আঞ্চলিক ভাষার প্রান্তিকতা
আজ একুশে ফেব্রুয়ারী৷ আন্তর্জাতিক ভাষা দিবস৷ আজকের দিনে ভারতবর্ষের ভাষা নীতির সমীক্ষা করা প্রাসঙ্গিক৷
বিশেষতঃ একটি আঞ্চলিক ভারতীয় ভাষা হিসাবে আমাদের জীবনে বাংলার ভূমিকা কতখানি সেটা বুঝে
নেওয়া প্রয়োজন৷ জাতীয় জীবনে একজন বাংলাভাষী নাগরিকের অংশগ্রহণ কতটা সামগ্রিক,
আর
কতখানি সীমাবদ্ধ তার পর্যালোচনা করা প্রয়োজন৷ এটা বোঝা দরকার, কেন বাংলা
ভাষা শিক্ষা এতটা অবহেলিত? কেনই বা শুধু শহরেই নয়, গ্রামে
গঞ্জেও ইংরাজী মাধ্যমে পড়াশুনা করানোর এত চাহিদা? কেনই বা বাঙালীঘরের
মা-বাবারাও সন্তানদের বাংলার বদলে হিন্দী ভাষা শেখাতে এত আগ্রহী? এ বছরের
মাধ্যমিক পরীক্ষার্থীদের পরিসংখ্যানও বলে দেয় বিষয়টি যথেষ্টই উদ্বেগজনক৷ গতবারের তুলনায়
সেই সংখ্যাটি প্রায় ১৫০০০ কমেছে৷ সাধারণতঃ জনসংখ্যার বৃদ্ধির নিরিখে এটি ক্রমবর্ধমান
হওয়াই স্বাভাবিক৷ যদিও পর্ষদ সভাপতি বিষয়টিকে লঘু করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন এই বলে
যে এ বার কম্পার্টমেন্টাল পরীক্ষার্থীর সংখ্যটিই আদতে কমেছে৷ কিন্তু বিষয়টিকে এই ভাবে
উপেক্ষা করে গেলে আসলে ভাবের ঘরেই চুরি করা হবে৷ বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে আমাদের
গর্ব কম নয়৷ ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের মনীষীদের দ্বারা সমৃদ্ধ এই সংস্কৃতির উত্তরাধিকার
আমরা বহন করছি৷ কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির
বিচারে সেই উত্তরাধিকারের দায়িত্ব বহনে আমাদের
যোগ্যতা প্রশ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে৷ এটা আমাদের কাছে সুখের ও গর্বের বিষয় যে আন্তর্জাতিক
মঞ্চে বাংলাকে তুলে ধরার জন্য আমাদের পড়শী দেশটি তার স্বাধীন ও স্বতন্ত্র ভূমিকা গ্রহণে
সক্ষম৷ ঠিক ততখানিই পীড়াদায়ক বাংলাভাষা নিয়ে আমাদের উদাসীনতা৷ অন্যান্য আঞ্চলিক ভারতীয়
ভাষার মতই আমাদের জাতীয় জীবনে এটিও কার্যত প্রান্তিক৷ আমার ছেলেবেলাতেও বাংলাভাষা যে মর্যাদা ও গুরুত্বের
সাথে জাতীয় জীবনে গৃহীত হোতো (অন্তত আমার কাছে সেটাই মনে হোতো), আজ সে
অবস্থার অনেক অবনতি হয়েছে৷ তাতে শুধু একজন বাংলাভাষী বলেই নয়, একজন
ভারতবাসী হিসেবেও আমি উদ্বিগ্ন৷ আমি উদ্বিগ্ন হই যখন কেন্দ্রীয় দপ্তরগুলিতে হিন্দী
চালু করাকে প্রায় বাধ্যতামূলক করার ফতোয়া জারি হয়৷ আমার অস্বস্তি হয় যখন পশ্চিমবঙ্গের
কোনা সরকারী ব্যাঙ্কের আধিকারিক বা কর্মচারীর কাছ থেকে কেবলই 'হিন্দী'
ভাষাতে
জবাব মেলে৷ ব্যথিত হই যখন দেখি এই রাজ্যের কোনো কেন্দ্রীয় বিদ্যালয়ে বাংলাভাষা শেখানোর
কোনো ব্যবস্থাই থাকেনা৷ এরকম বহু উদাহরণই আমরা আমাদের ব্যবহারিক জীবনে পাব,
যেখানে হিন্দীর সাপেক্ষে বাংলাভাষার প্রান্তিকতা ও গুরুত্বহ্রাসের
বিষয়টি সহজেই অনুভূত হয়৷
প্রশ্ন ওঠে একজন বাংলাভাষী হিসেবে আমরা কী এ বিষয়ে সচেতন?
না
কী আমরা জেনে বুঝেও উদাসীন? কেউ কেউ হয়তো এই অনুভবের বহিঃপ্রকাশে প্রাদেশিকতা
বা উগ্র-বাঙালী জাতীয়তাবাদের ছোঁয়াচ লেগে যাওয়ার আশংকাতে শঙ্কিত৷ অথচ বিষয়টিকে অগ্রাহ্য
করাও সমীচীন কিনা আমাদের ভেবে দেখতে হবে৷ প্রশ্নটি ভারতবর্ষের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির
স্বার্থেও প্রাসঙ্গিক৷ বাংলাভাষী হিসেবে আমরা যেমন বাঙালী, তেমনই ভারতীয়ও৷
আমাদের এই দ্বৈত পরিচয়ই জাতীয় সংহতির চাবিকাঠি৷ সেখানে আঞ্চলিক ভাষাগুলির প্রান্তিকতার
প্রক্রিয়াটি সেই ঐক্যের কতটা পরিপন্থী, তা নিয়ে আমাদের ভাববার সময় হয়েছে৷
সেই কারণেই আমাদের ভাষা নীতির পর্যালোচনা প্রয়োজন৷
এটা অনস্বীকার্য যে আমাদের সংবিধান হিন্দীকে রাজভাষা হিসেবে সুস্পষ্ট ভাবে চিহ্ণিত করেছে৷ অন্যদিকে অন্যান্য
ভারতীয় ভাষাকে আঞ্চলিক ভাষার সীমানায় সীমিত রেখেছে৷ সেই সাথে হিন্দীর প্রচার ও প্রসারে
সংবিধান যেভাবে দায়বদ্ধ, আঞ্চলিক ভাষাগুলির ক্ষেত্রে তা নয়৷ সেখানে
কোনো সুষ্পষ্ট নির্দেশিকা নেই৷ এমনকী তথাকথিত ত্রিভাষার সূত্র অনুসরনের কোনো উল্লেখ
সেখানে পাওয়া যায়না৷ তবুও স্বাধীনতা পরবর্তী সরকারগুলি এই ত্রিভাষানীতি গ্রহণের (রাজ্যগুলিতে
সেই প্রদেশের ভাষা, হিন্দী ও ইংরাজীর সম গুরুত্ব ও ব্যবহার) মাধ্যমে জাতীয় জীবনে এক
ধরণের বোঝাপড়া গড়ে তুলেছিল৷ কিন্তু উত্তোরোত্তর কেন্দ্রীয় সরকারগুলির নীতিতে সেটি উপেক্ষিত
হচ্ছে৷ বরং সংবিধান প্রণীত ৩৫১ নম্বর ধারাটির আক্ষরিক রূপায়নে অতি সক্রিয়তা দেখা যাচ্ছে৷
আশংকার মেঘ সেখানেই ঘণীভূত হচ্ছে৷ সেই কারণেই সময় হয়েছে, এই ভাষা নীতির
দুর্বলতা ও সংশয়কে ঝেড়ে ফেলার৷ খুব সুস্পষ্টভাবেই ত্রিভাষার নীতিকে গ্রহণ করতে হবে
এবং সমস্ত ভারতীয় ভাষাকে সমমর্যাদা দিতে হবে৷
প্রদেশগুলিতে তাদের নিজস্ব ভাষায় কাজকর্ম চালানোর অধিকারকে (সে
সরকারী, বেসরকারী, কেন্দ্রীয় কী প্রাদেশিক প্রতিষ্ঠানই হোক
না কেন) প্রশাসনিক স্তরে সর্বাধিক গুরুত্ব ও স্বীকৃতি দিতে হবে৷ এর জন্য বিভিন্ন স্তরে দোভাষী বা অনুবাদকের মাধ্যমে সরকারী
ও প্রশাসনিক কাজকর্ম চালাতে হবে৷ এর অর্থ, প্রতিটি কর্মী বা মানুষের অধিকার
থাকবে তার নিজস্ব ভাষাতে আলাপ-আলোচনা চালাবার ও লেখা-পত্রের যোগাযোগে৷
এ ব্যাপারে ইংরাজী ভাষার গুরুত্ব কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না৷ ঐতিহাসিকভাবেই এই বিদেশী ভাষাটি বর্তমান শিক্ষিত
ভারতীয় সমাজে ঐক্যের বন্ধন গড়ে তুলেছে৷ তাকে খর্ব করলে এই একতার সূত্রটি নষ্ট হবে৷
এই সত্যকে ঔপনিবেশিকতার কালিমায় লিপ্ত করা মূর্খামির নামান্তর৷ বরং হিন্দী সেই জায়গা
দখল করতে চাইলে ঔপনিবেশিকতার সূত্র সরাসরি সামনে হাজির হবে৷ হিন্দীওয়ালারা এই অনুভূতিটুকু
নস্যাৎ করতে চান৷ কিন্তু হিন্দীর বদলে বাংলাকেও জাতীয় জীবনে চাপিয়ে দিলে যে প্রতিক্রিয়া
হোতো - অনুরূপ প্রতিক্রিয়াই হিন্দীর সরকারী পৃষ্ঠপোষণ ও প্রসারণে হবে এবং হচ্ছে৷ আজ
ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রদেশে ভাষা নিয়ে ক্ষোভ তাই ক্রমবর্ধমান৷ সেই কারণেই চাই হিন্দীর
বিশেষ মর্যাদা অবলোপন৷ তাকে রাষ্ট্রভাষা বা রাজভাষা কোনো অভিধাতেই আখ্যায়িত করা উচিত
নয়৷ সেটি অন্যান্য জাতীয় ভাষার মতই একই পঙক্তিতে বসুক৷ যোগাযোগকারী ভাষা হিসেবেই ইংরাজী
ও হিন্দীর ভূমিকা গৃহীত হোক৷ তেমনি সমস্ত কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলিতে হয় ত্রিভাষিক
সূত্রের যথাযথ প্রয়োগ হোক, নয়তো ইংরাজী ও প্রাদেশিক ভাষা প্রয়োগের দ্বিভাষিক
নীতি গ্রহণ করা হোক৷
কোনো প্রদেশের অভ্যন্তরেও অন্যভাষার যথেষ্টসংখ্যক মানুষ থাকেন৷
যেমন আমাদের পশ্চিমবঙ্গেই বাস করেন নেপালী, রাজবংশী ও সাঁওতালী
ভাষার বহু মানুষ৷ ঝাড়খণ্ড ও আসামেও তেমনি বাস করেন বহু বাঙালী৷ এই সমস্ত অঞ্চলের স্থানীয়
ভাষাকেও সমমর্যাদা দিতে হবে৷ চাই তাদের প্রশাসনিক স্বীকৃতি ও দোভাষীর সাহায্যে প্রদেশের
অন্যান্য অঞ্চলের সাথে যোগাযোগ গড়ে তোলার পরিকল্পনা৷ এই কারণেই জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে
প্রশাসনিক স্তরে দোভাষী ও ভাষা-অনুবাদকের পদ সৃষ্টি করতে হবে এবং তাদের প্রশিক্ষিত
করতে কর্মসূচী নিতে হবে৷
শিক্ষাতেও মাতৃভাষার প্রচলন আবশ্যিক করতে হবে৷ উচ্চশিক্ষাতে মাতৃভাষা
প্রসারের বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে৷ যেভাবে স্বাধীন জাতি তাদের ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম
হিসেবে বেছে নিয়েছে, সেই নীতি অবলম্বন করতে হবে৷ এর অর্থ ইংরাজী পরিত্যাগও নয়,
আবার
স্বদেশী ভাষাকে ব্রাত্য রাখাও নয়৷ প্রয়োজন এই দুইয়েরই মেলবন্ধন৷
স্বাধীনতার পর ভারতবর্ষের অখণ্ডতার সামনে মস্ত চ্যালেঞ্জ এই বহু
ভাষাভিত্তিক জনজাতির সমবিকাশের শর্তের পরিপূরণ৷ আমাদের প্রাথমিক নীতিকারেরা যদিও এ
ব্যাপারে সংবেদনশীল ছিলেন, তবুও সেই নীতির বহু জায়গায় দুর্বলতা থেকে
যায়৷ তার একটি হিন্দীর উপর আলাদা গুরুত্ব আরোপ এবং প্রশাসনে ভাষা অনুবাদকের ভূমিকাকে
গুরুত্ব না দেওয়া৷ রাজ্যগুলিতেও এই পরিবেশে শিক্ষার প্রসারে মাতৃভাষা গুরুত্ব পায়নি৷
তবুও প্রথমদিকে সাধারণ মানুষের অনুভূতিকে বিবেচনা করে ভাষাগুলিকে যে গুরুত্ব দেওয়া
হোতো বর্তমানে কেন্দ্রীয় নীতিতে সেটি অনুপস্থিত৷ উপরন্তু হিন্দীকে সমস্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে
দেওয়া ও প্রাদেশিক ভাষার গুরুত্ব খর্ব করে তাকে প্রতিষ্ঠিত করার সরকারী প্রয়াসও নজরে
পড়ার মত৷ ভারতবর্ষের ঐক্যের পরিপন্থী এই নীতিকে অবিলম্বে বর্জন করে সংবিধান স্বীকৃত
সমস্ত ভাষাগুলির সমমর্যাদা প্রদানের নীতি গ্রহণ করা প্রয়োজন৷
২১.২.২০১৫

0 Comments:
Post a Comment
Subscribe to Post Comments [Atom]
<< Home