আমাদের রাজ্যেও সরকারী ব্যবস্থার বিশেষ বিকল্প কিছু
ছিলনা৷ সে কারণে সরকারী হাসপাতালে উন্নত পরিষেবা প্রদানে সরকার কিছুটা বাধ্য ছিল৷ কিন্তু
আজ বেসরকারী প্রতিষ্ঠানদের রমরমা৷ গ্রামের গরীব মানুষেরাও নার্সিংহোমে ছোটেন বিভিন্ন
অসুখ বিসুখে - সরকারী হাসপাতালের এমনই দুর্নাম৷ এতে ব্যবসায়ীদের পোয়া বারো৷ সরকারী
পরিষেবা যত দুর্বল হবে, যত তার বিশ্বাসযোগ্যতা হারাবে, ততই
বিকল্প খুঁজে বেড়াবে মানুষ৷ যদিও সেখানেও পরিষেবা কতটুকু উন্নত সে নিয়ে বহু প্রশ্ন
থেকে যায়৷ তবুও সেই কানামামাই পরিত্রাতার ভূমিকায়৷ এতে সরকারের লাভ - নিজের দায়িত্বকে
ঝেড়ে ফেলা৷ আর ব্যবসায়ীদের লাভ - অধিক মুনাফা কামানো৷ মাঝখান থেকে সাধারণের অশেষ দুর্ভোগ৷
শুধু স্বাস্থ্য কেন? যে কোনো সামাজিক পরিষেবার ক্ষেত্রেই এই হালচাল৷
সরকারীবিভাগুলি বেসরকারীকরণের অপেক্ষাতে - যাতে মানুষ সেই অত্যাবশ্যক পরিষেবা পেতে
গাঁটের পয়সা গুণে দেয়৷ সরকারী বাজনায় এখন নতুন খাজনা আদায়ের এই বেসরকারী বন্দোবস্ত৷
সে কারণেই শুদ্ধ পানীয় জলের সরবরাহকে অবহেলা করে মানুষকে ঠেলে দেওয়া হয় 'বোতলে'র
জল কিনতে৷ এমন দিনও আসছে পানীয় জলগুলির ঠিকাদারিতে দেশের নদীনালাগুলি নিলাম হয়ে যাবে৷
আর সে কারণেই খুব স্পষ্টভাবে দাবী জানাই জীবনধারণের আবশ্যিক শর্তগুলিকে সরকারী ব্যবস্থায়
পূরণ করতে হবে এবং উন্নততর জীবনের লক্ষ্যেই সেই পরিষেবা প্রদান করতে হবে৷ তেমনি বেসরকারী
প্রতিষ্ঠানগুলির স্বেচ্ছাচার বন্ধ করে সেগুলিকে সরকারী পরিষেবার অধীনে আনতে হবে৷ জীবনদায়ী
ওষুধ থেকে প্রতিষেধক টীকা সমস্ত কিছুর যোগান নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য নীতি গ্রহণ করতে
হবে৷ কিছুদিন আগেই সংবাদে শুনেছিলাম এবার বাজেটে গাড়ির দাম কমছে এবং ওষুধের দাম বাড়ছে৷
এতেই বোঝা যায় আমাদের সরকার কাদের স্বার্থে কাজ করছে৷ অথচ দেশের প্রতিটি জনপদেই চাই
উন্নত হাসপাতাল, স্কুল, কলেজ, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ, টেলি যোগাযাগ, স্টেডিয়াম, রঙ্গমঞ্চ, উদ্যান, ইত্যাদি৷ চাই সুস্থ পরিবেশ, দূষণমুক্ত
বায়ু, জল
ও মাটী ৷ যদি কোনো রাষ্ট্র ও সমাজ শুধুই সরকারী কোষাগারের দৈন্যদশা ও নানা অজুহাতে
আপন অসহায়তা ব্যক্ত করে - তবে চাই সেই রাষ্ট্র ও সমাজের পরিবর্তন৷
১০/২/২০০৬

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home